Categories
গল্প

যে মেয়েটি শব্দ দিয়ে ছবি আঁকত।

১. চোখে না দেখা পৃথিবী।

পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট শহরের পাশে ছিল শিউলিপুর গ্রাম। গ্রামের এক প্রান্তে টালির ছাউনি দেওয়া একটি বাড়িতে থাকত তেরো বছরের মেয়ে তিথি। তার পৃথিবীটা অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা ছিল। ছোটবেলা থেকেই সে চোখে খুব কম দেখতে পেত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টিশক্তি আরও কমে গিয়েছিল। এখন সে আলো-অন্ধকারের সামান্য পার্থক্য ছাড়া প্রায় কিছুই দেখতে পেত না।

কিন্তু তিথির কল্পনার জগৎ ছিল আশ্চর্য রঙিন।

সে যখন কারও কথা শুনত, তখন শুধু কথার অর্থ বুঝত না; তার মনের মধ্যে তৈরি হয়ে যেত নানা দৃশ্য। বৃষ্টির শব্দ শুনলে সে কল্পনা করত, টিনের চালের ওপর অসংখ্য ছোট্ট আঙুল টুপটাপ করে বাজনা বাজাচ্ছে। শীতের সকালে পাখির ডাক শুনলে মনে হতো, অদৃশ্য কোনো গায়ক দূরের মাঠ থেকে গান গেয়ে যাচ্ছে।

তিথির বাবা বিমলবাবু স্থানীয় একটি দোকানে কাজ করতেন। মা মঞ্জু দেবী বাড়িতে সেলাই করতেন। সংসারে খুব বেশি সচ্ছলতা ছিল না। তবু তাঁরা মেয়ের পড়াশোনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন।

তিথি সাধারণ স্কুলে পড়ত। শিক্ষকেরা তাকে ভালোবাসতেন, কিন্তু পাঠ্যবই পড়তে অসুবিধা হওয়ায় অনেক সময় তাকে অন্যদের সাহায্য নিতে হতো। পরীক্ষার প্রশ্ন পড়ে শোনানোর জন্যও আলাদা ব্যবস্থা দরকার হতো।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে তিথি মাকে বলল,
—মা, আমি যদি চোখে দেখতে না-ও পাই, তবু কি নিজের মতো করে পৃথিবীটাকে বুঝতে পারব?

মঞ্জু দেবী মেয়ের হাত ধরে বললেন,
—অবশ্যই পারবি। পৃথিবীকে জানার অনেক পথ আছে। চোখ তার মধ্যে একটা পথ মাত্র।

মায়ের কথাটা তিথির মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।

২. শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ছবি

তিথির সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল বাংলা সাহিত্য। গল্প শুনতে তার ভীষণ ভালো লাগত। তার ঠাকুরদা একসময় তাকে রূপকথা, লোককথা আর গ্রামের পুরোনো দিনের নানা গল্প শোনাতেন।

ঠাকুরদা মারা যাওয়ার পর সেই গল্প শোনার মানুষটি আর রইলেন না। তিথি তখন নিজের মনে গল্প তৈরি করতে শুরু করল।

একদিন প্রবল বৃষ্টির সময় সে জানালার পাশে বসেছিল। বাইরে ঝড়ের শব্দ, গাছের পাতার মর্মর, দূরে ব্যাঙের ডাক—সব মিলিয়ে তার মনে একটি গল্প জন্ম নিল।

সে মাকে বলল,
—মা, একটা খাতা দেবে? আমি একটা গল্প লিখব।

মা অবাক হলেন।
—তুই তো খাতায় লিখতে অসুবিধা বোধ করিস!

তিথি উত্তর দিল,
—আমি মুখে বলব। তুমি লিখে দেবে?

মা সেদিন সেলাইয়ের কাজ সরিয়ে রেখে মেয়ের পাশে বসলেন। তিথি বলতে শুরু করল এক ছোট্ট মেঘের গল্প, যে পৃথিবীর সব শুকনো মাঠে জল পৌঁছে দিতে চায়।

মা লিখতে লিখতে কখনও হাসলেন, কখনও অবাক হলেন। গল্প শেষ হলে তিথি জিজ্ঞাসা করল,
—কেমন হয়েছে?

মঞ্জু দেবী মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বললেন,
—তুই তো শব্দ দিয়ে ছবি আঁকতে পারিস রে!

সেদিনই প্রথম তিথি বুঝল, তার মনের মধ্যে যে দৃশ্যগুলো তৈরি হয়, সেগুলো অন্য মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

৩. নতুন শিক্ষকের আগমন

কয়েক মাস পরে তাদের স্কুলে নতুন বাংলা শিক্ষিকা এলেন। তাঁর নাম অনন্যা সেন। প্রথম দিনেই তিনি ছাত্রছাত্রীদের বললেন, প্রত্যেকে নিজের পছন্দের কোনো বিষয় নিয়ে ছোট্ট একটি লেখা তৈরি করবে।

তিথি বাড়িতে মাকে দিয়ে নিজের গল্পটি লিখিয়ে পরদিন স্কুলে নিয়ে এল। অনন্যা দেবী গল্পটি পড়ে মুগ্ধ হলেন।

তিনি তিথিকে জিজ্ঞাসা করলেন,
—এই গল্পটা কি তুমি নিজে তৈরি করেছ?

তিথি মাথা নাড়ল।

—তুমি কি আরও গল্প লেখো?

—মনে মনে অনেক গল্প বানাই, ম্যাডাম। কিন্তু সব লিখতে পারি না।

অনন্যা দেবী কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—লেখার জন্য সব সময় হাতে কলম ধরতেই হবে, এমন নয়। তুমি মোবাইলে নিজের গল্প রেকর্ড করতে পারো। পরে সেই কথাগুলো লিখে নেওয়া যাবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে তোমার কাজটা সহজ করা সম্ভব।

তিথি আগে কখনও এইভাবে ভাবেনি। সে বাড়ি ফিরে বাবার পুরোনো মোবাইল ফোনটি হাতে নিল। মা তাকে রেকর্ড করার ব্যবস্থা বুঝিয়ে দিলেন।

প্রথমবার রেকর্ড করতে গিয়ে তিথি বারবার থেমে গেল। কখনও নিজের কণ্ঠস্বর শুনে লজ্জা পেল, কখনও ভুল হয়ে গেল। কিন্তু সে হাল ছাড়ল না।

প্রতিদিন রাতে কিছু সময় ধরে সে গল্প বলার অনুশীলন করতে লাগল।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার ফোনে জমে গেল দশটি ছোট গল্প।

৪. যখন হাসির পাত্র হতে হলো

একদিন তিথি স্কুলে বন্ধুদের তার একটি গল্প শোনাল। গল্পটির নাম ছিল ‘রঙহীন প্রজাপতি’। গল্পে একটি প্রজাপতি নিজের রং হারিয়ে ফেলে, কিন্তু অন্যদের আনন্দ দেওয়ার ক্ষমতা হারায় না।

কয়েকজন বন্ধু গল্পটি পছন্দ করল। কিন্তু পেছনের বেঞ্চে বসা একটি ছেলে হেসে বলল,
—নিজে তো কিছু দেখতে পাস না, আবার রঙের গল্প লিখিস কী করে?

কথাটা শুনে শ্রেণিকক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

তিথির বুকের মধ্যে কষ্ট জমে উঠল। সে উত্তর দিতে পারল না। সেদিন বাড়ি ফিরে সে ফোনের রেকর্ড করা গল্পগুলো মুছে ফেলতে চেয়েছিল।

মা তাকে থামিয়ে দিলেন।

—কী হয়েছে?

তিথি কাঁদতে কাঁদতে সব বলল।

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—যে মানুষ সমুদ্র দেখেনি, সে কি সমুদ্র নিয়ে কল্পনা করতে পারে না? যে মানুষ পাহাড়ে যায়নি, সে কি পাহাড়ের গল্প লিখতে পারে না? কল্পনা মানে নিজের অভিজ্ঞতা, শোনা কথা, অনুভূতি আর চিন্তাকে একসঙ্গে নিয়ে নতুন কিছু তৈরি করা।

তিথি চোখ মুছে বলল,
—কিন্তু ওরা তো হাসল, মা।

—সবাই তোমার কাজ বুঝবে না। তাই বলে তোমার কাজের মূল্য কমে যায় না। তবে নিজের লেখা আরও ভালো করার চেষ্টা করবি। অন্যের কথায় কষ্ট পেলে সেটা লুকিয়ে রাখারও দরকার নেই।

পরদিন অনন্যা দেবী শ্রেণিকক্ষে একটি বিশেষ আলোচনা করলেন। তিনি বোঝালেন, মানুষের সক্ষমতা এক রকম নয়। কারও দৃষ্টিশক্তি ভালো, কেউ অসাধারণ শুনতে পারে, কেউ দ্রুত অঙ্ক করতে পারে, কেউ আবার সুন্দরভাবে গল্প বলতে পারে।

তিনি বললেন,
—কাউকে তার অক্ষমতা দিয়ে বিচার করা খুব সহজ, কিন্তু তার ক্ষমতাকে চিনতে শেখা অনেক বেশি জরুরি।

যে ছেলেটি তিথিকে কষ্ট দিয়েছিল, সে পরে তার কাছে এসে বলল,
—আমি সেদিন ভুল কথা বলেছি। আমাকে ক্ষমা করিস।

তিথি বলল,
—ক্ষমা করলাম। তবে আমার গল্পটা একদিন মন দিয়ে শুনিস।

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

৫. গ্রামের জন্য নতুন স্বপ্ন

অনন্যা দেবীর উৎসাহে তিথি স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে একটি গল্প রেকর্ড করে শোনাল। অনুষ্ঠান শুরুর আগে তার খুব ভয় করছিল। সে বারবার মাকে জিজ্ঞাসা করছিল,
—মা, সবাই যদি পছন্দ না করে?

মা বললেন,
—তুই মন দিয়ে বল। সবাই কী ভাববে, সেটা তোর হাতে নেই।

অনুষ্ঠানের সময় আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো। মাইক্রোফোনে ভেসে উঠল তিথির কণ্ঠস্বর।

সে গল্প বলতে শুরু করল এক বৃদ্ধ মুচির কথা, যিনি ছেঁড়া জুতো সারাতে সারাতে মানুষের জীবনের ভাঙা সম্পর্কগুলো জোড়া লাগানোর স্বপ্ন দেখতেন।

গল্পের শেষে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা ছিল। তারপর পুরো হল হাততালিতে ভরে উঠল।

তিথি বুঝতে পারল, তার শব্দগুলো মানুষের হৃদয়ে পৌঁছেছে।

অনুষ্ঠানের পরে প্রধান শিক্ষক তাকে ডেকে বললেন,
—তোমার গল্পগুলো শুধু তোমার কাছে রেখে দিলে চলবে না। গ্রামের অন্য শিশুরাও যেন এগুলো শুনতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে।

তিথির মাথায় নতুন ভাবনা এল। তাদের গ্রামে এমন অনেক শিশু ছিল, যাদের কাছে ভালো বই পৌঁছত না। কারও বাড়িতে বই কেনার সামর্থ্য ছিল না, কেউ আবার পড়তে খুব অসুবিধা বোধ করত।

তিথি ঠিক করল, সে নিজের কণ্ঠে গল্প রেকর্ড করবে এবং স্কুলের সাহায্যে একটি ছোট অডিও গল্পের সংগ্রহ তৈরি করবে।

তার নাম দিল—‘শোনো, গল্প বলছি’।

৬. ছোট্ট ঘরে গল্পের আসর

তিথির বাবা বাড়ির এক কোণে পুরোনো একটি টেবিল এনে দিলেন। মা একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে সেটি ঢেকে দিলেন। অনন্যা দেবী কয়েকটি বাংলা গল্পের বই ধার দিলেন। স্কুলের এক শিক্ষক অডিও রেকর্ডিং আরও পরিষ্কার করার কৌশল শেখালেন।

তিথি গল্প পড়ে নিজের ভাষায় বলত, কখনও নিজের তৈরি গল্প শোনাত। প্রতিটি রেকর্ডিংয়ের আগে সে বইয়ের লেখক ও উৎসের পরিচয় জানাতে শিখল। অন্যের লেখা গল্প নিজের বলে চালিয়ে না দেওয়ার বিষয়েও সে সতর্ক থাকত।

ধীরে ধীরে তার সংগ্রহে গল্পের সংখ্যা বাড়তে লাগল।

এক শনিবার বিকেলে স্কুলের কয়েকটি শিশু তিথিদের বাড়িতে এল। তাদের মধ্যে ছিল টুকাই, রিমি, রাহুল আর মিতু। তারা মেঝেতে গোল হয়ে বসে গল্প শুনতে লাগল।

গল্প শেষ হলে টুকাই বলল,
—দিদি, তোমার গল্প শুনলে মনে হয় আমি সব দেখতে পাচ্ছি!

তিথি হেসে বলল,
—তাহলে তুইও একটা গল্প বল। তোর মনে কী ছবি তৈরি হয়, সেটা আমরাও শুনব।

সেদিন টুকাই বলল এক চাঁদের কথা, যে রাতে একা হয়ে যায় কারণ পৃথিবীর সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। রিমি বলল এক সাহসী বিড়ালের গল্প। রাহুল বলল তার গ্রামের মাঠ নিয়ে একটি মজার কাহিনি।

তিথি তাদের গল্পগুলো রেকর্ড করল, অবশ্যই প্রত্যেকের অনুমতি নিয়ে। সে বুঝল, গল্প বলার ক্ষমতা শুধু তার একার নয়। প্রত্যেক শিশুর মনে আলাদা একটি জগৎ রয়েছে।

তার ঘরটি ধীরে ধীরে ছোট্ট এক গল্পের আসরে পরিণত হলো।

৭. অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া আলো

এক বর্ষার রাতে তিথির বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হলো। কয়েক দিন দোকানে যেতে না পারায় সংসারে টান পড়ল।

তিথি নিজের গল্পের কাজ বন্ধ করে দিল। তার মনে হচ্ছিল, এমন সময়ে এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকা উচিত নয়।

একদিন অনন্যা দেবী বাড়িতে এসে বললেন,
—তুমি গল্প বলা বন্ধ করে দিয়েছ কেন?

তিথি উত্তর দিল,
—বাবার শরীর ভালো নয়। বাড়িতে অনেক চিন্তা। এখন এসব করা ঠিক হবে না।

অনন্যা দেবী বললেন,
—পরিবারের দায়িত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিজের মনকে একেবারে বন্ধ করে দিলে তুমি আরও ক্লান্ত হয়ে পড়বে। সময় কমিয়ে কাজ করতে পারো, আবার পরিস্থিতি ভালো হলে বেশি সময় দিতে পারো। নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়।

তিথি আবার অল্প অল্প করে গল্প রেকর্ড করতে শুরু করল। সে বাবার পাশে বসে গল্প শোনাত। বাবা কখনও চোখ বন্ধ করে শুনতেন, কখনও গল্পের শেষে প্রশ্ন করতেন।

একদিন বাবা বললেন,
—তোর গল্প শুনলে মনে হয়, আমার চিন্তাগুলো একটু দূরে সরে যায়।

তিথি বাবার হাত ধরে বলল,
—আমি বড় হয়ে এমন একটা জায়গা তৈরি করতে চাই, যেখানে সবাই গল্প শুনতে পারবে। যারা বই পড়তে পারে না, তারাও যেন গল্পের আনন্দ পায়।

বিমলবাবু মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তুই চেষ্টা করে যা মা। আমরা যতটা পারি পাশে থাকব।

৮. গল্প যখন গ্রামের সম্পদ

এক বছর পরে শিউলিপুরের স্কুলে একটি ছোট অডিও লাইব্রেরি তৈরি হলো। সেখানে রাখা হলো শিশুদের তৈরি গল্প, কবিতা, ছড়া এবং বই পড়ে শোনানোর রেকর্ডিং। যেসব শিশু পড়তে অসুবিধা বোধ করত, তারা শিক্ষকদের সাহায্যে এই অডিও শুনতে পারত।

গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষও নিজেদের জীবনের গল্প রেকর্ড করতে রাজি হলেন। কেউ বললেন পুরোনো মেলার কথা, কেউ বললেন গ্রামের হারিয়ে যাওয়া পেশার কথা, কেউ আবার স্বাধীনতার পরের দিনের স্মৃতি ভাগ করে নিলেন।

তিথি তাঁদের কথা মন দিয়ে শুনত। রেকর্ডিংয়ের আগে অনুমতি নিত, নাম কীভাবে প্রকাশ করা হবে তা জেনে নিত, আর প্রয়োজন হলে তাঁদের কথাগুলো আবার শুনিয়ে নিশ্চিত হতো যে সব ঠিকভাবে ধরা হয়েছে।

একদিন এক বৃদ্ধা বললেন,
—আমার নাতি দূরে থাকে। আমি যে গল্পগুলো জানি, সে কখনও শোনেনি। এগুলো যদি রেকর্ড হয়ে থাকে, ওকে পাঠিয়ে দিস।

তিথি বলল,
—অবশ্যই। আপনার গল্প আপনার পরিবারের কাছেও পৌঁছবে।

এভাবেই অডিও লাইব্রেরিটি শুধু শিশুদের গল্পের সংগ্রহ রইল না; হয়ে উঠল গ্রামের মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণের একটি ছোট্ট উদ্যোগ।

তিথি স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে গেল। তার সামনে এখনও অনেক বাধা ছিল। পড়াশোনার উপযুক্ত উপকরণ পাওয়া, পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ব্যবহার শেখা—সব কিছুই সহজ ছিল না। কিন্তু সে জানত, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। প্রয়োজন হলে শিক্ষক, পরিবার ও সংশ্লিষ্ট মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

তার স্বপ্নও বদলাতে থাকল। আগে সে শুধু গল্প বলতে চাইত। এখন সে এমন একটি অডিও গ্রন্থাগার গড়তে চায়, যেখানে বিভিন্ন বয়সের মানুষ নিজেদের ভাষায় জ্ঞান, সাহিত্য আর অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারবেন।

৯. শব্দের রং

অনেক বছর পরে তিথি যখন বড় হলো, তখন তার তৈরি অডিও গল্পের সংগ্রহে শতাধিক রেকর্ডিং জমা হয়েছে। গ্রামের বাইরের কিছু স্কুলও সেগুলো ব্যবহার করতে আগ্রহ দেখাল।

একদিন এক ছোট্ট মেয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এল। মেয়েটিও চোখে খুব কম দেখতে পেত। সে তিথিকে জিজ্ঞাসা করল,
—দিদি, তুমি কি কখনও ভেবেছ, তোমার চোখে সবকিছু পরিষ্কার দেখা গেলে তোমার জীবন অন্য রকম হতো?

তিথি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—হয়তো কিছু অভিজ্ঞতা অন্য রকম হতো। কিন্তু আমি যে মানুষ হয়েছি, তার মধ্যে আমার সব অভিজ্ঞতারই ভূমিকা আছে। আমার কষ্টগুলোও আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তবে তার মানে এই নয় যে তোমার কোনো অসুবিধা হলে সাহায্য চাইবে না। যে সুযোগ ও সহায়তা তোমার দরকার, তা চাওয়ার অধিকার তোমার আছে।

মেয়েটি বলল,
—আমি তোমার মতো গল্প বলতে চাই।

তিথি তার হাত ধরে বলল,
—তাহলে আজ থেকেই শুরু কর। তোমার নিজের গল্পটা বল।

সেদিন সন্ধ্যায় তিথি জানালার পাশে বসে বৃষ্টির শব্দ শুনছিল। টিনের চালে টুপটাপ শব্দ পড়ছিল, দূরে ব্যাঙ ডাকছিল, বাতাসে পাতার মর্মর উঠছিল।

তার মনে আবার একটি নতুন গল্প জন্ম নিল।

সে রেকর্ডার চালু করে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল—

“এক দেশে এক মেয়ে ছিল, যে রং দেখতে পেত না, কিন্তু মানুষের কথার মধ্যে রং খুঁজে পেত। কেউ যখন দুঃখের কথা বলত, সে তার কণ্ঠে ধূসর মেঘের শব্দ শুনত। কেউ আনন্দের কথা বললে তার মনে ফুটে উঠত হলুদ রোদের ছবি। আর কেউ যখন সাহস করে নতুন কিছু শুরু করত, সে শুনতে পেত এমন এক সুর, যা কোনো বাদ্যযন্ত্রে বাজে না—বাজে মানুষের মনের মধ্যে।”

তিথি জানত, শব্দ দিয়ে আঁকা ছবি চোখে দেখা ছবির মতো নয়। কিন্তু মানুষের কল্পনা ও অনুভূতিকে ছুঁয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দুটিরই আছে।

তার কাছে পৃথিবী ছিল শব্দ, স্পর্শ, স্মৃতি, অনুভূতি আর কল্পনার এক বিশাল ক্যানভাস।

সেই ক্যানভাসে সে প্রতিদিন নতুন ছবি আঁকত—কখনও বৃষ্টির, কখনও বন্ধুত্বের, কখনও সাহসের, আবার কখনও এমন এক পৃথিবীর, যেখানে মানুষের সীমাবদ্ধতার চেয়ে তার সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কারণ, মানুষের স্বপ্নের রং শুধু চোখে দেখা যায় না। কখনও সেই রং ফুটে ওঠে একটি কণ্ঠস্বরে, একটি গল্পে, কিংবা অন্য কারও মনে সাহস জাগিয়ে তোলার ছোট্ট একটি কাজে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *