প্রথম পর্ব — চিঠিটা যে ঠিকানায় পৌঁছয়নি
ভোরের বাসটা যখন মাধবডাঙা বাসস্ট্যান্ডে ঢুকল, তখন আকাশের রং ধূসর।
শীতকাল।
কুয়াশায় রাস্তার দুপাশের দোকানগুলো অর্ধেক ঢাকা।
চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে।
কেউ পাউরুটি কাটছে।
কেউ খবরের কাগজ খুলে বসেছে।
আর বাস থেকে নামল একজন মানুষ।
বয়স পঁয়ত্রিশ।
কাঁধে একটা পুরনো ব্যাগ।
চোখে ক্লান্তি।
নাম অভীক মুখোপাধ্যায়।
বারো বছর পর সে নিজের শহরে ফিরেছে।
কেউ তাকে চিনল না।
অথবা চিনলেও চিনতে চাইল না।
অভীক বাসস্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখল।
অনেক কিছু বদলে গেছে।
যে মাঠে একসময় ছেলেরা ক্রিকেট খেলত, সেখানে এখন বহুতল বাড়ি।
যে সিনেমা হলের সামনে বিকেলে ভিড় থাকত, সেখানে মোবাইলের দোকান।
পুরনো মিষ্টির দোকানটা নেই।
কিন্তু চায়ের দোকানটা এখনও আছে।
অভীক ধীরে ধীরে সেই দোকানের সামনে গেল।
দোকানদার বৃদ্ধ।
অভীক বলল,
“একটা চা দেবেন?”
বৃদ্ধ চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে তার দিকে তাকালেন।
“কোথা থেকে এলেন?”
“কলকাতা।”
“এখানে নতুন?”
অভীক একটু থেমে বলল,
“পুরনো।”
বৃদ্ধ বুঝলেন না।
অভীক চুপ করে চা খেতে লাগল।
তারপর পকেট থেকে একটা কাগজ বের করল।
কাগজটা বারবার ভাঁজ করা।
তাতে একটা ঠিকানা—
১২, শিউলি লেন, মাধবডাঙা।
আর নিচে একটি নাম—
সৌমী।
অভীক মাধবডাঙায় জন্মেছিল।
এই শহরেই তার শৈশব।
এই শহরেই তার বাবা মারা গিয়েছিলেন।
এই শহরেই তার মা একদিন তাকে বলেছিলেন—
“তুই চলে যা।”
সেদিন অভীক বুঝতে পারেনি, কেন মা তাকে এমন বলেছিলেন।
এখন বুঝতে পারে।
কারণ সেই রাতে সে এমন একটা ভুল করেছিল, যার ভার নিয়ে সে বারো বছর বেঁচেছে।
তারপর শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
কলকাতা।
দিল্লি।
পুনে।
চাকরি।
ব্যর্থতা।
আবার চাকরি।
অবশেষে নিজের একটা ছোট ব্যবসা।
জীবন তাকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু একটা মানুষকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি।
সৌমী।
সৌমী ছিল তার ছোটবেলার বন্ধু।
বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি।
ভালোবাসার চেয়ে গভীর।
কিন্তু সেই সম্পর্কের শেষ হয়েছিল একটা ভুল বোঝাবুঝিতে।
অভীক চলে যাওয়ার আগে সৌমীকে একটা চিঠি লিখেছিল।
চিঠিটা পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু সৌমী কোনওদিন উত্তর দেয়নি।
অভীক ভেবেছিল—
সৌমী তাকে ক্ষমা করেনি।
বারো বছর পরে সে জানতে পেরেছিল—
সেই চিঠি নাকি কখনও সৌমীর হাতে পৌঁছয়নি।
কেউ সেটা আটকে দিয়েছিল।
কিন্তু কে?
আর কেন?
শিউলি লেনের রাস্তা এখনও সরু।
দুই পাশে পুরনো বাড়ি।
কিছু বাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা।
কিছু বাড়ি ভেঙে নতুন হয়েছে।
অভীক ১২ নম্বর বাড়ির সামনে দাঁড়াল।
দরজা বন্ধ।
বারান্দায় একটা মানিপ্ল্যান্ট।
দরজার পাশে নামের ফলক—
সৌমী চক্রবর্তী।
অভীকের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।
সে কলিংবেল টিপল।
কোনও উত্তর নেই।
আবার।
নীরবতা।
পাশের বাড়ির এক মহিলা জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছিলেন।
অভীক তাঁকে জিজ্ঞেস করল,
“সৌমীদি বাড়িতে আছেন?”
মহিলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
“আপনি কে?”
“পুরনো পরিচিত।”
“আপনি কি অভীক?”
অভীক থমকে গেল।
“হ্যাঁ।”
মহিলার মুখের ভাব বদলে গেল।
তিনি জানলা খুলে বললেন,
“এত বছর পরে?”
অভীক উত্তর দিল না।
মহিলা বললেন,
“সৌমী এখানে থাকে না।”
“কোথায়?”
“জানি না।”
অভীকের বুকটা হঠাৎ খালি হয়ে গেল।
“কতদিন হলো?”
“প্রায় ছয় মাস।”
“কেন?”
“কিছু একটা ঘটেছিল।”
“কী?”
মহিলা মাথা নাড়লেন।
“আমি জানি না।”
তারপর একটু থেমে বললেন,
“তবে যাওয়ার আগে একটা কথা বলেছিল।”
“কী?”
“যদি অভীক কোনওদিন ফিরে আসে…”
অভীকের বুক ধক করে উঠল।
“তাহলে?”
মহিলা বললেন,
“তাকে বলবেন, সে যেন পুরনো পোস্ট অফিসে যায়।”
মাধবডাঙার পুরনো পোস্ট অফিস এখন বন্ধ।
নতুন পোস্ট অফিস বাজারের দিকে।
পুরনো বাড়িটা পড়ে আছে।
দরজায় তালা।
জানলার কাঁচ ভাঙা।
দেয়ালে পুরনো বিজ্ঞাপনের কাগজ।
অভীক ভেতরে ঢোকার রাস্তা খুঁজতে লাগল।
পেছনের দরজাটা অর্ধেক খোলা।
সে ভিতরে ঢুকল।
ধুলোর গন্ধ।
পুরনো কাঠের কাউন্টার।
দেয়ালে বন্ধ ঘড়ি।
সবকিছু যেন বারো বছর আগের সময়ে আটকে আছে।
একটা টেবিলের ওপর কয়েকটা পুরনো রেজিস্টার।
অভীক এগিয়ে গেল।
কেন তাকে এখানে আসতে বলা হয়েছে?
সে বুঝতে পারছিল না।
হঠাৎ একটা শব্দ হলো।
উপরের তাক থেকে একটা খাম পড়ে গেল।
অভীক চমকে তাকাল।
খামটা মেঝেতে পড়ে আছে।
সাদা।
ধুলোমাখা।
সামনে লেখা—
অভীক মুখোপাধ্যায়ের জন্য।
তার হাত কাঁপতে লাগল।
খামটা খুলল।
ভেতরে একটি চিঠি।
সৌমীর হাতের লেখা।
“অভীক,
তুমি যদি এই চিঠি পড়ো, তার মানে তুমি ফিরে এসেছ।
আমি জানি না তুমি কেন ফিরেছ।
কিন্তু আমি চাই তুমি এবার সত্যিটা জানো।
তুমি যেটাকে আমার বিশ্বাসঘাতকতা ভেবেছিলে, সেটা সত্যি ছিল না।
সেদিন রাতে আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।
কিন্তু তোমার বাড়ির সামনে পৌঁছে আমি এমন একটা জিনিস দেখেছিলাম, যার পর থেকে আমার জীবন বদলে যায়।
তুমি চলে যাওয়ার আগে আমাকে যে কথাটা বলেছিলে, সেটা আমি কোনওদিন ভুলিনি।
কিন্তু তুমি যা জানো না—
সেদিন তোমার বাবার মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না।”
অভীকের চোখ থেমে গেল শেষ লাইনে।
তার বাবা মারা গিয়েছিলেন বারো বছর আগে।
ট্রাকের ধাক্কায়।
পুলিশ বলেছিল দুর্ঘটনা।
সবাই বলেছিল দুর্ঘটনা।
অভীকও তাই বিশ্বাস করেছিল।
চিঠির নিচে আরও লেখা—
“তোমার বাবার মৃত্যুর রাতের আসল ঘটনা জানতে হলে তোমাকে একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
নাম—
নির্মল কাকা।সে এখন আর মাধবডাঙায় নেই।
কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে নদীর ওপারের চরবাঁশি গ্রামে।
আর একটা কথা—
কাউকে বিশ্বাস কোরো না।”
চিঠি শেষ।
অভীক অনেকক্ষণ নড়ল না।
তারপর ধীরে ধীরে খামটা উল্টে দেখল।
পেছনে একটা তারিখ।
১২ বছর আগের।
কিন্তু চিঠিটা যেন সদ্য লেখা।
সন্ধ্যায় অভীক নিজের পুরনো বাড়িতে গেল।
বাড়িটা এখন প্রায় পরিত্যক্ত।
মা মারা যাওয়ার পর আর কেউ থাকেনি।
দরজা খুলতেই ধুলো উড়ল।
ঘরের ভেতর বাবার পুরনো কাঠের আলমারি এখনও আছে।
দেয়ালে একটা ভাঙা ঘড়ি।
অভীক নিজের ঘরে ঢুকল।
ছোটবেলার বইগুলো নেই।
কিন্তু জানলার পাশে একটা কাঠের টেবিল আছে।
সে বসে পড়ল।
মনে পড়ল সেই রাত।
বারো বছর আগে।
বৃষ্টি হচ্ছিল।
বাবা বলেছিলেন,
“আজ রাতে বাইরে যাবি না।”
অভীক রেগে বলেছিল,
“আমি সৌমীর সঙ্গে দেখা করতে যাব।”
বাবা চিৎকার করেছিলেন—
“তুই কোথাও যাবি না!”
অভীক প্রথমবার বাবার ওপর এত রেগে গিয়েছিল যে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যায়।
রাত দশটার দিকে সে শুনেছিল—
বাবার দুর্ঘটনা হয়েছে।
রাস্তার পাশে ট্রাক।
মৃত্যু।
তারপর সবকিছু বদলে যায়।
সৌমীকে সে আর দেখেনি।
মা তাকে বলেছিলেন—
“এই শহর ছেড়ে চলে যা।”
অভীক চলে গিয়েছিল।
কিন্তু আজ প্রথমবার তার মনে হলো—
সেদিন রাতে হয়তো সে এমন কিছু ঘটতে দেখেছিল, যা তার মনে নেই।
হঠাৎ ঘরের বাইরে শব্দ হলো।
অভীক উঠে দাঁড়াল।
দরজার কাছে কেউ নেই।
কিন্তু মেঝেতে একটা জিনিস পড়ে আছে।
পুরনো একটা চাবি।
অভীক চাবিটা তুলে নিল।
চাবির সঙ্গে ছোট্ট কাগজ বাঁধা।
তাতে লেখা—
“তোমার বাবার আলমারি।”
অভীক চমকে গেল।
সে বাবার পুরনো আলমারির সামনে গেল।
চাবিটা তালায় ঢুকল।
ঘুরল।
আলমারি খুলে গেল।
ভেতরে জামাকাপড় নেই।
শুধু নিচের তাকে একটি লোহার বাক্স।
বাক্স খুলতেই—
একটা পুরনো টেপ রেকর্ডার।
কয়েকটি কাগজ।
আর একটি ছবি।
ছবিটা হাতে নিয়ে অভীকের শ্বাস আটকে গেল।
ছবিতে তার বাবা দাঁড়িয়ে।
পাশে নির্মল কাকা।
আর তাদের মাঝখানে—
একজন তৃতীয় মানুষ।
অভীক লোকটাকে চিনত না।
ছবির পেছনে বাবার হাতের লেখা—
“যদি আমার কিছু হয়, নির্মলকে খুঁজে নিস। কিন্তু লোকটার নাম কাউকে বলবি না।”
লোকটার মুখের ওপর কালো কালি দিয়ে দাগ টানা।
অভীক ছবিটা আলোয় ধরল।
কালির নিচে মুখটা সামান্য বোঝা যাচ্ছে।
সে হঠাৎ মনে করতে পারল—
এই মুখ সে কোথায় দেখেছে।
আজ সকালে।
চায়ের দোকানের সামনে।
একজন বৃদ্ধ লোকের সঙ্গে কথা বলছিল একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ।
অভীক তখন খেয়াল করেনি।
কিন্তু এখন বুঝতে পারছে—
লোকটা তাকে দেখছিল।
রাত বাড়ল।
অভীক টেপ রেকর্ডারটা চালু করল।
কিছুক্ষণ শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর বাবার কণ্ঠ।
“অভীক, যদি তুই এই রেকর্ড শুনিস, তার মানে আমি আর নেই।”
অভীক চোখ বন্ধ করল।
বাবা বলছেন—
“আমি জানি, তুই আমাকে ভুল বুঝবি। কিন্তু একটা কথা বিশ্বাস করিস—আমি তোকে কখনও ছেড়ে যেতে চাইনি।”
তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
“সেদিন রাতে আমি যে লোকটার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, সে শুধু ব্যবসায়ী নয়।”
অভীক মন দিয়ে শুনতে লাগল।
“সে এমন কিছু করেছে, যার প্রমাণ আমার কাছে আছে।”
হঠাৎ রেকর্ডিংয়ে শব্দ।
তারপর বাবার গলা খুব নিচু হয়ে গেল।
“কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় ভয়—সে জানে তুই সব জানিস।”
অভীক কেঁপে উঠল।
“তুই কিছুই জানিস না। এটাই তোর বাঁচার একমাত্র সুযোগ।”
তারপর—
একটা প্রচণ্ড শব্দ।
মনে হলো দরজা বন্ধ হলো।
বাবা বললেন—
“কে?”
রেকর্ডিং থেমে গেল।
অভীক রেকর্ডারটা কয়েকবার চালাল।
শেষ শব্দটাই বারবার বাজল—
“কে?”
তারপর নীরবতা।
অভীক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার বাড়ির বাইরে তখন কারও পায়ের শব্দ।
একজন।
ধীরে ধীরে দরজার দিকে আসছে।
অভীক আলো নিভিয়ে দিল।
পায়ের শব্দ দরজার সামনে এসে থামল।
কেউ দরজায় হাত রাখল।
অভীক নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে।
তারপর বাইরে থেকে একটি গলা—
“অভীক?”
সে গলাটা চিনতে পারল।
সৌমী।
অভীক দরজা খুলতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
মাত্র এক লাইন—
“দরজা খুলবে না। বাইরে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে সৌমী নয়।”
অভীক স্থির হয়ে গেল।
বাইরে আবার সেই কণ্ঠ—
“অভীক, আমি সৌমী। দরজা খোলো।”
অভীক দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার হাতে তখনও বাবার পুরনো টেপ রেকর্ডার।
আর ঘরের অন্ধকারে—
তার পিছনে কেউ যেন খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল—
“দেরি হয়ে গেছে।”
অভীক ধীরে ধীরে পিছনে ঘুরল।
ঘরে কেউ নেই।
কিন্তু জানলাটা—
যেটা সে নিজে বন্ধ করেছিল—
এখন পুরো খোলা।
আর জানলার নিচে পড়ে আছে একটা পুরনো কাগজ।
সেখানে লেখা—
“চরবাঁশিতে যেও না।”
চলবে…