১. সুড়ঙ্গের ওপারে কে?
“অরিন্দম, বাড়ি ফিরে যা।”
অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটি আবার শোনা গেল।
অরিন্দমের শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল। ছোটবেলায় বাবার মৃত্যুর পর সে আর কখনও এই কণ্ঠ শোনেনি। পরিবারের অ্যালবামে বাবার কয়েকটি ছবি ছাড়া তাঁর স্মৃতি বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। অথচ সেই কণ্ঠের স্বর, কথা বলার ভঙ্গি—সবই যেন তার মনের গভীরে কোথাও জমে ছিল।
মেঘলা তার হাত চেপে ধরল।
“ওপাশে যাবেন না। আপনার দিদিও তো আপনাকে ট্রেনে উঠতে নিষেধ করেছিলেন।”
অরিন্দম চোখ না সরিয়ে বলল, “কিন্তু যদি সত্যিই বাবা হন?”
“যদি না হন?”
প্রশ্নটা অরিন্দমকে থামিয়ে দিল।
সে সাংবাদিকতা করত। বহু প্রতারণা, জালিয়াতি, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে কাজ করেছে। অন্যের কাছে প্রমাণ চেয়েছে। অথচ নিজের দিদির মুখ দেখার পর থেকেই তার যুক্তিবোধ যেন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সে মোবাইলের আলো সুড়ঙ্গের দিকে ফেলল।
সামনে প্রায় বিশ গজ দূরে একটি দরজা। দরজার ওপরে মরচে ধরা ফলক।
প্ল্যাটফর্ম ১৩।
মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “এটা কীভাবে সম্ভব? এই স্টেশনে তো তিনটি প্ল্যাটফর্ম।”
অরিন্দম বলল, “আমাদের সামনে যা আছে, সেটাকে অস্বীকার করে লাভ নেই। কিন্তু কী দেখছি, তা না বুঝে বিশ্বাসও করব না।”
দু’জনে সাবধানে এগিয়ে গেল।
দরজার কাছে পৌঁছতেই দেখা গেল, মেঝেতে একটি কালো চামড়ার জুতো পড়ে আছে। জুতোটির পাশে ছোট একটি ধাতব বাক্স।
অরিন্দম বাক্সটি তুলে খুলল।
ভিতরে একটি পুরোনো রেলওয়ে পরিচয়পত্র।
ছবিতে মধ্যবয়স্ক এক পুরুষ। চোখে চশমা, মুখে গম্ভীর ভাব।
নাম: দেবব্রত দত্ত।
মেঘলা কেঁপে উঠল।
“এটা আমার বাবার পরিচয়পত্র।”
পরিচয়পত্রের পিছনে পেন্সিলে লেখা ছিল—
‘যদি আমার মেয়ে কখনও এখানে আসে, তাকে বলবে, তার বাবাকে খুঁজতে হলে সে যেন ট্রেনের দিকে না তাকিয়ে ঘড়ির দিকে তাকায়।’
মেঘলা অস্ফুট স্বরে বলল, “ঘড়ির দিকে তাকাবে মানে?”
অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই তার ফোনে আলো জ্বলে উঠল।
কোনও নেটওয়ার্ক ছিল না, তবু একটি নতুন বার্তা এসেছে।
বার্তায় মাত্র তিনটি শব্দ—
“সময়টা পরীক্ষা করো।”
অরিন্দম মাথা তুলে ঘড়ির দিকে তাকাল।
সিগন্যাল ঘরের নীচের ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে রাত ১২টা ১৭ মিনিট।
কিন্তু তার হাতঘড়িতে রাত ১২টা ৪১।
মেঘলার ফোনে রাত ১২টা ০৯।
তিনটি ঘড়িতে তিন রকম সময়।
অরিন্দম ধীরে বলল, “এই ঘরে সময়ের হিসাব ঠিক নেই।”
ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
দেবব্রত দত্তের কণ্ঠ আবার ভেসে এল।
“মেঘলা, তুমি এসেছ?”
মেঘলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
“বাবা!”
সে দরজার দিকে ছুটতে গেল। অরিন্দম তাকে ধরে ফেলল।
“দাঁড়ান!”
“ছাড়ুন! আমি আমার বাবাকে সাত বছর ধরে খুঁজছি!”
“আপনার বাবা যদি সত্যিই ওখানে থাকেন, তিনি এখানেও থাকতে পারেন। কিন্তু দরজা খুলে কী আছে না জেনে ঢোকা বিপজ্জনক।”
মেঘলা চোখ মুছে তার দিকে তাকাল।
“তাহলে কী করব?”
অরিন্দম ধাতব বাক্সের মধ্যে আবার হাত ঢোকাল। এবার একটি ছোট কাগজ বেরিয়ে এল।
সেখানে লেখা—
‘১৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছনোর আগে তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নাও।
প্রথম প্রশ্ন: যে মানুষ নিখোঁজ, সে কি সত্যিই হারিয়ে যায়?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: যে মানুষকে মৃত বলা হয়েছে, তার মৃত্যু কে দেখেছে?
তৃতীয় প্রশ্ন: যে ট্রেন কখনও সময়সূচিতে ছিল না, তার টিকিট কে কেটেছে?’
অরিন্দম কাগজটি মুঠোয় ধরল।
“এটা কোনও ভূতের ধাঁধা নয়। কেউ আমাদের কিছু বোঝাতে চাইছে।”
“কে?” মেঘলা জিজ্ঞাসা করল।
অরিন্দম উত্তর দিল না।
কারণ, ঠিক তখনই দরজার নীচ দিয়ে একটি সাদা কাগজ গড়িয়ে এসে তাদের পায়ের কাছে থামল।
কাগজে লেখা—
‘অরিন্দম, তোমার দিদি তোমাকে যা বলেছে, তার অর্ধেক সত্যি। বাকি অর্ধেক জানলে তুমি আর তাকে খুঁজতে চাইবে না।’
২. বন্ধ স্টেশনের পুরোনো হিসাব
দু’জনে সিগন্যাল ঘরের নীচে ফিরে এল।
অরিন্দমের মাথায় তখন একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছে। নন্দিতা কি সত্যিই বেঁচে আছে? দেবব্রত দত্ত কি জীবিত? আর যদি সবটাই কোনও পরিকল্পিত প্রতারণা হয়, তবে তার উদ্দেশ্য কী?
সে পুরোনো রেলওয়ে রেজিস্টারগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখল।
“মেঘলা, তোমার বাবার নিখোঁজ হওয়ার আগে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল?”
মেঘলা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “বাবা শেষ কয়েক মাস খুব চিন্তায় থাকতেন। রাতে ঘুমোতে পারতেন না। বাড়িতে পুরোনো নথি নিয়ে আসতেন। একদিন তাঁকে বলতে শুনেছিলাম, রেলওয়ের একটি দুর্ঘটনার রিপোর্ট বদলে দেওয়া হয়েছে।”
“কী দুর্ঘটনা?”
“সেটা জানি না। আমি তখন কলেজে পড়ি। বাবাকে জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, এসব বড়দের ব্যাপার।”
“আর তোমার বাবার মৃত্যুসনদ?”
“পুলিশ একটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল। মুখ চেনা যাচ্ছিল না। পোশাক ও একটি আংটি দেখে তাঁকে আমার বাবা বলে শনাক্ত করা হয়। আমাকে দেহ দেখানো হয়নি। আমার মা তখন বেঁচে ছিলেন না। মামা আমাকে বলেছিলেন, দেহ শনাক্ত করা হয়ে গেছে।”
অরিন্দম চুপ করে রইল।
“তুমি কি কখনও ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলে?”
“না। তখন এসব ভাবিনি। বাবার মৃত্যুর কষ্টে ভেঙে পড়েছিলাম।”
অরিন্দম রেজিস্টারের একটি পাতায় আঙুল রাখল।
“এখানে দেখো। সাত বছর আগে, ১৩ অক্টোবর, রাত ১২টা ১৭ মিনিটে বিশেষ যাত্রী পরিবহণের উল্লেখ আছে। কিন্তু ট্রেনের নম্বর নেই, চালকের নাম নেই, গার্ডের নাম নেই।”
“এটা কি জাল রেজিস্টার হতে পারে?”
“হতে পারে। কিন্তু এই পাতায় যে সিল আছে, সেটি পুরোনো রেলওয়ে দপ্তরের আসল সিলের মতো।”
সে পরের পাতাটি উল্টাল।
একটি নামের পাশে লাল কালি দিয়ে দাগ দেওয়া।
নন্দিতা রায় — কর্মী নথি নম্বর: ৪৭১২।
অরিন্দমের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“দিদি তো এই স্টেশনে কাজ করত না।”
মেঘলা বলল, “হয়তো অন্য কোনও নথি থেকে নামটা এখানে এসেছে।”
অরিন্দম নথির নীচে লেখা তারিখটি দেখল। তারিখটি নন্দিতার নিখোঁজ হওয়ার ছয় মাস আগের।
আরও আশ্চর্যের বিষয়, নামের পাশে লেখা ছিল—
‘সাক্ষী হিসেবে নিযুক্ত। বিশেষ দুর্ঘটনা তদন্ত।’
অরিন্দম এবার বুঝতে পারল, নন্দিতার নিখোঁজ হওয়ার আগে এমন কিছু ঘটেছিল, যার কথা তার জানা ছিল না।
সে ফোন বের করে নিজের পুরোনো সহকর্মী সৌরভকে কল করল। সৌরভ রেলওয়ে সংক্রান্ত খবর নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছে।
কয়েকবার চেষ্টা করার পর ফোন ধরল সৌরভ।
“এত রাতে ফোন করেছিস কেন?”
“শালবনপুরে সাত বছর আগের কোনও রেল দুর্ঘটনার খবর মনে আছে?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
“কেন জিজ্ঞাসা করছিস?”
“একটা পুরোনো তদন্ত করছি। ১৩ অক্টোবরের রাত। বিশেষ ট্রেন, সম্ভবত ১৩০৭ নম্বর।”
সৌরভের গলা বদলে গেল।
“অরিন্দম, তুই কোথায় আছিস?”
“শালবনপুরে।”
“যেখানেই থাকিস, এখনই সেখান থেকে চলে আয়।”
“কেন?”
সৌরভ নিচু গলায় বলল, “সাত বছর আগে শালবনপুরের কাছে একটি মালগাড়ি লাইনচ্যুত হয়েছিল। সরকারি রিপোর্টে বলা হয়েছিল, কোনও যাত্রীবাহী ট্রেন জড়িত ছিল না। কিন্তু দুর্ঘটনার পর কয়েকজন রেলকর্মী নিখোঁজ হন। একজনের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল, বাকিদের খোঁজ মেলেনি।”
“তাদের নাম কী?”
“আমি সব নাম মনে করতে পারছি না। কিন্তু সহকারী স্টেশনমাস্টার দেবব্রত দত্তের নাম শুনেছিলাম।”
মেঘলা ফোনের কাছে এগিয়ে এল।
“আমার বাবা!”
সৌরভ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “মেঘলা দত্ত কি তোর সঙ্গে আছে?”
অরিন্দম বিস্মিত হয়ে বলল, “তুই তার নাম জানিস কী করে?”
“কারণ দুর্ঘটনার তদন্তে তার বাবার সাক্ষ্য নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তিনি নিখোঁজ হন।”
“আর নন্দিতা রায়?”
এবার সৌরভের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।
“তোর দিদি সেই দুর্ঘটনার একমাত্র বেসরকারি প্রত্যক্ষদর্শী ছিল।”
অরিন্দমের হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“কী বলছিস?”
“দুর্ঘটনার পর একটা অভিযোগ উঠেছিল, রেললাইনে সিগন্যালের সমস্যা ছিল। কয়েকজন যাত্রীকে নির্ধারিত ট্রেনের বদলে অন্য একটি ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারি নথিতে সেই ট্রেনের অস্তিত্ব নেই। নন্দিতা নাকি সেই যাত্রীদের তালিকা দেখেছিল।”
“তারপর?”
“তারপর সব নথি গায়েব হয়ে যায়। তোর দিদি নিখোঁজ হয়। আর তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়।”
অরিন্দম ধীরে ফোন নামিয়ে রাখল।
মেঘলা ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে।
“তাহলে আমার বাবা কোনও রহস্যময় ট্রেনে হারিয়ে যাননি। তিনি দুর্ঘটনার সাক্ষী ছিলেন!”
অরিন্দম বলল, “হয়তো। কিন্তু এখনও সব প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।”
ঠিক তখনই ওপরের ঘর থেকে ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।
দু’জনে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।
দরজার সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।
কালো কোট, মাথায় টুপি, হাতে একটি পুরোনো টিকিট।
লোকটি মুখ তুলে তাকাল।
“আপনারা দু’জনেই ভুল জায়গায় এসেছেন।”
৩. টিকিট পরীক্ষক
লোকটির বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে ছাঁটা গোঁফ, চোখে গোল চশমা। তার পোশাক দেখে মনে হচ্ছিল, সে কোনও পুরোনো রেলওয়ে কর্মচারী।
অরিন্দম বলল, “আপনি কে?”
লোকটি টিকিটটি সামনে ধরল।
“আমি এই ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক।”
“কোন ট্রেনের?”
“যে ট্রেনের অস্তিত্ব আপনারা অস্বীকার করছেন।”
মেঘলা পিছিয়ে গেল।
লোকটি মৃদু হাসল।
“ভয় পাবেন না। আমি আপনাদের ক্ষতি করতে আসিনি। বরং আপনাদের বাঁচাতে এসেছি।”
অরিন্দম বলল, “আপনি যদি টিকিট পরীক্ষক হন, আপনার পরিচয়পত্র কোথায়?”
লোকটি পকেট থেকে একটি কার্ড বের করল।
কার্ডে লেখা—
শশাঙ্ক মুখোপাধ্যায়।
টিকিট পরীক্ষক।
বিশেষ যাত্রী পরিবহণ বিভাগ।
অরিন্দম কার্ডটি হাতে নিল। কাগজটি পুরোনো, কিন্তু তাতে যে ছবি রয়েছে, তা স্পষ্ট।
“আপনি কি এই স্টেশনে কাজ করতেন?”
“করতাম।”
“কত বছর আগে?”
“অনেক বছর আগে।”
“আপনার চাকরির নথি কোথায়?”
লোকটি উত্তর দিল না।
অরিন্দম আবার জিজ্ঞাসা করল, “আপনি আমাদের বাঁচাতে এসেছেন বললেন। কী থেকে?”
শশাঙ্ক শেষ কামরার দিকে তাকাল।
“সেই ট্রেন থেকে, যার যাত্রীরা নিজেদের গন্তব্য ভুলে গেছে।”
“আপনি কি নন্দিতা রায়কে চেনেন?”
লোকটির চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।
“চিনি।”
“তিনি কোথায়?”
“ট্রেনে।”
“তিনি জীবিত?”
শশাঙ্ক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আপনাকে জানতে হবে, জীবিত থাকার অর্থ কী।”
অরিন্দম বিরক্ত হয়ে বলল, “ধাঁধা বন্ধ করুন। সরাসরি উত্তর দিন।”
শশাঙ্ক তার হাতে থাকা টিকিটটি টেবিলে রাখল।
টিকিটে লেখা—
যাত্রীর নাম: অরিন্দম রায়।
যাত্রার তারিখ: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬।
গন্তব্য: ফিরে যাওয়ার অসম্ভব স্থান।
অরিন্দম টিকিটটি তুলে নিল।
“এটা কে বানিয়েছে?”
“আপনার দিদি।”
“কিন্তু আমি তো টিকিট কাটিনি!”
“সব যাত্রীর টিকিট নিজের হাতে কাটা হয় না।”
মেঘলা বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, আমার বাবারও টিকিট কাটা হয়েছিল?”
শশাঙ্ক মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“তাহলে তিনি কোথায়?”
“তিনি তাঁর যাত্রা শেষ করতে পারেননি।”
মেঘলা চোখ মুছে বলল, “আমি তাঁকে দেখতে চাই।”
শশাঙ্কের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
“তাহলে আপনাকে তিনটি বিষয় জানতে হবে। প্রথমত, আপনার বাবা কেন সেই ট্রেনে উঠেছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি কেন ফিরতে পারেননি। তৃতীয়ত, আপনি যদি তাঁকে দেখতে পান, তাঁকে চিনতে পারবেন কি না।”
মেঘলা বলল, “আমি আমার বাবাকে চিনব।”
শশাঙ্ক মৃদু মাথা নাড়ল।
“সেটাই সবাই ভাবে।”
অরিন্দম টেবিলে হাত রেখে বলল, “আপনি কি জানেন, সাত বছর আগে কী ঘটেছিল?”
“জানি।”
“তাহলে বলুন।”
শশাঙ্ক জানলার দিকে তাকাল।
“সাত বছর আগে একটি বিশেষ ট্রেনে কয়েকজন যাত্রীকে তোলা হয়েছিল। তাঁদের বলা হয়েছিল, ট্রেনটি তাঁদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবে। কিন্তু ট্রেনটি নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছয়নি। পথে দুর্ঘটনা ঘটে। সরকারি নথিতে দুর্ঘটনার বিবরণ বদলে দেওয়া হয়। কিছু মানুষ মারা যান, কয়েকজন নিখোঁজ হন। যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই সত্য প্রকাশ করতে পারেননি।”
অরিন্দম বলল, “তাহলে এই ট্রেন সেই দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু আমরা যে ট্রেন দেখলাম, সেটি কীভাবে সাত বছর ধরে প্রতি বছর ফিরে আসে?”
শশাঙ্ক এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।
“আমি জানি না। হয়তো আপনারা যে ট্রেন দেখছেন, তা বাস্তব ট্রেন নয়। হয়তো পুরোনো স্মৃতি, অপরাধবোধ এবং গোপন নথির মধ্যে তৈরি একটি বিভ্রম। কিন্তু একটা বিষয় সত্যি—যে মানুষদের নাম ওই যাত্রী তালিকায় রয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে একটি বাস্তব ঘটনা জড়িত।”
অরিন্দম কিছুটা শান্ত হলো।
“তাহলে আমরা কি কোনও মানসিক প্রভাবের শিকার হচ্ছি?”
“সেটাও হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমের অভাব, ভয়, অন্ধকার এবং প্রত্যাশা মানুষের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই যা দেখছেন, তার সবকিছুকে সত্যি ধরে নেবেন না।”
মেঘলা প্রশ্ন করল, “তাহলে আপনি কে? সত্যিই কি টিকিট পরীক্ষক?”
শশাঙ্ক কোনও উত্তর দিল না।
বরং সে টেবিলের নীচ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।
“এই খামটি আপনার দিদি রেখে গিয়েছিলেন, অরিন্দম।”
খামের ওপর লেখা—‘ভাইয়ের জন্য’।
অরিন্দম হাত বাড়াতেই শশাঙ্ক বলল, “খোলার আগে একটা কথা মনে রাখবেন। আপনার দিদি হয়তো আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি যা করেছেন, তার সবটাই সঠিক ছিল—এমন নয়।”
৪. নন্দিতার চিঠি
অরিন্দম খাম খুলল।
ভিতরে চার পাতার একটি চিঠি।
‘অরিন্দম,
যদি এই চিঠি তোর হাতে পৌঁছয়, তাহলে বুঝব তুই শেষ পর্যন্ত শালবনপুরে এসেছিস।
আমি জানি, তুই আমাকে খুঁজেছিস। আমি জানি, তুই ভেবেছিস আমি তোকে ছেড়ে চলে গেছি। কিন্তু সত্যিটা এত সহজ নয়।
সাত বছর আগে আমি হাসপাতালের কাজে একটি অস্বাভাবিক ঘটনা জানতে পারি। রেল দুর্ঘটনায় আহত কয়েকজন যাত্রীকে আমাদের হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁদের নাম সরকারি তালিকার সঙ্গে মিলছিল না। একজন বৃদ্ধ বারবার বলছিলেন, তাঁকে যে ট্রেনে তোলা হয়েছিল, সেটির নম্বর ১৩০৭।
কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছিল, সেদিন ওই নম্বরের কোনও ট্রেন চলেনি।
আহতদের মধ্যে একজন ছিলেন দেবব্রত দত্ত। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ট্রেনটি দুর্ঘটনার আগে অন্য লাইনে পাঠানো হয়েছিল। সিগন্যাল পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা, যার নাম কোনও নথিতে ছিল না।
আমি তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করেছিলাম।
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে ওই রোগীদের মধ্যে দু’জন মারা যান, একজন নিখোঁজ হন, আর দেবব্রত দত্তকে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
আমি বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই আমাকে হুমকি দেওয়া হয়।
আমি তোকে কিছু বলতে পারিনি, কারণ তুই তখন কলেজে পড়তিস। আমি চাইনি, তুই এই বিপদের মধ্যে জড়িয়ে পড়িস।
কিন্তু এরপর আরও ভয়ংকর ঘটনা ঘটে।
আমি জানতে পারি, দুর্ঘটনার রাতে যে ট্রেনটি চলেছিল, তার যাত্রী তালিকায় আমার নিজের নামও রয়েছে।
অথচ আমি সেদিন ট্রেনে উঠিনি।
কেউ আমার নামে টিকিট কেটেছিল।
কেন?
সেই উত্তর আমি এখনও জানি না।
আমি জানি না, যে ট্রেনটিকে আমি দেখেছিলাম, সেটি সত্যিই ছিল কি না। আমি শুধু জানি, দুর্ঘটনার পরে কিছু মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিখোঁজ বলে দেখানো হয়েছিল।
আমি এখন নিরাপদে আছি। কিন্তু আমার কাছে এমন নথি রয়েছে, যা প্রকাশ পেলে কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের নাম সামনে চলে আসবে।
আমি চাই না, তুই আমার জন্য বিপদে পড়িস।
যদি কখনও আমার সঙ্গে দেখা হয়, আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করিস না। আমার পরিচয় যাচাই করিস। আমার কথা প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখিস।
কারণ, এই ঘটনার সবচেয়ে বড় রহস্য কোনও ভূতুড়ে ট্রেন নয়।
সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—কেউ কেন চেয়েছিল, কিছু মানুষকে পৃথিবীর চোখে মৃত করে দিতে?
— তোর দিদি, নন্দিতা।’
চিঠিটি পড়ে অরিন্দমের চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
“দিদি জীবিত,” সে ফিসফিস করে বলল। “চিঠিতে সে নিজেই লিখেছে।”
শশাঙ্ক মাথা নাড়ল।
“চিঠিটি সাত বছর আগে লেখা। এখন তিনি কোথায়, আমি জানি না।”
“কিন্তু একটু আগেই তো তাঁকে ট্রেনে দেখেছি!”
“আপনি তাঁর মুখ দেখেছেন। কিন্তু তিনি সত্যিই সেখানে ছিলেন কি না, তা এখনও প্রমাণিত নয়।”
অরিন্দম রাগে বলল, “তাহলে এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে এসব খেলা করছেন কেন?”
শশাঙ্ক শান্ত গলায় বলল, “কারণ আপনাকে এমন জায়গায় পৌঁছতে হবে, যেখানে কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করতে পারবেন।”
সে টেবিলের ওপর একটি মানচিত্র খুলল।
মানচিত্রে শালবনপুর স্টেশন থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটি পুরোনো রেলসেতু চিহ্নিত করা।
সেতুটির নাম—কালো সেতু।
“সাত বছর আগে দুর্ঘটনাটি এখানেই ঘটেছিল,” শশাঙ্ক বলল। “সরকারি রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, একটি মালগাড়ি লাইনচ্যুত হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওই রাতে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনও সেখানে ছিল।”
অরিন্দম মানচিত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
“যদি আমরা সেখানে যাই?”
“তাহলে হয়তো এমন কিছু পাবেন, যা এখনও কেউ সরাতে পারেনি।”
মেঘলা বলল, “চলুন। আমি আর অপেক্ষা করতে পারব না।”
শশাঙ্ক মাথা নাড়ল।
“এখন নয়। সূর্য ওঠার আগে সেখানে যাওয়া উচিত নয়। রাতের অন্ধকারে আপনারা আবার এমন কিছু দেখতে পারেন, যা আপনাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।”
অরিন্দম বলল, “তাহলে আমরা ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করব।”
শশাঙ্ক উঠে দাঁড়াল।
“আমি যাচ্ছি। কিন্তু যাওয়ার আগে আপনাদের একটি কথা বলি। ১৩০৭ নম্বর ট্রেনের যাত্রী তালিকায় একটি নাম এখনও অজানা রয়ে গেছে।”
“কার নাম?”
শশাঙ্ক দরজার কাছে গিয়ে থামল।
“আপনাদের দু’জনের মধ্যে একজনের।”
৫. যে নামটি লেখা ছিল না
শশাঙ্ক চলে যাওয়ার পর অরিন্দম আবার রেজিস্টারের কাছে ফিরে গেল।
সে যাত্রী তালিকাটি খুলে দেখল।
নন্দিতা রায়।
দেবব্রত দত্ত।
অজ্ঞাতপরিচয় নারী।
অজ্ঞাতপরিচয় শিশু।
চারটি নাম বা পরিচয়।
কিন্তু শশাঙ্ক বলেছে, অরিন্দম ও মেঘলার মধ্যে একজনের নাম তালিকায় রয়েছে।
“এটা কীভাবে সম্ভব?” মেঘলা বলল।
অরিন্দম উত্তর দিল, “আমাদের কারও নাম হয়তো পরে বদলে দেওয়া হয়েছে।”
“আমার বাবার নাম তো আছে।”
“তাহলে অন্য কেউ।”
অরিন্দম পুরোনো নথির প্রতিটি পাতা পরীক্ষা করতে লাগল। একটি পাতার কোণে সে দেখতে পেল, কালি দিয়ে কিছু মুছে ফেলা হয়েছে। কাগজটি আলোয় ধরতেই নিচে লেখা অক্ষরগুলো অস্পষ্টভাবে দেখা গেল।
সে মোবাইলের আলো কাগজের পিছন থেকে ফেলল।
মুছে দেওয়া নামটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো।
অরিন্দম রায়।
তারিখ—১৩ অক্টোবর, ২০২৬।
অরিন্দমের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“এটা অসম্ভব। আমি তো আজ প্রথম এখানে এসেছি!”
মেঘলা কাগজটি হাতে নিয়ে দেখল।
“এই নামটা আজকের তারিখে লেখা। কিন্তু তুমি তো সাত বছর আগে নিখোঁজ হওনি।”
“তাহলে কে আমার নামে টিকিট কেটেছে?”
তারপরই অরিন্দমের মনে পড়ল, শৈশবে একবার সে একটি দুর্ঘটনার কথা শুনেছিল। তার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আত্মীয়রা বলেছিল, অরিন্দমের জন্মের আগেই তার এক যমজ ভাই জন্মেছিল, কিন্তু জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে মারা যায়।
অরিন্দম কোনও দিন বিষয়টি নিয়ে বেশি প্রশ্ন করেনি।
কিন্তু এখন তার মনে হলো, হয়তো পরিবারের ইতিহাসের আরও একটি অধ্যায় গোপন করা হয়েছে।
সে মেঘলাকে বলল, “আমার জন্মের নথি দেখতে হবে।”
“কেন?”
“কারণ, আমার নামে এই ট্রেনের টিকিট কাটা হয়েছে। আর আমি জানতে চাই, আমার জন্মের দিন সত্যিই কী ঘটেছিল।”
মেঘলা বলল, “তোমার কি যমজ ভাই ছিল?”
অরিন্দম অবাক হয়ে তাকাল।
“তুমি কী করে জানলে?”
“তোমার মুখে শুনিনি। কিন্তু রেজিস্টারের শেষ পাতায় একটা নোট আছে।”
সে পাতাটি উল্টে দেখাল।
সেখানে লেখা—
‘যাত্রী নম্বর ৫: অরিন্দম রায়। পরিচয় যাচাই বাকি। যমজ জন্মের নথি সংযুক্ত।’
অরিন্দমের মাথার ভিতর যেন সবকিছু ঘুরতে লাগল।
যে রহস্যের সমাধান করতে সে শালবনপুরে এসেছিল, সেটি এখন তার নিজের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
সে জানলার বাইরে তাকাল।
দূরে কুয়াশার মধ্যে শেষ ট্রেনটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে।
শেষ কামরার জানলায় আবার সেই পরিচিত মুখ।
নন্দিতা এবার কাচের ওপারে একটি কাগজ তুলে ধরল।
অরিন্দম চোখ কুঁচকে দেখল।
কাগজে বড় অক্ষরে লেখা—
“তোর জন্মের দিনই প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল।”
তারপর জানলার আলো নিভে গেল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে সিগন্যাল ঘরের পুরোনো ঘড়িটি চলতে শুরু করল।
কাঁটা ঘুরছে উল্টো দিকে।
রাত ১২টা ১৭ মিনিট থেকে ১২টা ১৬।
তারপর ১২টা ১৫।
তারপর ১২টা ১৪।
মেঘলা আতঙ্কিত গলায় বলল, “অরিন্দম, ঘড়িটা উল্টো দিকে চলছে!”
অরিন্দম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল—
“সময়টা পিছিয়ে যাচ্ছে না। কেউ আমাদের অতীতের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে।”
দূরে ট্রেনের দরজা খুলল।
শেষ কামরা থেকে নেমে এল একটি ছোট ছেলে।
তার পরনে পুরোনো স্কুলের পোশাক। হাতে লাল রঙের খেলনা ট্রেন।
ছেলেটি ধীরে ধীরে সিগন্যাল ঘরের দিকে এগিয়ে এল।
অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে হাসল।
তারপর বলল—
“দাদা, তুমি এত দেরি করলে কেন?”
অরিন্দম ছেলেটির মুখ দেখে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
কারণ, ছেলেটির মুখটি অবিকল তার নিজের ছোটবেলার মুখ।
চলবে…