Categories
অনুগল্প

ভুল ছাপা বই।

শহরের পুরনো গলির ভেতরে ছোট্ট একটি ছাপাখানা ছিল।

নাম—“নবজাগরণ প্রেস”।

প্রেসের মালিক নীলমাধববাবু সত্তর বছর বয়সেও প্রতিদিন সকালে দোকান খুলতেন।

একদিন পুরনো কাগজের স্তূপ গোছাতে গিয়ে তিনি একটি বই পেলেন।

মলাটে কোনও নাম নেই।

লেখকের নাম নেই।

শুধু নিচে ছোট করে লেখা—

“প্রথম সংস্করণ—অসম্পূর্ণ।”

নীলমাধববাবু বইটা খুললেন।

প্রথম পাতায় মাত্র একটি বাক্য—

“এই বইটি যার হাতে পৌঁছবে, সে যেন শেষ পাতাটা পড়ে।”

তিনি পড়তে শুরু করলেন।

গল্পটি একজন তরুণ লেখকের।

নাম অরিন্দম।

সে বহু বছর আগে এই ছাপাখানায় এসে একটি উপন্যাস ছাপতে দিয়েছিল।

কিন্তু বইটি কখনও প্রকাশিত হয়নি।

কারণ শেষ মুহূর্তে অরিন্দম সব পাণ্ডুলিপি নিয়ে চলে যায়।

নীলমাধববাবুর মনে পড়ল।

অরিন্দম সত্যিই এসেছিল।

তখন তার বয়স মাত্র পঁচিশ।

সে বলেছিল,

—“কাকু, বইটা বেরোলে আমার মা খুব খুশি হবে।”

কিন্তু তারপর আর কখনও আসেনি।

নীলমাধববাবু বইয়ের শেষ পাতায় গেলেন।

সেখানে লেখা—

“যদি কেউ এই বইটি শেষ পর্যন্ত পড়ে, তবে তাকে শুধু একটি কথা বলতে চাই—স্বপ্নকে অসম্পূর্ণ রেখে চলে যেও না।”

নীলমাধববাবু থমকে গেলেন।

বইয়ের মাঝখানে একটি পুরনো ফোন নম্বর লেখা ছিল।

তিনি কৌতূহলবশত নম্বরটিতে ফোন করলেন।

ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধ কণ্ঠস্বর।

—“হ্যালো?”

—“আপনি কি অরিন্দম?”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

—“জি।”

নীলমাধববাবু নিজের পরিচয় দিলেন।

ওপাশে দীর্ঘশ্বাস।

—“প্রেসটা এখনও আছে?”

—“আছে।”

—“বইটা?”

—“আছে।”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“ওটা আর ছাপবেন না।”

—“কেন?”

—“কারণ সেটা আমার জীবনের একটা ব্যর্থতার স্মৃতি।”

নীলমাধববাবু বললেন,

—“আপনি এখনও লেখেন?”

—“না।”

—“কেন?”

—“জীবন লেখার সুযোগ দেয়নি।”

পরদিন অরিন্দম প্রেসে এলেন।

চুল সাদা।

চোখে মোটা চশমা।

হাতে পুরনো একটি ব্যাগ।

তিনি বইটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

—“আমি ভেবেছিলাম এটা হারিয়ে গেছে।”

নীলমাধববাবু বললেন,

—“আপনি শেষ করেননি কেন?”

অরিন্দম হেসে বললেন,

—“মা মারা গেলেন। তারপর চাকরি, সংসার… একসময় মনে হল, লেখালিখি আমার জন্য নয়।”

নীলমাধববাবু বইটা তাঁর হাতে দিয়ে বললেন,

—“আপনি ভুল ভাবছেন।”

—“কীভাবে?”

—“বইটা অসম্পূর্ণ। কিন্তু গল্পটা এখনও বেঁচে আছে।”

অরিন্দম চুপ করে রইলেন।

নীলমাধববাবু একটা খাতা এগিয়ে দিলেন।

—“শেষ করুন।”

—“এই বয়সে?”

—“স্বপ্নের বয়স হয় নাকি?”

অরিন্দম খাতাটা হাতে নিলেন।

তারপর ধীরে ধীরে হাসলেন।

তিন মাস পর তিনি আবার প্রেসে এলেন।

হাতে পাণ্ডুলিপি।

শেষ পৃষ্ঠায় লেখা—

“সমাপ্ত।”

নীলমাধববাবুর চোখে জল এসে গেল।

বইটি ছাপা হল।

প্রথম কপিটা অরিন্দম নিজের হাতে নিয়ে মলাটে হাত বুলিয়ে বললেন,

—“মা থাকলে খুব খুশি হতেন।”

নীলমাধববাবু বললেন,

—“হয়তো দেখছেন।”

অরিন্দম মৃদু হেসে বললেন,

—“তাহলে আজ ওঁকে একটা বই উপহার দিলাম।”

বই প্রকাশের কয়েক মাস পর অরিন্দমের লেখা নিয়ে পাঠকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হল।

একদিন তিনি নীলমাধববাবুর কাছে এসে বললেন,

—“কাকু, জানেন, বইটা প্রকাশের পর আমি আবার লিখতে শুরু করেছি।”

নীলমাধববাবু হেসে বললেন,

—“আমি জানতাম।”

—“কীভাবে?”

—“যে স্বপ্ন একবার সত্যি করে ফেলেছিস, সেটা দ্বিতীয়বার থামানো কঠিন।”

দু’জনেই হেসে উঠলেন।

প্রেসের পুরনো মেশিন তখন শব্দ করে চলেছে।

কাগজের ওপর একের পর এক অক্ষর ফুটে উঠছে।

আর সেই অক্ষরের ভেতর দিয়ে বহু বছর পর একজন মানুষ আবার নিজের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নকে খুঁজে পেয়েছে।

কিছু স্বপ্ন দেরি করে পূর্ণ হয়। তাই বলে তারা মরে যায় না—শুধু অপেক্ষা করে, যতদিন না আমরা আবার তাদের কাছে ফিরে যাই।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *