শহরের এক পুরনো পাড়ায় থাকত তেরো বছরের মেয়ে তৃষা। পড়াশোনায় মোটামুটি, কিন্তু ছবি আঁকতে সে অসম্ভব ভালোবাসত।
তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল একটি ছোট্ট কাঠের রঙের বাক্স। বাক্সটির ঢাকনায় তার বাবা নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন—
“রঙ শেষ হয়ে গেলেও আঁকা থামিও না।”
বাবা ছিলেন বাড়ি রং করার মিস্ত্রি। সংসারে অভাব থাকলেও মেয়ের আঁকার খাতার জন্য কখনও টাকা দিতে কৃপণতা করতেন না।
এক বর্ষার দুপুরে তৃষা স্কুল থেকে ফিরে দেখল, তার রঙের বাক্সটি নেই।
সে পুরো ঘর খুঁজল।
আলমারি, খাটের নিচে, বইয়ের তাক—কোথাও নেই।
মা বললেন,
—“হয়তো স্কুলে রেখে এসেছিস।”
তৃষা পরদিন স্কুলে গিয়েও পেল না।
কয়েকদিন কেটে গেল।
তৃষা আর ছবি আঁকল না।
একদিন স্কুলের আঁকার শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন,
—“তুই ছবি আঁকছিস না কেন?”
তৃষা বলল,
—“আমার রং নেই।”
শিক্ষক বললেন,
—“রং নেই, নাকি মনটা নেই?”
তৃষা কোনও উত্তর দিল না।
সেদিন স্কুল ছুটির পর সে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার পাশে বসে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখতে পেল। বৃদ্ধের সামনে কয়েকটি পুরনো বোতল, কাঠের টুকরো আর ভাঙা জিনিসপত্র।
তৃষা কৌতূহলী হয়ে দাঁড়াল।
বৃদ্ধ বললেন,
—“কী দেখছিস?”
—“আপনি এগুলো দিয়ে কী করেন?”
—“যা ফেলে দেয় মানুষ, সেগুলো দিয়ে নতুন জিনিস বানাই।”
তৃষা অবাক হল।
বৃদ্ধ একটি পুরনো কাঠের টুকরো তুলে বললেন,
—“সবাই ভাবে এটা আবর্জনা। আমি ভাবি, এর এখনও কাজ বাকি।”
কথাটা তৃষার মনে গেঁথে গেল।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে পুরনো খবরের কাগজ, কয়লা, হলুদ মাটি, ফুলের পাপড়ি আর রান্নাঘরের কিছু প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে নিজেই রং তৈরি করার চেষ্টা করল।
প্রথম ছবি খুব একটা ভালো হল না।
দ্বিতীয়টাও নয়।
তবু সে থামল না।
কয়েক সপ্তাহ পর তার আঁকা ছবিগুলো স্কুলের প্রদর্শনীতে রাখা হল।
ছবির নাম—
“রঙ ছাড়াও রঙ”।
ছবিটিতে ছিল একটি মেয়ে, যার হাতে কোনও রঙের বাক্স নেই। কিন্তু চারপাশে পৃথিবীর সব রঙ ছড়িয়ে আছে।
প্রদর্শনীতে ছবিটি দেখে এক ব্যক্তি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
তিনি তৃষার বাবা।
তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—“তোর সেই রঙের বাক্সটা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
তৃষা অবাক হয়ে তাকাল।
বাবা বললেন,
—“কাজে যাওয়ার সময় ভুল করে ব্যাগে চলে গিয়েছিল। পরে কোথায় রেখেছি মনে ছিল না। আজ বাড়ির পুরনো বাক্স খুলতে গিয়ে পেলাম।”
তৃষার চোখ বড় হয়ে গেল।
বাবা বাক্সটা তার হাতে তুলে দিলেন।
বাক্সটা আগের মতোই আছে।
শুধু ভেতরের রংগুলো শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে।
তৃষা ঢাকনাটা খুলে বাবার লেখা কথাটা পড়ল—
“রঙ শেষ হয়ে গেলেও আঁকা থামিও না।”
সে বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল।
—“বাবা, আমি থামিনি।”
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—“জানি।”
কয়েক বছর পরে তৃষা একজন চিত্রশিল্পী হল।
তার প্রথম প্রদর্শনীর নাম ছিল—
“যা হারিয়ে গিয়েছিল”।
প্রদর্শনীর একেবারে মাঝখানে রাখা ছিল সেই পুরনো কাঠের রঙের বাক্স।
তার পাশে ছোট্ট একটি লেখা—
“কখনও কখনও আমরা যা হারাই, তা আমাদের নতুন কিছু খুঁজে পেতে শেখায়।”