রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।
শহরের প্রান্তের ছোট্ট বাসস্ট্যান্ডটা প্রায় ফাঁকা। দোকানপাট একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু একটি চায়ের দোকানে ম্লান আলো জ্বলছে।
দোকানদার নিতাই হিসেব করছিলেন।
ঠিক তখনই তিনি দেখলেন, বেঞ্চের এক কোণে একটা ছোট্ট নীল ব্যাগ পড়ে আছে।
চারপাশে তাকালেন।
কেউ নেই।
ব্যাগটা হাতে নিয়ে ডাকলেন,
—“কার ব্যাগ? কারও ব্যাগ পড়ে গেছে?”
কোনও উত্তর এল না।
শেষ বাসটা আসতে আর দশ মিনিট।
নিতাই ব্যাগটা দোকানের ভেতর রেখে দিলেন। ভাবলেন, সকালে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই খুঁজতে আসবে।
ব্যাগটা তুলতেই তাঁর মনে হল, ভেতরে যেন কিছু ভারী জিনিস আছে।
তিনি ব্যাগ খোলেননি।
কিছুক্ষণ পর একটি বাস এসে দাঁড়াল।
একজন তরুণী ছুটে এসে বাসের দরজার কাছে দাঁড়িয়েই হঠাৎ থেমে গেল।
তার মুখ ফ্যাকাশে।
সে নিজের কাঁধে হাত দিয়ে ব্যাগ খুঁজল।
তারপর চারদিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
—“আমার ব্যাগটা… এখানে ছিল…”
নিতাই সঙ্গে সঙ্গে বুঝলেন।
—“নীল ব্যাগ?”
মেয়েটি দৌড়ে এল।
—“হ্যাঁ! হ্যাঁ, নীল ব্যাগ!”
নিতাই ব্যাগটা এগিয়ে দিলেন।
মেয়েটি ব্যাগ খুলে ভেতরের জিনিস দেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
—“সব আছে?”
নিতাই জিজ্ঞেস করলেন।
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
তারপর ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট খাম বের করে বুকে চেপে ধরল।
নিতাই বললেন,
—“এটার জন্য এত চিন্তা করছিলেন?”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“এটা আমার বাবার শেষ চিঠি।”
নিতাই আর কিছু বললেন না।
মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল,
—“বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে এই চিঠিটা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘যেদিন খুব একা লাগবে, পড়িস।’”
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
—“আজ প্রথমবার বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে যাচ্ছি। বাবার চিঠিটা সঙ্গে না থাকলে মনে হচ্ছিল… আমি যেন একেবারেই একা হয়ে যাব।”
নিতাই মৃদু স্বরে বললেন,
—“তাই বুঝি এত তাড়াহুড়ো?”
মেয়েটি হেসে মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
বাসের হর্ন বাজল।
মেয়েটি উঠে দাঁড়াল।
তারপর পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে নিতাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।
—“আপনি এটা রাখুন।”
নিতাই হাত সরিয়ে নিলেন।
—“কেন?”
—“আপনি আমার ব্যাগটা রেখে দিয়েছেন।”
নিতাই হেসে বললেন,
—“আমি শুধু আমার কাজ করেছি।”
মেয়েটি কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর বলল,
—“আপনার মতো মানুষ আছে বলেই পৃথিবীটা এখনও নিরাপদ মনে হয়।”
বাস ছেড়ে দিল।
নিতাই অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
পরদিন সকালে দোকান খুলতে এসে দেখলেন, তাঁর দোকানের সামনে একটি ছোট্ট কাগজ পড়ে আছে।
তাতে লেখা—
“কাকু, বাবার চিঠিটা গত রাতে পড়েছিলাম। সেখানে বাবা লিখেছিলেন—‘মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখিস, কারণ পৃথিবীতে খারাপ মানুষের চেয়ে ভালো মানুষ এখনও বেশি।’ কাল রাতে আপনার সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো কথাটা বিশ্বাস করতে পারতাম না। — মেঘলা”
নিতাই কাগজটা ভাঁজ করে তাঁর পুরনো হিসেবের খাতার মধ্যে রেখে দিলেন।
সেদিন থেকে দোকান বন্ধ করার আগে তিনি প্রতিদিন বাসস্ট্যান্ডের বেঞ্চগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে নিতেন।
কোনও হারানো ব্যাগ পাওয়ার আশায় নয়।
বরং এই বিশ্বাসটা মনে রাখার জন্য—
কখনও কখনও আমরা কারও জীবনে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য আসি, অথচ সেই কয়েক মিনিটই তার ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসটাকে আবার জোড়া লাগিয়ে দেয়।
সমাপ্ত।