সকাল থেকেই বৃষ্টি।
শহরের পুরনো বাসস্ট্যান্ডের পাশে ছোট্ট একটা বইয়ের দোকান চালাত অমল। দোকান বলতে টিনের চালের নিচে চারটে কাঠের তাক আর সামনে একটা পুরনো টেবিল। নতুন বইয়ের চেয়ে পুরনো বইই বেশি ছিল সেখানে।
অমলের একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।
প্রতিদিন দোকান খোলার আগে সে একটা লাল খাতা খুলে কিছু একটা লিখত।
কেউ জানত না কী লিখে।
একদিন বৃষ্টির মধ্যে এক স্কুলছাত্রী দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। নাম তার ঐশী। হাতে ছেঁড়া ছাতা, কাঁধে ভেজা স্কুলব্যাগ।
সে একটা বই হাতে নিয়ে বলল,
—“কাকু, বইটা কত?”
অমল দাম বলতেই মেয়েটা চুপ করে গেল।
তারপর ব্যাগ খুলে কয়েকটা কয়েন বের করল।
—“এত টাকা আছে। বাকিটা কাল দেব?”
অমল বইটা তার হাতে দিয়ে বলল,
—“কাল নয়, যখন পারিস তখন দিবি।”
ঐশী অবাক হয়ে তাকাল।
—“সত্যি?”
—“বইয়ের দাম সবসময় টাকা দিয়ে দিতে হয় না।”
মেয়েটা বই নিয়ে চলে গেল।
অমল লাল খাতাটা খুলে লিখল—
“ঐশী—একটা বই। টাকা পরে।”
এভাবেই চলতে লাগল।
কেউ পরীক্ষার আগে বই নিত, কেউ চাকরির প্রস্তুতির বই, কেউ গল্পের বই।
যাদের টাকা থাকত না, অমল তাদের বই দিত।
আর লাল খাতায় শুধু নাম আর বইয়ের নাম লিখে রাখত।
কেউ কেউ টাকা ফিরিয়ে দিত।
কেউ দিত না।
অমল কাউকে মনে করিয়ে দিত না।
একদিন দোকানে এলেন এক ভদ্রলোক।
চেহারায় বয়সের ছাপ। হাতে একটা পুরনো ফাইল।
তিনি অমলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“আপনি কি অমলবাবু?”
—“জি।”
ভদ্রলোক ফাইল খুলে একটা পুরনো বই বের করলেন।
বইটার প্রথম পাতায় অমলের হাতের লেখা।
অমল অবাক হয়ে গেল।
—“এটা তো আমার দোকানের বই!”
ভদ্রলোক মৃদু হাসলেন।
—“প্রায় পঁচিশ বছর আগে আমি এই বইটা আপনার কাছ থেকে নিয়েছিলাম।”
অমল কিছু মনে করতে পারল না।
ভদ্রলোক বললেন,
—“তখন আমার কাছে বই কেনার টাকা ছিল না। আপনি বলেছিলেন, ‘চাকরি পেলে টাকা দিও।’”
অমল হেসে বলল,
—“তারপর?”
—“চাকরি পেয়েছিলাম। কিন্তু আপনাকে আর খুঁজে পাইনি।”
ভদ্রলোক ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করলেন।
—“আজ টাকা দিতে আসিনি।”
অমল অবাক হয়ে তাকাল।
—“তাহলে?”
ভদ্রলোক বললেন,
—“আজ আপনার দোকানের সামনে একটা নতুন সাইনবোর্ড লাগাতে এসেছি।”
অমল কিছু বুঝতে পারল না।
বাইরে গিয়ে দেখল, নতুন বোর্ডে লেখা—
“অমলের পাঠঘর — যার বই কেনার সামর্থ্য নেই, তার জন্যও দরজা খোলা।”
অমলের চোখ ভিজে উঠল।
ভদ্রলোক বললেন,
—“আমি একা আপনার কাছে ঋণী নই। আমার মতো আরও অনেকেই আছে। আপনার লাল খাতায় যাদের নাম আছে, তাদের মধ্যে অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত।”
অমল ধীরে ধীরে দোকানে ফিরে এল।
লাল খাতাটা খুলল।
শেষ পাতায় আজকের তারিখ লিখে থামল।
তারপর লিখল—
“আজ বুঝলাম, কিছু ধার টাকা দিয়ে শোধ হয় না। মানুষের জীবনে আলো জ্বালিয়ে শোধ করতে হয়।”
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে।
ঐশী, যে এখন কলেজের ছাত্রী, ছাতা হাতে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল।
হেসে বলল,
—“কাকু, নতুন বই এসেছে?”
অমল তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
—“এসেছে। তোর জন্য একটা আলাদা করে রেখেছি।”
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে পুরনো বইয়ের দোকানটায় যেন আরও একটু আলো বেড়ে গেল।
আর টেবিলের ওপর পড়ে রইল সেই লাল খাতা—
যেখানে হিসেব ছিল না টাকার,
হিসেব ছিল মানুষের।