ভিয়েতনামের কেন্দ্রীয় উপকূলে এমন একটি শহর রয়েছে, যেখানে সন্ধ্যা নামলেই রাস্তার আলো বদলে যায়, পুরনো বাড়ির জানালায় রঙিন লণ্ঠন জ্বলে ওঠে এবং নদীর জলে সেই আলোর প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়। শহরটির নাম হোই আন।
হোই আন শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি ভিয়েতনামের ইতিহাস, বাণিজ্য, স্থাপত্য, খাবার এবং লোকসংস্কৃতির এক সুন্দর মিলনস্থল। একসময় এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বন্দর। চীন, জাপান, ভারত এবং ইউরোপের ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে আসতেন। সেই বাণিজ্যিক অতীতের ছাপ আজও শহরের পুরনো বাড়ি, মন্দির, সেতু ও বাজারে দেখা যায়।
আজকের হোই আন তুলনামূলক শান্ত। পুরনো শহরের অনেক অংশে গাড়ির চলাচল সীমিত থাকায় হাঁটতে হাঁটতে ঘোরা যায়। হলুদ রঙের পুরনো ভবন, কাঠের দরজা, ছোট দোকান, রেশমের পোশাক, স্থানীয় খাবার এবং হাজার হাজার রঙিন লণ্ঠন শহরটিকে একটি গল্পের বইয়ের মতো করে তোলে।
আর হোই আন শুধু পুরনো শহরেই সীমাবদ্ধ নয়। কাছেই রয়েছে সমুদ্রসৈকত, ধানক্ষেত, গ্রাম, নারকেলবন এবং নদী। ফলে ইতিহাসের সঙ্গে প্রকৃতিরও সুন্দর মিলন এখানে দেখা যায়।
হোই আন কোথায়
হোই আন ভিয়েতনামের Quảng Nam প্রদেশে অবস্থিত। কাছাকাছি বড় শহর হল Da Nang। দা নাং থেকে সড়কপথে সহজেই হোই আন পৌঁছানো যায়।
এই ভৌগোলিক অবস্থান হোই আনকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। একই সফরে দা নাং, হোই আন এবং আশপাশের পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চল ঘুরে দেখা সম্ভব।
হোই আন শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে Thu Bon River। নদীটি শহরের ইতিহাস ও বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
প্রাচীন হোই আন
হোই আন-এর সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ হল Hoi An Ancient Town।
পুরনো শহরের রাস্তা দিয়ে হাঁটলে একসময়ের বাণিজ্যিক শহরের চেহারা কল্পনা করা যায়। কাঠের বাড়ি, সরু গলি, দোকান, মন্দির এবং ঐতিহাসিক ভবনগুলো এখনও শহরের পুরনো চরিত্র ধরে রেখেছে।
এই ঐতিহাসিক কেন্দ্রটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের অন্তর্ভুক্ত।
পুরনো শহরের বাড়িগুলোতে চীনা, জাপানি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায়।
হলুদ বাড়ির শহর
হোই আন-এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল পুরনো ভবনগুলোর হলুদ রঙ।
সূর্যের আলোয় এই হলুদ দেয়ালগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। লাল ও রঙিন লণ্ঠন, কাঠের দরজা এবং সবুজ গাছপালার সঙ্গে হলুদ ভবনের সমন্বয় শহরের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
দিনের বেলায় এই স্থাপত্য যেমন সুন্দর, রাতে লণ্ঠনের আলোয় তা সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে ওঠে।
জাপানি কভার্ড ব্রিজ
হোই আন-এর অন্যতম পরিচিত প্রতীক হল Japanese Covered Bridge।
ঐতিহাসিক এই সেতুটি পুরনো শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এর স্থাপত্যে জাপানি প্রভাব স্পষ্ট।
সেতুর সঙ্গে একটি ছোট উপাসনাস্থলও যুক্ত রয়েছে।
শহরের বহু পোস্টকার্ড ও পর্যটনচিত্রে এই সেতুকে দেখা যায়।
সকালে যখন পর্যটকের ভিড় কম থাকে, তখন সেতু ও আশপাশের গলি শান্তভাবে ঘুরে দেখা যায়।
প্রাচীন বাণিজ্যের স্মৃতি
একসময় হোই আন ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর।
বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা এখানে এসে পণ্য কেনাবেচা করতেন। ফলে শহরের সংস্কৃতিতে বহিরাগত প্রভাব তৈরি হয়।
চীনা বণিকদের বসতি, জাপানি স্থাপত্য এবং স্থানীয় ভিয়েতনামি ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে হোই আন-এর চরিত্র গড়ে ওঠে।
এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ইতিহাসই শহরের স্থাপত্যকে এত বৈচিত্র্যময় করেছে।
ফু কিয়েন অ্যাসেম্বলি হল
হোই আন-এর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে Fujian Assembly Hall বা Phuc Kien Assembly Hall বিশেষভাবে পরিচিত।
চীনা সম্প্রদায়ের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এই স্থাপনার গেট, অলংকরণ, ড্রাগনের নকশা এবং প্রাঙ্গণ অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
চীনা অভিবাসী ও বণিকদের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে এ ধরনের অ্যাসেম্বলি হল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
পুরনো বাড়ি
হোই আন-এর পুরনো শহরে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক বাড়ি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত।
এর মধ্যে Tan Ky Ancient House বিশেষভাবে পরিচিত।
বাড়িটির কাঠের কাজ, অভ্যন্তরীণ উঠোন এবং স্থাপত্যে চীনা, জাপানি ও ভিয়েতনামি প্রভাবের মিশ্রণ দেখা যায়।
এই বাড়িগুলো দেখলে বোঝা যায়, বহু শতাব্দী আগে বণিক পরিবারগুলো কীভাবে বসবাস করত।
হোই আন-এর লণ্ঠন
হোই আন-এর সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্য সম্ভবত তার লণ্ঠন।
রাতে শহরের পুরনো অংশে অসংখ্য রঙিন লণ্ঠন জ্বলে ওঠে। লাল, হলুদ, নীল, গোলাপি, সবুজ—বিভিন্ন রঙের লণ্ঠন রাস্তা ও দোকানকে সাজিয়ে তোলে।
নদীর জলে লণ্ঠনের আলো প্রতিফলিত হলে দৃশ্যটি আরও সুন্দর হয়।
এই কারণে হোই আনকে অনেকেই লণ্ঠনের শহর হিসেবে মনে রাখেন।
লণ্ঠন উৎসব
পূর্ণিমার সময় হোই আন-এর পুরনো শহরে বিশেষ লণ্ঠন পরিবেশ দেখা যায়।
কিছু সময়ে ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে শহরকে আরও সুন্দর করে তোলা হয়।
নদীতে ছোট নৌকা এবং ভাসমান আলোর দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
তবে উৎসবের তারিখ চাঁদের পঞ্জিকা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। ভ্রমণের আগে বর্তমান সময়সূচি যাচাই করা ভালো।
Thu Bon River
হোই আন-এর প্রাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে Thu Bon River।
দিনের বেলায় নদীর ওপর ছোট নৌকা চলাচল করতে দেখা যায়। সন্ধ্যায় নদীর ধারে রেস্তোরাঁ ও দোকানের আলো জ্বলে ওঠে।
নৌকায় ছোট ভ্রমণ করে শহরের আলো দেখা যায়।
বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় নদীর ওপরের অভিজ্ঞতা হোই আন ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অংশ হতে পারে।
নদীর ধারে রাত
হোই আন-এর রাতের সৌন্দর্য ধীরে ধীরে উপভোগ করতে হয়।
নদীর ধারে বসে স্থানীয় খাবার খাওয়া, লণ্ঠনের আলো দেখা এবং মানুষের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা যায়।
শহরটি অত্যন্ত ব্যস্ত মহানগরের মতো নয়। তাই রাতের পরিবেশেও একটি শান্ত, ধীর ছন্দ রয়েছে।
হোই আন-এর খাবার
হোই আন ভিয়েতনামের অন্যতম আকর্ষণীয় খাদ্যসংস্কৃতির শহর।
এখানকার বিশেষ খাবারের মধ্যে Cao Lau অন্যতম।
মোটা ধরনের নুডলস, মাংস, শাকসবজি এবং বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে এই খাবার তৈরি করা হয়। এর সঙ্গে হোই আন-এর স্থানীয় জল ও খাদ্যসংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে নানা ঐতিহ্যবাহী কথা প্রচলিত আছে।
আরেকটি জনপ্রিয় খাবার White Rose—পাতলা চালের ডাম্পলিংয়ের মতো, যার ভেতরে চিংড়ি বা অন্যান্য পুর থাকতে পারে।
বান মি
ভিয়েতনামের জনপ্রিয় Bánh mì হোই আনেও পাওয়া যায়।
ফরাসি উপনিবেশিক ইতিহাসের প্রভাব থেকে তৈরি এই খাবারে রুটি, মাংস, সবজি, সস ও বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়।
স্থানীয় দোকানে তৈরি বান মি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়।
কাও লাউ ও স্থানীয় খাবারের স্বাদ
হোই আন-এর খাবারের বিশেষত্ব হল সাধারণ উপাদানকে স্থানীয় পদ্ধতিতে ব্যবহার করা।
নুডলস, ভেষজ পাতা, সবজি, মাছ ও মাংসের সঙ্গে বিভিন্ন সসের সমন্বয় ভিয়েতনামি রান্নাকে আলাদা করে।
রাস্তার ছোট দোকান থেকে শুরু করে নদীর ধারের রেস্তোরাঁ—বিভিন্ন জায়গায় খাবারের অভিজ্ঞতা নেওয়া যায়।
কেন্দ্রীয় বাজার
Hoi An Central Market স্থানীয় জীবন বোঝার জন্য একটি ভালো জায়গা।
এখানে ফল, সবজি, মাছ, মাংস, মশলা, রান্না করা খাবার এবং বিভিন্ন স্থানীয় পণ্য পাওয়া যায়।
সকালের দিকে বাজার বেশি প্রাণবন্ত থাকে।
পর্যটকেরা এখানে স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি ছোট স্মারক ও হস্তশিল্প কিনতে পারেন।
রেশম ও পোশাক
হোই আন-এর আরেকটি জনপ্রিয় আকর্ষণ হল tailor-made পোশাক।
শহরে বহু টেইলারিং দোকান রয়েছে যেখানে মাপ অনুযায়ী পোশাক তৈরি করা হয়।
স্থানীয় রেশম ও কাপড়ের কাজও পরিচিত।
পর্যটকরা চাইলে ঐতিহ্যবাহী পোশাক বা আধুনিক ডিজাইনের পোশাক তৈরি করিয়ে নিতে পারেন। তবে সময় কম থাকলে অর্ডার দেওয়ার আগে ডেলিভারি সময় নিশ্চিত করা উচিত।
হোই আন-এর সৈকত
পুরনো শহরের বাইরে গেলে সমুদ্রসৈকত পাওয়া যায়।
An Bang Beach হোই আন-এর অন্যতম পরিচিত সৈকত।
সাদা বালি, সমুদ্রের ঢেউ এবং সৈকতের পাশে ক্যাফে মিলিয়ে এখানে আরাম করে সময় কাটানো যায়।
পুরনো শহরের ইতিহাস দেখার পর সৈকতে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা কাটালে ভ্রমণে বৈচিত্র্য আসে।
কুয়া দাই বিচ
Cua Dai Beach-ও হোই আন-এর কাছাকাছি একটি পরিচিত উপকূলীয় এলাকা।
সমুদ্রের ধারে হাঁটা, সূর্যাস্ত দেখা এবং স্থানীয় রেস্তোরাঁয় খাবার খাওয়া যায়।
আবহাওয়া ও সমুদ্রের পরিস্থিতি অনুযায়ী জলক্রীড়ার সুযোগও থাকতে পারে।
ধানক্ষেতের মধ্যে সাইকেল
হোই আন-এর আশপাশের গ্রামাঞ্চলে সাইকেল চালানো একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা।
শহরের বাইরে বেরিয়ে ধানক্ষেত, ছোট রাস্তা, খাল এবং গ্রাম্য বাড়ি দেখা যায়।
সকালে সাইকেল নিয়ে বের হলে কৃষকদের কাজ করতে দেখা যায়। গ্রামের জীবন শহরের পর্যটনকেন্দ্রের তুলনায় অনেক শান্ত।
ট্রা কুয়ে ভেজিটেবল ভিলেজ
হোই আন-এর কাছাকাছি Tra Que Vegetable Village কৃষি ও গ্রামীণ জীবনের জন্য পরিচিত।
এখানে বিভিন্ন শাকসবজি ও ভেষজ চাষ করা হয়।
পর্যটকেরা স্থানীয় কৃষিকাজ সম্পর্কে জানতে পারেন এবং কিছু পর্যটন কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন।
এটি হোই আন-এর খাবারের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক বোঝারও একটি সুযোগ।
নারকেলবন ও নৌভ্রমণ
হোই আন-এর কাছাকাছি Cam Thanh অঞ্চলে নারকেলবন ও জলাভূমি রয়েছে।
এখানে গোলাকার ঝুড়ি-নৌকা বা basket boat-এ ভ্রমণ করা জনপ্রিয়।
নৌকা ছোট জলপথ ধরে নারকেল গাছের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়।
এটি শহরের পুরনো স্থাপত্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি অভিজ্ঞতা।
গ্রামের জীবন
হোই আন-এর আশপাশের গ্রামগুলোতে গেলে ভিয়েতনামের দৈনন্দিন জীবনের আরেকটি চিত্র দেখা যায়।
সকালে কৃষিকাজ, ছোট দোকান, সাইকেলে চলাচল, স্থানীয় বাজার এবং পরিবারের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে একটি শান্ত জীবনধারা দেখা যায়।
ভ্রমণের সময় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি সম্মান রাখা এবং ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া ভালো।
হোই আন-এর সাইকেল সংস্কৃতি
পুরনো শহরের আশপাশে সাইকেল ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়।
শহরটি তুলনামূলক সমতল হওয়ায় সাইকেলে বিভিন্ন এলাকা ঘোরা সহজ।
বিশেষ করে ভোর বা বিকেলে গ্রামের দিকে সাইকেল চালানো মনোরম।
তবে রাস্তার যানবাহন ও স্থানীয় ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।
জাপানি ও চীনা প্রভাব
হোই আন-এর স্থাপত্যে চীনা ও জাপানি প্রভাব বিশেষভাবে দৃশ্যমান।
জাপানি কভার্ড ব্রিজ তার একটি উদাহরণ। অন্যদিকে বিভিন্ন অ্যাসেম্বলি হল, মন্দির ও বাড়ির অলংকরণে চীনা ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে।
স্থানীয় ভিয়েতনামি স্থাপত্যের সঙ্গে এই প্রভাবগুলো মিশে একটি অনন্য শহুরে চরিত্র তৈরি করেছে।
ফরাসি প্রভাব
ভিয়েতনামের ইতিহাসে ফরাসি ঔপনিবেশিক সময়েরও প্রভাব রয়েছে।
খাবার, বিশেষ করে Bánh mì-এর মতো কিছু খাদ্য ঐতিহ্যে সেই ইতিহাসের ছাপ দেখা যায়।
স্থাপত্যের কিছু অংশেও ইউরোপীয় প্রভাব দেখা যায়।
হোই আন তাই যেন বহু দেশের সংস্কৃতির দীর্ঘ যোগাযোগের একটি জীবন্ত দলিল।
ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
হোই আন-এর আবহাওয়া ঋতুভেদে পরিবর্তিত হয়।
শুষ্ক ও তুলনামূলক আরামদায়ক সময় শহর ঘুরে দেখার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
বর্ষাকালে বৃষ্টি ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখা জরুরি।
লণ্ঠন উৎসবের সময় যেতে চাইলে পূর্ণিমার তারিখও আগে থেকে দেখে নেওয়া উচিত।
বর্ষার হোই আন
বৃষ্টির সময় হোই আন-এর নদী ও পুরনো শহরের পরিবেশ সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে যায়।
ভেজা হলুদ দেয়ালে লণ্ঠনের আলো প্রতিফলিত হলে সুন্দর দৃশ্য তৈরি হতে পারে।
তবে অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় কিছু রাস্তা বা নদীর তীরের এলাকায় পানি জমতে পারে।
তাই বর্ষাকালে ভ্রমণের পরিকল্পনায় কিছুটা নমনীয়তা রাখা ভালো।
বসন্ত ও শরৎ
মৃদু আবহাওয়ার সময় হোই আন ঘোরার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
সকালে পুরনো শহর, দুপুরে গ্রাম বা সৈকত এবং সন্ধ্যায় লণ্ঠনের আলো—একদিনে নানা ধরনের অভিজ্ঞতা নেওয়া সম্ভব।
ভারত থেকে হোই আন
ভারত থেকে হোই আন যেতে সাধারণত ভিয়েতনামের Da Nang বিমানবন্দর ব্যবহার করা সুবিধাজনক।
দা নাং থেকে সড়কপথে হোই আন যাওয়া যায়।
ভিয়েতনামে প্রবেশের ভিসা ও বর্তমান নিয়ম ভারতীয় ভ্রমণকারীদের যাত্রার আগে সরকারি সূত্র থেকে যাচাই করা উচিত।
বিমান, হোটেল এবং স্থানীয় পরিবহন আগে থেকে বুক করলে ভ্রমণ অনেক সহজ হয়।
তিন দিনের হোই আন ভ্রমণ পরিকল্পনা
প্রথম দিন: পুরনো শহর
Japanese Covered Bridge, পুরনো বাড়ি, assembly hall, বাজার এবং ঐতিহাসিক গলি ঘুরে দেখা যায়।
সন্ধ্যায় Thu Bon River-এর ধারে সময় কাটানো এবং লণ্ঠনের আলো দেখা যায়।
দ্বিতীয় দিন: গ্রাম ও সৈকত
সকালে সাইকেলে Tra Que Vegetable Village বা আশপাশের গ্রামে যাওয়া যায়।
দুপুরে An Bang Beach-এ সময় কাটানো যেতে পারে।
সন্ধ্যায় আবার পুরনো শহরে ফিরে স্থানীয় খাবার খাওয়া যায়।
তৃতীয় দিন: নদী ও সংস্কৃতি
Cam Thanh-এর নারকেলবনে basket boat ভ্রমণ করা যায়।
বিকেলে শহরের বাজার ও দোকান ঘুরে দেখা এবং স্থানীয় পোশাক বা হস্তশিল্প কেনা যেতে পারে।
রাতে ফ্লোটিং লণ্ঠনের আলো দেখে ভ্রমণ শেষ করা যায়।
পাঁচ দিনের হোই আন ও আশপাশের ভ্রমণ
পাঁচ দিন সময় থাকলে হোই আন-এর সঙ্গে Da Nang ও আশপাশের অঞ্চল যুক্ত করা যায়।
প্রথম তিন দিন হোই আন-এর জন্য রাখা যায়। চতুর্থ দিনে Da Nang শহর ঘুরে দেখা যেতে পারে। পঞ্চম দিনে আশপাশের পাহাড় বা উপকূলীয় অঞ্চলে দিনের সফর করা যায়।
ভ্রমণকারীর জন্য কিছু পরামর্শ
হোই আন-এ হাঁটার সময় আরামদায়ক জুতো ব্যবহার করা ভালো।
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার জন্য হালকা পোশাক ও পানির বোতল সঙ্গে রাখা উপকারী।
সাইকেল বা মোটরবাইক ব্যবহার করলে স্থানীয় ট্রাফিক নিয়ম মানা জরুরি।
নৌভ্রমণের সময় লাইফ জ্যাকেট ও স্থানীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।
ঐতিহাসিক ভবন ও ধর্মীয় স্থানে প্রবেশের সময় পোশাক ও আচরণ সম্পর্কে স্থানীয় নিয়ম মানা ভালো।
হোই আন-এর স্মারক
হোই আন থেকে রঙিন লণ্ঠন, সিরামিক, রেশমের সামগ্রী, কাঠের কারুশিল্প, স্থানীয় শিল্পকর্ম এবং ছোট অলংকার কেনা যায়।
লণ্ঠন হোই আন-এর অন্যতম পরিচিত স্মারক।
তবে বিমানযাত্রায় বহনের সুবিধা ও দেশের কাস্টমস নিয়ম মাথায় রেখে কেনাকাটা করা উচিত।
হোই আন কেন আলাদা
হোই আন-এর সৌন্দর্য তার ধীর গতিতে।
বিশাল মহানগরের মতো এখানে সবকিছু দ্রুত ঘটে না। বরং একটি পুরনো রাস্তা ধরে ধীরে হাঁটা, দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কারুশিল্প দেখা, নদীর ধারে বসা কিংবা লণ্ঠনের আলোয় খাবার খাওয়াই ভ্রমণের বড় অংশ হয়ে ওঠে।
এই ধীরতা আধুনিক ব্যস্ত জীবনের জন্য একটি আলাদা অভিজ্ঞতা।
ইতিহাস ও বর্তমানের মিলন
হোই আন-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হল তার অতীত এখনও বর্তমানের সঙ্গে জীবন্তভাবে যুক্ত।
পুরনো বাড়িগুলো শুধু মিউজিয়াম নয়; অনেকগুলো এখনও দোকান, বাড়ি বা ব্যবসার অংশ।
নদী এখনও মানুষের জীবন ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত।
বাজার এখনও সক্রিয়।
লণ্ঠন এখনও শহরের রাত আলোকিত করে।
এই কারণেই হোই আন একটি ‘জীবন্ত ঐতিহাসিক শহর’-এর অনুভূতি দেয়।
শেষ কথা
হোই আন এমন একটি ভ্রমণস্থল, যেখানে সৌন্দর্য চোখে পড়ার আগেই মনকে ধীরে করে দেয়।
দিনের আলোয় হলুদ দেয়াল, কাঠের দরজা, পুরনো সেতু এবং সরু গলি; সন্ধ্যায় লাল-হলুদ লণ্ঠন, নদীর জলে প্রতিফলিত আলো এবং দূর থেকে ভেসে আসা সংগীত—সব মিলিয়ে শহরটি যেন একটি দীর্ঘ কবিতা।
এখানে ইতিহাস আছে, কিন্তু ইতিহাস ভারী হয়ে নেই। সংস্কৃতি আছে, কিন্তু তা কেবল জাদুঘরে বন্দি নয়। প্রকৃতি আছে, কিন্তু শহরের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
এক সকালে ধানক্ষেতের পাশে সাইকেল চালানো, দুপুরে স্থানীয় খাবার খাওয়া, বিকেলে সমুদ্রের ধারে বসা এবং রাতে লণ্ঠনের আলোয় পুরনো শহর ঘুরে বেড়ানো—এই অভিজ্ঞতাগুলোর সমন্বয়ই হোই আনকে স্মরণীয় করে তোলে।
যে ভ্রমণকারী শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, একটি শহরের আত্মাকে অনুভব করতে চান, তাঁর জন্য হোই আন হতে পারে ভিয়েতনাম ভ্রমণের সবচেয়ে মায়াবী অধ্যায়গুলোর একটি।
========== শেষ ==========