Categories
অনুগল্প

ছাদের ঘুড়ি।

প্রতিদিন বিকেলে ছাদের এক কোণে বসে ঘুড়ি বানাত রুদ্র।

ঘুড়ি ওড়ানোর শখ তার ছোটবেলা থেকেই।

কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর সে আর ঘুড়ি ওড়াত না।

বাবা ছিলেন ঘুড়ি বানানোর কারিগর। রঙিন কাগজ, বাঁশের কঞ্চি আর সুতো দিয়ে এমন সুন্দর ঘুড়ি বানাতেন যে পাড়ার সবাই তাঁর কাছে আসত।

একদিন পুরনো বাক্স গোছাতে গিয়ে রুদ্র একটি অর্ধেক তৈরি ঘুড়ি পেল।

ঘুড়িটির মাঝখানে বাবার হাতের লেখা—

“এটা রুদ্র একদিন নিজে শেষ করবে।”

রুদ্র অবাক হয়ে গেল।

সে তো তখন মাত্র দশ বছরের।

কীভাবে বাবা জানলেন?

সে ঘুড়িটা নিয়ে ছাদে উঠল।

বাঁশের কাঠামোটা ঠিক করল।

কাগজ লাগাল।

লেজ বানাল।

সবশেষে সুতো বাঁধতে গিয়ে দেখল, ঘুড়ির ভেতরে আরও একটি ছোট্ট কাগজ লুকানো।

তাতে লেখা—

“তুই যখন এটা ওড়াবি, তখন হয়তো আমি থাকব না। কিন্তু মনে রাখিস, ঘুড়ি কখনও আকাশে ওঠে না শুধু নিজের জোরে। তাকে ওপরে তুলতে বাতাসের সাহায্য লাগে। জীবনের ক্ষেত্রেও তাই—কখনও সাহায্য নিতে লজ্জা পাবি না।”

রুদ্র অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

পরদিন বিকেলে সে ঘুড়িটা নিয়ে ছাদে উঠল।

কিন্তু ঘুড়ি উঠল না।

বারবার মাটিতে পড়ে গেল।

রুদ্র বিরক্ত হয়ে সুতো ছুড়ে ফেলল।

পাশের বাড়ির ছাদ থেকে এক বৃদ্ধ বললেন,

—“ঘুড়ি ওড়াতে জানিস?”

রুদ্র বলল,

—“জানি।”

বৃদ্ধ হেসে বললেন,

—“না। তুই ঘুড়ি বানাতে জানিস। ওড়াতে এখনও শেখিসনি।”

রুদ্র তাকিয়ে রইল।

বৃদ্ধ বললেন,

—“সুতোটা একটু ঢিলে দে।”

রুদ্র তাই করল।

হাওয়া লাগতেই ঘুড়িটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে শুরু করল।

আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেটি আকাশে।

রুদ্র বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

বৃদ্ধ বললেন,

—“দেখলি? সবকিছু শক্ত করে ধরে রাখলেই ওপরে ওঠা যায় না।”

রুদ্রের মনে পড়ল বাবার চিঠির কথা।

সেদিন সন্ধ্যায় সে বাবার পুরনো বাক্স থেকে আরও কিছু কাগজ বের করল।

প্রতিটি কাগজে ছোট ছোট কথা।

“ভয় পেলে কাউকে বলবি।”

“ভুল করলে আবার শুরু করবি।”

“হারলে লজ্জা নেই।”

“কারও হাত ধরতে হলে আগে নিজের হাতটা বাড়াবি।”

সবশেষে একটি কাগজ।

“আমি না থাকলেও তুই একা হবি না। কারণ মানুষ একা বাঁচে না—মানুষ মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে।”

রুদ্র কাগজটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

পরদিন থেকে সে পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েদের ঘুড়ি বানানো শেখাতে শুরু করল।

কেউ সুতো জট পাকালে সে খুলে দিত।

কেউ ঘুড়ি তুলতে না পারলে পাশে দাঁড়াত।

আর প্রতিটি নতুন ঘুড়ির ভেতরে সে বাবার একটি করে কথা লিখে দিত।

বছর কয়েক পর পাড়ার আকাশে একসঙ্গে ডজনখানেক ঘুড়ি উড়তে দেখা গেল।

সবচেয়ে ওপরে ছিল একটি লাল ঘুড়ি।

তার লেজে ছোট্ট কাগজ বাঁধা।

তাতে লেখা—

“বাবা, ঘুড়িটা আমি শেষ করেছি। এবার তুমি নিশ্চিন্তে আকাশে থাকো।”

রুদ্র নিচে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসল।

হাওয়া একটু জোরে উঠল।

লাল ঘুড়িটা আরও ওপরে উঠতে লাগল।

আর রুদ্র বুঝল—

কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও আমাদের হাতে সুতো দিয়ে যায়। সেই সুতো ধরেই আমরা একদিন নিজেদের আকাশ খুঁজে নিই।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *