আষাঢ় মাসের এক সকাল। কলকাতার আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। রাস্তায় মানুষের ছোটাছুটি, বাসস্ট্যান্ডে ভিড়, দোকানের সামনে আশ্রয় নেওয়া মানুষ—চারদিকে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
শহরের এক কোণে থাকতেন অমরেশ চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত একজন স্কুলশিক্ষক। বয়স বাহাত্তর। স্ত্রী মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। একমাত্র ছেলে চাকরির সূত্রে বেঙ্গালুরুতে থাকেন। অমরেশবাবুর সঙ্গী বলতে ছিল তাঁর বই, একটি পুরোনো রেডিও আর একটি কালো ছাতা।
ছাতাটি ছিল খুবই সাধারণ। কিন্তু অমরেশবাবুর কাছে সেটি ছিল অমূল্য। কারণ, চাকরির প্রথম বেতনে তিনি ছাতাটি কিনেছিলেন। তারপর প্রায় চল্লিশ বছর ধরে সেই ছাতাই তাঁর সঙ্গী।
একদিন সকালে বাজারে যাওয়ার পথে তিনি দেখলেন, বাসস্ট্যান্ডে একটি ছোট্ট মেয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। তার স্কুলব্যাগ ভিজে একাকার। মেয়েটির নাম মেঘলা।
অমরেশবাবু এগিয়ে গিয়ে বললেন,
— “মা, এই ছাতার নিচে এসো।”
মেঘলা ইতস্তত করছিল।
— “দাদু, আপনার তো অসুবিধা হবে।”
— “না রে, ছাতা ভাগ করলে বৃষ্টি কম ভেজায়।”
দু’জনে একই ছাতার নিচে হেঁটে স্কুলের সামনে পৌঁছাল।
সেদিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতো তাদের।
মেঘলা স্কুলে যেত, অমরেশবাবু হাঁটতে বেরোতেন।
একদিন মেঘলা জিজ্ঞেস করল,
— “দাদু, আপনি একা থাকেন?”
অমরেশবাবু হেসে বললেন,
— “একা থাকি, কিন্তু একা নই। মানুষের ভালোবাসা থাকলে কেউ একা হয় না।”
ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে দাদু-নাতনির মতো সম্পর্ক গড়ে উঠল।
এক বর্ষার সন্ধ্যায় প্রবল ঝড় উঠল। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, কিন্তু মেঘলার বাবা-মা কেউ আসতে পারেননি। রাস্তা জলমগ্ন।
অমরেশবাবু স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি বললেন,
— “চলো, আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।”
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে পাশ দিয়ে চলে গেল। নোংরা জল ছিটকে দু’জনের গায়ে পড়ল।
মেঘলা মুখ ভার করে বলল,
— “মানুষ এত অসাবধান কেন?”
অমরেশবাবু মৃদু হেসে বললেন,
— “বাবা, পৃথিবীতে দু’ধরনের মানুষ আছে। কেউ কাদা ছিটিয়ে যায়, কেউ ছাতা ধরে রাখে। চেষ্টা করবে, সবসময় দ্বিতীয় ধরনের মানুষ হতে।”
মেঘলা কথাটা মনে গেঁথে নিল।
কয়েক মাস পর অমরেশবাবু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন।
মেঘলা প্রতিদিন স্কুল শেষে তাঁকে দেখতে যেত।
একদিন অমরেশবাবু তাঁর সেই পুরোনো কালো ছাতাটি মেঘলার হাতে দিয়ে বললেন,
— “এটা আজ থেকে তোমার।”
মেঘলার চোখে জল।
— “না দাদু, এটা আপনার স্মৃতি।”
— “স্মৃতি আলমারিতে রেখে দিলে বেঁচে থাকে না। অন্যের কাজে লাগলে তবেই তার মূল্য।”
কয়েক সপ্তাহ পরে অমরেশবাবু শান্তিতে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
মেঘলা সেই ছাতাটি খুব যত্ন করে রেখে দিল।
বছর কেটে গেল।
মেঘলা বড় হয়ে একজন চিকিৎসক হলো।
একদিন প্রবল বৃষ্টির মধ্যে হাসপাতাল থেকে ফেরার সময় সে দেখল, রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধা ভিজছেন।
এক মুহূর্তও দেরি না করে সে নিজের ছাতাটি বৃদ্ধার মাথার ওপর ধরল।
বৃদ্ধা বললেন,
— “মা, তুমি তো নিজেই ভিজে যাচ্ছ।”
মেঘলা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— “একজন মানুষ আমাকে শিখিয়েছিলেন, ছাতা শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যকেও বাঁচানোর জন্য।”
সেদিন বাড়ি ফিরে সে ছাতার হাতলটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল।
মনে হলো, অমরেশবাবুর সেই পরিচিত কণ্ঠ যেন আবার ভেসে আসছে—
“ছাতা ভাগ করলে বৃষ্টি কম ভেজায়।”
পরের বছর মেঘলা শহরে একটি উদ্যোগ শুরু করল—”একটি ছাতা, একটি হাসি”।
বর্ষাকালে স্বেচ্ছাসেবীরা দরিদ্র মানুষ, পথশিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে ছাতা বিতরণ করতে লাগলেন।
প্রথম ছাতাটি ছিল সেই পুরোনো কালো ছাতা।
এখন সেটি ব্যবহার করা হয় না।
হাসপাতালের একটি কাচের বাক্সে সংরক্ষিত আছে।
তার নিচে একটি ছোট্ট ফলকে লেখা—
“মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় আশ্রয় ছাতা নয়, সহানুভূতি।”
আজও বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নামলে মেঘলা কিছুক্ষণ সেই ছাতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
তার মনে হয়—
একজন ভালো মানুষের রেখে যাওয়া শিক্ষা কখনও পুরোনো হয় না।
বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক বৃষ্টির ফোঁটার মতো।
সমাপ্ত। ☔🌧️❤️
Categories
গল্প : বৃষ্টিভেজা ছাতা।।