Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

প্রফেসর বিমলা বুটি: প্লাজমার রহস্য অনুসন্ধান করা ভারতের এক বিজ্ঞান-অগ্রদূত।

বিজ্ঞানের কিছু ক্ষেত্র সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অদৃশ্য। আমরা বিদ্যুৎ দেখি, আলো দেখি, মহাকাশ দেখি; কিন্তু সেই দৃশ্যমান জগতের পেছনে থাকা অদৃশ্য কণিকা, তরঙ্গ, শক্তি ও ক্ষেত্রের আচরণ বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা যে গভীর গবেষণা করেন, তার অনেকটাই আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়।

প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞান তেমনই একটি ক্ষেত্র।

সূর্য, নক্ষত্র এবং মহাকাশের বিভিন্ন পরিবেশে প্লাজমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্লাজমার মধ্যে কণিকার সম্মিলিত আচরণ, তরঙ্গ, অস্থিতিশীলতা এবং শক্তির প্রবাহ বোঝা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র।

এই জটিল জগতে ভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নাম ছিলেন প্রফেসর বিমলা বুটি। তিনি শুধু একজন তাত্ত্বিক প্লাজমা পদার্থবিদ ছিলেন না; ভারত ও আন্তর্জাতিক পরিসরে প্লাজমা গবেষণার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন Indian National Science Academy বা INSA-র প্রথম ভারতীয় নারী Physics Fellow এবং The World Academy of Sciences-এরও প্রথম ভারতীয় নারী বিজ্ঞানী Fellow হিসেবে স্বীকৃত।

তাঁর জীবন ছিল গবেষণা, শিক্ষকতা, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চা এবং পরবর্তী জীবনে তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য কাজ করার এক দীর্ঘ যাত্রা।

দেশভাগের সময় শৈশব

বিমলা বুটির জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ সালে অবিভক্ত ভারতের মুলতানে। তাঁর বাবা ছিলেন বোধরাজ বুটি এবং মা যমুনা দেবী বুটি।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তাঁর পরিবার মুলতান থেকে দিল্লিতে চলে আসে। তখন বিমলার বয়স ছিল মাত্র তেরো-চৌদ্দ বছর।

পরবর্তীকালে Physics Today-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই সেই সময়ের কথা স্মরণ করেছিলেন। দেশভাগের পরে নতুন পরিবেশে তাঁর পড়াশোনা শুরু করতে হয়েছিল। যে স্কুলে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন, সেটি মূলত পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তু শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি সরকারি স্কুল ছিল এবং সেখানে বিজ্ঞান পড়ার সুযোগ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েই তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞানশিক্ষার সুযোগ পান।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

একদিকে ছিল দেশভাগের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ।

গণিত থেকে পদার্থবিজ্ঞান

ছোটবেলা থেকেই বিমলা বুটির গণিতের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। Physics Today-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, গণিতে তাঁর আগ্রহই তাঁকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়।

তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে Physics নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকেই Bachelor’s ও Master’s ডিগ্রি অর্জন করেন।

এরপর ভারত সরকারের একটি Fellowship নিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান।

গন্তব্য ছিল University of Chicago।

সেই সময় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের একজন ছিলেন সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর। পরবর্তীকালে চন্দ্রশেখর নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর অধীনেই বিমলা বুটি ডক্টরাল গবেষণা শুরু করেন।

চন্দ্রশেখরের অধীনে গবেষণা

১৯৬২ সালে University of Chicago থেকে বিমলা বুটি Plasma Physics-এ PhD অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল plasma oscillations এবং two-stream instability-এর মতো জটিল সমস্যা।

প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞান তখনও তুলনামূলকভাবে নতুন এবং দ্রুত বিকাশমান ক্ষেত্র।

একটি প্লাজমা পরিবেশে charged particles বা আধানযুক্ত কণিকাগুলি কীভাবে সম্মিলিতভাবে আচরণ করে, কীভাবে তরঙ্গ তৈরি হয় এবং কখন সেই ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন বিজ্ঞানীরা।

বিমলা বুটি সেই গবেষণারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রবেশ করেছিলেন।

চন্দ্রশেখরের মতো একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর তত্ত্বাবধানে গবেষণা তাঁর বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তী জীবনেও তিনি চন্দ্রশেখরকে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক ও পথপ্রদর্শকদের একজন হিসেবে স্মরণ করেছেন।

বিদেশের গবেষণা শেষ করে দেশে ফেরা

PhD সম্পন্ন করার পর বিমলা বুটি ভারতে ফিরে আসেন। সরকারি Fellowship-এর শর্ত অনুযায়ী দেশে ফিরে তিনি Delhi University-তে শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত হন।

কিছুদিন পর তিনি আবার যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং NASA-র Goddard Space Flight Center-এ গবেষণার সুযোগ পান।

এখানে তাঁর গবেষণার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়।

মহাকাশের পরিবেশে প্লাজমার আচরণ বোঝার জন্য plasma physics-এর জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাঁর গবেষণা ধীরে ধীরে পৃথিবীর গবেষণাগার থেকে মহাকাশবিজ্ঞানের বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে তিনি NASA-র Ames Research Center এবং Jet Propulsion Laboratory-তেও কাজ করেন।

ভারতে ফিরে নতুন অধ্যায়

১৯৬৮ সালে বিমলা বুটি ভারতে ফিরে আসেন এবং Indian Institute of Technology Delhi-তে যোগ দেন। সেখানে তিনি প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন।

কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলির একটি শুরু হয় যখন তিনি Physical Research Laboratory বা PRL, আহমেদাবাদে যোগ দেন।

তৎকালীন PRL-এর পরিচালক ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাই। সারাভাই তাঁকে PRL-এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

বিমলা বুটি ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে PRL-এ Associate Professor হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে Professor, Senior Professor ও Dean of Faculty পদে দায়িত্ব পালন করেন।

PRL-এ প্লাজমা গবেষণার ভিত

PRL-এ বিমলা বুটির অন্যতম বড় অবদান ছিল প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানের একটি শক্তিশালী গবেষণা কর্মসূচি গড়ে তোলা।

তিনি সেখানে theoretical এবং experimental—দুই ধারার প্লাজমা গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গবেষণা দল পরবর্তী সময়ে ভারতের plasma physics গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। Astronomical Society of India-র স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে, PRL-এ তাঁর গড়ে তোলা plasma physics group পরবর্তীকালে আলাদা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে Institute for Plasma Research (IPR) গঠনের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এখানেই একজন বিজ্ঞানীর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে।

গবেষণা শুধু নিজের গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি নতুন ক্ষেত্রের জন্য গবেষণাগার, ছাত্র, শিক্ষক, প্রযুক্তি এবং গবেষণার সংস্কৃতি তৈরি করাও বিজ্ঞানীর দীর্ঘমেয়াদি অবদানের অংশ।

বিমলা বুটি সেই কাজটিই করেছিলেন।

প্লাজমা তরঙ্গ, অস্থিরতা ও Chaos

বিমলা বুটির গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল nonlinear plasma waves, solitons এবং chaos।

সহজ ভাষায় বললে, প্লাজমার মধ্যে শক্তি ও কণিকার সম্মিলিত আচরণ সব সময় সরল নিয়ম মেনে চলে না। অনেক সময় ছোট পরিবর্তন জটিল তরঙ্গ বা অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।

এই ধরনের nonlinear phenomena বোঝার জন্য গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত সূক্ষ্ম পদ্ধতি প্রয়োজন।

University of Chicago-র একটি স্মৃতিচারণে তাঁর কাজকে plasma phenomena বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং nonlinear waves ও chaos নিয়ে তাঁর গবেষণার কথাও বলা হয়েছে।

এই গবেষণার ফলে তিনি আন্তর্জাতিক প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চায় নেতৃত্ব

বিমলা বুটির কর্মজীবন শুধু ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

১৯৮৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ইতালির Trieste-এ অবস্থিত Abdus Salam International Centre for Theoretical Physics বা ICTP-তে Plasma Physics-এর Director হিসেবে কাজ করেন।

এই প্রতিষ্ঠানটি বিশেষভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলির বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিমলা বুটি সেখানে বিভিন্ন দেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় যুক্ত করার কাজ করেন।

তিনি বহু Spring College এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লক্ষ্য ছিল উন্নয়নশীল দেশের তরুণ গবেষকদের বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়া।

অর্থাৎ তিনি শুধু নিজে গবেষণা করেননি; নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণার দরজাও খুলতে সাহায্য করেছিলেন।

একজন নারী বিজ্ঞানীর পথ

বিমলা বুটির কর্মজীবনের সময় পদার্থবিজ্ঞান ছিল মূলত পুরুষ-প্রধান ক্ষেত্র।

বিশেষ করে plasma physics-এর মতো অত্যন্ত বিশেষায়িত গবেষণাক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি ছিল আরও কম।

নিজের একটি লেখায় তিনি পুরুষ-প্রধান বিজ্ঞানক্ষেত্রে একজন নারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। American Physical Society-র একটি আলোচনায় তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, তিনি মনে করতেন নারী বিজ্ঞানীদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বাধা ছিল।

তবে তাঁর পথ শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়।

তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, সেখানে গবেষণা দল তৈরি করেছেন, ছাত্রছাত্রীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং একটি নতুন গবেষণাক্ষেত্রকে শক্তিশালী করেছেন।

এই কারণে তাঁর উত্তরাধিকার ব্যক্তিগত সাফল্যের বাইরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞানসম্মান ও পুরস্কার

বিমলা বুটির গবেষণার স্বীকৃতি এসেছে বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সম্মানের মাধ্যমে।

১৯৭৭ সালে তিনি Vikram Sarabhai Award for Planetary Sciences লাভ করেন।

১৯৯৩ সালে পান Jawaharlal Nehru Birth Centenary Lectureship Award।

১৯৯৪ সালে তিনি পান INSA-Vainu Bappu Award for Astrophysics।

১৯৯৬ সালে University of Chicago তাঁকে Professional Achievement Citation প্রদান করে।

পরবর্তী সময়ে nonlinear waves এবং chaos-এর ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য ২০১০ সালে একটি US Medal-ও পান।

তাঁর বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল Fellowship।

১৯৮১ সালে তিনি Indian National Science Academy-এর Fellow নির্বাচিত হন এবং INSA-র সরকারি উপাদানে তাঁকে প্রথম ভারতীয় নারী Physics Fellow হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি TWAS, National Academy of Sciences India এবং American Physical Society-এরও Fellow ছিলেন।

গবেষণা থেকে সমাজের দিকে

অবসর নেওয়ার পরেও বিমলা বুটির কাজ থেমে যায়নি।

২০০৩ সালে তিনি Buti Foundation প্রতিষ্ঠা করেন।

এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি তরুণ বিজ্ঞানীদের উৎসাহ দেওয়া, শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং computer literacy-র মতো বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত হন। Physics Today-কে তিনি বলেছিলেন, অবসরের পর তিনি সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। STEM ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও তাঁর অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ জীবনের শেষ পর্যায়েও তাঁর মনোযোগ ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে।

যে বিজ্ঞান তিনি একসময় শিখেছিলেন, সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কিছুটা নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়াই হয়ে ওঠে তাঁর পরবর্তী কাজের অন্যতম উদ্দেশ্য।

একজন শিক্ষকের উত্তরাধিকার

বিমলা বুটির ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে তাঁর শিক্ষকসুলভ ভূমিকার কথা বারবার উঠে এসেছে।

International Astronomical Union-এর স্মৃতিচারণে তাঁর একজন প্রাক্তন ছাত্র লিখেছেন, বিমলা বুটি শুধু একজন অসাধারণ গবেষক ছিলেন না, তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ mentor-ও ছিলেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীকালে নিজ নিজ গবেষণাক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হন।

বিজ্ঞানে একজন শিক্ষক কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর জীবন তার একটি উদাহরণ।

একটি গবেষণাপত্র হয়তো একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান করে। কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক বহু মানুষের চিন্তার ধরন বদলে দিতে পারেন।

বিমলা বুটির ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় উত্তরাধিকারটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪-এ বিদায়

প্রফেসর বিমলা বুটি ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে ৯০ বছর বয়সে মারা যান। International Astronomical Union, Astronomical Society of India এবং Plasma Science Society of India তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদান ও শিক্ষকতার কথা স্মরণ করে।

তাঁর চলে যাওয়ার সঙ্গে ভারতীয় প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজন্মেরও অবসান ঘটে।

কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত গবেষণার ধারাগুলি, ছাত্রছাত্রীদের কাজ এবং তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য তৈরি সুযোগ তাঁর উত্তরাধিকারকে বহন করে চলেছে।

বিমলা বুটির জীবন থেকে যে অধ্যায়টি থেকে যায়

বিমলা বুটির জীবনের গল্পে একাধিক সময় ও ভূগোল একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।

মুলতানে জন্ম।

দেশভাগের সময় দিল্লিতে চলে আসা।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানচর্চা।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে চন্দ্রশেখরের অধীনে PhD।

NASA-তে গবেষণা।

IIT Delhi-তে শিক্ষকতা।

বিক্রম সারাভাইয়ের আমন্ত্রণে PRL-এ যোগদান।

ভারতে plasma physics-এর গবেষণাভিত্তি শক্তিশালী করা।

Trieste-এ আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণের নেতৃত্ব।

আর অবসরের পরে তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য Foundation গড়ে তোলা।

এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি ধাপে তাঁর কাজের ধরন কিছুটা বদলেছে, কিন্তু একটি বিষয় একই থেকেছে—জ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

তিনি দেখিয়েছেন, বিজ্ঞানীর কাজ শুধু নতুন তথ্য আবিষ্কার করা নয়। কখনও গবেষণাগার তৈরি করা, কখনও ছাত্র তৈরি করা, কখনও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা, আবার কখনও পরবর্তী প্রজন্মকে সুযোগ করে দেওয়াও বিজ্ঞানেরই অংশ।

শেষ কথা

প্রফেসর বিমলা বুটি এমন এক সময়ে প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যখন এই ক্ষেত্রটি ছিল কঠিন, বিশেষায়িত এবং পুরুষ-প্রধান।

কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল “প্রথম ভারতীয় নারী” হওয়ার মধ্যে আটকে নেই।

তাঁর আসল কৃতিত্ব ছিল একটি গবেষণাক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া এবং বহু তরুণ গবেষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

মহাকাশের প্লাজমা নিয়ে গবেষণা করা এই বিজ্ঞানী শেষ পর্যন্ত বুঝেছিলেন—একজন গবেষকের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার শুধু তাঁর নিজের প্রকাশিত গবেষণাপত্র নয়; তিনি যাঁদের হাতে জ্ঞান তুলে দেন, তাঁদের কাজের মধ্যেও তাঁর চিন্তার ধারাবাহিকতা বেঁচে থাকে।

বিমলা বুটির জীবন সেই ধারাবাহিকতারই এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *