Categories
গল্প বিবিধ

যে বাগান কথা বলত।।।

কাঁকড়াঝোড় গ্রামের একেবারে পশ্চিম দিকে ছিল একটা বিশাল বাগান।

বাগানটা গ্রামের কারও একার ছিল না। বহু বছর আগে গ্রামের কয়েকজন মানুষ মিলে সেখানে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা আর নানা ধরনের গাছ লাগিয়েছিলেন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বাগানটার কথা ভুলে গিয়েছিল।

অনেক গাছ শুকিয়ে গিয়েছিল। কোথাও আগাছা, কোথাও ভাঙা বেড়া। বর্ষায় জল জমত, শীতকালে শুকনো পাতায় ঢেকে যেত মাটিটা।

শুধু একজন মানুষ এখনও প্রতিদিন সেখানে যেতেন।

তাঁর নাম অমলবাবু।

বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি।

কেউ তাঁকে বাগানের মালিক বলত না।

তিনি নিজেই বলতেন,

—আমি মালিক নই। আমি পাহারাদার।

প্রতিদিন সকালে একটা পুরোনো ঝুড়ি হাতে নিয়ে তিনি বাগানে ঢুকতেন।

শুকনো ডাল সরাতেন। গাছের গোড়ায় মাটি দিতেন। কোথাও পোকা ধরলে পাতা পরিষ্কার করতেন।

গ্রামের লোকজন তাঁকে দেখে হাসত।

একদিন চায়ের দোকানে বসে হরু বলল,

—অমলদা, ওই জঙ্গল পরিষ্কার করে কী হবে?

অমলবাবু চা খেতে খেতে বললেন,

—জঙ্গল নয়। বাগান।

—কোন বাগান? ওখানে তো আর ফল হয় না।

অমলবাবু শান্তভাবে বললেন,

—হয়নি। তাই বলে হবে না—এটা কে বলেছে?

সবাই হেসে উঠল।

অমলবাবু আর কিছু বললেন না।


সেদিন বিকেলে গ্রামের স্কুলের মেয়ে তৃষা বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।

সে দেখল অমলবাবু একটা শুকিয়ে যাওয়া আমগাছের পাশে বসে আছেন।

তৃষা জিজ্ঞেস করল,

—কী করছেন?

—গাছটার সঙ্গে কথা বলছি।

তৃষা হেসে ফেলল।

—গাছ আবার কথা বলে?

অমলবাবু বললেন,

—সবাই কথা বলে। শুধু শোনার মানুষ লাগে।

তৃষা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—গাছটা কী বলছে?

অমলবাবু গাছের শুকনো ডালের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—বলছে, ‘আমাকে একটু সময় দাও।’

তৃষার কেমন যেন ভালো লাগল কথাটা।

সে বলল,

—আমি সাহায্য করব?

অমলবাবু তাকিয়ে হেসে বললেন,

—করবি?

—হ্যাঁ।

—তাহলে কাল একটা কোদাল নিয়ে আসিস।

পরদিন সত্যিই তৃষা কোদাল নিয়ে এল।

তার সঙ্গে এল আরও দুজন বন্ধু—মৌ আর রুদ্র।

তিনজন মিলে গাছের চারপাশ পরিষ্কার করতে লাগল।

অমলবাবু বললেন,

—গাছ লাগানো সহজ। গাছ বড় করা কঠিন।

তৃষা বলল,

—মানুষের মতো?

অমলবাবু থেমে গেলেন।

তারপর বললেন,

—ঠিক মানুষের মতো।


কয়েকদিন পর স্কুলের আরও কয়েকজন ছাত্রছাত্রী বাগানে আসতে শুরু করল।

তারা শুকনো পাতা সরাল। আগাছা তুলল। ভাঙা বেড়া মেরামত করল।

কিন্তু একটা বড় সমস্যা ছিল।

জল।

বাগানে জল দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না।

তৃষা বলল,

—জল কোথা থেকে আসবে?

অমলবাবু বললেন,

—বর্ষার জল ধরে রাখতে হবে।

—কীভাবে?

অমলবাবু মাটিতে একটা ছবি আঁকলেন।

—এখানে ছোট নালা করব। বৃষ্টির জল নালার মধ্যে দিয়ে এসে এই গর্তে জমবে।

রুদ্র বলল,

—এত কাজ কে করবে?

অমলবাবু বললেন,

—যে বাগানকে নিজের মনে করবে, সে করবে।

কথাটা তৃষার মনে গেঁথে গেল।

পরদিন সে স্কুলে একটা ঘোষণা করল।

‘একটি গাছের জন্য এক ঘণ্টা।’

যে ছাত্র চাইবে, সে সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা বাগানে কাজ করবে।

প্রথমে দশজন এল।

তারপর বিশজন।

তারপর গ্রামের কয়েকজন যুবকও যোগ দিল।

কেউ নালা কাটল।

কেউ বাঁশ দিয়ে বেড়া বানাল।

কেউ শুকনো ডাল কেটে সরাল।

কেউ নতুন চারা আনল।

বাগানটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।


কিন্তু গ্রামের সবাই খুশি ছিল না।

একদিন কয়েকজন ব্যবসায়ী এসে বলল,

—এই জমিটা ফাঁকা পড়ে আছে। এখানে গুদাম হলে গ্রামের উপকার হবে।

কথাটা ছড়িয়ে পড়ল।

অনেকে ভাবল, সত্যিই তো! বাগান থেকে তো এখন কোনও আয় হয় না।

তৃষা খুব চিন্তায় পড়ে গেল।

সে অমলবাবুর কাছে গিয়ে বলল,

—বাগানটা কি চলে যাবে?

অমলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—জানি না।

—তাহলে?

—লড়াই করতে হবে।

—আমরা তো ছোট।

অমলবাবু হেসে বললেন,

—ছোট মানুষদের স্বপ্নও কি ছোট হয়?

তৃষা মাথা নাড়ল।

অমলবাবু বললেন,

—বাগানটা শুধু গাছের জায়গা নয়। এটা গ্রামের স্মৃতি। এখানে তোমাদের দাদুদের গাছ আছে। এখানে প্রথম আম পেড়েছিল তোমাদের বাবারা। এই বাগানের ছায়ায় কত মানুষ দুপুর কাটিয়েছে। এমন জায়গার মূল্য শুধু টাকা দিয়ে মাপা যায় না।


তৃষা ঠিক করল, সবাইকে বোঝাতে হবে।

স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বাগানের পুরোনো ছবি সংগ্রহ করল।

বৃদ্ধ মানুষদের কাছ থেকে গল্প লিখে নিল।

কে কখন কোন গাছ লাগিয়েছিলেন, কোন বছরে বড় ঝড়ে কোন গাছ পড়েছিল—সবকিছু লিখে একটা খাতা তৈরি হল।

খাতার নাম দেওয়া হল—

‘আমাদের বাগানের ইতিহাস।’

স্কুলে প্রদর্শনী হল।

গ্রামের মানুষ এল।

বৃদ্ধ গোপাল কাকু একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

—এই গাছটা আমি আর আমার ভাই মিলে লাগিয়েছিলাম। এখন তো ভাই নেই। গাছটাও বেঁচে আছে।

আরেকজন বললেন,

—এই বাগানে বসেই আমার বাবা আমাকে প্রথম অ আ ক খ শিখিয়েছিলেন।

একজন বৃদ্ধা বললেন,

—আমার বিয়ের আগে এই বাগানেই বান্ধবীদের সঙ্গে বসতাম।

তৃষা বুঝল—

বাগানটা আসলে গাছের চেয়ে অনেক বড়।

এটা মানুষের স্মৃতি।


কয়েক মাস পর বর্ষা এল।

একদিন ভোর থেকে প্রবল বৃষ্টি।

নতুন তৈরি নালাগুলো দিয়ে জল ছুটে বাগানের বড় জলাধারে জমতে লাগল।

সন্ধ্যায় বৃষ্টি থামার পর সবাই বাগানে গেল।

তৃষা দেখল—

যে আমগাছটাকে সবাই মৃত ভেবেছিল, তার একটা ডালে ছোট্ট সবুজ কুঁড়ি এসেছে।

সে দৌড়ে অমলবাবুকে ডাকল।

—দাদু! দাদু! দেখো!

অমলবাবু ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

কুঁড়িটার দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখ ভিজে উঠল।

তিনি হাত দিয়ে গাছের গুঁড়ি ছুঁয়ে বললেন,

—আমি জানতাম, তুই কথা রাখবি।

তৃষা হেসে বলল,

—গাছটা কী বলল?

অমলবাবু বললেন,

—বলল, ‘আমি এখনও বেঁচে আছি।’


এক বছর পর কাঁকড়াঝোড়ের সেই বাগান আর আগের মতো রইল না।

সেখানে নতুন গাছ জন্মেছে।

পুরোনো গাছগুলো আবার ফল দিতে শুরু করেছে।

বাগানের এক কোণে ছোট্ট পাঠাগার হয়েছে।

আরেক কোণে শিশুদের জন্য বসার জায়গা।

গ্রামের মানুষ সেখানে সকালে হাঁটতে যায়।

স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সপ্তাহে একদিন বাগানের গাছের যত্ন নেয়।

বাগানের প্রবেশপথে একটি কাঠের ফলক লাগানো হয়েছে।

তাতে লেখা—

‘এই বাগানের কোনও মালিক নেই।
কারণ এই বাগান আমাদের সবার।’

ফলকের নিচে ছোট করে লেখা—

‘একটি গাছকে বাঁচানো মানে শুধু একটি গাছকে বাঁচানো নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু স্মৃতিকেও বাঁচানো।’

একদিন তৃষা অমলবাবুকে জিজ্ঞেস করল,

—দাদু, তুমি প্রথম দিন থেকেই কি জানত যে বাগানটা একদিন এমন হবে?

অমলবাবু মৃদু হেসে বললেন,

—না।

—তাহলে এতদিন কাজ করলে কেন?

তিনি সামনের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন,

—কারণ ভবিষ্যৎ কেমন হবে সেটা আমরা জানি না। কিন্তু আজ কী করতে পারি, সেটা তো জানি।

তৃষা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

হাওয়ায় আমপাতা নড়ছিল।

দূরে একটা পাখি ডাকছিল।

আর মনে হচ্ছিল, সত্যিই যেন পুরো বাগানটা কথা বলছে।

বলছে—

‘যে মানুষ যত্ন করতে জানে, সে কখনও সত্যিকারের একা থাকে না।’

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *