বেলতলা গ্রামের মাঝখানে ছিল একটি বড় পুকুর। গ্রামের বয়স্করা বলতেন, পুকুরটির বয়স নাকি একশো বছরেরও বেশি।
পুকুরের এক কোণে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বাঁধা থাকত একটি ছোট কাঠের নৌকা।
নৌকাটির মালিক ছিলেন গদাধর কাকা।
বয়স সত্তরের কাছাকাছি হলেও প্রতিদিন ভোরে তিনি নৌকায় চেপে পুকুরে নামতেন।
মাছ ধরতেন।
কখনও জাল ফেলতেন, কখনও শুধু নৌকা নিয়ে পুকুরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতেন।
গ্রামের ছেলে-মেয়েরা তাঁকে দেখে বলত,
—“গদাধর কাকা, আজ কত মাছ?”
তিনি হেসে বলতেন,
—“পুকুর যা দেয়, তাই।”
কিন্তু এক বছর বর্ষার পর পুকুরের অবস্থা বদলে গেল।
পুকুরের চারপাশে মাটি জমল।
জলজ আগাছা ছড়িয়ে পড়ল।
পুকুরের জল ধীরে ধীরে নোংরা হতে লাগল।
মাছও কমে গেল।
একদিন গ্রামের কয়েকজন বলল,
—“পুকুরটা ভরাট করে দিলে তো ভালো হয়। এখানে বাজার করা যাবে।”
গদাধর কাকা শুনে চুপ করে রইলেন।
পুকুরটি তাঁর কাছে শুধু মাছ ধরার জায়গা ছিল না।
এই পুকুরেই তাঁর বাবা তাঁকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন।
এই পুকুরের ঘাটেই তাঁর বিয়ের পর প্রথমবার স্ত্রীকে নিয়ে বসেছিলেন।
এই জলেই তাঁর ছেলেবেলার অর্ধেক স্মৃতি।
কিন্তু তিনি জানতেন, শুধু স্মৃতি দিয়ে পুকুর বাঁচানো যায় না।
সেই সময় গ্রামের স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অয়ন প্রতিদিন পুকুরের পাশে বসে ছবি আঁকত।
একদিন সে গদাধর কাকাকে জিজ্ঞেস করল,
—“কাকা, পুকুরটা কি সত্যিই ভরাট হয়ে যাবে?”
গদাধর বললেন,
—“জানি না।”
অয়ন বলল,
—“তাহলে কিছু করো না কেন?”
গদাধর হেসে বললেন,
—“আমার একার হাতে কতটা সম্ভব?”
অয়ন কিছু বলল না।
পরদিন সে স্কুলে গিয়ে বিজ্ঞান শিক্ষিকা শর্মিষ্ঠা ম্যাডামকে সব জানাল।
ম্যাডাম বললেন,
—“পুকুর শুধু মাছের জন্য নয়। গ্রামের জল, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য—সবকিছুর সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে।”
অয়ন বলল,
—“তাহলে আমরা কি পুকুরটা পরিষ্কার করতে পারি?”
—“পারো। তবে পরিকল্পনা করে।”
সেদিন থেকেই শুরু হল কাজ।
স্কুলের ছাত্ররা দল বানাল।
কেউ পুকুরের চারপাশের প্লাস্টিক সংগ্রহ করল।
কেউ আগাছার ছবি তুলল।
কেউ পুকুরের জল কোথা থেকে আসে, কোথায় বেরিয়ে যায়—তার মানচিত্র আঁকল।
অয়ন গদাধর কাকার কাছ থেকে পুকুরের পুরোনো ইতিহাস শুনল।
জানা গেল, বহু বছর আগে এই পুকুরে গ্রামের মানুষ শুধু মাছ ধরত না, বর্ষার জলও সংরক্ষণ করত।
পুকুরটি ছিল গ্রামের জলব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অয়ন সব তথ্য নিয়ে একটি ছোট রিপোর্ট তৈরি করল।
নাম দিল—
“আমাদের পুকুর, আমাদের ভবিষ্যৎ।”
রিপোর্টটি গ্রামের সভায় পড়ে শোনানো হল।
প্রথমে অনেকে বলল,
—“এত বড় কথা একটা পুকুর নিয়ে?”
অয়ন শান্তভাবে বলল,
—“পুকুর ছোট হতে পারে, কিন্তু তার কাজ ছোট নয়।”
তারপর সে পুরোনো ছবি দেখাল।
কত পরিষ্কার ছিল পুকুর।
কত নৌকা ছিল।
কত মাছ ছিল।
কত মানুষ পুকুরের জল ব্যবহার করত।
গদাধর কাকা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি বললেন,
—“আমি এই পুকুরকে বদলাতে দেখেছি। এখন যদি সবাই চায়, তাহলে আবার এটাকে বাঁচানো যায়।”
শেষ পর্যন্ত গ্রামের মানুষ রাজি হল।
পুকুর ভরাটের পরিকল্পনা বন্ধ করা হল।
শুরু হল পরিষ্কার করার কাজ।
কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না।
কয়েকদিন পরেই সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
কেউ বলল,
—“এত কাজ করে লাভ কী?”
কেউ বলল,
—“দু’দিন পর আবার নোংরা হবে।”
অয়ন তখন একটি নিয়ম চালু করল।
প্রতি সপ্তাহে একদিন গ্রামের কয়েকটি পরিবার পালা করে পুকুরের চারপাশ পরিষ্কার করবে।
স্কুলের ছাত্ররা নজর রাখবে।
পুকুরে আবর্জনা ফেলার জন্য নিষেধাজ্ঞার বোর্ড লাগানো হল।
গদাধর কাকা নিজের নৌকাটি নিয়ে প্রতিদিন পুকুরের আগাছা সরানোর কাজে সাহায্য করতে লাগলেন।
একদিন অয়ন বলল,
—“কাকা, আপনার নৌকাটা তো খুব পুরোনো।”
গদাধর হাসলেন,
—“আমার মতোই।”
—“নতুন নৌকা নেবেন না?”
—“এই নৌকাটা আমার বাবার।”
অয়ন নৌকার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল,
—“তাহলে এটাও বাঁচাতে হবে।”
কয়েক মাসের মধ্যে পুকুরের চেহারা বদলে গেল।
জল পরিষ্কার হল।
আগাছা কমল।
পুকুরের ধারে নতুন গাছ লাগানো হল।
কিছুদিন পর দেখা গেল, ছোট মাছ আবার ফিরে এসেছে।
শীতের সকালে পুকুরের ওপর কুয়াশা ভাসতে লাগল।
পাখি আসতে শুরু করল।
একদিন গদাধর কাকা নৌকা নিয়ে পুকুরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন।
অয়নও সঙ্গে ছিল।
গদাধর বললেন,
—“দেখেছিস?”
—“কী?”
—“পুকুর আবার শ্বাস নিচ্ছে।”
অয়ন হেসে বলল,
—“জলও কি শ্বাস নেয়?”
গদাধর বললেন,
—“মানুষের মতো নয়। কিন্তু জলও বাঁচে, মরে।”
অয়ন চুপ করে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় গদাধর কাকা বাড়ি ফিরে নৌকাটাকে পরিষ্কার করলেন।
তারপর কাঠের গায়ে নতুন করে তেল লাগালেন।
পরদিন সকালে নৌকাটি দেখতে একেবারে নতুনের মতো লাগছিল।
গ্রামের লোকজন বলল,
—“গদাধর কাকার নৌকা আবার জলে নামল!”
কিন্তু গদাধর কাকা এবার মাছ ধরার জন্য নয়, অন্য কাজে নৌকাটি ব্যবহার করলেন।
তিনি অয়ন ও স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে পুকুরের জলজ উদ্ভিদ ও পাখিদের পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলেন।
অয়ন তার খাতায় সব লিখে রাখত।
কোন পাখি কখন আসে।
কোন মাছ কোথায় দেখা যায়।
কোন ঋতুতে জল কতটা কমে।
একসময় সেই খাতাটি স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় প্রদর্শিত হল।
অয়ন পুরস্কার পেল।
কিন্তু মঞ্চে উঠে সে বলল,
—“এই পুরস্কার শুধু আমার নয়। আমাদের গ্রামের পুকুরের।”
সবাই হাততালি দিল।
গদাধর কাকার চোখ ভিজে উঠল।
বহু বছর পরে এক ভোরে তিনি নৌকায় একা বসেছিলেন।
সূর্য উঠছে।
পুকুরের জল সোনালি হয়ে গেছে।
তিনি হাত দিয়ে জল ছুঁয়ে দেখলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—“বাবা, তোমার পুকুরটা এখনও আছে।”
দূরে দাঁড়িয়ে অয়ন শুনে ফেলেছিল।
সে কিছু বলল না।
শুধু বুঝল, কিছু জায়গা কেবল মাটি আর জল দিয়ে তৈরি হয় না।
তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্মৃতি, জীবন আর ভবিষ্যৎ।
আর সেই কারণেই গ্রামের সবাই সিদ্ধান্ত নিল—
এই পুকুর আর কখনও ভরাট হবে না।
পুকুরের ধারে একটি কাঠের ফলক লাগানো হল—
“জলকে বাঁচাও, কারণ জল শুধু আজকে নয়—আগামীকালকেও বাঁচিয়ে রাখে।”
গদাধর কাকার নৌকাটি এখনও সেই পুকুরের এক কোণে বাঁধা থাকে।
পুরোনো কাঠ।
জীর্ণ দড়ি।
কিন্তু প্রতিদিন ভোরে তার ওপর পড়ে সূর্যের আলো।
আর সেই আলোয় মনে হয়—
শেষ নৌকাটিও কখনও কখনও একটি পুরো গ্রামের ভবিষ্যৎকে পার করে দিতে পারে।