Categories
গল্প নারী কথা

লাল সাইকেলের স্বপ্ন।

সোনাঝুরি গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকত বারো বছরের মেয়ে ঝিলিক। ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি, সামনে তুলসীতলা, পাশে কয়েকটা কলাগাছ আর বাড়ির পেছনে বিস্তীর্ণ ধানখেত—এই ছিল তার পৃথিবী।

ঝিলিক পড়াশোনা করতে খুব ভালোবাসত।

কিন্তু গ্রামের স্কুলটা ছিল বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে।

প্রতিদিন ভোরে উঠে তাকে হেঁটে স্কুলে যেতে হত।

বর্ষার দিনে কাদা পেরিয়ে, গ্রীষ্মে ধুলো উড়িয়ে, শীতের সকালে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে সে হাঁটত।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে ঝিলিক মাকে বলল,

—“মা, আমার যদি একটা সাইকেল থাকত!”

মা চুপ করে রইলেন।

বাবা দিনমজুর। সংসারে চারজন মানুষ। সাইকেল কেনার মতো টাকা তাদের হাতে কখনও জমেনি।

মা শুধু বললেন,

—“একদিন হবে।”

ঝিলিক জানত, মায়ের সেই ‘একদিন’ হয়তো অনেক দূরে।

তবু সে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করল না।

স্কুলে তার প্রিয় বিষয় ছিল বিজ্ঞান। শিক্ষক যখন নতুন কিছু বোঝাতেন, ঝিলিকের চোখ জ্বলে উঠত।

একদিন বিজ্ঞান শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু বললেন,

—“তোমরা সবাই বড় হয়ে কী হতে চাও?”

কেউ বলল ডাক্তার।

কেউ পুলিশ।

কেউ শিক্ষক।

ঝিলিক উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—“আমি বিজ্ঞানী হতে চাই।”

ক্লাসে কয়েকজন হেসে ফেলল।

অনিরুদ্ধবাবু হাসলেন না।

তিনি বললেন,

—“কেন?”

ঝিলিক বলল,

—“আমাদের গ্রামের অনেক সমস্যা আছে। আমি এমন কিছু বানাতে চাই যাতে গ্রামের মানুষের কাজ সহজ হয়।”

শিক্ষক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তাহলে আজ থেকেই শুরু করো।”

সেদিন কথাটা ঝিলিকের মনে গেঁথে গেল।

কয়েকদিন পর স্কুলে বিজ্ঞান প্রদর্শনীর ঘোষণা হল।

ঝিলিক ঠিক করল, সে এমন একটা জিনিস বানাবে যাতে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে ব্যবহার করা যায়।

কিন্তু সমস্যা হল—প্রকল্প বানানোর টাকা কোথায়?

বাড়িতে বলতেই বাবা বললেন,

—“যা আছে তাই দিয়ে কর মা। নতুন জিনিস কিনতে পারব না।”

ঝিলিক বলল,

—“নতুন কিছু লাগবে না বাবা।”

সে পুরনো প্লাস্টিকের বোতল, বাঁশের টুকরো, ব্যবহৃত পাইপ আর কয়েকটি খালি ড্রাম জোগাড় করল।

অনিরুদ্ধবাবুর সাহায্যে সে একটি ছোট মডেল তৈরি করল।

বৃষ্টির জল ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে ড্রামে জমবে। তারপর সেই জল বাগানে ব্যবহার করা যাবে।

প্রথম মডেলটি ভেঙে পড়ল।

দ্বিতীয়টিও ঠিকমতো কাজ করল না।

তৃতীয়বার আবার চেষ্টা করল ঝিলিক।

এক রাতে মা দেখলেন, মেয়েটা উঠোনে বসে কিছু একটা নিয়ে কাজ করছে।

—“এত রাতে?”

—“কাল স্কুলে পরীক্ষা।”

—“ঘুমাবি না?”

ঝিলিক বলল,

—“স্বপ্নটা শেষ না করলে ঘুম আসবে না।”

মা কিছু বললেন না।

শুধু ঘরে গিয়ে মেয়ের জন্য এক গ্লাস জল নিয়ে এলেন।

পরদিন বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে ঝিলিকের মডেল ঠিকঠাক কাজ করল।

বিচারকরা অবাক হয়ে দেখলেন।

একজন জিজ্ঞেস করলেন,

—“এটা তুমি নিজে বানিয়েছ?”

ঝিলিক মাথা নাড়ল।

—“জি।”

—“কী দিয়ে?”

ঝিলিক সবকিছু বুঝিয়ে বলল।

শেষে ফল ঘোষণা হল।

ঝিলিক প্রথম হল।

পুরস্কার হিসেবে সে পেল একটি বইয়ের সেট এবং একটি সাইকেল।

লাল রঙের সাইকেল।

সাইকেলটি দেখে ঝিলিক কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

তার চোখে জল এসে গেল।

অনিরুদ্ধবাবু বললেন,

—“কী হল?”

ঝিলিক ফিসফিস করে বলল,

—“স্যার, এটাই তো আমার স্বপ্ন ছিল।”

পরদিন ভোরে ঝিলিক প্রথমবার সাইকেল নিয়ে স্কুলের পথে বেরোল।

লাল সাইকেলটি কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে ছুটছিল।

তার চুল বাতাসে উড়ছিল।

কিন্তু ঝিলিকের মনে হচ্ছিল, সে শুধু স্কুলে যাচ্ছে না—সে যেন নিজের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কয়েক মাস পর গ্রামে আরেকটি সমস্যা দেখা দিল।

গরমের সময় পুকুরের জল শুকিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের মানুষ দূরের টিউবওয়েল থেকে জল আনত।

ঝিলিক ভাবতে শুরু করল।

সে এবার একটা সহজ জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করল।

অনিরুদ্ধবাবুর সাহায্যে গ্রামের কয়েকটি বাড়ির ছাদ থেকে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করল।

প্রথমে গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করল না।

একজন বললেন,

—“এই বাচ্চা মেয়ে আবার আমাদের জল শেখাবে?”

আরেকজন হাসলেন।

কিন্তু ঝিলিক থামল না।

বর্ষার প্রথম বৃষ্টির দিন সে নিজের বাড়িতে ব্যবস্থা চালু করল।

বৃষ্টির জল পাইপ দিয়ে ড্রামে জমতে লাগল।

মা অবাক হয়ে বললেন,

—“এত জল!”

ঝিলিক হাসল।

—“এই জল ফেলে দিলে আবার কিনতে হবে।”

কয়েকদিন পর গ্রামের আরও তিনটি পরিবার সেই ব্যবস্থা তৈরি করল।

তারপর দশটি।

তারপর আরও অনেক বাড়ি।

ঝিলিকের ছোট্ট পরিকল্পনা ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষের কাজে লাগতে শুরু করল।

একদিন পঞ্চায়েতের এক কর্মী এসে বললেন,

—“তোমার এই মডেলটা আমরা অন্য গ্রামেও দেখাতে চাই।”

ঝিলিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

যে মেয়েটাকে নিয়ে একদিন সবাই হাসছিল, আজ তার কাজ দেখতে মানুষ দূর থেকে আসছে।

তবে ঝিলিক বদলায়নি।

সে এখনও প্রতিদিন স্কুলে যায়।

লাল সাইকেলটাও এখনও তার সঙ্গী।

একদিন অনিরুদ্ধবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

—“তুই বড় হয়ে কী হতে চাস?”

ঝিলিক একটু ভেবে বলল,

—“আগে ভাবতাম বিজ্ঞানী হব। এখন মনে হয়, আমি এমন কিছু বানাতে চাই যা গ্রামের মানুষের কাজে লাগে।”

শিক্ষক বললেন,

—“এটাই তো বিজ্ঞানীর আসল স্বপ্ন।”

বছর কেটে গেল।

ঝিলিক উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে চলে গেল।

বিদায়ের দিন তার মা বললেন,

—“সাইকেলটা নিয়ে যাবি?”

ঝিলিক হেসে বলল,

—“না মা। এটা এখানেই থাকবে।”

—“কেন?”

—“গ্রামের যে মেয়েটা স্কুলে যেতে চায়, কিন্তু সাইকেল নেই—সে ব্যবহার করবে।”

মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ঝিলিক সাইকেলটা গ্রামের স্কুলে দিয়ে গেল।

সাইকেলের হ্যান্ডেলে ছোট্ট একটা কাগজ বাঁধা ছিল।

তাতে লেখা—

“স্বপ্ন দেখো। পথ যত দূরই হোক, একদিন পৌঁছবে।”

পরদিন গ্রামের আরেকটি মেয়ে সেই লাল সাইকেলে চেপে স্কুলে গেল।

তারপর আরেকজন।

তারপর আরও একজন।

লাল সাইকেলটি যেন এক স্বপ্ন থেকে আরেক স্বপ্নের কাছে ছুটে বেড়াতে লাগল।

আর সোনাঝুরি গ্রামের মানুষ বুঝল—

কখনও কখনও একটি ছোট্ট স্বপ্ন শুধু একজনের জীবন বদলায় না।

সেটা অনেক মানুষের পথ দেখায়।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *