Categories
গল্প

মাটির হাঁড়িতে আঁকা স্বপ্ন।

নদীর ধারে ছোট্ট একটা গ্রাম—কুমোরডাঙা। গ্রামের নামের মতোই এই গ্রামের বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম মাটির কাজ করে আসছিল। কারও হাতে তৈরি হত হাঁড়ি, কারও হাতে কলসি, কারও হাতে প্রদীপ কিংবা মাটির পুতুল।

সেই গ্রামেরই মেয়ে ছিল মাধবী।

ছোটবেলা থেকেই মাটির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। অন্য শিশুরা যখন পুতুল নিয়ে খেলত, মাধবী তখন মায়ের পাশে বসে ভেজা মাটি দিয়ে ছোট ছোট ঘর বানাত।

মা হাসতেন।

—“তুই বড় হয়ে কী হবি রে?”

মাধবী বলত,

—“আমি মাটির মানুষ হব।”

মা হেসে বলতেন,

—“মাটির মানুষ আবার কী?”

মাধবী উত্তর দিত,

—“যে মাটিকে সুন্দর করে।”

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাধবীর হাতের কাজও নিখুঁত হতে লাগল। কিন্তু সংসারে অভাব ছিল। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ল মায়ের ওপর।

মাধবীর পড়াশোনাও অষ্টম শ্রেণির পর বন্ধ হয়ে গেল।

একদিন মা বললেন,

—“মাধু, তুই যদি শহরে কোনো কাজ পেতিস, সংসারটা একটু চলত।”

মাধবী চুপ করে রইল।

তার চোখ তখন উঠোনের কোণে রাখা মাটির হাঁড়িগুলোর দিকে।

সেই রাতে সে সিদ্ধান্ত নিল, অন্যের বাড়িতে কাজ করতে যাওয়ার আগে নিজের মাটির কাজ দিয়েই কিছু করার চেষ্টা করবে।

পরদিন থেকেই শুরু হল নতুন লড়াই।

সে পুরনো মাটির হাঁড়িতে নতুন নকশা আঁকতে শুরু করল। কখনও ফুল, কখনও পাখি, কখনও নদীর ছবি।

কিন্তু গ্রামের বাজারে কেউ সেগুলো কিনল না।

এক দোকানদার বলল,

—“এগুলো নিয়ে কে বসে থাকবে? এখন সবাই প্লাস্টিকের জিনিস ব্যবহার করে।”

আর একজন বলল,

—“মাটির জিনিস দিয়ে সংসার চলে না।”

মাধবী বাড়ি ফিরে খুব কাঁদল।

মা তাকে বললেন,

—“কাঁদলে মাটি নরম হবে না রে। হাত দিয়ে কাজ কর।”

মায়ের কথায় মাধবী আবার উঠে দাঁড়াল।

সে নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নিল।

গ্রামের পুরনো কুমোরদের কাছ থেকে সে মাটির কাজের নানা কৌশল শিখল। তারপর নিজের মতো করে ছোট ছোট ফুলদানি, কলমদানি, টব এবং সাজানোর সামগ্রী তৈরি করতে লাগল।

কিন্তু এবারও সমস্যা হল—বিক্রি করবে কোথায়?

মাধবীর গ্রামের কাছে একটি কলেজ ছিল। সেখানে পড়ত শহরের অনেক ছেলে-মেয়ে।

একদিন সে কয়েকটি মাটির কলমদানি নিয়ে কলেজের সামনে বসে পড়ল।

প্রথম দিন কেউ তাকাল না।

দ্বিতীয় দিন একজন ছাত্রী এসে একটা কলমদানি হাতে নিল।

—“এটা কত?”

—“পঞ্চাশ টাকা।”

মেয়েটি কিনে নিল।

তারপর আরও দুজন এল।

সেদিন মাধবী পাঁচটি জিনিস বিক্রি করল।

বাড়ি ফিরে সে মাকে পঞ্চাশ টাকা এগিয়ে দিয়ে বলল,

—“দেখেছ মা? মাটি কথা বলেছে!”

মা হেসে বললেন,

—“না রে, তুই কথা বলিয়েছিস।”

সেই ছোট্ট সাফল্য মাধবীর মনে সাহস এনে দিল।

সে প্রতিদিন নতুন নতুন নকশা করতে লাগল।

কখনও মাটির পুতুলে গ্রামের বধূ, কখনও কৃষক, কখনও নদীর মাঝি। তার তৈরি জিনিসে গ্রামের জীবন ফুটে উঠতে লাগল।

একদিন এক শিক্ষক তার কাজ দেখে বললেন,

—“তুমি এগুলো অনলাইনে বিক্রি করার চেষ্টা করেছ?”

মাধবী মাথা নাড়ল।

—“অনলাইন কীভাবে করতে হয় জানি না।”

শিক্ষক বললেন,

—“শিখবে?”

—“হ্যাঁ।”

সেই দিন থেকেই শুরু হল আরেক শিক্ষা।

স্মার্টফোনে ছবি তোলা, ছবি পাঠানো, দাম লেখা, অর্ডার নেওয়া—সবকিছু ধীরে ধীরে শিখতে লাগল মাধবী।

প্রথমে খুব কম অর্ডার আসত।

কখনও একটি।

কখনও দুটো।

কখনও এক সপ্তাহেও কোনো অর্ডার আসত না।

তবুও সে থামেনি।

একদিন কলকাতা থেকে দশটি মাটির ফুলদানি তৈরির অর্ডার এল।

মাধবী আনন্দে মাকে জড়িয়ে ধরল।

—“মা, কলকাতা থেকে অর্ডার এসেছে!”

মা বললেন,

—“তাহলে মাটিও এবার শহরে যাবে।”

কিন্তু অর্ডার তৈরি করতে গিয়ে বড় সমস্যা দেখা দিল।

মাধবীর নিজের চাকা ছিল না।

সে প্রতিবেশী কুমোরদের কাছ থেকে ধার করে কাজ করত। বড় অর্ডার এলে সময়মতো কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ত।

তবু সে রাত জেগে কাজ করল।

অর্ডার ঠিক সময়ে পৌঁছে গেল।

কয়েকদিন পর খবর এল—ক্রেতারা খুব পছন্দ করেছেন।

মাধবীর কাজের ছবি আরও কয়েকজনের কাছে পৌঁছে গেল।

তারপর অর্ডার বাড়তে লাগল।

একদিন মাধবী মাকে বলল,

—“আমি একা আর পারছি না।”

মা ভয় পেয়ে গেলেন।

—“তাহলে কাজ বন্ধ করবি?”

মাধবী হেসে বলল,

—“না। গ্রামের অন্য মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করব।”

সে গ্রামের পাঁচজন মহিলাকে ডেকে বলল,

—“তোমরা আমার সঙ্গে কাজ করবে?”

তারা প্রথমে দ্বিধায় ছিল।

কারও স্বামী রাজি হবে কি না, কেউ জানত না।

মাধবী বলল,

—“আমরা বাড়ির কাজের পাশাপাশি কাজ করব। যে যতটা পারবে।”

শেষ পর্যন্ত পাঁচজনই রাজি হল।

শুরু হল নতুন দল।

কেউ মাটি প্রস্তুত করত, কেউ হাঁড়ি বানাত, কেউ নকশা আঁকত, কেউ রং করত।

মাধবী সব কাজের সমন্বয় করত।

কয়েক মাসের মধ্যে গ্রামের আরও দশজন মহিলা তাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন।

কুমোরডাঙায় নতুন পরিবর্তন শুরু হল।

যে মাটিকে সবাই অবহেলা করত, সেই মাটিই এখন বহু পরিবারের আয়ের পথ হয়ে উঠল।

একদিন জেলা শহর থেকে একটি সাংস্কৃতিক মেলা করার ডাক এল।

মাধবীরা সেখানে নিজেদের স্টল দিল।

স্টলের সামনে বড় করে লেখা—

“কুমোরডাঙার মাটি”

মেলার প্রথম দিনেই প্রচুর মানুষ তাদের কাজ দেখতে এল।

একজন বৃদ্ধ তাদের তৈরি একটি মাটির পুতুল হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

তিনি মাধবীকে বললেন,

—“এই পুতুলটা আমার ছোটবেলার গ্রামের কথা মনে করিয়ে দিল।”

মাধবী মৃদু হেসে বলল,

—“তাহলে পুতুলটা আপনারই।”

বৃদ্ধ পুতুলটি কিনে নিলেন।

সেদিন সন্ধ্যায় মাধবী হিসাব করছিল।

তার মা পাশে বসে ছিলেন।

মা বললেন,

—“তুই ছোটবেলায় বলতিস, মাটির মানুষ হবি।”

মাধবী হেসে বলল,

—“মনে আছে তোমার?”

—“সব মনে আছে।”

—“তাহলে বলো, আমি পেরেছি?”

মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“তুই শুধু মাটিকে সুন্দর করিসনি। মাটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর জীবনও সুন্দর করার চেষ্টা করেছিস।”

মাধবী কিছু বলল না।

তার চোখ ভিজে উঠল।

কয়েক বছর পর কুমোরডাঙায় একটি ছোট প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি হল। সেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা মাটির কাজ শেখে।

দেয়ালের ওপর মাধবী একটি কথা লিখে রেখেছে—

“যে মাটিকে সবাই পায়ের নিচে রাখে, সেই মাটিই একদিন কারও স্বপ্নের ভিত্তি হতে পারে।”

আজও ভোর হলে কুমোরডাঙার উঠোনে মাটি মাখার শব্দ শোনা যায়।

চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে ঘুরতে থাকে অনেক মানুষের স্বপ্ন।

আর মাধবী?

সে এখনও প্রতিদিন নতুন কিছু বানায়।

কারণ তার কাছে মাটি শুধু মাটি নয়।

মাটি মানে স্মৃতি।

মাটি মানে শিকড়।

আর মাটি মানে—অসম্ভবকে সম্ভব করার এক নীরব শক্তি।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *