Categories
গল্প বিবিধ

নদীর ধারের আলো।।।

নদীটা দিনের বেলায় শান্ত থাকত।

কিন্তু রাত নামলেই তার চেহারা বদলে যেত।

বিশেষ করে বর্ষাকালে।

কালো জলের ওপর বাতাসের ঝাপটা, মাঝে মাঝে বৃষ্টির শব্দ, দূরে কোথাও নৌকার ইঞ্জিনের আওয়াজ—সব মিলিয়ে নদী তখন যেন এক অচেনা জগৎ।

নদীর বাঁকে একটি ছোট্ট বাতিঘর ছিল।

বাতিঘর বললে অবশ্য খুব বড় কিছু নয়। পাকা দোতলা ঘর, উপরে কাচে ঘেরা একটি আলো, আর তার পাশে সরু লোহার সিঁড়ি।

সেই আলো জ্বালানোর দায়িত্ব ছিল মাধব কাকার।

বয়স ষাটের কাছাকাছি।

প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাতিঘরে উঠে আলো জ্বালাতেন।

গ্রামের লোকেরা বলত,

—“ওই আলো না থাকলে রাতের নদী চিনতে ভুল হয়।”

মাধব কাকা সবসময় বলতেন,

—“আলো নিজের জন্য জ্বলে না। অন্যকে পথ দেখানোর জন্য জ্বলে।”

তার স্ত্রী বহু বছর আগে মারা গিয়েছিলেন।

এখন তিনি একাই থাকতেন।

তবে পাশের বাড়ির কিশোরী মেঘা প্রায়ই তার কাছে আসত।

মেঘার বাবা নদীতে মাছ ধরতেন।

মা বাড়িতে কাজ করতেন।

মেঘা পড়াশোনায় ভালো ছিল। তার স্বপ্ন ছিল একদিন ইঞ্জিনিয়ার হবে।

কিন্তু সে মাঝেমধ্যে বলত,

—“কাকা, আমাদের গ্রামের মেয়েরা এত দূর পড়তে পারে না।”

মাধব কাকা বলতেন,

—“আলো যত দূর যায়, পথও তত দূর হয়।”

মেঘা বুঝত না।

—“আলো দিয়ে আবার পথ হয় নাকি?”

মাধব হাসতেন।

—“হয়। শুধু চোখ দিয়ে দেখলে বুঝবি না।”

এক বর্ষার রাতে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় উঠল।

সন্ধ্যার পর থেকেই নদী উত্তাল।

মাধব কাকা বাতিঘরের আলো জ্বালিয়ে নিচে নামছিলেন।

ঠিক তখন মেঘা দৌড়ে এসে বলল,

—“কাকা!”

—“কী হয়েছে?”

—“বাবার নৌকা এখনও ফেরেনি।”

মাধব নদীর দিকে তাকালেন।

আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল।

তিনি বললেন,

—“কখন বেরিয়েছিল?”

—“বিকেলে।”

মাধবের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

সাধারণত সন্ধ্যার আগেই জেলেদের নৌকা ফিরে আসে।

তিনি আবার বাতিঘরে উঠে গেলেন।

দূরে তাকিয়ে রইলেন।

ঝড়ের মধ্যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

মেঘা নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।

—“কাকা, বাবা কি ফিরবে?”

মাধব বললেন,

—“ফিরবে।”

—“আপনি কী করে জানেন?”

—“কারণ এখনও আলো জ্বলছে।”

মেঘা বুঝতে পারল না।

কিন্তু মাধবের কথায় তার সাহস হল।

রাত বাড়তে লাগল।

বৃষ্টি আরও বেড়ে গেল।

হঠাৎ বাতিঘরের আলো কেঁপে উঠল।

তারপর নিভে গেল।

মাধব থমকে গেলেন।

বিদ্যুৎ নেই।

জেনারেটরও চালু হচ্ছে না।

তিনি দ্রুত নিচে নেমে এলেন।

মেঘা বলল,

—“কী হয়েছে?”

—“আলো নিভে গেছে।”

—“এখন?”

মাধব কোনো উত্তর দিলেন না।

তিনি টর্চ নিয়ে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করলেন।

একটি তার পুড়ে গেছে।

জেনারেটরের পুরোনো অংশও নষ্ট।

মেঘা বলল,

—“তাহলে এখন কী হবে?”

মাধব বললেন,

—“আলো জ্বালাতেই হবে।”

তিনি ঘরের পুরোনো বাক্স খুললেন।

সেখানে ছিল কেরোসিনের লণ্ঠন, কয়েকটি পুরোনো কাচ আর কিছু তার।

মেঘা অবাক হয়ে বলল,

—“এগুলো দিয়ে হবে?”

—“চেষ্টা করলে হয়।”

দুজন মিলে কাজ শুরু করল।

মাধব যন্ত্র ঠিক করছেন।

মেঘা কাচ পরিষ্কার করছে।

বাতাসে দরজা বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বৃষ্টি ঢুকে পড়ছে।

তবু তারা থামল না।

প্রায় এক ঘণ্টা পর একটা লণ্ঠন জ্বলে উঠল।

মাধব সেটাকে বাতিঘরের কাচঘেরা ঘরে তুলে রাখলেন।

আলো খুব উজ্জ্বল নয়।

কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

মাধব বললেন,

—“যতক্ষণ বড় আলো না জ্বলে, এই ছোট আলোই যথেষ্ট।”

মেঘা নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখন দূরে একটা ক্ষীণ আলো দেখা গেল।

একবার।

দুবার।

তারপর আবার অদৃশ্য।

মাধব চিৎকার করে বললেন,

—“নৌকা!”

মেঘার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

মাধব লণ্ঠনটা আরও উঁচুতে ধরলেন।

নৌকাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।

কিন্তু স্রোত তাকে বারবার অন্যদিকে ঠেলে দিচ্ছিল।

মাধব দ্রুত ঘণ্টা বাজাতে শুরু করলেন।

ঢং!

ঢং!

ঢং!

নৌকার দিক থেকে একটা আলো নড়ল।

তারপর একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল,

—“আলো দেখা যাচ্ছে!”

মেঘা চিৎকার করে উঠল,

—“বাবা!”

নৌকাটা কিছুক্ষণ পরে ঘাটে এসে পৌঁছল।

মেঘার বাবা ভিজে একেবারে কাঁপছিলেন।

মেঘা ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

মাধব দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

জেলে বললেন,

—“মাধবদা, আজ আপনার আলো না থাকলে আমরা ঘাট খুঁজে পেতাম না।”

মাধব বললেন,

—“আলোটা আমার নয়।”

—“তাহলে কার?”

মাধব নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“যার পথ হারায়, তার।”

পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা বাতিঘরের কাছে জড়ো হল।

সবাই জানল, পুরোনো ব্যবস্থা আর নিরাপদ নয়।

গ্রামের পঞ্চায়েত থেকে নতুন সৌরবিদ্যুৎ চালিত আলো বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হল।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাতিঘরে নতুন সৌর আলো লাগল।

এখন আর বিদ্যুৎ চলে গেলেও আলো নিভে না।

মেঘা প্রতিদিন মাধবের কাছে এসে পড়াশোনা করত।

একদিন সে বলল,

—“কাকা, আমি বড় হয়ে এমন কিছু বানাতে চাই, যাতে গ্রামের আলো কখনও না নেভে।”

মাধব হেসে বললেন,

—“তাহলে তুই ইঞ্জিনিয়ার হ।”

—“পারব?”

—“যে মেয়ে ঝড়ের রাতে লণ্ঠন নিয়ে বাতিঘরে উঠতে পারে, সে অনেক কিছুই পারে।”

মেঘা হেসে ফেলল।

বছর কয়েক কেটে গেল।

মেঘা শহরে পড়তে গেল।

তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ল।

একদিন সে গ্রামে ফিরে এল।

বাতিঘরের পাশে দাঁড়িয়ে মাধব কাকাকে বলল,

—“কাকা, মনে আছে? এক রাতে আলো নিভে গিয়েছিল।”

মাধব হাসলেন।

—“মনে আছে।”

—“সেদিন আপনি একটা কথা বলেছিলেন।”

—“কী?”

—“ছোট আলোও অন্ধকার ভাঙতে পারে।”

মাধব কিছু বললেন না।

মেঘা বলল,

—“আমি বুঝেছি, আপনি শুধু বাতিঘরের কথা বলেননি।”

মাধব তার দিকে তাকালেন।

মেঘা বলল,

—“মানুষের জীবনেও আলো দরকার। আর কখনও কখনও সেই আলো অন্য কেউ জ্বালিয়ে দেয়।”

মাধবের চোখে জল চিকচিক করল।

তিনি ধীরে ধীরে বললেন,

—“এবার তুই আলো জ্বালাবি।”

সন্ধ্যা নেমে এল।

বাতিঘরের নতুন সৌর আলো জ্বলে উঠল।

নদীর কালো জলের ওপর সেই আলো অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল।

মাধব কাকা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলেন।

তার মনে হল, আলোটা শুধু নদীর পথ দেখাচ্ছে না।

একটা মেয়ের স্বপ্নের পথও আলোকিত করছে।

আর সেই মুহূর্তে তিনি বুঝলেন—

কোনও আলো ছোট নয়।

যদি তা অন্ধকারের মধ্যে জ্বলে ওঠে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *