বাঁকুড়ার একটি ছোট শহরে ছিল ‘সুরসঙ্গম’ নামে একটি কমিউনিটি রেডিও কেন্দ্র। সেখানে প্রতিদিন স্থানীয় খবর, কৃষি সংক্রান্ত পরামর্শ, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং মানুষের জীবনের নানা গল্প প্রচারিত হতো। বড় কোনও সম্প্রচারকেন্দ্রের মতো আধুনিক ব্যবস্থা না থাকলেও, এলাকার মানুষের কাছে এই রেডিও ছিল ভরসার জায়গা।
কেন্দ্রটির অনুষ্ঠান পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিল ছাব্বিশ বছরের মেঘলা। সে বিশ্বাস করত, সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু খবর শোনানো নয়, যাঁদের কথা সাধারণত কেউ শোনে না, তাঁদের কণ্ঠস্বরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
একদিন মেঘলা একটি নতুন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করল—‘আমাদের পাড়া, আমাদের সিদ্ধান্ত’। প্রতি সপ্তাহে এলাকার মানুষ কোনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নিজেদের মতামত জানাবেন। অনুষ্ঠানটির প্রথম বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়া হলো শহরের পুরোনো কসাইখানার পাশের এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
সেখানে দীর্ঘদিন ধরে আবর্জনা জমে থাকত। বাসিন্দাদের একাংশ চাইছিলেন, ওই জায়গায় অবিলম্বে একটি উঁচু প্রাচীর তুলে দেওয়া হোক। অন্যরা বলছিলেন, শুধু প্রাচীর দিলে সমস্যার সমাধান হবে না; নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কয়েকজন দোকানদার আবার অভিযোগ করলেন, তাঁদের ব্যবসাকেই অন্যায়ভাবে দায়ী করা হচ্ছে।
মেঘলা ঠিক করল, কোনও পক্ষকে আগে থেকে দোষী না ধরে সবার বক্তব্য রেডিওতে তুলে ধরা হবে।
অনুষ্ঠানের দিন স্টুডিওতে সাতাশজন মানুষ উপস্থিত হলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দোকানদার, স্থানীয় বাসিন্দা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পুরসভার প্রতিনিধি এবং কয়েকজন কলেজপড়ুয়া।
প্রথমে আলোচনা শান্তভাবেই চলছিল। কিন্তু এক দোকানদার বললেন, “সব দোষ আমাদের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। এলাকার অন্য বাড়ি থেকেও তো আবর্জনা আসে!”
একজন বাসিন্দা প্রতিবাদ করে বললেন, “আপনার দোকানের পিছনেই তো সবচেয়ে বেশি বর্জ্য জমে থাকে!”
কথা কাটাকাটি শুরু হলো। কেউ কারও বক্তব্য শেষ করতে দিচ্ছিলেন না। অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠল।
মেঘলা মাইক্রোফোনের সামনে বসে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর বলল, “আমরা এখানে কাউকে অপমান করতে আসিনি। যদি শুধু অভিযোগ করি, তাহলে অনুষ্ঠান শেষ হবে, কিন্তু সমস্যাটা থেকে যাবে। প্রত্যেকে নিজের বক্তব্যের সঙ্গে একটি করে সমাধানের প্রস্তাবও দিন।”
সে প্রত্যেককে নির্দিষ্ট সময় দিল। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী জানালেন, বর্জ্য সংগ্রহের গাড়ি প্রতিদিন একই সময়ে আসে না। ফলে দোকানদার ও বাসিন্দারা কখন আবর্জনা বাইরে রাখবেন, তা বুঝতে পারেন না।
পুরসভার প্রতিনিধি স্বীকার করলেন, নির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো হয়নি। একজন কলেজপড়ুয়া প্রস্তাব দিলেন, বাজারের প্রবেশপথে বর্জ্য সংগ্রহের সময় ও নিয়ম লেখা বোর্ড লাগানো হোক। এক দোকানদার বললেন, দোকানগুলির জন্য আলাদা বর্জ্য রাখার পাত্রের ব্যবস্থা করা গেলে রাস্তায় আবর্জনা ছড়ানো কমবে।
ধীরে ধীরে আলোচনা অভিযোগ থেকে সমাধানের দিকে এগোল।
অনুষ্ঠানের শেষদিকে মেঘলা সাতাশজনের কাছে একটি প্রশ্ন রাখল, “আগামী এক মাসে আমরা প্রত্যেকে কোন একটি কাজ করার দায়িত্ব নিতে পারি?”
কেউ বললেন, দোকানের সামনে আবর্জনা জমতে দেবেন না। কেউ প্রতিশ্রুতি দিলেন, বাড়ির বর্জ্য নির্দিষ্ট সময়ে বাইরে রাখবেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সংগ্রহের সময়সূচি স্পষ্টভাবে জানাতে সম্মত হলেন। পুরসভার প্রতিনিধি জানালেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়মিত সংগ্রহের ব্যবস্থা উন্নত করার চেষ্টা করবেন।
মেঘলা সবাইকে মনে করিয়ে দিল, রেডিওতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু কাজের অগ্রগতি যাচাই করাও জরুরি। তাই এক মাস পর আবার আলোচনা হবে বলে ঠিক করা হলো।
পরের কয়েক সপ্তাহে কিছু পরিবর্তন দেখা গেল। বর্জ্য সংগ্রহের সময়সূচি জানিয়ে বোর্ড লাগানো হলো। দোকানগুলির জন্য নির্দিষ্ট পাত্রের ব্যবস্থা করা হলো। বাসিন্দারাও আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলার বিষয়ে সচেতন হলেন। অবশ্য সব সমস্যা এক মাসে মিটে যায়নি, কিন্তু আগের তুলনায় এলাকাটি অনেক পরিচ্ছন্ন হলো।
এক মাস পর দ্বিতীয় অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হলো। এবারও সাতাশজনের সবাই আসতে পারেননি, কিন্তু তাঁদের কয়েকজনের কাজের অভিজ্ঞতা বাকিদের উৎসাহ দিল।
অনুষ্ঠান শেষে এক বৃদ্ধ শ্রোতা ফোন করে বললেন, “আগে আমরা ভাবতাম, রেডিও মানে শুধু দূরের মানুষের কথা শোনা। এখন বুঝলাম, আমাদের নিজেদের কথাও যদি মন দিয়ে শুনি, অনেক সমস্যার সমাধান আমাদের হাতেই থাকে।”
মেঘলা হাসল। সে জানত, একটি অনুষ্ঠান শহরের সব সমস্যা মিটিয়ে দিতে পারে না। কিন্তু মানুষের মধ্যে কথা বলার সুযোগ তৈরি করতে পারে, ভুল বোঝাবুঝি কমাতে পারে এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার পথ দেখাতে পারে।
সেদিন স্টুডিওর আলো নিভিয়ে বেরোনোর সময় তার মনে হলো, সাতাশটি কণ্ঠের মধ্যে কেউই একা পুরো সমস্যার সমাধান করতে পারেননি। কিন্তু প্রত্যেকে নিজের অংশের দায়িত্ব বুঝতে পেরেছিলেন বলেই পরিবর্তনের শুরু হয়েছিল।
শিক্ষা: সমাজের সমস্যা সমাধানে শুধু অভিযোগ বা দোষারোপ যথেষ্ট নয়। মন দিয়ে অন্যের কথা শোনা, নিজের দায়িত্ব স্বীকার করা এবং সম্মিলিতভাবে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়াই স্থায়ী পরিবর্তনের পথ।