Categories
গল্প

আগুনের পাশে বসা মানুষটি।

শালবনের ধারে ছোট্ট একটি গ্রাম—দেউলিয়া। গ্রামের শেষ মাথায় টিনের চালের একটি ঘর। ঘরের সামনে পড়ে থাকে লোহা, হাতুড়ি, চিমটা আর নানা রকম যন্ত্রপাতি।

সেখানেই বসতেন মহাদেব কর্মকার।

গ্রামের সবাই তাঁকে বলত মহাদেব কাকা।

সকাল হলেই তাঁর ঘর থেকে শোনা যেত—

ঠং! ঠং! ঠং!

লোহার ওপর হাতুড়ির আঘাত।

আগুনের লাল আলোয় তাঁর মুখ আরও গম্ভীর দেখাত।

তিনি কোদাল বানাতেন, কাস্তে বানাতেন, লাঙলের ফলা মেরামত করতেন। কৃষকদের যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে তাঁর কাছেই আসতে হতো।

কিন্তু সময় বদলাচ্ছিল।

বাজারে তৈরি যন্ত্রের সংখ্যা বাড়ছিল।

অনেকেই আর হাতে তৈরি জিনিস কিনতে চাইত না।

মহাদেবের ছেলে রতন শহরে গিয়ে অন্য কাজ করত।

সে বাবাকে বলত,

—“বাবা, এই দোকানটা বন্ধ করে দাও। এখন আর আগের মতো কাজ নেই।”

মহাদেব হাসতেন।

—“লোহার কাজ কমেছে, মানুষের প্রয়োজন কমেনি।”

রতন বলত,

—“তুমি সবকিছুর মধ্যে আশা খুঁজে পাও।”

মহাদেব উত্তর দিতেন,

—“আশা না থাকলে আগুনও জ্বলে না।”

একদিন গ্রামের স্কুলের ছাত্র অর্ক মহাদেব কাকার কাছে এল।

তার হাতে ছিল একটি ভাঙা লোহার ঘুড়ির কাঠামো।

সে বলল,

—“কাকা, এটা ঠিক করে দিতে পারবেন?”

মহাদেব দেখে বললেন,

—“পারব। তবে তুই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবি না। হাতে কাজ শিখবি।”

অর্ক অবাক হয়ে বলল,

—“আমি?”

—“হ্যাঁ।”

সেদিন থেকেই অর্ক মাঝে মাঝে মহাদেবের দোকানে আসতে লাগল।

সে আগুন জ্বালানো শিখল।

লোহা গরম করা শিখল।

চিমটা দিয়ে ধরতে শিখল।

হাতুড়ি চালাতে শিখল।

প্রথম দিন তার হাত কেঁপে যাচ্ছিল।

মহাদেব বললেন,

—“হাতুড়ি জোরে মারলেই কাজ হয় না।”

—“তাহলে?”

—“কোথায় মারছিস, সেটা বুঝতে হয়।”

অর্ক ধীরে ধীরে শিখতে লাগল।

একদিন সে দেখল, মহাদেব একটি পুরোনো লোহার টুকরো আগুনে দিচ্ছেন।

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

—“ওটা দিয়ে কী হবে?”

—“দেখবি।”

কিছুক্ষণ পর লাল গরম লোহাটাকে তিনি হাতুড়ি দিয়ে পেটাতে শুরু করলেন।

ঠং!

ঠং!

ঠং!

ধীরে ধীরে লোহার টুকরোটি একটি সুন্দর ছোট্ট ছুরির আকার নিল।

অর্ক অবাক।

—“এত পুরোনো লোহা থেকে এটা বানালেন?”

মহাদেব বললেন,

—“লোহারও দ্বিতীয় জীবন আছে।”

কথাটা অর্কের মনে গেঁথে গেল।

কয়েকদিন পর স্কুলে বিজ্ঞান মেলার ঘোষণা হল।

অর্ক ঠিক করল, সে পুরোনো জিনিস দিয়ে নতুন কিছু বানাবে।

সে মহাদেব কাকার কাছে গেল।

—“কাকা, আমাকে একটা জিনিস বানাতে সাহায্য করবেন?”

—“কী?”

—“পুরোনো লোহা দিয়ে একটা বাতাস চালিত ছোট যন্ত্র।”

মহাদেব কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—“চেষ্টা করা যাক।”

দু’জনে মিলে কাজ শুরু করল।

পুরোনো সাইকেলের চাকা।

ভাঙা লোহার রড।

কিছু নাট-বল্টু।

একটি পুরোনো পাখার অংশ।

সব মিলিয়ে তারা একটি ছোট্ট বাতাসচালিত যন্ত্র বানাতে লাগল।

প্রথমবার কাজ করল না।

দ্বিতীয়বারও না।

তৃতীয়বার ঘুরতে গিয়েই ভেঙে পড়ল।

অর্ক হতাশ হয়ে বলল,

—“হবে না।”

মহাদেব বললেন,

—“লোহা ভাঙলে আবার গরম করা যায়।”

—“আর যদি বারবার ভাঙে?”

—“তাহলে বারবার বানাবি।”

অর্ক আবার কাজ শুরু করল।

এক সপ্তাহ পর যন্ত্রটি তৈরি হল।

ছোট্ট একটি চাকা বাতাসে ঘুরল।

তার সঙ্গে লাগানো ছোট ডায়নামো থেকে একটি বাতি জ্বলে উঠল।

অর্ক আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

—“কাকা! আলো!”

মহাদেব হেসে বললেন,

—“আগুন থেকে আলো আসে, আর পরিশ্রম থেকেও।”

বিজ্ঞান মেলার দিন অর্ক তার মডেল নিয়ে গেল।

অনেক ছাত্র বড় বড় মডেল এনেছিল।

কেউ রোবট।

কেউ সৌরশক্তির মডেল।

কেউ কম্পিউটার প্রজেক্ট।

অর্কের ছোট্ট যন্ত্রটি দেখতে খুব সাধারণ।

কিন্তু যখন সে বাতাসে সেটি ঘুরিয়ে দেখাল এবং বলল কীভাবে গ্রামের পুরোনো লোহার জিনিস দিয়ে এটি তৈরি হয়েছে, সবাই মন দিয়ে শুনল।

একজন বিচারক জিজ্ঞেস করলেন,

—“এই কাজের পিছনে তোমাকে কে সাহায্য করেছে?”

অর্ক বলল,

—“আমাদের গ্রামের মহাদেব কাকা।”

—“তিনি কী করেন?”

অর্ক গর্ব করে বলল,

—“তিনি লোহার কারিগর।”

অর্ক পুরস্কার পেল।

কিন্তু বাড়ি ফেরার পর সে সরাসরি মহাদেবের দোকানে গেল।

পুরস্কারটি তাঁর হাতে দিয়ে বলল,

—“এটা আপনার।”

মহাদেব মাথা নাড়লেন।

—“না রে, এটা তোর।”

—“আপনি না থাকলে আমি পারতাম না।”

মহাদেব বললেন,

—“আমি শুধু হাতুড়ি ধরতে শিখিয়েছি। কাজটা তুই করেছিস।”

সেইদিন থেকে অর্ক আরও অনেক ছেলেমেয়েকে নিয়ে মহাদেবের দোকানে আসতে শুরু করল।

মহাদেব তাদের পুরোনো লোহা দিয়ে নানা জিনিস বানানো শেখাতে লাগলেন।

কারও হাতে তৈরি হল পাখির খাবার রাখার পাত্র।

কেউ বানাল গাছের জন্য লোহার খুঁটি।

কেউ বানাল ছোট্ট বাতাসচালিত খেলনা।

মহাদেবের দোকানে আবার শিশুদের হাসির শব্দ শোনা যেতে লাগল।

একদিন রতন শহর থেকে ফিরে এসে দোকানের সামনে অনেক ছেলেমেয়েকে দেখে অবাক হয়ে গেল।

সে বাবাকে বলল,

—“এরা সবাই এখানে কেন?”

মহাদেব বললেন,

—“শিখতে এসেছে।”

রতন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“বাবা, তুমি দোকানটা বন্ধ করোনি কেন বুঝতে পারছি।”

মহাদেব হাসলেন।

—“আমি দোকান চালাইনি রে। কাজটা চালিয়ে গেছি।”

রতন বাবার পাশে বসে বলল,

—“আমিও শিখব।”

মহাদেব চমকে তাকালেন।

—“তুই?”

রতন হেসে বলল,

—“হ্যাঁ। শহরে অনেক কাজ শিখেছি। এবার বাবার কাজটাও শিখি।”

সেদিন সন্ধ্যায় আবার আগুন জ্বলল।

তার চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ক, রতন আর গ্রামের কয়েকজন শিশু।

মহাদেব একটি লোহার টুকরো আগুনে ধরলেন।

লোহা ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠল।

তিনি বললেন,

—“মনে রাখিস, আগুন জিনিসকে শুধু পোড়ায় না। ঠিকভাবে ব্যবহার করলে তাকে নতুন আকারও দেয়।”

অর্ক আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হল, কথাটা শুধু লোহার জন্য নয়।

মানুষের জীবনেও হয়তো কিছু আগুন আসে—

যা ভেঙে দেয়।

আবার সেই আগুনই কখনও মানুষকে নতুন করে গড়ে তোলে।

সেদিন রাতেও মহাদেবের দোকান থেকে অনেকক্ষণ ধরে শোনা গেল—

ঠং! ঠং! ঠং!

কিন্তু সেই শব্দ এবার শুধু লোহা পেটানোর শব্দ ছিল না।

সেটা ছিল একটি পুরোনো শিল্পের নতুন প্রজন্মের হাতে ফিরে আসার শব্দ।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *