শালবনের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা গ্রাম—নাম তার কুসুমডাঙা। গ্রামের একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে লাল মাটির উঁচুনিচু পথ চলে গেছে জঙ্গলের দিকে। বর্ষায় সেই পথ কাদায় ডুবে যায়, আর গ্রীষ্মে ধুলো উড়িয়ে হাঁটা কঠিন হয়ে ওঠে।
গ্রামের মানুষজন বহু বছর ধরে একটা সমস্যায় ভুগছিল।
গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। বাজার যেতে হলে আরও তিন কিলোমিটার। কিন্তু কুসুমডাঙা থেকে পাকা রাস্তা পর্যন্ত যাওয়ার কোনো ভালো পথ ছিল না।
বর্ষায় অসুস্থ মানুষকে বাঁশের খাটিয়ায় তুলে নিয়ে যেতে হতো।
কেউ কেউ মাঝপথেই ফিরে আসত।
গ্রামের সবাই সমস্যাটা জানত। কিন্তু সমস্যাটা যেন সবারই—তাই কারও একার দায়িত্ব ছিল না।
সেই গ্রামেই থাকত মাধবী।
বয়স তার তেইশ। বাবা নেই। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করেন। মাধবী নিজে গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে আর পড়তে পারেনি। সংসারের জন্য ছোটবেলা থেকেই কাজ করেছে।
কিন্তু একটা জিনিস সে খুব ভালোবাসত—রাস্তা।
অদ্ভুত শোনালেও সত্যি।
মাধবী প্রায়ই গ্রামের পথ ধরে হাঁটত। কোথায় গর্ত, কোথায় জল জমে, কোথায় রাস্তা সরু—সব তার মুখস্থ।
একদিন বর্ষার দুপুরে গ্রামের বৃদ্ধা কমলা পিসি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
মাধবী ছুটে এল।
—“পিসি, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”
দুজন যুবক বাঁশের খাটিয়া নিয়ে এল।
বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি।
লাল মাটির পথ কাদায় পরিণত হয়েছে।
চারজন মিলে কমলা পিসিকে খাটিয়ায় তুলে রওনা দিল।
কিন্তু আধঘণ্টা পরেই সমস্যা হল।
একটা জায়গায় রাস্তার মাঝখানে এত বড় গর্ত তৈরি হয়েছে যে খাটিয়া নিয়ে যাওয়া অসম্ভব।
সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল।
কমলা পিসি কষ্ট করে বললেন,
—“আমাকে আর নিয়ে যেও না। বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে চলো।”
মাধবী চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখের সামনে যেন শুধু গর্তটা নয়—পুরো গ্রামের ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে ছিল।
সেদিন শেষ পর্যন্ত পাশের গ্রামের একটা ট্রাক্টর ডেকে কমলা পিসিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
তিনি বেঁচে গেলেন।
কিন্তু মাধবী সেদিন একটা সিদ্ধান্ত নিল।
এই রাস্তা ঠিক করতেই হবে।
পরদিন সকালে সে একটা খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
প্রথমে গ্রামের সব রাস্তা মেপে নিল।
কোথায় গর্ত, কোথায় কালভার্ট ভাঙা, কোথায় জল জমে—সব লিখে রাখল।
তারপর গ্রামের মানুষজনের বাড়ি বাড়ি গেল।
—“আপনারা সবাই একটা করে সই করবেন?”
একজন হেসে বলল,
—“কী হবে সই করে?”
মাধবী বলল,
—“রাস্তার জন্য আবেদন করব।”
আরেকজন বলল,
—“আগেও তো অনেক আবেদন হয়েছে।”
মাধবী শান্তভাবে বলল,
—“হয়েছে। কিন্তু এবার আমরা রাস্তার সমস্যার পুরো হিসাব দেব।”
সে শুধু সই সংগ্রহ করল না।
প্রতিটি গর্তের ছবি তুলল।
বর্ষায় কোথায় জল জমে তার ছবি তুলল।
স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের সমস্যা লিখে রাখল।
অসুস্থ মানুষকে কীভাবে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়, তারও তথ্য সংগ্রহ করল।
তারপর সব কাগজ সুন্দর করে সাজিয়ে আবেদন করল।
কিন্তু উত্তর এল না।
এক মাস কেটে গেল।
দুই মাস।
তিন মাস।
গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলল।
একদিন চায়ের দোকানে বসে একজন বলল,
—“মাধবী, এত কাগজপত্র করে কী পেলি?”
মাধবী চা নামিয়ে রেখে বলল,
—“রাস্তা এখনও হয়নি। কিন্তু কাজটা শেষও হয়নি।”
—“তুই একা কী করতে পারবি?”
মাধবী মৃদু হেসে বলল,
—“আমি একা নই। এই গ্রামের সবাই তো আমার সঙ্গে আছে।”
লোকটা চারদিকে তাকিয়ে বলল,
—“কোথায়?”
মাধবী বলল,
—“আজ নেই। কাল থাকবে।”
সেই কথাটা সত্যি হতে শুরু করল।
মাধবী গ্রামের স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে একটা ছোট দল তৈরি করল।
নাম দিল—‘আমাদের পথ’।
বাচ্চারা রাস্তার পাশে প্লাস্টিক পড়ে থাকলে তুলে ফেলত।
কেউ গর্তের পাশে বাঁশ পুঁতে দিত, যাতে রাতে মানুষ পড়ে না যায়।
কেউ রাস্তার জল বের করার জন্য ছোট নালা পরিষ্কার করত।
গ্রামের যুবকরাও ধীরে ধীরে যুক্ত হল।
একদিন পঞ্চাশ বছরের কৃষক হরিপদ এসে বললেন,
—“তুই যখন ছাড়ছিস না, আমরাও ছাড়ব না।”
তারপর শুরু হল গ্রামের মানুষের নিজস্ব উদ্যোগ।
যেখানে বড় গর্ত, সেখানে ইট ফেলা হল।
যেখানে জল দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে নালা কাটা হল।
কেউ শ্রম দিল।
কেউ বাঁশ দিল।
কেউ পুরনো ইট দিল।
কেউ শুধু এক বোতল জল নিয়ে এসে কাজ করা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াল।
মাধবী বুঝতে পারল—একটা রাস্তা শুধু মাটি আর পাথর দিয়ে তৈরি হয় না।
মানুষের ইচ্ছা দিয়েও রাস্তা তৈরি হয়।
ছয় মাস পরে একদিন খবর এল—গ্রামের রাস্তা সংস্কারের জন্য সরকারি প্রকল্পে কাজ অনুমোদন হয়েছে।
কাজ শুরু হল।
বড় বড় মেশিন এল।
লাল মাটির পথ ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল।
যে পথে বর্ষায় হাঁটা যেত না, সেখানে পাথর বিছানো হল।
নালা তৈরি হল।
কালভার্ট মেরামত হল।
কয়েক মাস পর রাস্তার চেহারা বদলে গেল।
সেদিন সকালে মাধবী একা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার মা এসে বললেন,
—“কী দেখছিস?”
মাধবী বলল,
—“রাস্তা।”
মা হেসে বললেন,
—“রাস্তা তো প্রতিদিনই দেখিস।”
মাধবী মাথা নাড়ল।
—“আজ অন্যরকম লাগছে।”
ঠিক তখনই দূর থেকে একটা অ্যাম্বুল্যান্স এল।
কুসুমডাঙার রাস্তা ধরে সরাসরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে চলে গেল।
মাধবীর চোখে জল এসে গেল।
তার মনে পড়ল কমলা পিসির সেই দিনটার কথা।
কাদায় আটকে থাকা খাটিয়া।
অসহায় মানুষের মুখ।
আর নিজের সেই সিদ্ধান্ত—
এই রাস্তা ঠিক করতেই হবে।
কয়েকদিন পর গ্রামের স্কুলে একটা অনুষ্ঠান হল।
প্রধান শিক্ষক মাধবীকে সামনে ডেকে বললেন,
—“তুমি রাস্তা বানাওনি শুধু। তুমি আমাদের একটা শিক্ষা দিয়েছ।”
মাধবী অবাক হয়ে বলল,
—“কী শিক্ষা?”
প্রধান শিক্ষক বললেন,
—“সমস্যা বড় হলেই মানুষ অসহায় হয় না। মানুষ তখনই অসহায় হয়, যখন সে সমস্যাকে নিজের বলে মনে করা বন্ধ করে দেয়।”
সবাই হাততালি দিল।
মাধবী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
অনুষ্ঠান শেষে ছোট্ট এক ছাত্র তার কাছে এসে বলল,
—“দিদি, বড় হয়ে আমি কী করব জানো?”
মাধবী হাসল।
—“কী করবে?”
ছেলেটা বলল,
—“যেখানে রাস্তা নেই, সেখানে রাস্তা বানাব।”
মাধবী তার মাথায় হাত রেখে বলল,
—“রাস্তা বানানোর আগে একটা কথা মনে রাখবে।”
—“কী?”
—“রাস্তা শুধু গন্তব্যে নিয়ে যায় না। রাস্তা মানুষকে মানুষের কাছেও নিয়ে যায়।”
সন্ধ্যা নেমেছিল।
লাল মাটির পথের ওপর সূর্যের শেষ আলো পড়েছিল।
মাধবী ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।
পেছনে পড়ে রইল সেই পথ—
যে পথ একদিন ছিল গ্রামের দুঃখের কারণ,
আর আজ হয়ে উঠেছে
গ্রামের স্বপ্নের পথ।