ভোরের ট্রেন ধরতে প্রতিদিন স্টেশনে আসত মধু।
স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় ছোট্ট একটা জুতোর দোকান ছিল তার। দোকান বলতে কাঠের বাক্সের ওপর সাজানো কয়েক জোড়া স্যান্ডেল, চটি আর জুতো।
মধু জুতো বিক্রি করত ঠিকই, কিন্তু তার দোকানের একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল।
কেউ টাকা না দিতে পারলে সে কাউকে খালি পায়ে ফিরিয়ে দিত না।
এক শীতের সকালে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল বছর দশেকের একটি ছেলে। নাম রনি।
তার এক পায়ে জুতো আছে, অন্য পা খালি।
মধু জিজ্ঞেস করল,
—“আরেকটা জুতো কোথায়?”
রনি মাথা নিচু করে বলল,
—“ট্রেনে উঠে খুলে গিয়েছিল। নামার সময় আর পাইনি।”
—“বাড়িতে টাকা নেই?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল।
—“মা বলেছে, মাসের শেষে কিনে দেবে।”
মধু তাক থেকে একটা জোড়া জুতো নামিয়ে দিল।
—“নাও।”
রনি চমকে উঠল।
—“কিন্তু টাকা?”
—“যেদিন পারবে, সেদিন দিও।”
রনি জুতো পরে কয়েক পা হাঁটল। তারপর ফিরে এসে বলল,
—“কাকু, আমি বড় হয়ে টাকা দিয়ে দেব।”
মধু হেসে বলল,
—“টাকা না দিলেও চলবে। কাউকে একদিন জুতো কিনে দিও।”
রনি চলে গেল।
মধু ঘটনাটা ভুলেই গেল।
প্রায় পনেরো বছর কেটে গেল।
মধুর চুলে তখন পাক ধরেছে। দোকানটাও আগের মতো ভালো চলছে না।
একদিন দুপুরে একজন যুবক এসে তার সামনে দাঁড়াল।
পরনে পরিচ্ছন্ন পোশাক, হাতে একটা বড় ব্যাগ।
—“আপনি কি মধু কাকু?”
মধু তাকিয়ে বলল,
—“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি কে?”
যুবকটা হেসে বলল,
—“এক পায়ে জুতো ছিল, আর এক পা খালি।”
মধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বুঝতে পারল।
—“রনি?”
যুবকটা মাথা নাড়ল।
তারপর ব্যাগ খুলে অনেকগুলো নতুন জুতো বের করল।
—“আমি এখন একটা জুতোর কোম্পানিতে কাজ করি। আজ আপনার জন্য কিছু নিয়ে এসেছি।”
মধু অবাক হয়ে বলল,
—“আমার জন্য?”
রনি একটা জোড়া জুতো তার হাতে তুলে দিল।
—“আপনি বলেছিলেন, টাকা না দিলেও চলবে। কাউকে একদিন জুতো কিনে দিতে।”
মধুর চোখ ভিজে উঠল।
রনি বলল,
—“আমি সেই কথা ভুলিনি।”
তারপর স্টেশনের বাইরে একটা টেবিল পেতে সে জুতোগুলো সাজিয়ে দিল।
যে শিশুদের জুতো নেই, তাদের বিনা পয়সায় জুতো দিতে শুরু করল।
মধু পাশে বসে রইল।
একটা ছোট মেয়ে নতুন জুতো পরে আনন্দে লাফাচ্ছিল।
রনি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“কেমন লাগছে?”
মেয়েটা বলল,
—“খুব ভালো!”
রনি মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—“তাহলে দৌড়ে বাড়ি যাও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—কখনও কাউকে খালি পায়ে দেখলে, পারলে তার পাশে দাঁড়াবে।”
মধু চুপ করে শুনছিল।
তার মনে হল, পনেরো বছর আগে সে আসলে একটা জোড়া জুতো দেয়নি।
সে দিয়েছিল একটা বিশ্বাস।
আর সেই বিশ্বাসই আজ ফিরে এসেছে বহু জোড়া জুতো হয়ে।
স্টেশনের ভিড়ে ট্রেনের হুইসেল বাজল।
মধু নিজের নতুন জুতোর দিকে তাকিয়ে হাসল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—“কিছু ভালো কাজের কোনও দাম থাকে না। শুধু তার পথটা অনেক দূর যায়।”
আর প্ল্যাটফর্মের ধুলোয় সেদিন অসংখ্য ছোট ছোট পায়ের ছাপ পড়ে রইল।
একটি জোড়া জুতো থেকে শুরু হওয়া গল্প, একদিন হয়ে উঠল অনেক শিশুর পথচলার সাহস।