বাজারের শেষ মাথায় ছোট্ট একটা দোকান ছিল।
দোকানের সামনে ঝুলত কাঠের পুতুল, বাঁশের বাঁশি আর রঙিন ঘুড়ি।
দোকানের মালিক ছিলেন বৃদ্ধ কারিগর রঘুনাথ।
সারাদিন কাঠ কেটে, ঘষে, রং করে পুতুল বানাতেন তিনি।
কিন্তু দোকানের এক কোণে রাখা একটি পুতুল তিনি কখনও বিক্রি করতেন না।
পুতুলটি ছিল অন্যগুলোর থেকে আলাদা।
ছোট্ট মেয়ে।
দুটি বেণি।
লাল ফ্রক।
চোখে কালো কাজল।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় রঘুনাথ পুতুলটার ধুলো মুছে দিতেন।
একদিন দোকানে এল আট বছরের একটি মেয়ে।
নাম তার তুলি।
পুতুলটার দিকে তাকিয়ে সে মুগ্ধ হয়ে বলল,
—“কাকু, এটা কত টাকা?”
রঘুনাথ হেসে বললেন,
—“ওটা বিক্রি হবে না।”
তুলি মন খারাপ করে বলল,
—“কেন?”
—“ওটা আমার মেয়ের।”
তুলি অবাক।
—“আপনার মেয়ে কোথায়?”
রঘুনাথ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“অনেক দূরে।”
তুলি আর প্রশ্ন করল না।
তারপর থেকে প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর সে দোকানে আসত।
পুতুলটার পাশে বসে গল্প করত।
—“আজ স্কুলে আমি কবিতা বলেছি।”
—“আজ ম্যাডাম আমাকে একটা স্টার দিয়েছে।”
—“আজ মা আমার জন্য পায়েস করেছে।”
রঘুনাথ চুপ করে শুনতেন।
কখনও কখনও পুতুলটার দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখ ভিজে উঠত।
একদিন তুলি এসে দেখল, দোকান বন্ধ।
পরদিনও বন্ধ।
তৃতীয় দিনও।
চতুর্থ দিন দোকান খুলল।
রঘুনাথ বসে আছেন, কিন্তু আগের মতো হাসছেন না।
তুলি জিজ্ঞেস করল,
—“কাকু, কী হয়েছে?”
রঘুনাথ বললেন,
—“পুতুলটা নিয়ে যা।”
তুলি অবাক।
—“আমাকে?”
—“হ্যাঁ।”
—“কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন এটা আপনার মেয়ের!”
রঘুনাথ মৃদু হেসে বললেন,
—“তুই তো প্রতিদিন ওর সঙ্গে কথা বলিস। তাই মনে হল, এবার ওর নতুন বাড়ি হওয়া উচিত।”
তুলি পুতুলটা হাতে নিল।
তারপর জিজ্ঞেস করল,
—“আপনার মেয়ে কি সত্যিই অনেক দূরে?”
রঘুনাথ জানালার বাইরে তাকালেন।
—“হ্যাঁ।”
—“কোথায়?”
—“যেখানে মানুষ চলে গেলে আর ফিরে আসে না।”
তুলি কিছু বুঝল না।
সে পুতুলটা বুকে চেপে ধরল।
তারপর বলল,
—“আমি ওকে খুব ভালো করে রাখব।”
রঘুনাথ মাথা নাড়লেন।
—“জানি।”
কয়েকদিন পর তুলি আবার দোকানে এল।
হাতে একটা খাম।
—“কাকু, এটা আপনার জন্য।”
রঘুনাথ খুলে দেখলেন, ভেতরে একটি ছবি।
তুলি তার কোলে সেই কাঠের পুতুল নিয়ে বসে আছে।
ছবির পেছনে লেখা—
“আপনার মেয়ের জন্য নতুন বাড়ি।”
রঘুনাথ অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর চোখ মুছে বললেন,
—“তুই জানিস, ওর নাম কী ছিল?”
তুলি মাথা নাড়ল।
রঘুনাথ বললেন,
—“মেঘ।”
তুলি হেসে বলল,
—“তাহলে আজ থেকে মেঘ আমারও বন্ধু।”
রঘুনাথ প্রথমবারের মতো জোরে হেসে উঠলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে তিনি কাঠের ছোট্ট একটা নতুন পুতুল বানাতে বসে গেলেন।
তারপর নিজের মনেই বললেন,
—“মেঘ, তুই তো চলে গেছিস। কিন্তু দেখ, তোর জন্য একটা নতুন মেয়ে এসেছে।”
বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছিল।
আর দোকানের ভেতরে বৃদ্ধ কারিগরের হাতের কাঠ ধীরে ধীরে নতুন এক পুতুলের রূপ নিচ্ছিল।
কিছু মানুষ আমাদের জীবন থেকে চলে যায়। কিন্তু তাদের ভালোবাসা অন্য কারও হাসির মধ্যে আবার ফিরে আসে।
সমাপ্ত।