Categories
নারী কথা প্রবন্ধ রিভিউ

চেতনা গালা সিনহা: গ্রামের নারীর হাতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার চাবিকাঠি।

ভারতের উন্নয়নের গল্পে শহরের বড় বড় শিল্প, প্রযুক্তি, বহুজাতিক সংস্থা কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কথা প্রায়ই সামনে আসে। কিন্তু ভারতের প্রকৃত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা হয়েছে গ্রামের ছোট ছোট ঘর, সাপ্তাহিক হাট, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্বনির্ভর নারীদের হাত ধরে। সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ চেতনা গালা সিনহা। তিনি দেখিয়েছেন, একটি ব্যাংক শুধু টাকা জমা রাখা বা ঋণ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; সঠিকভাবে পরিচালিত হলে একটি ব্যাংক একজন সাধারণ নারীর আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনতা এবং সামাজিক মর্যাদা গড়ে তোলার শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

চেতনা সিনহা মূলত গ্রামীণ মহিলাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করেছেন। মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার খরা-প্রবণ অঞ্চল ম্হাসওয়াদকে কেন্দ্র করে তাঁর কাজের সূচনা। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Mann Deshi Foundation। তার পরের বছর, ১৯৯৭ সালে, প্রতিষ্ঠিত হয় Mann Deshi Mahila Sahakari Bank—গ্রামীণ নারীদের দ্বারা পরিচালিত এবং গ্রামীণ নারীদের জন্য গড়ে ওঠা একটি বিশেষায়িত সমবায় ব্যাংক।

একটি সমস্যার মধ্যে জন্ম নেয় একটি স্বপ্ন

চেতনা সিনহার কাজের পেছনে ছিল বাস্তব জীবনের একটি ঘটনা। ম্হাসওয়াদের এক মহিলা শ্রমিক ও ওয়েল্ডার, কানতাবাই, নিজের কিছু টাকা নিরাপদে রাখার জন্য ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একাধিক ব্যাংক থেকে তিনি প্রত্যাখ্যাত হন। তাঁর প্রয়োজন ছিল খুব সামান্য—নিরাপদে সঞ্চয় করা এবং ভবিষ্যতে নিজের পরিবারের জন্য কিছুটা সুরক্ষা তৈরি করা। কিন্তু প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাছে তাঁর মতো একজন দরিদ্র গ্রামীণ মহিলা ছিলেন যেন ‘উপযুক্ত গ্রাহক’ নন।

এই অভিজ্ঞতা চেতনা সিনহাকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেন, সমস্যা শুধু অর্থের অভাব নয়; সমস্যা হলো এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থার অভাব, যা গ্রামের নারীদের বাস্তব জীবন, আয় এবং প্রয়োজনকে বুঝবে। সেই ভাবনা থেকেই গড়ে ওঠে নারীদের নিজস্ব ব্যাংকের ধারণা।

এই ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—বড় পরিবর্তনের সূচনা সবসময় বড় কোনো পরিকল্পনা থেকে হয় না। কখনও কখনও একজন সাধারণ মানুষের ছোট একটি সমস্যাই একটি বৃহৎ সামাজিক আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাংক মানে শুধু ঋণ নয়

চেতনা সিনহার দর্শনের বিশেষত্ব এখানেই যে তিনি নারীর ক্ষমতায়নকে শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর মতে, একজন নারীকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে হলে তাঁকে অর্থের পাশাপাশি জ্ঞান, দক্ষতা, বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দিতে হবে।

Mann Deshi Foundation-এর বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাই আর্থিক শিক্ষা, ব্যবসায়িক দক্ষতা, বাজারের সঙ্গে সংযোগ এবং সামাজিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারীরা যাতে নিজের ছোট ব্যবসা শুরু করতে পারেন কিংবা ইতিমধ্যে থাকা ব্যবসাকে আরও বড় করতে পারেন, তার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এই পদ্ধতির ফলে একজন নারী শুধু ঋণগ্রহীতা থাকেন না; তিনি ধীরে ধীরে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন।

সাপ্তাহিক হাট থেকে নতুন চিন্তা

চেতনা সিনহার কাজের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তিনি সমস্যাকে কাগজে-কলমে দেখেননি; তিনি মানুষের কাছে গিয়েছেন। গ্রামের সাপ্তাহিক বাজারে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন, Mann Deshi Bank-এর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও কিছু মহিলা প্রয়োজনের সময় মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার করছেন।

কারণ ছিল খুব বাস্তব। মহাজন উচ্চ সুদ নিলেও প্রয়োজনমতো দ্রুত টাকা দিতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সুবিধামতো ফেরতের সুযোগ থাকত। ব্যাংকের প্রচলিত ঋণপ্রক্রিয়া তাঁদের কাছে তুলনামূলকভাবে কঠিন ছিল।

এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয় Weekly Market Cash Credit Loan-এর মতো উদ্যোগ। অর্থাৎ, নারীদের ব্যবসার ধরন ও নগদ অর্থের প্রয়োজন বুঝে আর্থিক পরিষেবাকে তাঁদের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এখানেই চেতনা সিনহার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন দেখা যায়—মানুষকে ব্যবস্থার সঙ্গে জোর করে মানিয়ে নেওয়ার বদলে প্রয়োজন হলে ব্যবস্থাকেই মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থেকে আত্মবিশ্বাস

একজন গ্রামীণ নারী যখন নিজের উপার্জন করেন, নিজের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রাখেন, ব্যবসা পরিচালনা করেন এবং নিজের অর্থ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তখন পরিবর্তন শুধু তাঁর আয়ে আসে না। পরিবর্তন আসে তাঁর আত্মপরিচয়েও।

Mann Deshi Foundation-এর কাজের অন্যতম লক্ষ্য হলো নারীদের নিজেদের জীবনের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাঁদের পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে পারে, সন্তানদের শিক্ষায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং সামাজিক আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে।

এই কারণে চেতনা সিনহার কাছে নারী-ক্ষমতায়ন কোনও স্লোগান নয়; এটি দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি বাস্তব প্রক্রিয়া।

ব্যবসায়িক শিক্ষার নতুন দরজা

চেতনা সিনহার উদ্যোগ শুধু ব্যাংকেই থেমে থাকেনি। গ্রামীণ মহিলাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা বাড়াতে Mann Deshi Foundation-এর Business School-গুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এই প্রশিক্ষণে আর্থিক সাক্ষরতা, ডিজিটাল দক্ষতা, ব্যবসা পরিচালনা, বিপণনসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মহিলাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য মোবাইল স্কুলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের বিভিন্ন Business School ও Chambers of Commerce কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক নারী অংশ নিয়েছেন।

অর্থাৎ, চেতনা সিনহার মডেলটি ছিল—ব্যাংক থেকে পুঁজি, প্রশিক্ষণ থেকে দক্ষতা এবং বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে ব্যবসার বিস্তার।

নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা

চেতনা সিনহার কাজের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তিনি শুধু মাঠপর্যায়ে কাজ করেননি; আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নীতিগত আলোচনাতেও ভূমিকা রেখেছেন।

Mann Deshi Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে KYC সংক্রান্ত কিছু কঠোরতা শিথিল করার পক্ষে তিনি কাজ করেছিলেন। তাঁর সংগঠন নারীদের জন্য পেনশন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উপযোগী আর্থিক পণ্য তৈরির ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নিয়েছে।

এ ধরনের কাজের গুরুত্ব অনেক। কারণ একটি দরিদ্র পরিবারে সঞ্চয়, ঋণ, বিমা কিংবা পেনশনের মতো বিষয়গুলি শুধু আর্থিক পরিভাষা নয়—এগুলি ভবিষ্যতের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।

জলবায়ু ও গ্রামের অর্থনীতি

গ্রামীণ অর্থনীতি প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে খরা-প্রবণ অঞ্চলে কৃষি ও ছোট ব্যবসা নানা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়। তাই গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে জলবায়ু ও জীবিকার প্রশ্নও যুক্ত হয়ে পড়ে।

Mann Deshi Foundation-এর কাজের পরিধি ধীরে ধীরে আর্থিক পরিষেবা ছাড়িয়ে কৃষি, দক্ষতা উন্নয়ন, বাজার সংযোগ এবং জলবায়ু-সহনশীল জীবিকার মতো ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। Foundation-এর বর্তমান কাঠামোতেও Climate Resilient Agriculture-এর জন্য আলাদা উদ্যোগ রয়েছে।

এর ফলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে বৃহত্তর গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার একটি মডেল তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

চেতনা গালা সিনহার কাজ দেশ-বিদেশে একাধিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি Ashoka Fellow, Schwab Foundation-এর Social Entrepreneur of the Year—India এবং Forbes India Leadership Award-সহ বিভিন্ন সম্মান পেয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি World Economic Forum-এর Co-Chair হিসেবে নির্বাচিত হন এবং একই সময়ে W20-এর Financial Inclusion-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

২০১৯ সালে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে Nari Shakti Puraskar লাভ করেন। নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের জন্য এই সম্মান তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

একজন নারীর গল্প থেকে একটি আন্দোলন

চেতনা গালা সিনহার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—একজন মানুষের সমস্যা কখনও কখনও একটি বৃহৎ সামাজিক পরিবর্তনের দরজা খুলে দিতে পারে।

কানতাবাই ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেননি। সেই প্রত্যাখ্যান যদি কেবল একটি ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখা হতো, তাহলে হয়তো ঘটনাটি সেখানেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু চেতনা সিনহা সেই সমস্যার মধ্যে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন দেখেছিলেন—কেন গ্রামের একজন নারী নিজের পরিশ্রমের টাকা নিরাপদে রাখার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন?

সেই প্রশ্ন থেকেই তৈরি হয় একটি ব্যাংক, একটি ফাউন্ডেশন, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, বাজার সংযোগ এবং হাজার হাজার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ।

আগামী দিনের জন্য শিক্ষা

চেতনা সিনহার কাজ আমাদের শেখায়, উন্নয়নের অর্থ শুধু বড় রাস্তা, বড় কারখানা বা বড় প্রযুক্তি নয়। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণ হয়, যখন সমাজের প্রান্তিক মানুষও নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেন।

একজন নারী নিজের নামে সঞ্চয় করতে পারেন, ব্যবসা করতে পারেন, ঋণ নিতে পারেন, বাজারে নিজের পণ্য বিক্রি করতে পারেন, নিজের আয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এই ছোট ছোট পরিবর্তনই একটি পরিবার এবং পরবর্তী প্রজন্মের জীবন বদলে দিতে পারে।

চেতনা গালা সিনহা সেই পরিবর্তনের পথ দেখিয়েছেন। তাঁর কাজের মূল শক্তি ছিল মানুষের বাস্তব সমস্যাকে বোঝা এবং সেই সমস্যার জন্য মানুষের উপযোগী সমাধান তৈরি করা।

তাই চেতনা সিনহার গল্প শুধু একজন সমাজকর্মীর জীবনী নয়। এটি এমন একটি ভারতের গল্প, যেখানে গ্রামের একজন সাধারণ নারীও অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার হতে পারেন। যেখানে ব্যাংকের দরজা তাঁর জন্য বন্ধ থাকবে না। যেখানে সঞ্চয় হবে নিরাপত্তার প্রতীক, ঋণ হবে সম্ভাবনার হাতিয়ার এবং ব্যবসা হবে আত্মনির্ভরতার পথ।

সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নারীর হাতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তুলে দেওয়া মানে শুধু একজন নারীকে শক্তিশালী করা নয়; তার সঙ্গে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *