বিষ্ণুপুরের কাছাকাছি ছোট্ট একটি গ্রাম—মাধবপুর। গ্রামের শেষ মাথায় ছিল একটি পুরোনো ডাকবাংলো। বহু বছর ধরে সেটি আর ব্যবহার করা হতো না।
জানালার কাচ ভাঙা, দরজায় মরচে, চারদিকে আগাছা।
গ্রামের মানুষ জায়গাটিকে বলত—“ভূতের বাড়ি।”
কিন্তু তেরো বছরের মেয়ে রিনি ভূতে বিশ্বাস করত না।
সে বিশ্বাস করত বইয়ে।
রিনির বাবা ছিলেন দিনমজুর। মা বাড়িতে সেলাই করতেন। সংসারে বই কেনার মতো বাড়তি টাকা ছিল না।
তবু রিনি পড়তে ভালোবাসত।
স্কুলের লাইব্রেরিতে যে কয়েকটি বই ছিল, সেগুলো সে বারবার পড়ত।
একদিন স্কুলে শিক্ষক বললেন,
—“তোমরা যদি আরও বই পড়তে চাও, নিজেদের একটা ছোট লাইব্রেরি তৈরি করতে পারো।”
রিনি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“কোথায়?”
শিক্ষক হাসলেন,
—“জায়গা খুঁজে বের করো।”
সেদিন স্কুল ছুটির পর রিনি তার বন্ধুদের নিয়ে গ্রামের চারপাশে ঘুরতে লাগল।
তখনই তার চোখ পড়ল পুরোনো ডাকবাংলোটার দিকে।
বন্ধু পলাশ বলল,
—“ওখানে যাবি?”
—“হ্যাঁ।”
—“লোকজন বলে ওখানে রাতে শব্দ হয়।”
রিনি হেসে বলল,
—“দিনে গেলে ভূত থাকে না।”
তারা ভাঙা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ঘরের মধ্যে ধুলো।
মাকড়সার জাল।
এক কোণে ভাঙা টেবিল।
কিন্তু দেয়ালের পাশে একটি কাঠের আলমারি ছিল।
আলমারির দরজা আটকে ছিল।
অনেক চেষ্টা করে রিনি সেটি খুলল।
ভেতরে কয়েকটি পুরোনো বই।
ধুলোয় ঢাকা।
কেউ বহু বছর ছুঁয়েও দেখেনি।
রিনি একটি বই হাতে তুলে নিল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“মাধবপুর পাঠাগার, ১৯৭৮।”
রিনি অবাক হয়ে গেল।
—“এখানে আগে লাইব্রেরি ছিল!”
পরদিন সে স্কুলের শিক্ষককে বইটি দেখাল।
শিক্ষক বললেন,
—“হ্যাঁ। তোমার দাদুর সময়ে এখানে একটি ছোট পাঠাগার ছিল। পরে বন্ধ হয়ে যায়।”
রিনি বলল,
—“আবার চালু করা যাবে?”
শিক্ষক বললেন,
—“চেষ্টা করলে কেন নয়?”
সেই দিন থেকেই শুরু হল কাজ।
রিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলল,
—“আপনাদের বাড়িতে পুরোনো বই থাকলে আমাদের দিন।”
কেউ গল্পের বই দিল।
কেউ পুরোনো উপন্যাস।
কেউ খবরের কাগজ বাঁধাই করা বই।
কেউ স্কুলের পুরোনো পাঠ্যবই।
এক সপ্তাহের মধ্যে বইয়ের সংখ্যা দাঁড়াল একশোর বেশি।
কিন্তু ডাকবাংলো পরিষ্কার করা ছিল কঠিন কাজ।
রিনি, পলাশ, আরও কয়েকজন বন্ধু ঝাড়ু নিয়ে নেমে পড়ল।
গ্রামের কয়েকজন বড়রাও সাহায্য করলেন।
কেউ জানালা ঠিক করলেন।
কেউ দরজা।
কেউ ছাদ মেরামত করলেন।
একজন কাঠমিস্ত্রি পুরোনো টেবিলটি ঠিক করে দিলেন।
সবশেষে শিক্ষক একটি সাইনবোর্ড বানিয়ে আনলেন—
“মাধবপুর মুক্ত পাঠাগার”
উদ্বোধনের দিন গ্রামের অনেক মানুষ এল।
রিনি প্রথম বইটি তাকের ওপর রাখল।
তারপর ছোট্ট একটি ঘণ্টা বাজানো হল।
পাঠাগার খুলে গেল।
প্রথম দিন মাত্র সাতজন শিশু বই পড়তে এল।
কিন্তু রিনি হতাশ হল না।
সে বলল,
—“সাতজন দিয়েই শুরু হোক।”
দিন যেতে লাগল।
সাতজন থেকে বারোজন।
বারোজন থেকে পঁচিশজন।
তারপর গ্রামের বয়স্করাও আসতে শুরু করলেন।
একদিন হরিপদ কাকা এসে বললেন,
—“আমার ছোটবেলায় যে বই পড়েছিলাম, তার একটা বই কি আছে?”
রিনি বলল,
—“নাম বলুন।”
হরিপদ কাকা নাম বললেন।
রিনি খুঁজে বইটি বের করে দিল।
বৃদ্ধ মানুষটি বইটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“চল্লিশ বছর পর আবার পেলাম।”
রিনির মনে হল, সে শুধু বই নয়—মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিও ফিরিয়ে দিচ্ছে।
কিছুদিন পর রিনি পাঠাগারে একটি নতুন নিয়ম চালু করল।
প্রতি শনিবার সবাইকে নিজের পড়া বই নিয়ে পাঁচ মিনিট করে কথা বলতে হবে।
প্রথমে কেউ রাজি হচ্ছিল না।
তারপর ধীরে ধীরে সবাই বলতে শুরু করল।
কেউ গল্পের চরিত্র নিয়ে কথা বলল।
কেউ বিজ্ঞান নিয়ে।
কেউ ইতিহাস নিয়ে।
একদিন গ্রামের এক কিশোর, বাবাই, বলল,
—“আমি একটা বই পড়েছি, যেখানে একজন মানুষ নিজের গ্রামে স্কুল বানিয়েছিল।”
সে থেমে বলল,
—“আমরাও কি গ্রামের জন্য কিছু করতে পারি?”
রিনি বলল,
—“অবশ্যই।”
সেই আলোচনা থেকেই শুরু হল আরেকটি উদ্যোগ।
গ্রামের যে শিশুরা পড়াশোনায় দুর্বল, তাদের জন্য সপ্তাহে তিনদিন বিনামূল্যে পড়ানো হবে।
পাঠাগারের এক ঘর হয়ে গেল পড়ার ঘর।
স্কুলের বড় ছাত্ররা ছোটদের পড়াতে লাগল।
রিনি বাংলা পড়াত।
পলাশ অঙ্ক।
বাবাই বিজ্ঞান।
ধীরে ধীরে গ্রামের শিশুদের ফলাফলও ভালো হতে লাগল।
একদিন রিনির বাবা সন্ধ্যায় পাঠাগারে এলেন।
তিনি মেয়েকে বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,
—“তুই এখানে এত সময় দিস?”
রিনি হেসে বলল,
—“হ্যাঁ।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“তুই ছোটবেলায় বই চাইতিস, আমি কিনে দিতে পারতাম না।”
রিনি বাবার হাত ধরল।
—“এখন আর আমার একার বই দরকার নেই বাবা। এখানে সবার বই আছে।”
বাবার চোখ ভিজে উঠল।
এক বছর পর মাধবপুর পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা দাঁড়াল এক হাজারের বেশি।
দূরের শহর থেকেও মানুষ বই পাঠাতে লাগল।
কেউ পুরোনো কম্পিউটার দিল।
কেউ সংবাদপত্র।
কেউ মানচিত্র।
পাঠাগারটি ধীরে ধীরে গ্রামের ছোট্ট শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হল।
একদিন জেলা থেকে একজন আধিকারিক এলেন।
তিনি সব দেখে রিনিকে জিজ্ঞেস করলেন,
—“এই পাঠাগার শুরু করার ভাবনা কার?”
রিনি বলল,
—“আমার।”
—“কেন?”
রিনি একটু ভেবে বলল,
—“কারণ আমাদের গ্রামে অনেক মানুষ আছে যারা বই কিনতে পারে না, কিন্তু পড়তে চায়।”
আধিকারিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“এই কথাটাই আসল।”
সেদিন সন্ধ্যায় রিনি একা পাঠাগারের জানালার পাশে বসে ছিল।
বাইরে অন্ধকার নামছে।
ঘরের ভেতর ছোট্ট একটি বাতি জ্বলছে।
একটি ছেলে বই পড়ছে।
একজন বৃদ্ধ সংবাদপত্র দেখছেন।
দু’জন মেয়ে গল্পের বই নিয়ে আলোচনা করছে।
রিনি পুরোনো সেই ১৯৭৮ সালের বইটি হাতে নিল।
প্রথম পাতায় এখনও লেখা—
“মাধবপুর পাঠাগার।”
সে মৃদু হেসে বলল,
—“তুমি আবার ফিরে এসেছ।”
বাইরে বাতাসে পুরোনো ডাকবাংলোর গাছের পাতা নড়ছিল।
যে বাড়িটিকে একসময় সবাই ভয় পেত, আজ সেখানে প্রতিদিন মানুষের কণ্ঠ শোনা যায়।
ভূতের গল্পের বদলে সেখানে এখন স্বপ্নের গল্প বলা হয়।
আর রিনি বুঝেছিল—
একটি বই কখনও শুধু কাগজের পাতা নয়। কখনও একটি বই এমন একটি দরজা, যার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের জন্য এক নতুন পৃথিবী।