শহরের পুরনো পাড়ায় একটা ছোট্ট কারিগরের দোকান ছিল। সেখানে পাথর, কাঠ আর ধাতু দিয়ে নানা ধরনের মূর্তি তৈরি করতেন রঘুনাথ।
বয়স হয়েছে, হাতের জোর কমেছে। তবু কাজের প্রতি তাঁর ভালোবাসা একটুও কমেনি।
একদিন এক ব্যবসায়ী তাঁর কাছে একটি দামি পাথরের মূর্তি বানানোর অর্ডার দিলেন।
রঘুনাথ কয়েক মাস ধরে কাজ করলেন।
মূর্তিটা প্রায় শেষ।
কিন্তু এক সকালে শেষবারের মতো পাথরে আঘাত করতেই—
ঠক!
মূর্তির মুখের একপাশ ভেঙে গেল।
রঘুনাথ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন।
ব্যবসায়ী এসে দেখে রেগে গেলেন।
—“এটা কী করেছেন? এত টাকা খরচ করলাম!”
রঘুনাথ মাথা নিচু করে বললেন,
—“আমি ঠিক করে দেব।”
—“আর হবে না। অর্ডার বাতিল।”
ব্যবসায়ী চলে গেলেন।
মূর্তিটা দোকানের এক কোণে পড়ে রইল।
কয়েকদিন পর সেখানে এল রঘুনাথের নাতি শুভ।
সে মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“ঠাকুরদা, এটা ফেলে রেখেছ কেন?”
—“ভেঙে গেছে।”
শুভ মূর্তির মুখের ভাঙা অংশটা ছুঁয়ে বলল,
—“তাহলে?”
—“তাহলে আর কিছু করার নেই।”
শুভ বলল,
—“আপনি তো আমাকে বলেছিলেন, ভাঙা জিনিস ফেলে দিতে নেই।”
রঘুনাথ হেসে বললেন,
—“সব ভাঙা জিনিস ঠিক করা যায় না।”
শুভ কিছু বলল না।
পরদিন সে আবার এল।
হাতে কয়েকটি ছোট পাথরের টুকরো।
—“আমি একটা চেষ্টা করেছি।”
রঘুনাথ অবাক হয়ে দেখলেন, শুভ ভাঙা অংশের পাশে ছোট ছোট পাথর বসিয়ে একটি নকশা তৈরি করেছে।
মূর্তির মুখের দাগটা আর লুকোনো হয়নি।
বরং সেটাই হয়ে উঠেছে মূর্তিটির বিশেষ সৌন্দর্য।
রঘুনাথ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—“তুই আমাকে আজ একটা নতুন জিনিস শিখলি।”
মূর্তিটা তিনি নতুন করে সাজালেন।
ভাঙা অংশের চারপাশে সূক্ষ্ম নকশা করলেন। ফাটলগুলো ঢাকলেন না।
কয়েক মাস পর শহরে একটি শিল্প প্রদর্শনী হল।
রঘুনাথ সেখানে মূর্তিটা নিয়ে গেলেন।
নাম দিলেন—
“অসম্পূর্ণতায় সৌন্দর্য”।
মূর্তিটির সামনে মানুষের ভিড় জমে গেল।
একজন শিল্পসমালোচক বললেন,
—“এই মূর্তির ভাঙা দাগগুলোই এর সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ।”
রঘুনাথ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
শুভ পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—“ঠাকুরদা, দেখলে? ভেঙে গেলেও সুন্দর হওয়া যায়।”
রঘুনাথ তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
—“শুধু মূর্তি নয় রে। মানুষও।”
বহু বছর পর রঘুনাথ আর কাজ করতে পারলেন না।
তাঁর দোকানটি শুভই চালাতে শুরু করল।
দোকানের দরজার ওপরে সে একটি বাক্য লিখে রাখল—
“ভাঙা জিনিস মেরামত করার আগে, তার ভাঙার গল্পটা শুনুন।”
কারণ শুভ জানত—
কিছু দাগ মুছে ফেলতে হয় না। কিছু দাগই প্রমাণ করে, ভেঙে যাওয়ার পরও কেউ আবার নিজেকে গড়ে তুলেছিল।