গ্রামের মাঝখানে একটা বিশাল বটগাছ ছিল। তার নিচে কাঠের তৈরি একটি ছোট্ট বাক্স ঝুলত।
বাক্সটির গায়ে লেখা ছিল—
“যা মুখে বলতে পারছেন না, এখানে লিখে রাখুন।”
কে প্রথম বাক্সটা ঝুলিয়েছিল, কেউ জানত না।
তবে গ্রামের মানুষ জানত, সপ্তাহে একদিন বিকেলে স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হেমন্তবাবু এসে বাক্সটা খুলে চিঠিগুলো নিয়ে যান।
চিঠিগুলোর কোনও ঠিকানা থাকত না।
কখনও লেখা থাকত—
“বাবা, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই, কিন্তু অভিমানটা কাটাতে পারছি না।”
কখনও—
“আমি পড়াশোনা করতে চাই। কেউ কি আমাকে সাহায্য করবেন?”
আবার কখনও শুধু একটা লাইন—
“আজ আমার খুব একা লাগছে।”
হেমন্তবাবু প্রতিটি চিঠি পড়তেন।
যার উত্তর দেওয়া দরকার, নিজের হাতে উত্তর লিখতেন।
কখনও কাউকে বই দিতেন, কখনও কারও বাড়িতে গিয়ে কথা বলতেন।
একদিন বাক্সে এল একটা চিঠি।
মাত্র তিনটি শব্দ—
“আমি হারিয়ে গেছি।”
নাম নেই।
ঠিকানা নেই।
হেমন্তবাবু অনেকক্ষণ চিঠিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
পরদিন আবার বাক্স খুললেন।
আরেকটা চিঠি।
“কেউ আমাকে খুঁজবে?”
তৃতীয় সপ্তাহে—
“আমি বাড়ি ফিরতে চাই।”
হেমন্তবাবুর মনে হল, এই চিঠিগুলো একই মানুষের।
কিন্তু কে?
তিনি গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে খোঁজ নিলেন।
কেউ কিছু জানে না।
একদিন স্কুলের মাঠে তিনি দেখলেন, এক কিশোর একা বসে আছে।
নাম সায়ন।
সায়নের বাবা-মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো নয়। পড়াশোনায় ভালো হলেও সে খুব চুপচাপ হয়ে গেছে।
হেমন্তবাবু কাছে বসে বললেন,
—“কী হয়েছে?”
সায়ন মাথা নিচু করে বলল,
—“কিছু না।”
হেমন্তবাবু মৃদু হেসে বললেন,
—“কিছু না থাকলে মানুষ এত চুপ করে থাকে না।”
ছেলেটা কিছু বলল না।
সেদিন রাতে হেমন্তবাবু আবার বটগাছের কাছে গেলেন।
বাক্স খুলতেই দেখলেন নতুন একটা চিঠি।
“স্যার, আপনি কি বুঝতে পেরেছেন?”
হেমন্তবাবু চিঠিটা হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করলেন।
পরদিন সায়নকে স্কুলে ডেকে বললেন,
—“চিঠিগুলো তুই লিখেছিস?”
ছেলেটার চোখে জল এসে গেল।
সে মাথা নাড়ল।
—“বাড়িতে কেউ আমার কথা শোনে না। কাউকে বলতে পারি না। তাই লিখি।”
হেমন্তবাবু তার কাঁধে হাত রাখলেন।
—“কথা বলার জন্য সবসময় বড় মানুষ লাগে না। শুধু একজন মন দিয়ে শুনবে—এমন মানুষ লাগে।”
সায়ন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“আপনি কি আমার কথা শুনবেন?”
—“যতদিন তুই বলতে চাইবি।”
সেদিন প্রথমবার সায়ন অনেক কথা বলল।
বাবার সঙ্গে তার অভিমান, মায়ের সঙ্গে দূরত্ব, নিজের স্বপ্ন—সব।
হেমন্তবাবু পরদিন সায়নের বাবা-মাকে স্কুলে ডাকলেন।
তাদের সামনে ছেলের কোনও অভিযোগ করলেন না।
শুধু বললেন,
—“আপনারা ওকে পড়াশোনার ফলাফল দিয়ে নয়, মানুষ হিসেবে দেখুন।”
কথাগুলো ধীরে ধীরে কাজ করল।
কয়েক মাস পর সায়নের বাড়িতে আবার হাসি ফিরল।
এক সন্ধ্যায় হেমন্তবাবু বটগাছের বাক্স খুললেন।
ভেতরে একটা শেষ চিঠি।
“এবার আমি আর হারিয়ে যাইনি।”
নিচে সায়নের নাম।
হেমন্তবাবু চিঠিটা ভাঁজ করে বুকের কাছে রাখলেন।
তারপর বাক্সটার পাশে আরেকটা ছোট কাগজ লাগিয়ে দিলেন—
“চিঠি লিখুন। কেউ না কেউ পড়বে।”
বছর কেটে গেল।
হেমন্তবাবু আর নেই।
কিন্তু বটগাছের নিচে সেই বাক্স এখনও ঝুলছে।
এখন গ্রামের স্কুলের কয়েকজন ছাত্র পালা করে চিঠি সংগ্রহ করে।
কেউ উত্তর দেয়।
কেউ বই দেয়।
কেউ শুধু পাশে বসে থাকে।
একদিন এক ছোট মেয়ে বাক্সে চিঠি ফেলল।
চিঠিতে লেখা—
“আমার খুব ভয় করছে। আমি কি একা?”
কিছুক্ষণ পর বাক্সের ভেতর থেকে একটা উত্তর বেরিয়ে এল।
“না। তুমি একা নও।”
বটগাছের পাতাগুলো বাতাসে দুলছিল।
হয়তো কোথাও হেমন্তবাবুর হাসিও মিশে ছিল সেই শব্দে।
কারণ কিছু মানুষ চলে গেলেও,
তারা মানুষের পাশে থাকার যে অভ্যাস তৈরি করে যায়, সেটি কখনও মরে না।