Categories
গল্প

বাঁশিওয়ালার সুর।

পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম—মাধবপুর। চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, কাঁচা রাস্তা, পুকুর আর তালগাছ। সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের আকাশে ভেসে আসত এক অপূর্ব বাঁশির সুর।
কেউ জানত না, বাঁশিটি কে বাজায়।
গ্রামের মানুষ শুধু জানত, প্রতিদিন সূর্য ডুবে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর সেই সুর শোনা যায়। আর আশ্চর্যের বিষয়, সেই সুর শুনলেই মানুষের মন যেন অদ্ভুত শান্তিতে ভরে উঠত।
গ্রামের এক কিশোর ছিল সুব্রত। তার খুব ইচ্ছে ছিল সেই বাঁশিওয়ালাকে একবার দেখা।
একদিন বিকেলে সে ধানের ক্ষেত পেরিয়ে সুরের উৎস খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল।
অনেক দূরে একটি পুরোনো বটগাছের নিচে সে একজন বৃদ্ধকে দেখতে পেল।
সাদা ধুতি, কাঁধে মলিন গামছা, চোখ বন্ধ করে তিনি বাঁশি বাজাচ্ছেন।
সুর থামতেই সুব্রত এগিয়ে গিয়ে বলল,
— “দাদু, আপনি এত সুন্দর বাঁশি বাজান! কোথায় শিখেছেন?”
বৃদ্ধ মুচকি হেসে বললেন,
— “জীবনের কাছ থেকে।”
— “জীবনও কি শেখায়?”
— “সবচেয়ে বড় শিক্ষক তো জীবনই।”
সেদিন থেকেই প্রতিদিন বিকেলে সুব্রত তাঁর কাছে যেতে শুরু করল।
বৃদ্ধের নাম ছিল রঘুনাথ।
তিনি একসময় শহরের বিখ্যাত বাঁশিবাদক ছিলেন। বড় বড় মঞ্চে অনুষ্ঠান করতেন। কিন্তু স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সব ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন।
তিনি বলতেন,
— “হাততালির শব্দ খুব তাড়াতাড়ি থেমে যায়। কিন্তু মানুষের মুখের হাসি অনেক দিন বেঁচে থাকে।”
একদিন সুব্রত বলল,
— “আমাকেও বাঁশি বাজানো শিখিয়ে দেবেন?”
রঘুনাথ হেসে বললেন,
— “বাঁশি বাজাতে হলে আগে শুনতে শিখতে হবে।”
— “কী শুনব?”
— “নদীর শব্দ, বাতাসের শব্দ, পাখির ডাক, মানুষের কান্না, মানুষের হাসি—সব।”
প্রথম দিন তিনি সুব্রতের হাতে বাঁশি দিলেন না।
শুধু মাঠের মাঝে বসিয়ে বললেন,
— “চোখ বন্ধ করো।”
সুব্রত শুনতে পেল—
ধানের শিষে বাতাসের দোলা…
দূরে গরুর ঘণ্টা…
পুকুরে ব্যাঙের ডাক…
আর গাছের পাতার মৃদু শব্দ…
রঘুনাথ বললেন,
— “এই সব শব্দই একদিন তোমার সুর হয়ে বেরোবে।”
ছয় মাস পর প্রথমবার সুব্রত বাঁশিতে একটি সুর তুলতে পারল।
সুরটি নিখুঁত ছিল না।
কিন্তু রঘুনাথের চোখ আনন্দে ভরে উঠল।
— “আজ তুমি বাঁশি বাজাওনি, নিজের মনকে কথা বলতে দিয়েছ।”
কয়েক বছর কেটে গেল।
সুব্রত জেলার সেরা বাঁশিবাদক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠল।
একদিন কলকাতার একটি বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো।
অনুষ্ঠানের আগে সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন,
— “আপনার সবচেয়ে বড় শিক্ষক কে?”
সুব্রত মঞ্চের সামনে রাখা নিজের বাঁশিটির দিকে তাকিয়ে বলল,
— “একজন মানুষ, যিনি আমাকে সুরের আগে নীরবতাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।”
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সে সরাসরি গ্রামে ফিরে এল।
কিন্তু বটগাছের নিচে গিয়ে দেখল—
রঘুনাথ আর নেই।
কয়েকদিন আগেই তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন।
বটগাছের গুঁড়ির পাশে একটি কাপড়ে মোড়ানো পুরোনো বাঁশি রাখা ছিল।
তার সঙ্গে একটি ছোট্ট চিঠি—
“সুব্রত, বাঁশি শুধু গান শোনানোর জন্য নয়। ভেঙে যাওয়া মনকে জোড়া লাগানোর জন্যও বাজিও। তাহলেই আমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে।”
সুব্রতের চোখ ভিজে উঠল।
সে সেই বাঁশিটি কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করল।
তারপর থেকে প্রতি বছর রঘুনাথের জন্মদিনে মাধবপুরে “বাঁশি উৎসব” শুরু হলো।
দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিল্পীরা আসতে লাগলেন।
কিন্তু উৎসবের শুরুতে একটি নিয়ম আজও মানা হয়—
সবাই এক মিনিট নীরব থাকে।
কারণ রঘুনাথ বলতেন,
“যে নীরবতাকে সম্মান করতে পারে না, সে কখনও সত্যিকারের সুর সৃষ্টি করতে পারে না।”
উৎসবের মাঠে আজও একটি ফলক রয়েছে।
সেখানে লেখা—
“সুর মানুষের কানে পৌঁছায়, কিন্তু ভালোবাসা পৌঁছায় মানুষের হৃদয়ে।”
সন্ধ্যা নামলে মাধবপুরের বাতাসে আবার বাঁশির সুর ভেসে ওঠে।
গ্রামের মানুষ বলে—
রঘুনাথ নেই, কিন্তু তাঁর সুর এখনও বেঁচে আছে।
কারণ একজন শিল্পী একদিন চলে যান,
কিন্তু তাঁর সৃষ্টি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বাজতে থাকে।
সমাপ্ত। 🎶🎋❤️

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *