Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

শরদা শ্রীনিবাসন: প্রাচীন ভারতের ধাতুবিদ্যার ইতিহাসকে নতুন চোখে দেখা এক মহীয়সী নারী।

ভারতের ইতিহাসকে আমরা সাধারণত রাজা-রাজড়া, যুদ্ধ, সাম্রাজ্য, সাহিত্য কিংবা স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে দেখি। কিন্তু একটি সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতির গল্প লুকিয়ে থাকে তার প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা এবং মানুষের হাতে তৈরি বস্তুগুলির মধ্যেও। হাজার বছর আগে কোন ধাতু কীভাবে গলানো হত, কীভাবে অস্ত্র তৈরি হত, কীভাবে মূর্তি ঢালাই করা হত কিংবা কোন প্রযুক্তির মাধ্যমে অসাধারণ মানের ইস্পাত তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল—এই প্রশ্নগুলিও একটি দেশের ইতিহাস বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের এই বিস্মৃত প্রযুক্তির ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অনুসন্ধান করেছেন অধ্যাপক শরদা শ্রীনিবাসন। প্রত্নতত্ত্ব, ধাতুবিদ্যা, শিল্প-ইতিহাস, প্রকৌশল এবং ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প—এই একাধিক ক্ষেত্রকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করে তিনি ভারতীয় ঐতিহ্য গবেষণায় একটি স্বতন্ত্র পথ তৈরি করেছেন। তিনি বেঙ্গালুরুর National Institute of Advanced Studies-এর অধ্যাপক এবং প্রাচীন ধাতু ও ধাতুশিল্পের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত।

প্রকৌশল থেকে প্রত্নতত্ত্বের পথে

শরদা শ্রীনিবাসনের শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি। তিনি ১৯৮৭ সালে IIT Bombay থেকে Engineering Physics-এ B.Tech সম্পন্ন করেন। এরপর লন্ডনের School of Oriental and African Studies থেকে Art and Archaeology-তে মাস্টার্স করেন। ১৯৯৬ সালে University College London-এর Institute of Archaeology থেকে Archaeometallurgy-তে PhD অর্জন করেন।

এই শিক্ষাগত যাত্রার মধ্যেই তাঁর কাজের ভবিষ্যৎ দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু প্রাচীন নিদর্শন দেখবেন না, বরং তার ভিতরের বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিও বুঝতে চাইবেন।

একটি কয়েকশো বছরের পুরনো ধাতব মূর্তি তাঁর কাছে শুধুই শিল্পকর্ম নয়। সেটি একই সঙ্গে একটি প্রযুক্তিগত দলিল। মূর্তির ধাতব সংমিশ্রণ, তৈরির পদ্ধতি, ব্যবহৃত আকরিক এবং কারিগরদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান—সবকিছু বিশ্লেষণ করে সেই সময়ের সমাজ ও প্রযুক্তির ইতিহাস পুনর্গঠন করা যায়।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে প্রচলিত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার পাশাপাশি archaeometallurgy বা প্রত্নধাতুবিদ্যার দিকে নিয়ে যায়।

প্রাচীন ধাতুর ভিতরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস

শরদা শ্রীনিবাসনের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন ধাতব শিল্প।

তিনি দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন ধাতব মূর্তি, ধাতব পাত্র, ব্রোঞ্জ, প্রাচীন খনি এবং ঐতিহ্যবাহী ধাতুশিল্পের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর গবেষণায় রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ, trace-element analysis এবং lead-isotope analysis-এর মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনও ধাতব বস্তু কোথায় তৈরি হয়েছিল, কোন ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছিল এবং বিভিন্ন অঞ্চলের কারিগরি ঐতিহ্যের মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সম্ভব হয়েছে।

এখানেই তাঁর গবেষণার বিশেষত্ব।

প্রত্নতত্ত্ব যেখানে অতীতের বস্তু খুঁজে বের করে, বিজ্ঞান সেখানে সেই বস্তুর গঠন বিশ্লেষণ করে। আর এই দুই জগতকে একসঙ্গে ব্যবহার করে শরদা শ্রীনিবাসন অতীতের প্রযুক্তিকে নতুনভাবে পড়ার চেষ্টা করেছেন।

ভারতের কিংবদন্তি ‘উট্‌জ’ ইস্পাত

তাঁর গবেষণার অন্যতম পরিচিত বিষয় Wootz steel বা উট্‌জ ইস্পাত।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতে উচ্চমানের ইস্পাত তৈরির একটি বিশেষ প্রযুক্তি ছিল। এই ইস্পাতের সঙ্গে পরবর্তীকালে বিখ্যাত Damascus steel-এর ইতিহাসেরও সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ ভারতে crucible process-এর মাধ্যমে উচ্চ-কার্বনযুক্ত ইস্পাত তৈরির ঐতিহ্য নিয়ে শরদা শ্রীনিবাসন দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন।

তিনি সহ-লেখক হিসেবে India’s Legendary Wootz Steel বইটিও প্রকাশ করেছেন। বইটিতে প্রাচীন ভারতের এই গুরুত্বপূর্ণ ধাতুবিদ্যার প্রযুক্তি, ইতিহাস এবং বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

উট্‌জ ইস্পাতের গবেষণা শুধু একটি পুরনো ধাতুর ইতিহাস নয়। এটি দেখায় যে শিল্পবিপ্লবের বহু আগে ভারতীয় কারিগররা ধাতুর বৈশিষ্ট্য, তাপ, কার্বন এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অত্যন্ত উন্নত ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

এই জ্ঞান অনেক সময় লিখিত বৈজ্ঞানিক গ্রন্থে সংরক্ষিত ছিল না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম কারিগরদের হাতে-কলমে তা বেঁচে ছিল।

শরদা শ্রীনিবাসনের গবেষণা সেই অদৃশ্য জ্ঞানকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছে।

চোল ব্রোঞ্জ ও নটরাজের বিজ্ঞান

দক্ষিণ ভারতের চোল যুগের ব্রোঞ্জ মূর্তি ভারতীয় শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বিশেষ করে নটরাজের মূর্তি বিশ্বজুড়ে ভারতীয় শিল্পের এক পরিচিত প্রতীক।

কিন্তু একটি নটরাজ মূর্তি কীভাবে তৈরি হত?

কোন ধাতু ব্যবহার করা হত?

ধাতুর অনুপাত কত ছিল?

কারিগররা কী প্রযুক্তি ব্যবহার করতেন?

একটি নির্দিষ্ট মূর্তির ধাতব উৎস কোথায় ছিল?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে শিল্প-ইতিহাসের সঙ্গে বিজ্ঞানকে যুক্ত করেছেন শরদা শ্রীনিবাসন। দক্ষিণ ভারতের ধাতব মূর্তির archaeometric characterisation তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

তিনি শুধু ল্যাবরেটরিতে ধাতু পরীক্ষা করেননি; মূর্তির শিল্পরূপ, নির্মাণপ্রযুক্তি, প্রতীকী অর্থ এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করেছেন।

ফলে একটি প্রাচীন মূর্তি তাঁর গবেষণায় হয়ে উঠেছে একই সঙ্গে শিল্প, বিজ্ঞান এবং ইতিহাসের মিলিত দলিল।

হারিয়ে যেতে বসা কারুশিল্প সংরক্ষণ

শরদা শ্রীনিবাসনের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের documentation।

কেরলের Aranmula metal mirror, তামিলনাড়ুর Swamimalai bronze casting, দক্ষিণ ভারতের high-tin bronze এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ধাতুশিল্প নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন।

এ ধরনের কারুশিল্পের বড় সমস্যা হল—প্রযুক্তির অনেকটাই বইয়ে লেখা থাকে না। কারিগরদের অভিজ্ঞতা, পরিবারের মধ্যে শেখানো পদ্ধতি এবং দীর্ঘদিনের অনুশীলনের মাধ্যমে তা টিকে থাকে।

একটি প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম যদি সেই কাজ না শেখে, তাহলে প্রযুক্তিটি হারিয়ে যেতে পারে।

তাই শরদা শ্রীনিবাসনের কাছে ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে শুধু পুরনো জিনিস জাদুঘরে রাখা নয়। সেই জিনিস তৈরির জ্ঞানটিও সংরক্ষণ করা।

বিজ্ঞান ও নৃত্যের এক আশ্চর্য মিলন

শরদা শ্রীনিবাসনের ব্যক্তিত্বের একটি বিশেষ দিক হল—তিনি একজন দক্ষ ভারতনাট্যম শিল্পীও।

বিজ্ঞান ও নৃত্যকে সাধারণত আমরা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জগত হিসেবে দেখি। কিন্তু তাঁর গবেষণায় এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যেও সংযোগ তৈরি হয়েছে।

নটরাজের মূর্তি নিয়ে তাঁর কাজের মধ্যে শিল্পের নন্দনতত্ত্ব, মূর্তির শরীরী ভঙ্গি, প্রতীকী অর্থ এবং প্রযুক্তিগত নির্মাণ—সবই একসঙ্গে এসেছে। তিনি নটরাজের শিল্প ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে lecture-demonstration-ও করেছেন।

এখানে তাঁর কাজের একটি গভীর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়—তিনি জ্ঞানকে আলাদা আলাদা বাক্সে বন্দি করে দেখেননি।

প্রকৌশল তাঁকে ধাতুর গঠন বুঝতে সাহায্য করেছে।

প্রত্নতত্ত্ব তাঁকে অতীতের প্রেক্ষাপট দিয়েছে।

শিল্প-ইতিহাস তাঁকে মূর্তির নন্দনতত্ত্ব বুঝতে সাহায্য করেছে।

আর নৃত্য তাঁকে ভারতীয় শিল্পের শরীরী ভাষার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করেছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

শরদা শ্রীনিবাসনের গবেষণা শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি Smithsonian Institution-এর Freer Gallery of Art-এর সঙ্গে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রকল্পে অংশ নিয়েছেন। তাঁর কাজের সঙ্গে University College London, Oxford এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি Royal Asiatic Society of Great Britain এবং World Academy of Art and Science-এর Fellow। ২০২১ সালে তিনি Indian National Academy of Engineering-এর Woman Engineer of the Year Award পান।

২০১৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে, Archaeology ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। American Academy of Arts and Sciences-এর তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে ২০২১ সালে International Honorary Member হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

গবেষণার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ

শরদা শ্রীনিবাসনের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—আমরা কি শুধু অতীতকে জানব, নাকি ভবিষ্যতের জন্যও তাকে সংরক্ষণ করব?

দক্ষিণ ভারতের বহু ঐতিহ্যবাহী ধাতুশিল্প আজ সংকটের মুখে। কিছু প্রযুক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে খুব অল্পসংখ্যক কারিগর সেই পুরনো পদ্ধতি জানেন। তাঁর সাম্প্রতিক কাজের মধ্যেও দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী ধাতুকারিগর সম্প্রদায়ের হারিয়ে যেতে বসা প্রযুক্তি নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ রয়েছে।

এই কাজ তাই নিছক অতীতের গবেষণা নয়। এর মধ্যে সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ, কারিগরদের জ্ঞান, প্রযুক্তির ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রশ্নও রয়েছে।

এক নারীর গবেষণায় বহু ভারতের সন্ধান

শরদা শ্রীনিবাসনের জীবন ও কর্মের দিকে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে—তিনি কোনও একটি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি।

তিনি প্রকৌশলী।

তিনি প্রত্নতাত্ত্বিক।

তিনি archaeometallurgist।

তিনি শিল্প-ইতিহাস গবেষক।

তিনি ঐতিহ্যবাহী প্রযুক্তির নথিবদ্ধকারী।

তিনি লেখক।

এবং একই সঙ্গে একজন ভারতনাট্যম শিল্পী।

এই বহুমাত্রিক পরিচয় তাঁর গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

প্রাচীন একটি ধাতব মূর্তি তাঁর কাছে শুধু জাদুঘরের প্রদর্শনী নয়। তার মধ্যে তিনি দেখতে পান একজন প্রাচীন কারিগরের দক্ষতা, একটি সমাজের প্রযুক্তিগত জ্ঞান, একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ, একটি শিল্পরীতির বিবর্তন এবং একটি সভ্যতার সৃজনশীলতা।

এই কারণেই শরদা শ্রীনিবাসনের কাজ আমাদের ইতিহাসকে নতুনভাবে পড়তে সাহায্য করে।

ইতিহাস শুধু রাজপ্রাসাদে লেখা হয় না। কখনও তা লেখা থাকে মাটির নিচে পাওয়া একটি ধাতব টুকরোয়, কোনও পুরনো খনির চিহ্নে, কোনও ব্রোঞ্জ মূর্তির সংকর ধাতুতে কিংবা বহু প্রজন্ম ধরে কোনও কারিগর পরিবারের হাতে বেঁচে থাকা এক প্রাচীন প্রযুক্তিতে।

সেই নীরব ইতিহাসের ভাষা পড়ার কাজেই নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন শরদা শ্রীনিবাসন।

আর সেই কারণেই ভারতীয় বিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহ্য গবেষণার ইতিহাসে তাঁর নাম একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *