Categories
গল্প

বাঁশের ঝুড়ির ভিতর।

নদীর ধারে ছোট্ট একটা গ্রাম—নাম মাধবপুর।

গ্রামটা খুব সুন্দর। চারদিকে সবুজ ধানখেত, মাঝখানে কাঁচা রাস্তা, আর গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা পুরোনো বটগাছ। সেই বটগাছের নিচেই প্রতিদিন বিকেলে বসতেন গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধ।

মাধবপুরের আর একটা পরিচয় ছিল।

এই গ্রামের মানুষ বাঁশ দিয়ে ঝুড়ি, কুলো, ডালা, চালুনি আর নানা ধরনের জিনিস তৈরি করত।

কিন্তু সময় বদলাচ্ছিল।

প্লাস্টিকের ঝুড়ি বাজার দখল করে নিচ্ছিল।

শহরের সস্তা জিনিসের সঙ্গে গ্রামের হাতে তৈরি বাঁশের জিনিসের প্রতিযোগিতা হচ্ছিল না।

একসময় যে বাড়িগুলো থেকে সকাল-বিকেল বাঁশ কাটার শব্দ শোনা যেত, সেখানে নীরবতা নেমে এল।

সেই গ্রামেই থাকত কেয়া।

বয়স মাত্র উনিশ।

তার বাবা নিতাই ছিলেন বাঁশের কারিগর।

বাবার হাতের কাজ ছিল অসাধারণ।

তিনি একটা সাধারণ বাঁশের টুকরো হাতে নিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এমন সুন্দর ঝুড়ি বানিয়ে ফেলতেন যে মনে হতো, বাঁশ নয়—কেউ যেন কাঠের ওপর ছবি এঁকেছে।

কিন্তু সেই কাজ থেকে সংসার চলছিল না।

একদিন বাজার থেকে ফিরে নিতাই একটা ঝুড়ি উঠোনে ছুড়ে রেখে বললেন,

—“আজ সারাদিন বসে থেকেও তিনটে ঝুড়ি বিক্রি হল।”

কেয়া চুপ করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

—“কত পেলেন?”

—“দেড়শো টাকা।”

মা বললেন,

—“তুমি আর এই কাজ কোরো না। অন্য কিছু করো।”

নিতাই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“বাঁশের কাজ ছেড়ে দিলে আমার হাত দুটোই যেন অকেজো হয়ে যাবে।”

কেয়া বাবার পাশে বসে বলল,

—“কাজটা খারাপ নয় বাবা। হয়তো আমরা কাজটাকে নতুনভাবে দেখছি না।”

বাবা হেসে বললেন,

—“তুই এখন আমাকে শেখাবি?”

কেয়া বলল,

—“হ্যাঁ। শেখাব।”

বাবা হেসে ফেললেন।

কিন্তু কেয়া কথাটা সত্যিই ভেবে দেখেছিল।

পরদিন সে বাবার বানানো ঝুড়িগুলো ভালো করে দেখতে শুরু করল।

সবগুলোই একই ধরনের।

বড় ঝুড়ি।

মাঝারি ঝুড়ি।

ছোট ঝুড়ি।

কুলো।

ডালা।

চালুনি।

কেয়া বলল,

—“বাবা, এগুলো দেখতে সুন্দর। কিন্তু শহরের মানুষ এগুলো কীভাবে ব্যবহার করবে?”

বাবা বললেন,

—“ঝুড়ি দিয়ে জিনিস রাখবে।”

—“আর কিছু?”

বাবা মাথা নাড়লেন।

সেই রাতে কেয়া একটা খাতা খুলল।

পাতার ওপর লিখল—

“বাঁশ দিয়ে আর কী কী বানানো যায়?”

তারপর সে ভাবতে শুরু করল।

ফুলের টবের খোলস।

ল্যাম্পশেড।

কলম রাখার পাত্র।

ফলের ঝুড়ি।

চা রাখার বাক্স।

ছোট আয়নার ফ্রেম।

দেয়ালে ঝোলানোর সাজসজ্জা।

মোবাইল রাখার স্ট্যান্ড।

আরও অনেক কিছু।

পরদিন কেয়া বাবাকে বলল,

—“আমরা শুধু ঝুড়ি বানাব না।”

বাবা অবাক।

—“তাহলে?”

—“বাঁশ দিয়ে বাড়ির জিনিস বানাব।”

বাবা কিছু বললেন না।

কেয়া কাজ শুরু করল।

প্রথমে সে একটা ছোট ল্যাম্পশেডের নকশা আঁকল।

বাবা সেটাকে দেখে বললেন,

—“এটা বাঁশ দিয়ে হবে?”

—“চেষ্টা করে দেখুন।”

বাবা বাঁশ কেটে পাতলা করে নিলেন।

কয়েক ঘণ্টা পর তৈরি হল একটা সুন্দর ল্যাম্পশেড।

মাটির প্রদীপের আলো তার ফাঁক দিয়ে বাইরে এসে দেওয়ালে অদ্ভুত নকশা তৈরি করল।

মা অবাক হয়ে বললেন,

—“এটা তো সত্যিই সুন্দর!”

কেয়া বলল,

—“এবার ছবি তুলব।”

সে মোবাইলে ছবি তুলল।

তারপর ছবিটা গ্রামের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে শহরের একটা অনলাইন পেজে পাঠাল।

কয়েকদিন কোনো উত্তর এল না।

তারপর এক সন্ধ্যায় ফোন এল।

একজন মহিলা বললেন,

—“আপনারা কি এই ধরনের ল্যাম্পশেড তৈরি করেন?”

কেয়া বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“আমাদের দশটা লাগবে।”

কেয়া যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

—“দশটা?”

—“হ্যাঁ। আরও ভালো হলে পরে বেশি নেব।”

ফোন রেখে কেয়া ছুটে বাবার কাছে গেল।

—“বাবা!”

নিতাই তখন বাঁশ কাটছিলেন।

—“কী হয়েছে?”

—“দশটা অর্ডার!”

বাবার হাত থেমে গেল।

—“কীসের?”

—“ল্যাম্পশেড।”

নিতাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“সত্যি?”

কেয়া হেসে বলল,

—“মিথ্যে বললে তো এত খুশি হতাম না।”

সেই দশটা ল্যাম্পশেড তৈরি করতে গ্রামের আরও দুজন কারিগরকে ডাকা হল।

তারপর আরও অর্ডার এল।

কেয়া বুঝল—শুধু নিজের পরিবার নয়, পুরো গ্রামের কারিগরদের নিয়ে কাজ করতে হবে।

সে বটগাছের নিচে একটা ছোট বৈঠক ডাকল।

গ্রামের কারিগররা এলেন।

কেয়া বলল,

—“আমরা সবাই আলাদা আলাদা করে কাজ করলে দাম কম পাব। কিন্তু সবাই মিলে কাজ করলে বড় অর্ডার নিতে পারব।”

একজন বৃদ্ধ কারিগর বললেন,

—“কিন্তু আমাদের জিনিস কে কিনবে?”

কেয়া বলল,

—“আমি খুঁজব।”

সে ছবি তুলতে লাগল।

প্রতিটি পণ্যের নাম দিল।

দাম লিখল।

কোন বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে, কীভাবে তৈরি হয়েছে—সেটাও লিখল।

সবচেয়ে বড় কথা, সে প্রতিটি কারিগরের নামও লিখে রাখল।

কেয়া বলত,

—“এই জিনিসটা শুধু বাঁশ দিয়ে তৈরি নয়। এর সঙ্গে একজন মানুষের কয়েক ঘণ্টার শ্রম জড়িয়ে আছে।”

ধীরে ধীরে অর্ডার বাড়তে লাগল।

গ্রামের যে যুবকেরা অন্য শহরে কাজের জন্য চলে যেতে চেয়েছিল, তারাও ফিরে এল।

কারও কাজ হল বাঁশ কাটার।

কারও কাজ বাঁশ শুকোনোর।

কারও কাজ বুননের।

কারও কাজ পালিশের।

আর কেয়ার কাজ হল নকশা, ছবি, হিসাব আর ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ।

একদিন শহর থেকে একদল মানুষ গ্রামে এল।

তারা মাধবপুরের কাজ দেখতে চাইল।

বটগাছের নিচে বসে তারা কারিগরদের কাজ দেখল।

একজন শহুরে মহিলা একটা ছোট বাঁশের ঝুড়ি হাতে নিয়ে বললেন,

—“এটার দাম কত?”

নিতাই দাম বললেন।

মহিলা বললেন,

—“এত কম?”

নিতাই অবাক।

কেয়া হেসে বলল,

—“আমরা এতদিন শুধু জিনিসের দাম ভেবেছি। শ্রমের দাম ভাবিনি।”

মহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“আজ থেকে আপনারা নিজের কাজের দাম নিজেরাই ঠিক করবেন।”

সেদিনের পর মাধবপুরে একটা পরিবর্তন শুরু হল।

কারিগররা আর নিজেদের কাজ লুকিয়ে রাখত না।

বরং গর্ব করে বলত,

—“আমি বাঁশের কাজ করি।”

যে কাজ একসময় দারিদ্র্যের প্রতীক বলে মনে করা হতো, সেটাই ধীরে ধীরে গ্রামের পরিচয় হয়ে উঠল।

কয়েক মাস পর কেয়ার বাবা নতুন একটা জিনিস বানালেন।

একটা বড় বাঁশের ঝুড়ি।

কিন্তু ঝুড়িটার ভিতরে তিনি একটা ছোট কাঠের বাক্স বসিয়েছিলেন।

কেয়া জিজ্ঞেস করল,

—“এটা কী?”

বাবা বললেন,

—“তোর জন্য।”

কেয়া বাক্সটা খুলল।

ভিতরে একটা কাগজ।

বাবা লিখেছেন—

“যে জিনিসকে সবাই শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করে, তার ভিতরেও নতুন শুরুর জায়গা থাকে।”

কেয়ার চোখ ভিজে গেল।

সে বাবার হাত ধরে বলল,

—“এই কথাটা কোথা থেকে শিখলেন?”

নিতাই হাসলেন।

—“তুই শিখিয়েছিস।”

সন্ধ্যায় বটগাছের নিচে আবার গ্রামের মানুষ জড়ো হল।

কেউ বাঁশ কাটছে।

কেউ বুনছে।

কেউ নতুন নকশা আঁকছে।

দূরে বাজারের রাস্তা ধরে একটা গাড়ি চলে গেল।

কেয়া তাকিয়ে রইল।

তার মনে হল, বদলে যাওয়ার জন্য সবসময় বড় শহরে যেতে হয় না।

কখনও কখনও নিজের গ্রামের পুরোনো কাজটার ভিতরেই নতুন ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে।

শুধু তাকে খুঁজে বের করার মতো একজন মানুষের দরকার হয়।

মাধবপুরে সেই মানুষটি ছিল কেয়া।

আর একটা সাধারণ বাঁশের ঝুড়ির ভিতরে সে খুঁজে পেয়েছিল—

একটা পুরো গ্রামের নতুন স্বপ্ন।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *