নদিয়ার একটি ছোট্ট গ্রাম—বেলতলা। গ্রামের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে ছিল একটি বিশাল বটগাছ। কেউ বলতে পারত না, গাছটির বয়স কত। গ্রামের সবচেয়ে বৃদ্ধ মানুষটিও বলতেন, তাঁর জন্মের আগেও নাকি গাছটি ছিল।
বটগাছটি শুধু একটি গাছ ছিল না, যেন পুরো গ্রামের নীরব অভিভাবক।
তার ছায়াতেই বসত গ্রামের আড্ডা, সালিশি সভা, কীর্তন, কবিগান, নাটকের মহড়া। দুপুরে কৃষকেরা বিশ্রাম নিত, বিকেলে শিশুরা খেলত, আর সন্ধ্যায় বৃদ্ধরা বসে অতীতের গল্প করতেন।
গ্রামেরই এক কিশোর ছিল নির্মল। ছোটবেলা থেকেই বটগাছটির সঙ্গে তার অদ্ভুত এক সম্পর্ক ছিল। মন খারাপ হলে সে গাছের নিচে এসে বসত। পরীক্ষার আগে বই নিয়ে এখানে পড়তে আসত। বাবার বকুনি খেলে এসে গাছের গুঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে চুপ করে থাকত।
নির্মলের দাদু একদিন বলেছিলেন,
— “মানুষ কথা বলে মুখ দিয়ে, কিন্তু গাছ কথা বলে ছায়া দিয়ে।”
নির্মল কথাটা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। তবে গাছটার নিচে এলেই তার মনটা শান্ত হয়ে যেত।
সময় কেটে গেল।
নির্মল কলেজে পড়তে কলকাতায় চলে গেল। পড়াশোনা শেষ করে বড় একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেল। ব্যস্ত জীবনে গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ ধীরে ধীরে কমে গেল।
প্রায় পনেরো বছর পরে একদিন সে গ্রামে ফিরল।
গ্রামে ঢুকেই তার চোখ বটগাছটিকে খুঁজল।
কিন্তু যেখানে গাছটি ছিল, সেখানে শুধু একটি বড় ফাঁকা জায়গা।
নির্মলের বুক কেঁপে উঠল।
সে দৌড়ে পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “বটগাছটা কোথায়?”
দোকানদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— “দুই বছর আগে কেটে ফেলা হয়েছে।”
— “কেটে ফেলা হয়েছে? কেন?”
— “নতুন বাজার আর বাসস্ট্যান্ড হবে বলে।”
নির্মল স্তব্ধ হয়ে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় সে বাড়িতে গিয়ে দাদুর পুরোনো ডায়েরি খুলে বসে।
ডায়েরির একটি পাতায় লেখা ছিল—
“যে গ্রাম তার পুরোনো গাছকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, একদিন সে নিজের ইতিহাসও হারিয়ে ফেলে।”
পরদিন সকালে নির্মল সেই ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল।
মাটিতে এখনও বটগাছের বিশাল শিকড়ের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল।
সে হাত দিয়ে মাটি স্পর্শ করল।
মনে পড়ল—
এখানেই প্রথম সাইকেল চালানো শিখেছিল।
এখানেই প্রথম কবিতা আবৃত্তি করেছিল।
এখানেই দাদুর কাছ থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প শুনেছিল।
এখানেই একদিন তার মা বলেছিলেন,
— “বড় মানুষ হবি, কিন্তু নিজের শিকড় ভুলে যাস না।”
নির্মলের চোখ ভিজে উঠল।
সে সিদ্ধান্ত নিল, হারানোকে ফিরিয়ে আনা না গেলেও নতুন কিছু শুরু করা যায়।
গ্রামের পঞ্চায়েত, স্কুল এবং যুবকদের নিয়ে সে “সবুজ বেলতলা অভিযান” শুরু করল।
প্রথম দিনই গ্রামের মানুষ মিলে একশোটি চারা গাছ লাগাল।
শিশুরা প্রতিটি গাছের নাম রাখল।
কেউ নাম দিল “আশা”, কেউ “বন্ধু”, কেউ “স্বপ্ন”, কেউ “মায়া”।
নির্মল একটি ছোট্ট বটগাছের চারা নিজ হাতে রোপণ করল।
চারা লাগানোর আগে সে বলল,
— “এই গাছ শুধু ছায়া দেবে না, আগামী প্রজন্মকে আমাদের গল্পও শোনাবে।”
দশ বছর কেটে গেল।
সেই ছোট্ট চারাটি এখন অনেক বড় হয়েছে।
যদিও আগের বটগাছের মতো বিশাল নয়, তবু তার ছায়ায় আবার গ্রামের শিশুরা খেলে।
আবার বিকেলে বৃদ্ধরা বসে গল্প করেন।
আবার পথিকরা একটু বিশ্রাম নেন।
একদিন নির্মলের নাতনি তাকে জিজ্ঞেস করল,
— “দাদু, এই গাছটা এত ভালোবাসো কেন?”
নির্মল হেসে বলল,
— “কারণ মানুষ চলে যায়, কিন্তু গাছ মানুষের স্মৃতি ধরে রাখে।”
নাতনি আবার প্রশ্ন করল,
— “তাহলে এই গাছও একদিন বুড়ো হবে?”
নির্মল আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
— “হবে। কিন্তু যদি তোমরা এর সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখো, তাহলে এই গাছ কোনোদিন সত্যি মারা যাবে না।”
বিকেলের শেষ আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়ছিল।
হালকা বাতাসে পাতাগুলো দুলছিল।
মনে হচ্ছিল, সেই হারিয়ে যাওয়া পুরোনো বটগাছ যেন নতুন চারাটিকে আশীর্বাদ করছে।
সেদিন গ্রামের স্কুলের সামনে একটি ফলক বসানো হলো। সেখানে লেখা ছিল—
“গাছ কেটে রাস্তা বানানো সহজ, কিন্তু একটি গাছের মতো ইতিহাস তৈরি হতে শত বছর লাগে।”
গ্রামের মানুষ প্রতিজ্ঞা করল—
“একটি গাছ কাটলে অন্তত দশটি গাছ লাগাব।”
তারপর থেকে প্রতি বছর বর্ষার প্রথম দিনে বেলতলায় “বট উৎসব” পালিত হয়।
শিশুরা গাছ লাগায়, প্রবীণরা গল্প বলেন, আর সবাই মিলে প্রকৃতিকে রক্ষা করার শপথ নেয়।
সেই ছোট্ট চারাটি আজ গ্রামের নতুন পরিচয়।
কারণ মানুষ বুঝে গেছে—
একটি গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না, সে একটি গ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখে।
সমাপ্ত। 🌳🍃
Categories
সেই পুরোনো বটগাছ।