Categories
গল্প বিবিধ

হারমোনিয়ামের শেষ সুর।।।

কাঁসাই নদীর ধারে ছোট্ট একটি গ্রাম—বেলডাঙা।

গ্রামটা খুব বড় নয়। কয়েকশো পরিবার, একটা প্রাথমিক স্কুল, একটা পুরোনো মন্দির, বাজারে কয়েকটি দোকান আর গ্রামের মাঝখানে বিশাল এক বটগাছ।

সেই বটগাছের নিচেই প্রতি বছর শীতকালে গান-বাজনার আসর বসত।

একসময় সেই আসরের প্রাণ ছিলেন অমরনাথ মাস্টার।

বয়স প্রায় সত্তর।

তিনি স্কুলে বাংলা পড়াতেন। অবসর নেওয়ার পরও গ্রামের ছেলেমেয়েদের গান শেখাতেন।

তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী ছিল একটি পুরোনো হারমোনিয়াম।

হারমোনিয়ামটির কাঠের গায়ে আঁচড়ের দাগ, কয়েকটি বোতাম ভাঙা, কোথাও পুরোনো কাপড় লাগানো।

কিন্তু অমরনাথ মাস্টার সেটাকে খুব যত্ন করে রাখতেন।

তিনি বলতেন,

—“যন্ত্র পুরোনো হতে পারে, সুর পুরোনো হয় না।”

গ্রামের অনেকেই এখন আর তার গান শোনে না।

মোবাইলে গান, টেলিভিশন, শহরের অনুষ্ঠান—সবকিছুর ভিড়ে গ্রামের পুরোনো গানের আসর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল।

অমরনাথ মাস্টারের মন খারাপ হত।

একদিন বিকেলে তিনি বটগাছের নিচে একা বসে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছিলেন।

সুরটা খুব ধীর।

ঠিক তখনই পাশ দিয়ে যাচ্ছিল বারো বছরের রুদ্র।

সে থেমে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ শুনে বলল,

—“মাস্টারমশাই, এই যন্ত্রটা এত পুরোনো কেন?”

অমরনাথ হেসে বললেন,

—“কারণ এটা আমার থেকেও পুরোনো।”

রুদ্র হারমোনিয়ামের কাছে এসে বসল।

—“এটা বাজাতে শেখাবেন?”

অমরনাথ একটু অবাক হলেন।

—“তুই শিখবি?”

—“হ্যাঁ।”

—“কেন?”

রুদ্র বলল,

—“জানি না। আপনার বাজানো শুনলে ভালো লাগে।”

সেদিন থেকেই শুরু হল শিক্ষা।

প্রথম দিন অমরনাথ শুধু বললেন,

—“হারমোনিয়াম বাজানোর আগে কান দিয়ে শুনতে শেখ।”

রুদ্র অবাক।

—“কী শুনব?”

—“সুরের ফাঁক।”

রুদ্র কিছুই বুঝল না।

কিন্তু সে প্রতিদিন আসতে লাগল।

প্রথমে আঙুল ঠিকমতো চলত না।

কখনও ভুল সুর বেরোত।

কখনও একসঙ্গে দুই-তিনটা কী চাপা পড়ত।

অমরনাথ কখনও রাগ করতেন না।

বলতেন,

—“ভুল সুরও শেখার অংশ।”

রুদ্রের বাবা দিনমজুর।

বাড়িতে গান-বাজনার জন্য টাকা খরচ করার মতো অবস্থা নেই।

একদিন রুদ্র বলল,

—“মাস্টারমশাই, আমার নিজের হারমোনিয়াম নেই।”

অমরনাথ বললেন,

—“তাতে কী?”

—“বাড়িতে কী করে অনুশীলন করব?”

অমরনাথ নিজের পুরোনো হারমোনিয়ামটা তার হাতে দিয়ে বললেন,

—“নিয়ে যা।”

রুদ্র হতভম্ব।

—“এটা?”

—“হ্যাঁ।”

—“আপনি?”

—“আমার আর কত বাজাতে হবে?”

রুদ্র বলল,

—“কিন্তু এটা তো আপনার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস।”

অমরনাথ মৃদু হেসে বললেন,

—“যে জিনিস ভালোবাসা যায়, তাকে আটকে রাখা যায় না।”

রুদ্র হারমোনিয়াম নিয়ে বাড়ি গেল।

সেই থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাদের বাড়ি থেকে সুর ভেসে আসতে লাগল।

প্রথমে কর্কশ।

তারপর ধীরে ধীরে পরিষ্কার।

একদিন গ্রামের চায়ের দোকানে কয়েকজন বলছিল,

—“রুদ্র নাকি গান শিখছে!”

আরেকজন হেসে বলল,

—“ওসব দিয়ে পেট চলবে?”

কথাটা রুদ্র শুনে ফেলেছিল।

সেদিন সে মন খারাপ করে মাস্টারমশাইয়ের কাছে গেল।

—“আমি আর শিখব না।”

অমরনাথ জিজ্ঞেস করলেন,

—“কেন?”

রুদ্র চুপ।

—“কে কী বলেছে?”

রুদ্র সব বলল।

অমরনাথ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হারমোনিয়ামের ঢাকনা বন্ধ করলেন।

—“রুদ্র, মানুষ যখন নিজের স্বপ্নকে ছোট করে দেখে, তখন অন্যের কথাই বড় হয়ে যায়।”

রুদ্র বলল,

—“কিন্তু গান দিয়ে কি সত্যিই কিছু করা যায়?”

—“সব গান দিয়ে নয়। কিন্তু মন দিয়ে করা কাজ কখনও পুরোপুরি নষ্ট হয় না।”

কয়েকদিন পর গ্রামের বার্ষিক উৎসবের ঘোষণা হল।

এবার বড় কোনও শিল্পী আসবেন না।

অমরনাথ মাস্টার বললেন,

—“এই বছর গ্রামের ছেলেমেয়েরাই অনুষ্ঠান করবে।”

অনেকে অবাক।

রুদ্রকে গান গাইতে বলা হল।

সে ভয় পেয়ে গেল।

—“আমি পারব না।”

অমরনাথ বললেন,

—“তুই পারবি।”

অনুষ্ঠানের দিন বটগাছের নিচে ভিড় জমল।

রুদ্র মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল।

তার হাতে পুরোনো হারমোনিয়াম।

অমরনাথ এসে বললেন,

—“ভয় করছে?”

রুদ্র মাথা নাড়ল।

—“অনেক।”

—“তাহলে ভালো।”

—“ভালো?”

—“ভয় মানে তুই বিষয়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছিস।”

রুদ্র মঞ্চে উঠল।

প্রথমে তার গলা কেঁপে গেল।

হারমোনিয়ামের প্রথম সুরটাও একটু ভুল হল।

কেউ কেউ ফিসফিস করল।

রুদ্র চোখ বন্ধ করল।

তার মনে পড়ল মাস্টারমশাইয়ের কথা—

“সুরের আগে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হয়।”

সে আবার শুরু করল।

এবার গলা স্থির।

হারমোনিয়ামের সুর পরিষ্কার।

পুরো মাঠ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

গান শেষ হওয়ার পর কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বলল না।

তারপর হাততালির শব্দ উঠল।

রুদ্র মঞ্চ থেকে নেমে সরাসরি অমরনাথের কাছে গেল।

—“মাস্টারমশাই!”

অমরনাথের চোখ ভিজে উঠেছিল।

তিনি বললেন,

—“আজ আমার হারমোনিয়াম ঠিক জায়গায় পৌঁছেছে।”

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

কয়েক মাস পর অমরনাথ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

তিনি আর নিয়মিত বটগাছের নিচে যেতে পারলেন না।

রুদ্র প্রতিদিন তার বাড়িতে যেত।

একদিন অমরনাথ হারমোনিয়ামটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“এটা এবার তুই রাখ।”

রুদ্র মাথা নাড়ল।

—“না। এটা আপনার।”

—“আমি তোকে দিয়েছি।”

—“তাহলে আমি একটা কথা বলব?”

—“বল।”

—“আমি এটা নিজের কাছে রাখব না।”

অমরনাথ অবাক।

—“তাহলে?”

রুদ্র বলল,

—“গ্রামে একটা গানের ঘর বানাব। এখানে সবাই শিখবে।”

অমরনাথ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে হাসলেন।

—“এই তো আমার আসল ছাত্র।”

পরের বছর গ্রামের পুরোনো পঞ্চায়েত ঘরের একটি অংশ পরিষ্কার করে তৈরি হল ছোট্ট একটি সংগীতকক্ষ।

দেওয়ালে লেখা হল—

“অমরনাথ সুরকক্ষ”

সেখানে গ্রামের শিশুদের গান শেখানো শুরু হল।

রুদ্র বড় হয়ে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করল।

শহরে অনুষ্ঠান করার সুযোগ পেলেও সে গ্রামকে ভুলল না।

প্রতি বছর শীতকালে সে ফিরে আসত।

বটগাছের নিচে আবার গান-বাজনার আসর বসত।

এক শীতের সন্ধ্যায় অমরনাথ মাস্টার হুইলচেয়ারে বসে সেই আসর দেখতে এলেন।

রুদ্র তখন তার পুরোনো হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করছিল।

গান শেষ হলে অমরনাথ ধীরে ধীরে হাততালি দিলেন।

রুদ্র ছুটে এসে তার পায়ের কাছে বসে বলল,

—“মাস্টারমশাই, আপনার হারমোনিয়াম এখনও বাজে।”

অমরনাথ হেসে বললেন,

—“হারমোনিয়ামটা বাজে না রে। তোর ভেতরের সুরটা বাজে।”

রুদ্র মাথা নিচু করল।

বটগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তখন চাঁদের আলো পড়ছে।

দূরে গ্রামের বাড়িগুলোতে একে একে আলো জ্বলছে।

আর পুরোনো হারমোনিয়ামের সুর ভেসে যাচ্ছে রাতের বাতাসে।

সেই সুরে ছিল একজন শিক্ষকের ভালোবাসা।

একজন ছাত্রের স্বপ্ন।

আর একটি গ্রামের হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতির নতুন করে ফিরে আসার গল্প।

অমরনাথ চোখ বন্ধ করে শুনছিলেন।

তার মুখে তৃপ্তির হাসি।

তিনি জানতেন—

একজন শিক্ষক কখনও শুধু একজন ছাত্রকে শেখান না।

তিনি একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করেন।

আর সেই ভবিষ্যৎ যখন নিজের সুর খুঁজে পায়, তখন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার মেলে।

পুরোনো হারমোনিয়ামটি হয়তো একদিন আরও পুরোনো হবে।

কাঠে আরও দাগ পড়বে।

কিছু কী হয়তো আবার নষ্ট হবে।

কিন্তু তার সুর—

সেটা বেঁচে থাকবে।

এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *