একটি শিশুর জন্ম সাধারণত একটি পরিবারের ব্যক্তিগত আনন্দের ঘটনা। কিন্তু কখনও কখনও কোনও শিশুর জন্ম একটি দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ১৯৮৬ সালের ৬ আগস্ট মুম্বইয়ের KEM Hospital-এ জন্ম নেওয়া হর্ষা চাওদার জন্ম এমনই একটি ঘটনা।
এই ঘটনাটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ ড. ইন্দিরা হিন্দুজা। ভারতে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা IVF প্রযুক্তির বিকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁর নেতৃত্ব ও চিকিৎসা-গবেষণার সঙ্গে যুক্ত প্রকল্পের ফলেই ভারতে প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে নথিবদ্ধ IVF শিশুর জন্ম হয়। ভারতের Press Information Bureau-র ‘First Ladies’ সংকলনেও তাঁকে এই ঐতিহাসিক চিকিৎসা-অর্জনের সঙ্গে যুক্ত প্রথম ভারতীয় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে “ভারতের প্রথম টেস্ট-টিউব বেবি” প্রসঙ্গে ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতাও রয়েছে। কলকাতার চিকিৎসক ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ১৯৭৮ সালের IVF-সংক্রান্ত কাজ এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে জন্ম নেওয়া ‘দুর্গা’-কে ঘিরে পরবর্তী সময়ে গবেষণাভিত্তিক পুনর্মূল্যায়ন হয়েছে। তাই ইন্দিরা হিন্দুজার ক্ষেত্রে “ভারতের প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে নথিবদ্ধ IVF শিশুর জন্মের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক”—এই বর্ণনাটি বেশি নির্ভুল।
ছোটবেলার স্বপ্ন থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে
ইন্দিরা হিন্দুজার চিকিৎসক হওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ছোটবেলাতেই। একটি দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙে হাসপাতালে যাওয়ার পর চিকিৎসকদের কাজ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল বলে তাঁর জীবনীভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সেখান থেকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যার পাশাপাশি বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা ও প্রজননবিজ্ঞানের দিকে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন।
তখন ভারতে infertility বা বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা আজকের মতো উন্নত ছিল না। IVF প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং পরীক্ষামূলক পর্যায়ের। ফলে এই ক্ষেত্রে কাজ করার অর্থ ছিল একই সঙ্গে চিকিৎসা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার নানা সমস্যার মোকাবিলা করা।
IVF নিয়ে গবেষণার সময়
ইন্দিরা হিন্দুজা যখন IVF নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন মানুষের ডিম্বাণু, শুক্রাণু, ভ্রূণ এবং জরায়ুর মধ্যে সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে গর্ভধারণ করানো ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি প্রক্রিয়া।
এই গবেষণায় তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রজননবিজ্ঞানের গবেষক ও চিকিৎসকদের একটি দল। KEM Hospital এবং Institute for Research in Reproduction-এর সহযোগিতায় পরিচালিত প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত ১৯৮৬ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এনে দেয়। গবেষণাভিত্তিক ইতিহাসে এই শিশুর জন্মকে ভারতের প্রথম “scientifically documented” IVF birth হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৮৬ সালের ৬ আগস্ট মুম্বইয়ের KEM Hospital-এ হর্ষা চাওদার জন্ম হয়।
সেই সময় এই ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তি যে ভারতেও সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব—এই সাফল্য তার বাস্তব প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
হর্ষার জন্মের পেছনের সংগ্রাম
হর্ষার জন্মের আগে একাধিক দম্পতির ক্ষেত্রে IVF-এর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
ভারতের প্রথম নথিবদ্ধ IVF শিশুর জন্মের ঘটনাটি তাই হঠাৎ পাওয়া কোনও সাফল্য ছিল না। এর পেছনে ছিল বহু বছরের গবেষণা, ব্যর্থতা, পরীক্ষা এবং চিকিৎসকদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।
India Today-এর একটি ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, হর্ষার আগে বহু দম্পতির ক্ষেত্রে IVF-এর চেষ্টা করা হয়েছিল। অবশেষে মণি ও শ্যাম চাওদার পরিবারে সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে।
একটি চিকিৎসা-প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ যে কতগুলি ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর সম্ভব হতে পারে, এই ঘটনাটি তারও একটি উদাহরণ।
‘টেস্ট-টিউব বেবি’ শব্দটির আড়ালে আসল বিজ্ঞান
“টেস্ট-টিউব বেবি” কথাটি জনপ্রিয় হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় IVF বা in vitro fertilization অনেক বেশি নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া।
সাধারণ গর্ভধারণে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন নারীর শরীরের ভেতরে ঘটে। IVF-এ ডিম্বাণু সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে শুক্রাণুর সঙ্গে নিষেক ঘটানো হয়। এরপর তৈরি হওয়া ভ্রূণকে জরায়ুতে স্থানান্তর করা হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই অত্যন্ত সূক্ষ্ম চিকিৎসা-দক্ষতা প্রয়োজন।
১৯৮০-এর দশকে ভারতে এই প্রযুক্তি আরও কঠিন ছিল। আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা, উন্নত embryo culture system এবং বর্তমানের মতো sophisticated reproductive technology তখন সহজলভ্য ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে IVF-এর সফল প্রয়োগ ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছিল।
একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক
ইন্দিরা হিন্দুজার কৃতিত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভারতের IVF-এর ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম সামনে আসে—ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
১৯৭৮ সালে কলকাতায় ড. মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি শিশুর জন্ম হয়, যাকে পরবর্তীকালে ‘দুর্গা’ নামে পরিচিত করা হয়। বহু বছর পর তাঁর গবেষণার নথি ও কাজ নিয়ে পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয়। গবেষক টি. সি. আনন্দ কুমারও পরবর্তী সময়ে মুখোপাধ্যায়ের কাজ পর্যালোচনা করেছিলেন।
অন্যদিকে, ১৯৮৬ সালের হর্ষা চাওদার জন্মটি KEM Hospital ও Institute for Research in Reproduction-এর যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে হয় এবং সেটিই ভারতের প্রথম scientifically documented IVF birth হিসেবে সরকারি ও চিকিৎসা-ইতিহাসের বহু নথিতে স্থান পেয়েছে।
অতএব ইতিহাসটিকে এক লাইনের “প্রথম” দিয়ে ব্যাখ্যা না করে বলা যায়—ভারতে IVF-এর ইতিহাস একাধিক বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকের গবেষণা ও প্রচেষ্টার ফল, আর ইন্দিরা হিন্দুজা সেই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
IVF-এর বাইরেও তাঁর গবেষণা
ইন্দিরা হিন্দুজার কাজ শুধু IVF-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি infertility treatment-এর বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। বিশেষ করে Gamete Intrafallopian Transfer বা GIFT প্রযুক্তির বিকাশ ও প্রয়োগেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৮৮ সালের ৪ জানুয়ারি ভারতে GIFT পদ্ধতির মাধ্যমে প্রথম শিশুর জন্মের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। এই প্রযুক্তি IVF-এর থেকে আলাদা হলেও সহায়ক প্রজনন চিকিৎসার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি ছিল।
পরবর্তী সময়ে তিনি menopause বা premature ovarian failure-এর মতো সমস্যায় oocyte donation নিয়ে কাজ করেন। ১৯৯১ সালে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারতে একটি শিশুর জন্মের সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিকে সফল করা নয়; বরং বিভিন্ন ধরনের বন্ধ্যত্ব সমস্যার চিকিৎসার পথ তৈরি করা।
চিকিৎসা থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে
একজন চিকিৎসকের সাফল্য শুধু নিজের চিকিৎসা-প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তার প্রভাব একটি নির্দিষ্ট সময় ও রোগীর মধ্যে আটকে থাকে। কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞান যখন পরবর্তী প্রজন্মের চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তার প্রভাব অনেক বিস্তৃত হয়।
ইন্দিরা হিন্দুজা দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। KEM Hospital এবং Seth G.S. Medical College-এ তাঁর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছিল। বিভিন্ন প্রজন্মের চিকিৎসক ও ছাত্রছাত্রী তাঁর কাছ থেকে reproductive medicine ও infertility treatment সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন।
স্বীকৃতি ও পদ্মশ্রী
ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন সময়ে।
তিনি Dhanvantari Award-সহ বিভিন্ন সম্মান পেয়েছেন। ২০১১ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। সরকারি নথিতেও তাঁর IVF ও assisted reproduction ক্ষেত্রে অবদানের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এই সম্মান তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি reproductive medicine-কে ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ইতিহাসেরও অংশ।
একটি শিশুর জন্ম থেকে একটি নতুন চিকিৎসা-যুগ
১৯৮৬ সালের সেই শিশুর জন্মের সময় হয়তো কেউই জানতেন না যে ঘটনাটি ভবিষ্যতের ভারতীয় fertility treatment-কে কতটা বদলে দেবে।
আজ IVF, ICSI, embryo freezing, donor programmes এবং নানা ধরনের assisted reproductive technology নিয়ে মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি পরিচিত। কিন্তু এই প্রযুক্তিগুলির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও চিকিৎসা-পরিকাঠামো তৈরি হতে বহু বছর লেগেছে।
সেই দীর্ঘ পথের প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলির একটি ছিল ১৯৮৬ সালের সফল IVF জন্ম।
ড. ইন্দিরা হিন্দুজার কাজ সেই পরিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
ইন্দিরা হিন্দুজার জীবনের তাৎপর্য
ইন্দিরা হিন্দুজার জীবনের গল্প কোনও একক সাফল্যের গল্প নয়। এটি গবেষণার ধৈর্য, চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষানিরীক্ষা এবং ব্যর্থতার পরেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার গল্প।
একদিকে ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে ছিল অত্যন্ত জটিল একটি চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকদের কাজ ছিল বিজ্ঞানকে বাস্তব চিকিৎসায় রূপ দেওয়া।
হর্ষা চাওদার জন্ম সেই প্রচেষ্টার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
আর ইন্দিরা হিন্দুজার উত্তরাধিকার কেবল সেই একটি শিশুর জন্মে শেষ হয়ে যায়নি। IVF ও assisted reproduction-এর ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা, চিকিৎসা এবং শিক্ষাদানের কাজ পরবর্তী প্রজন্মের চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথকে আরও প্রশস্ত করেছে।
ভারতের চিকিৎসা-ইতিহাসে তাই তাঁর নাম উচ্চারিত হয় এমন এক সময়ের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে, যখন আধুনিক reproductive medicine এখনও শৈশব অবস্থায় ছিল। সেই সময়ে গবেষণাগারের একটি সম্ভাবনাকে বাস্তব চিকিৎসায় পরিণত করার কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
একটি শিশুর জন্ম যেমন একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, তেমনই কোনও বৈজ্ঞানিক সাফল্য কখনও কখনও একটি গোটা দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। ড. ইন্দিরা হিন্দুজার কর্মজীবন সেই দ্বিতীয় ধরনের পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।