Categories
গল্প বিবিধ

শেষ বাঁশির ওপারে।

১. যে মেয়েটি মাঠ ছাড়তে চায়নি

পূর্ব মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম—নাম কৃষ্ণপুর। গ্রামের মানুষজন বেশিরভাগই কৃষিকাজ, ছোট ব্যবসা কিংবা দিনমজুরির সঙ্গে যুক্ত। গ্রামটিতে একটি উচ্চবিদ্যালয় ছিল, আর বিদ্যালয়ের পাশে ছিল ছোট্ট একটি খেলার মাঠ। মাঠটি খুব সুন্দর ছিল না। কোথাও শক্ত মাটি, কোথাও ঘাসের অভাব, কোথাও আবার বৃষ্টির পরে জমে থাকত জল। তবু বিকেল হলেই ছেলেরা সেখানে ফুটবল খেলতে আসত।

মেয়েরা অবশ্য মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে খেলা দেখত। গ্রামের অনেকের ধারণা ছিল, ফুটবল ছেলেদের খেলা। মেয়েরা খেলাধুলা করলে পড়াশোনায় মন বসবে না, এমন কথাও শোনা যেত।

এই গ্রামেই থাকত ষোলো বছরের মেয়ে রূপা। ছোটবেলা থেকেই তার ফুটবলের প্রতি অদ্ভুত টান ছিল। বাবা বাজারে একটি সাইকেল মেরামতির দোকান চালাতেন, মা বাড়িতে সেলাই করতেন। সংসারে অভাব থাকলেও রূপার বাবা-মা মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি।

রূপা প্রথম ফুটবল খেলতে শিখেছিল তার দাদা অমিতের কাছ থেকে। অমিত তখন স্কুলের দলে খেলত। সে বাড়ি ফিরে পুরোনো একটি বল দিয়ে বোনকে পাস দেওয়া, বল থামানো আর গোলপোস্টে শট নেওয়া শেখাত।

একদিন রূপা দাদাকে বলেছিল,
—দাদা, আমি বড় হয়ে ভালো ফুটবলার হতে চাই।

অমিত হেসে বলেছিল,
—তাহলে শুধু বল নিয়ে খেললে হবে না। নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। পড়াশোনাও ঠিক রাখতে হবে।

রূপা মাথা নেড়ে বলেছিল,
—আমি দুটোই করব।

কিন্তু তার স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল অন্যদের ধারণা। গ্রামের অনেকেই বলত, মেয়েদের এত দৌড়ঝাঁপ মানায় না। কেউ কেউ আবার তার পোশাক নিয়ে মন্তব্য করত।

রূপা প্রথমে কষ্ট পেত। পরে সে ঠিক করল, তর্ক করে নয়, নিজের কাজ দিয়েই উত্তর দেবে।

২. মাঠের নতুন মানুষ

এক বছর পরে কৃষ্ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ে নতুন ক্রীড়াশিক্ষক এলেন। তাঁর নাম সমীর মজুমদার। তিনি নিজে একসময় জেলা স্তরে ফুটবল খেলেছেন, কিন্তু চোটের কারণে প্রতিযোগিতামূলক খেলা ছেড়ে দিতে হয়েছিল।

প্রথম দিন মাঠে এসে তিনি দেখলেন, কয়েকজন ছেলে ফুটবল খেলছে আর মাঠের এক কোণে রূপা একা একা বল নিয়ে অনুশীলন করছে।

সমীরবাবু কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন,
—তুমি একা খেলছ কেন?

রূপা একটু ইতস্তত করে বলল,
—স্যার, ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গেলে ওরা ঠিকমতো পাস দেয় না। বলে, আমি নাকি বল সামলাতে পারব না।

—তুমি কি সত্যিই বল সামলাতে পারো না, নাকি ওরা তোমাকে সুযোগ দেয় না?

রূপা চুপ করে রইল।

সমীরবাবু বললেন,
—আগামীকাল বিকেলে স্কুল ছুটির পরে এসো। তোমার খেলা দেখব।

পরদিন রূপা সময়মতো মাঠে এল। সমীরবাবু তাকে বল নিয়ন্ত্রণ, ছোট পাস, দিক পরিবর্তন এবং শট নেওয়ার কয়েকটি অনুশীলন করালেন। প্রথম দিকে রূপা ভুল করছিল, কিন্তু দ্রুত শিখছিল।

কিছুক্ষণ পরে শিক্ষক বললেন,
—তোমার পায়ে গতি আছে। কিন্তু ভালো খেলোয়াড় হতে হলে শুধু গতি যথেষ্ট নয়। মাঠ দেখতে শিখতে হবে, সতীর্থের অবস্থান বুঝতে হবে, আর ভুল হলে পরের মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিতে হবে।

রূপা সেদিন বাড়ি ফিরল নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে।

এরপর থেকে প্রতিদিন স্কুলের পরে সে অনুশীলন করতে লাগল। কখনও বৃষ্টি, কখনও প্রচণ্ড গরম, কখনও পরীক্ষার চাপ—সব কিছুর মধ্যে সময় বের করে নিত।

৩. প্রথম অপমান

কয়েক মাস পরে স্কুলে আন্তঃশ্রেণি ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন হলো। রূপা নিজের শ্রেণির দলে নাম লেখাতে চাইল।

দলের অধিনায়ক সুমন প্রথমে রাজি হলো না।

—রূপা, ফুটবল খেলাটা খুব কঠিন। মাঠে ধাক্কাধাক্কি হয়। তুই আহত হয়ে যাবি।

রূপা শান্তভাবে বলল,
—আঘাতের ভয় থাকলে তো কেউ খেলতেই পারবে না। আমি অনুশীলন করেছি। আমাকে একটা সুযোগ দাও।

সুমন বলল,
—দেখ, আমি তোর সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। কিন্তু দলকে জেতাতে হবে।

কথাটা শুনে রূপার মন খারাপ হলো। সে সমীরবাবুর কাছে গেল। শিক্ষক সব শুনে বললেন,
—দলে সুযোগ পাওয়ার অধিকার তোমার আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের জন্য একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকা দরকার। তুমি অনুশীলন চালিয়ে যাও। আমি বলব, সবাইকে সমান সুযোগ দিয়ে দক্ষতা যাচাই করা হোক।

পরের দিন মাঠে পরীক্ষামূলক অনুশীলন হলো। প্রত্যেক খেলোয়াড়কে বল নিয়ন্ত্রণ, পাস দেওয়া, শট নেওয়া এবং দলগত খেলার কয়েকটি পরীক্ষা দিতে হলো।

রূপা সব পরীক্ষায় ভালো করল। তাকে দলে নেওয়া হলো।

কিন্তু দলের কয়েকজন তখনও তাকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। অনুশীলনের সময় তারা ইচ্ছে করে তাকে পাস দিত না। রূপা একদিন রাগ করে মাঠ ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিল।

সমীরবাবু তাকে ডেকে বললেন,
—তুমি অন্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কিন্তু নিজের অনুশীলন, নিজের ব্যবহার আর নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। অন্যায় হলে প্রতিবাদ করবে, তবে নিজের লক্ষ্য ভুলে যেও না।

রূপা আবার মাঠে ফিরে গেল।

৪. গোলপোস্টের সামনে

প্রতিযোগিতা শুরু হলো। রূপা সাধারণত মাঝমাঠে খেলতে চাইত, কিন্তু দলের গোলরক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে গোলপোস্টের সামনে দাঁড়াতে হলো।

রূপা আগে কখনও প্রতিযোগিতায় গোলরক্ষকের দায়িত্ব পালন করেনি। সে ভয় পেয়ে বলল,
—স্যার, আমি যদি গোল আটকে দিতে না পারি?

সমীরবাবু বললেন,
—গোলরক্ষক হওয়া মানে সব বল আটকে দেওয়া নয়। মনোযোগ ধরে রাখা, সঠিক অবস্থানে থাকা এবং সতীর্থদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও জরুরি। ভুল হলে আবার দাঁড়াতে হয়।

প্রথম ম্যাচে প্রতিপক্ষের দল খুব শক্তিশালী ছিল। রূপা দুটি গোল আটকাতে পারল, কিন্তু একটি বল তার হাত ফসকে জালে ঢুকে গেল। দল হেরে গেল।

খেলা শেষে সুমন রেগে বলল,
—তুই যদি ওই গোলটা আটকাতে পারতিস, আমরা জিততাম!

রূপার চোখে জল চলে এল। সে জানত, ভুল হয়েছে। কিন্তু পুরো হারের দায় তার একার নয়।

সমীরবাবু সবাইকে এক জায়গায় ডেকে বললেন,
—একটা দল হারলে শুধু একজনকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরা কোথায় ভুল করেছি, সেটা বুঝতে হবে। রূপার ভুল হয়েছে, আমাদেরও হয়েছে। পরের ম্যাচে সেই ভুল শুধরে খেলতে হবে।

তিনি রূপাকে আলাদা করে গোলরক্ষকের অনুশীলন করালেন। বলের দিকে ঝাঁপ দেওয়া, হাতের অবস্থান, পায়ে বল আটকানো এবং প্রতিপক্ষের শটের দিক অনুমান করার অনুশীলন চলতে লাগল।

রূপা প্রতিদিন আরও কিছুক্ষণ সময় দিত। তার হাতের তালুতে ব্যথা হতো, হাঁটুতে কাদা লাগত, কখনও শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ত। তবু সে শিখতে থাকল।

৫. দলের ভিতরের বদল

দ্বিতীয় ম্যাচের আগে দলের মধ্যে আলোচনা হলো। সমীরবাবু প্রত্যেককে নিজের শক্তি ও দুর্বলতার কথা বলতে বললেন।

সুমন স্বীকার করল, সে কখনও কখনও একা গোল করার চেষ্টা করে এবং সতীর্থদের পাস দেওয়ার সুযোগ মিস করে।

রূপা বলল,
—গোলরক্ষক হিসেবে আমি সব সময় সামনে কী হচ্ছে দেখতে পাই। মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা একটু আগে পাস দিলে আক্রমণটা ভালো হতে পারে।

প্রথমে কয়েকজন অবাক হলেও পরে তারা তার কথা শুনল।

দ্বিতীয় ম্যাচে রূপা দুটি কঠিন শট আটকায়। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সে বারবার সতীর্থদের সতর্ক করছিল—কোন দিকে প্রতিপক্ষ এগোচ্ছে, কোথায় ফাঁকা জায়গা রয়েছে।

খেলার শেষদিকে সুমন বল পেয়ে একা এগিয়ে যাওয়ার বদলে পাশের খেলোয়াড়কে পাস দিল। সেই খেলোয়াড় বলটি গোলের সামনে থাকা আরেকজনকে বাড়িয়ে দিল, আর দল গোল করল।

কৃষ্ণপুর জিতল।

খেলা শেষে সুমন রূপার কাছে এসে বলল,
—আজ তুই না বললে আমরা হয়তো আবার একই ভুল করতাম। আগে ভাবতাম, গোল আটকানোই গোলরক্ষকের কাজ। এখন বুঝছি, পুরো দলকে সাহায্য করাও তার কাজ।

রূপা হেসে বলল,
—আমিও শিখছি। এখনও অনেক কিছু শেখা বাকি।

সেদিন প্রথমবার দলের সবাই তাকে সত্যিকারের সতীর্থ হিসেবে গ্রহণ করল।

৬. শেষ ম্যাচের আগের রাত

প্রতিযোগিতার ফাইনালে উঠল কৃষ্ণপুর উচ্চবিদ্যালয়। তাদের প্রতিপক্ষ ছিল পাশের এলাকার শক্তিশালী একটি স্কুল। সেই দলের খেলোয়াড়েরা নিয়মিত অনুশীলন করত, তাদের ভালো কোচও ছিল।

ফাইনালের আগের রাতে রূপার ঘুম হচ্ছিল না। সে বারবার ভাবছিল, যদি শেষ মুহূর্তে ভুল করে বসে? যদি তার জন্য দল হেরে যায়?

মা এসে দেখলেন, মেয়ে বিছানায় বসে আছে।

—ঘুমাসনি কেন?

রূপা বলল,
—মা, আমি খুব ভয় পাচ্ছি।

মা পাশে বসে বললেন,
—ভয় পাওয়া মানে তুমি কাজটাকে গুরুত্ব দিচ্ছ। কিন্তু ভয়কে যদি নিজের ওপর চেপে বসতে দাও, তাহলে সেটাই বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তুই যতটা অনুশীলন করেছিস, ততটাই মাঠে কাজে লাগানোর চেষ্টা কর। ফল সব সময় নিজের হাতে থাকে না।

রূপা মায়ের হাত ধরে শুয়ে পড়ল।

পরদিন স্কুলে যাওয়ার আগে বাবা তার পুরোনো ফুটবলটি হাতে দিলেন। বলটির গায়ে কয়েকটি দাগ ছিল, সেলাইও এক জায়গায় খুলে গিয়েছিল।

বাবা বললেন,
—দাদার সঙ্গে এই বল দিয়েই তো তোর খেলা শুরু। বলটা নতুন নয়, কিন্তু তোর স্বপ্নের শুরুটা এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

রূপা বলটি বুকে চেপে ধরল।

৭. শেষ বাঁশির আগে

ফাইনালের দিন মাঠে প্রচুর দর্শক এসেছিল। গ্রামের মানুষ, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবক—সবাই নিজেদের দলের জন্য উৎসাহ দিচ্ছিলেন।

খেলা শুরু হতেই প্রতিপক্ষ আক্রমণ চালাতে লাগল। প্রথম দশ মিনিটেই রূপাকে তিনটি শট আটকাতে হলো। একটি বল তার কাঁধে লেগে বাইরে চলে গেল। সে ব্যথা পেলেও উঠে দাঁড়াল।

প্রথমার্ধের শেষদিকে কৃষ্ণপুর একটি গোল খেল। রূপা বল আটকানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শটটি এত জোরে এসেছিল যে তার হাত ছুঁয়ে বল জালে ঢুকে যায়।

সে কিছুক্ষণ গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলটি তুলে মাঝমাঠে ছুড়ে দিল।

দ্বিতীয়ার্ধে কৃষ্ণপুরের খেলোয়াড়েরা আরও মন দিয়ে খেলতে শুরু করল। সুমন একটি গোল করে সমতা ফিরিয়ে আনল। দর্শকদের চিৎকারে মাঠ মুখর হয়ে উঠল।

খেলার সময় প্রায় শেষ। স্কোর এক-এক। প্রতিপক্ষ শেষবারের মতো আক্রমণ করল। তাদের এক খেলোয়াড় বল নিয়ে গোলের দিকে এগিয়ে এল। কৃষ্ণপুরের রক্ষণভাগের একজন পিছলে পড়ে গেল, আর আক্রমণকারী খেলোয়াড়টি গোলপোস্টের সামনে এসে শক্তিশালী শট নিল।

রূপা এক মুহূর্তের জন্য বলের দিক বুঝতে পারল না। তবু প্রশিক্ষণের কথা মনে করে শরীরটাকে সঠিক দিকে ছুড়ে দিল।

বলটি তার দুই হাতের মাঝখানে এসে আটকে গেল।

মাঠে যেন এক মুহূর্তের জন্য সব শব্দ থেমে গেল। তারপর কৃষ্ণপুরের সমর্থকেরা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন।

রূপা বলটি মাটিতে রেখে সতীর্থদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল,
—এখনও সময় আছে! খেলো!

শেষ কয়েক মিনিটে কৃষ্ণপুর আর গোল করতে পারল না। নির্ধারিত সময় শেষে স্কোর সমান থাকায় টাইব্রেকারের সিদ্ধান্ত হলো।

রূপার বুক ধুকপুক করছিল। গোলরক্ষক হিসেবে তাকে এবার প্রতিপক্ষের পেনাল্টি শট আটকানোর চেষ্টা করতে হবে।

প্রথম শটটি গোল হলো। দ্বিতীয়টিও। তৃতীয় শটে রূপা সঠিক দিকে ঝাঁপ দিলেও বল তার আঙুল ছুঁয়ে জালে ঢুকে গেল।

চতুর্থ শটে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় বলটি গোলপোস্টের বাইরে মেরে দিল।

এবার কৃষ্ণপুরের সুযোগ। সুমন গোল করল। তারপর আরেক সতীর্থ গোল করল।

শেষ শট নিতে এগিয়ে এল প্রতিপক্ষের অধিনায়ক। রূপা তার চোখের দিকে তাকাল, তারপর বলের দিকে মন দিল। শট নেওয়ার মুহূর্তে সে ডানদিকে ঝাঁপ দিল।

বলটি তার হাতের তালুতে লেগে বাইরে চলে গেল।

কৃষ্ণপুর জিতে গেল!

শেষ বাঁশি বাজতেই সতীর্থরা দৌড়ে এসে রূপাকে জড়িয়ে ধরল। কেউ তার কাঁধে হাত রাখল, কেউ আনন্দে লাফাতে লাগল। রূপার চোখে জল এসে গিয়েছিল। কিন্তু সে জানত, এই জয় শুধু তার একার নয়। দলের প্রত্যেকের পরিশ্রম এতে জড়িয়ে আছে।

৮. আসল জয়

পুরস্কার বিতরণের সময় রূপাকে সেরা গোলরক্ষকের সম্মান দেওয়া হলো। প্রধান শিক্ষক তাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
—আজকের জয়ের সবচেয়ে বড় কারণ কী বলে মনে হয়?

রূপা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল,
—আমি কয়েকটা গোল আটকেছি, কিন্তু একা আমি দলকে জেতাতে পারতাম না। আমার সতীর্থরা ভুলের পরে আমাকে সুযোগ দিয়েছে, কোচ আমাকে শিখিয়েছেন, আর পরিবার আমাকে সাহস দিয়েছে। আমরা একসঙ্গে খেলেছি বলেই জিতেছি।

দর্শকদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন অভিভাবক হাততালি দিলেন। তাঁদের মধ্যে রূপার মা-বাবাও ছিলেন।

পরদিন গ্রামের চায়ের দোকানে রূপার খেলা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। যাঁরা একসময় বলেছিলেন, ফুটবল মেয়েদের খেলা নয়, তাঁদেরও কেউ কেউ স্বীকার করলেন যে তাঁরা ভুল ভেবেছিলেন।

কিন্তু রূপা শুধু নিজের সাফল্যে সন্তুষ্ট হয়ে থাকল না। সে স্কুলের শিক্ষকদের কাছে প্রস্তাব দিল, মেয়েদের জন্য নিয়মিত ফুটবল অনুশীলনের ব্যবস্থা করা হোক। যারা খেলতে চায়, তাদের যেন সুযোগ দেওয়া হয়।

সমীরবাবু তার প্রস্তাবকে সমর্থন করলেন। ধীরে ধীরে আরও কয়েকজন মেয়ে অনুশীলনে যোগ দিল। রূপা তাদের বলত,
—প্রথম দিনেই ভালো খেলতে হবে না। ভুল হবে, পড়ে যাবে, আবার উঠে দাঁড়াবে। কিন্তু নিজের ইচ্ছেটাকে অন্যের কথায় ছোট করে দেখবে না।

কয়েক মাস পরে রূপা জেলা স্তরের নির্বাচনী শিবিরে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেল। সেখানে অনেক ভালো খেলোয়াড় ছিল। সে নির্বাচিত হবে কি না, তা নিশ্চিত ছিল না। কিন্তু এবার সে জানত, একটি ম্যাচের ফল তার পুরো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।

সে নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে গেল, পড়াশোনার সময়ও ঠিক রাখল এবং নিজের শরীরের যত্ন নিতে শিখল।

একদিন সন্ধ্যায় খেলা শেষ করে মাঠ ছাড়ার সময় সে শুনতে পেল, দূরে কোথাও আরেকটি ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজছে।

রূপা থেমে গেল। তার মনে পড়ল প্রথম দিনের কথা—যেদিন তাকে দলে নিতে কেউ রাজি হয়নি, যেদিন গোল খেয়ে সে নিজেকে ব্যর্থ মনে করেছিল, যেদিন ভয়ে ঘুম আসেনি।

আজ সে বুঝতে পারল, জীবনে প্রতিটি বাঁশিই শেষ নয়। কোনো বাঁশি একটি ম্যাচ শেষ করে, কোনো বাঁশি নতুন প্রতিযোগিতার শুরু ঘোষণা করে।

আর কখনও কখনও শেষ বাঁশির ওপারেই অপেক্ষা করে থাকে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

স্বপ্ন পূরণ মানে কখনও না হারানো নয়; বরং হার, অপমান ও ভয়ের পরেও আবার মাঠে ফিরে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করা।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *