প্রথম পর্ব — অন্ধকারের আগে
রাত নামার কথা ছিল সন্ধে ছ’টার পর।
কিন্তু ঘড়িতে তখন রাত দুটো বেজে সতেরো মিনিট।
তবু গ্রামের আকাশে একফোঁটা অন্ধকার নেই।
চাঁদ নেই। তারা নেই। অথচ চারপাশ এমনভাবে আলোয় ভেসে আছে, যেন অদৃশ্য কোনও বিশাল বাতি আকাশের ওপরে জ্বলে রয়েছে।
অনন্যা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার হাতের মোবাইলের স্ক্রিনে সময়টা আবার দেখল।
২:১৭ AM
সে ধীরে ধীরে পর্দা সরিয়ে দিল।
দূরে বাঁশঝাড়।
তার ওপারে একটা পুকুর।
পুকুরের জল স্থির।
একটুও বাতাস নেই।
আর পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ।
অনন্যার বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল।
লোকটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
সাদা জামা।
কালো প্যান্ট।
মাথাটা সামান্য নিচু।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
অনন্যা জানলাটা বন্ধ করে দিল।
তারপর নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—
“এটা নিশ্চয়ই কেউ নয়। আলো-আঁধারির ভুল।”
কিন্তু তখনই দরজায় তিনটে শব্দ হল।
ঠক।
একটু বিরতি।
ঠক।
আরও একটু বিরতি।
ঠক।
অনন্যা স্থির হয়ে গেল।
তার থাকার ঘরটা বাড়ির একেবারে শেষ প্রান্তে।
বাইরে একটা সরু বারান্দা।
বারান্দার পরে সিঁড়ি।
তারপর উঠোন।
এই সময় সেখানে কেউ আসবে কেন?
আবার শব্দ হল।
ঠক। ঠক। ঠক।
অনন্যা বিছানার পাশে রাখা টর্চটা তুলে নিল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
“কে?”
কোনও উত্তর এল না।
“কে ওখানে?”
নীরবতা।
অনন্যা দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
কাঠের দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে।
মানে বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
কারণ ঘরের আলো বাইরে যাওয়ার কথা নয়।
অনন্যার গলা শুকিয়ে গেল।
সে দরজার হাতল ধরল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা মেয়ের গলা শোনা গেল।
খুব নিচু স্বর।
“দিদি…”
অনন্যা জমে গেল।
গলাটা তার পরিচিত।
খুব পরিচিত।
কিন্তু অসম্ভব পরিচিত।
সে ফিসফিস করে বলল,
“মৌ?”
বাইরে থেকে কোনও উত্তর এল না।
অনন্যা দরজা খুলে ফেলল।
বারান্দায় কেউ নেই।
শুধু মেঝের ওপর পড়ে আছে একটা ছোট্ট লাল ফিতা।
অনন্যা ফিতেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ তার বুকের ভেতর থেকে একটা পুরনো স্মৃতি উঠে এল।
লাল ফিতা।
দুটি বিনুনি।
ছোট্ট একটা মেয়ে।
বৃষ্টির মধ্যে দৌড়ে যাচ্ছে।
আর তার নিজের চিৎকার—
“মৌ! দাঁড়া!”
অনন্যা চোখ বন্ধ করল।
পনেরো বছর আগে সেই দিনটার কথা সে মনে করতে চাইত না।
কখনও না।
কারণ সেই দিনই তার ছোট বোন মৌ নিখোঁজ হয়েছিল।
আর আজ—
পনেরো বছর পর—
এই অচেনা গ্রামের এক বাড়ির দরজার সামনে পড়ে আছে ঠিক সেই রকম একটা লাল ফিতা।
অনন্যা এই গ্রামে এসেছিল মাত্র তিন দিন আগে।
গ্রামের নাম চাঁদপুরা।
জেলার শেষ প্রান্তে, পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝখানে ছোট্ট একটা গ্রাম।
মানচিত্রে নাম আছে।
সরকারি নথিতেও আছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কলকাতায় বসে অনন্যা যখন গ্রামটার ছবি খুঁজেছিল, তখন খুব কম তথ্যই পেয়েছিল।
গুগল ম্যাপে রাস্তা আছে।
কিন্তু গ্রামের ভেতরের ছবি নেই।
কোনও পর্যটন তথ্য নেই।
কোনও বড় বাজার নেই।
হাসপাতাল নেই।
এমনকি মোবাইল নেটওয়ার্কও বেশিরভাগ সময় থাকে না।
তবু অনন্যা এসেছিল।
কারণ তার পেশা ছিল শব্দ সংগ্রহ করা।
সে একটি স্বাধীন অডিও-ডকুমেন্টারি তৈরি করছিল—ভারতের এমন কিছু গ্রাম নিয়ে, যেখানে আধুনিক জীবন এখনও পুরোপুরি পৌঁছয়নি।
চাঁদপুরার নাম তাকে দিয়েছিল তার বন্ধু ঋজু।
ঋজু বলেছিল,
“ওখানে গেলে একটা জিনিস রেকর্ড করিস।”
“কী?”
“রাতের শব্দ।”
“রাতের শব্দ আবার কী?”
ঋজু হেসেছিল।
“তুই নিজে বুঝবি।”
অনন্যা তখন হাসতে হাসতেই বলেছিল,
“ভূতের শব্দ?”
ঋজু উত্তর দেয়নি।
শুধু বলেছিল,
“রাতে যদি কেউ তোকে বাইরে থেকে ডাকে, দরজা খুলিস না।”
অনন্যা মজা করে বলেছিল,
“কেন?”
ঋজু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,
“কারণ চাঁদপুরায় রাতের পরে যারা বাইরে বেরোয়, তারা সবাই ফিরে আসে না।”
সেদিন কথাটা শুনে অনন্যা হেসেছিল।
আজ আর হাসি পাচ্ছে না।
পরদিন সকাল।
সূর্য উঠেছে।
পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।
গ্রামের মানুষজন উঠোনে কাজ করছে।
সবকিছু স্বাভাবিক।
যেন গত রাতের ঘটনা কিছুই নয়।
অনন্যা রান্নাঘরের সামনে বসে চা খাচ্ছিল।
বাড়ির মালিক হরিপদবাবু চুপচাপ মুড়ি খাচ্ছিলেন।
অনন্যা হঠাৎ বলল,
“কাকু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
হরিপদবাবু তাকালেন।
“বল।”
“এই গ্রামে রাতে এত আলো থাকে কেন?”
লোকটির হাত থেমে গেল।
“কী আলো?”
“রাতে। আকাশটা পুরো আলোয় থাকে।”
হরিপদবাবু কিছু বললেন না।
অনন্যা আবার বলল,
“আর গত রাতে আমার দরজায় কেউ এসেছিল।”
এবার হরিপদবাবু মুড়ির বাটি নামিয়ে রাখলেন।
“কখন?”
“রাত দুটো সতেরো মিনিটে।”
লোকটির মুখের রং বদলে গেল।
“তুই দরজা খুলেছিলি?”
অনন্যা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
হরিপদবাবু উঠে দাঁড়ালেন।
“কী দেখলি?”
“কেউ ছিল না।”
“আর কিছু?”
অনন্যা একটু থেমে বলল,
“একটা লাল ফিতা ছিল।”
হরিপদবাবু যেন হঠাৎ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,
“ফিতেটা কোথায়?”
“ঘরে রেখেছি।”
“এখনই নিয়ে আয়।”
অনন্যা উঠে ঘরে গেল।
কিন্তু দরজা খুলে সে থেমে গেল।
ফিতেটা যেখানে রেখেছিল, সেখানে নেই।
সে পুরো ঘর খুঁজল।
বিছানার নিচে।
ব্যাগের ভেতর।
টেবিলের ওপর।
কোথাও নেই।
শেষে সে বারান্দায় এল।
লাল ফিতেটা পড়ে আছে।
কিন্তু এবার তার সঙ্গে একটা ছোট কাগজও রয়েছে।
অনন্যা কাগজটা তুলে নিল।
মাত্র তিনটি শব্দ লেখা—
“আজ রাতেও এসো।”
অনন্যার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
সেদিন দুপুরে সে গ্রামের স্কুলে গেল।
স্কুল বলতে টিনের ছাউনি দেওয়া দুটো ঘর।
একজন বৃদ্ধ শিক্ষক বসে খাতা দেখছিলেন।
অনন্যা পরিচয় দিল।
“আমি অনন্যা সেন। কলকাতা থেকে এসেছি। গ্রামের ওপর একটা অডিও প্রজেক্ট করছি।”
শিক্ষক চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
“চাঁদপুরা নিয়ে?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে বেশি দিন থাকিস না।”
অনন্যা হেসে বলল,
“সবাই আমাকে এই কথাটাই বলছে কেন?”
বৃদ্ধ শিক্ষক এবার হাসলেন না।
“কারণ তোর আসার কারণটা আমরা জানি।”
অনন্যা অবাক।
“কী কারণ?”
“তুই শব্দ খুঁজতে এসেছিস।”
“হ্যাঁ।”
“চাঁদপুরায় শব্দ কম নয়। কিন্তু সব শব্দ রেকর্ড করা যায় না।”
অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“আপনার নাম?”
“নির্মল ভট্টাচার্য।”
“স্যার, একটা প্রশ্ন করব?”
“কর।”
“মৌ নামে কোনও মেয়েকে আপনি চিনতেন?”
নির্মলবাবুর চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
“কোন মৌ?”
অনন্যা নিজের ব্যাগ থেকে একটা পুরনো ছবি বের করল।
ছবিতে আট বছরের একটা মেয়ে।
দুটি বিনুনি।
চোখে দুষ্টু হাসি।
চুলে লাল ফিতা।
“আমার বোন।”
নির্মলবাবু ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
“এই ছবিটা কোথায় পেলি?”
“আমাদের বাড়িতে ছিল।”
“না।”
“কী না?”
“এই ছবিটা তোর বাড়িতে থাকার কথা নয়।”
অনন্যা কপাল কুঁচকে বলল,
“কেন?”
নির্মলবাবু ছবিটা ফেরত দিয়ে বললেন,
“কারণ আমি এই ছবিটা আগে দেখেছি।”
“কোথায়?”
বৃদ্ধ শিক্ষক জানলার বাইরে তাকালেন।
“এই গ্রামে।”
অনন্যার গলা শুকিয়ে গেল।
“কবে?”
“পনেরো বছর আগে।”
“কাদের কাছে?”
নির্মলবাবু উত্তর দিলেন না।
অনন্যা টেবিলের ওপর হাত রাখল।
“স্যার, আমার বোন পনেরো বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিল। পুলিশ অনেক খুঁজেছিল। কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। আপনি যদি কিছু জানেন—”
“আমি কিছু জানি না।”
“কিন্তু আপনি ছবিটা দেখেছেন।”
“হ্যাঁ।”
“কার কাছে?”
বৃদ্ধ শিক্ষক এবার তার দিকে সরাসরি তাকালেন।
“একজনের কাছে।”
“কে?”
“তোর বোনের কাছে।”
অনন্যার শরীর কেঁপে উঠল।
“কী বললেন?”
নির্মলবাবু ধীরে ধীরে বললেন,
“মৌ এখানে এসেছিল।”
“কীভাবে?”
“সে নিজে আসেনি।”
“তাহলে?”
“তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল।”
“কে?”
নির্মলবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই স্কুলের বাইরে একটা ঘণ্টা বেজে উঠল।
টাং।
টাং।
টাং।
অনন্যা চমকে উঠল।
“স্কুল তো ছুটি হয়ে গেছে!”
নির্মলবাবু উঠে দাঁড়ালেন।
“এখন তুই চলে যা।”
“কিন্তু—”
“এখনই।”
“আমাকে সবটা বলুন।”
“রাত নামার আগে বাড়িতে ফিরে যা।”
অনন্যা বলল,
“আমি সত্যিটা না জেনে যাব না।”
নির্মলবাবু দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
তারপর থেমে বললেন,
“সত্যি জানতে চাইলে আজ রাত দুটো সতেরো মিনিটে পুকুরের ধারে যা।”
অনন্যা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“আপনি তো বললেন বাইরে যেতে না!”
বৃদ্ধ শিক্ষক ধীরে ধীরে ফিরে তাকালেন।
তার চোখে এবার ভয়।
“আমি বলিনি তুই যাস না।”
একটু থেমে তিনি বললেন,
“আমি বলেছিলাম—যারা বাইরে যায়, তারা সবাই ফিরে আসে না।”
রাত বাড়ল।
একটা।
দেড়টা।
দুটো।
অনন্যা বিছানায় বসে রইল।
তার রেকর্ডার টেবিলের ওপর রাখা।
সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আজ রাতে সব রেকর্ড করবে।
যা-ই ঘটুক।
২:১৬।
ঘরের আলো হঠাৎ নিভে গেল।
অনন্যা উঠে দাঁড়াল।
বাইরে আবার সেই অদ্ভুত আলো।
২:১৭।
দরজায় শব্দ হল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
এইবার অনন্যা দরজা খুলল না।
বাইরে থেকে একটা মেয়ের গলা এল।
“দিদি…”
অনন্যার চোখে জল চলে এল।
“মৌ?”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর উত্তর এল—
“তুই এত দেরি করলি কেন?”
অনন্যার হাত কাঁপতে লাগল।
“তুই কোথায়?”
“দরজা খোল।”
“তুই কি সত্যিই মৌ?”
বাইরে থেকে হাসির শব্দ এল।
একটা শিশুর হাসি।
ঠিক সেই হাসি।
পনেরো বছর আগের।
অনন্যা ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।
কিন্তু দরজা খোলার আগেই তার রেকর্ডার নিজে থেকে চালু হয়ে গেল।
লাল আলো জ্বলে উঠল।
স্পিকারে ভেসে এল একটা শব্দ।
প্রথমে খুব ক্ষীণ।
তারপর পরিষ্কার।
“দিদি, দরজা খুলিস না।”
অনন্যা জমে গেল।
কারণ সেই কণ্ঠটা—
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মৌয়ের কণ্ঠ নয়।
রেকর্ডারে যে কণ্ঠটা শোনা যাচ্ছে—
সেটা অনন্যার নিজের কণ্ঠ।
তারপর রেকর্ডারের ভেতর থেকে আবার তার নিজের গলা শোনা গেল—
“ওটা মৌ নয়।”
বাইরে দাঁড়ানো মেয়েটা এবার দরজায় জোরে আঘাত করল।
ধাম!
অনন্যা পিছিয়ে গেল।
তারপর বাইরে থেকে কান্নার শব্দ।
“দিদি…”
“দিদি, আমাকে বাঁচা…”
“দিদি…”
অনন্যা কানে হাত চাপা দিল।
কিন্তু রেকর্ডার থামল না।
আর ঠিক তখনই—
জানলার কাঁচে কেউ আঙুল দিয়ে লিখল—
২:১৭ নয়।
তার নিচে আরেকটা লাইন।
আজ রাতটা ১৫ বছর আগের রাত।
অনন্যা ধীরে ধীরে জানলার দিকে তাকাল।
কাঁচের ওপারে কেউ নেই।
শুধু পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে আছে সেই সাদা জামা পরা মানুষটি।
এইবার তার মুখ দেখা যাচ্ছে।
অনন্যার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
কারণ লোকটা—
অনন্যার নিজের মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আর তার হাতে ধরা—
একটা ছোট্ট লাল ফিতা।
চলবে…