Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (তৃতীয় পর্ব: যে যাত্রার শেষ নেই)।

১. নিজের মুখোমুখি

“দাদা, তুমি এত দেরি করলে কেন?”

ছোট ছেলেটির প্রশ্নে অরিন্দমের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমে গেল।

ছেলেটির বয়স আট কি নয়। পরনে নীল স্কুলের পোশাক, পায়ে কালো জুতো, হাতে লাল রঙের খেলনা ট্রেন। কপালের বাঁ দিকে ছোট একটি কাটা দাগ।

অরিন্দমের নিজের শৈশবের ছবিতেও ঠিক সেই জায়গায় এমন একটি দাগ ছিল।

“তুমি কে?” অরিন্দম কোনও রকমে প্রশ্ন করল।

ছেলেটি অবাক হয়ে তাকাল।

“আমাকে চিনতে পারছ না? আমি তো তোমার সঙ্গে সব সময় খেলতাম!”

মেঘলা অরিন্দমের পাশে এসে দাঁড়াল।

“এটা কোনওভাবে সম্ভব নয়। তুমি তো বলেছিলে, তোমার যমজ ভাই জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা গিয়েছিল।”

অরিন্দম ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার নাম কী?”

ছেলেটি হাসল।

“তুমি জানো না? আমার নাম অরুণ।”

“অরুণ রায়?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি কোথায় থাকো?”

ছেলেটি আঙুল তুলে ট্রেনের দিকে দেখাল।

“ওখানে।”

তারপর সে অরিন্দমের হাত ধরতে গেল।

অরিন্দম পিছিয়ে এল।

“আমাকে ছোঁবে না!”

ছেলেটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে মাথা নীচু করে বলল, “তুমিও কি আমাকে ভুলে গেছ?”

এই প্রশ্নটি অরিন্দমের বুকের গভীরে কোথাও আঘাত করল। তার মনে পড়তে লাগল কিছু অস্পষ্ট ছবি—একটি ছোট বাড়ি, উঠোনে দু’টি শিশু, মায়ের কোলে বসে থাকা দুই ভাই, আর একটি খেলনা ট্রেন নিয়ে ঝগড়া।

কিন্তু সে জানত, স্মৃতি সব সময় নির্ভুল নয়। কোনও ছবি মনে পড়লেই সেটি বাস্তব ঘটনা ছিল, এমন নিশ্চয়তা নেই।

সে নিজেকে সামলে বলল, “আমি তোমাকে চিনতে পারছি না। কিন্তু তোমার পরিচয় জানতে চাই।”

ছেলেটি খেলনা ট্রেনটি মেঝেতে রাখল।

“তাহলে আমার সঙ্গে চলো। মা অপেক্ষা করছেন।”

“তোমার মা?”

“আমাদের মা।”

অরিন্দমের গলা শুকিয়ে গেল।

তার মা মারা গিয়েছিলেন যখন সে খুব ছোট। মায়ের মুখের স্মৃতি তার কাছে ঝাপসা। কিন্তু ছেলেটির কথায় এমন একটি ব্যথা ছিল, যা অভিনয় বলে মনে হচ্ছিল না।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “ওর সঙ্গে যেও না। আমরা জানি না, এটা কী।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“আমি কোথাও যাচ্ছি না। আগে প্রমাণ চাই।”

ছেলেটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করে দিল।

ছবিতে দু’টি শিশু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একজন অরিন্দম, অন্যজন সম্ভবত অরুণ। পিছনে তাঁদের মা। ছবিটির কোণে তারিখ লেখা—১৭ মার্চ, ১৯৯৬।

অরিন্দম ছবিটি হাতে নিয়ে কাঁপতে লাগল।

“এই ছবিটা কোথায় পেলে?”

“মা দিয়েছেন।”

“তোমার মা কোথায়?”

ছেলেটি এবার ট্রেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “শেষ কামরায়।”

তারপর সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার অবয়ব কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যেতে লাগল।

অরিন্দম ছুটে এগিয়ে গেল।

“দাঁড়াও! অরুণ!”

কিন্তু সেখানে আর কেউ নেই।

মেঝেতে পড়ে রয়েছে শুধু লাল খেলনা ট্রেনটি।

অরিন্দম সেটি তুলে নিল। খেলনাটির নীচে ছোট অক্ষরে লেখা—‘অরিন্দম ও অরুণের জন্য, মা।’

তার চোখ ভিজে উঠল।

কিন্তু ঠিক তখনই সে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করল।

খেলনাটির গায়ে ধুলো জমে আছে, কিন্তু ছেলেটির হাত থেকে পড়ার পর মেঝেতে কোনও পায়ের ছাপ নেই।

সে মেঘলার দিকে তাকাল।

“আমরা যা দেখলাম, তার ব্যাখ্যা এখনও জানি না। কিন্তু এই খেলনাটি বাস্তব। ছবিটাও বাস্তব হতে পারে। আমাদের জানতে হবে, আমার যমজ ভাইয়ের কথা পরিবার কেন গোপন করেছিল।”

মেঘলা বলল, “তাহলে প্রথমে তোমার জন্মের নথি খুঁজতে হবে।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“আর তারপর কালো সেতুতে যেতে হবে।”

২. জন্মের নথিতে যে মিথ্যে ছিল

ভোর পাঁচটার দিকে তাঁরা শালবনপুর স্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়লেন। রাতের অদ্ভুত ঘটনার পরও অরিন্দমের মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনও দীর্ঘ স্বপ্নের মধ্যে রয়েছে।

কিন্তু তার পকেটে রাখা ছবিটি বাস্তব। লাল খেলনা ট্রেনটিও বাস্তব।

সকালে তাঁরা শহরের পুরোনো পুরসভা কার্যালয়ে পৌঁছলেন। সেখানে অরিন্দমের জন্মের নথি থাকার কথা। অরিন্দম আগে কখনও এই নথি সংগ্রহ করার চেষ্টা করেনি, কারণ পরিবারের সবাই বলেছিল, তার জন্মের সময় কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর একজন প্রবীণ কর্মচারী পুরোনো রেজিস্টার বের করে আনলেন।

জন্মের তারিখ: ১৭ মার্চ, ১৯৯৬।

প্রথম শিশুর নাম: অরিন্দম রায়।

দ্বিতীয় শিশুর নাম: অরুণ রায়।

দু’জনের জন্মের ব্যবধান: চার মিনিট।

অরিন্দমের হাত কেঁপে উঠল।

“দ্বিতীয় শিশুর মৃত্যুর কোনও নথি আছে?”

কর্মচারী অন্য একটি রেজিস্টার খুললেন।

সেখানে লেখা ছিল, দ্বিতীয় শিশুকে জন্মের পর চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। মৃত্যুর নথি নেই।

অরিন্দম ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল।

“তাহলে সবাই কেন বলেছিল, সে জন্মের পরেই মারা গিয়েছিল?”

কর্মচারী অসহায়ভাবে বললেন, “আমি শুধু নথি দেখাতে পারি। কেন এমন বলা হয়েছিল, তা জানি না।”

অরিন্দম নিজের ফোনে নথির ছবি তুলে নিল।

ঠিক তখন তার ফোনে একটি কল এল। নম্বরটি অচেনা।

“হ্যালো?”

ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধ পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।

“তুমি অবশেষে জন্মের নথি খুঁজে পেয়েছ?”

অরিন্দম চমকে উঠল।

“আপনি কে?”

“আমার নাম ড. শৈলেন বসু। আমি তোমার জন্মের সময় হাসপাতালে কর্মরত ছিলাম।”

“আপনি কি আমার যমজ ভাইকে চিনতেন?”

“হ্যাঁ। আর আমি জানি, তাকে কেন তোমাদের পরিবার থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।”

অরিন্দম উঠে দাঁড়াল।

“কেন?”

“ফোনে সব বলা সম্ভব নয়। তুমি যদি সত্য জানতে চাও, আজ বিকেল চারটায় পুরোনো মাতৃসদনে এসো। তবে একা এসো না।”

কল কেটে গেল।

মেঘলা বলল, “আমরা যাব।”

অরিন্দম তার দিকে তাকাল।

“তুমি কি মনে করো, এই লোকটি বিশ্বাসযোগ্য?”

“না। কিন্তু তাঁর কাছে এমন তথ্য থাকতে পারে, যা আমাদের দরকার। আমরা প্রমাণ যাচাই করব।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, এই রহস্যের সমাধান হয়তো কোনও ভূতুড়ে ট্রেনে নেই।

সমাধান লুকিয়ে আছে মানুষের তৈরি নথি, গোপন সিদ্ধান্ত এবং বহু বছরের অপরাধবোধের মধ্যে।

৩. ডাক্তারের স্বীকারোক্তি

পুরোনো মাতৃসদনটি শহরের এক নির্জন প্রান্তে। বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভবনটির বেশিরভাগ অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। শুধু একটি ছোট অফিসঘর এখনও ব্যবহারযোগ্য।

বিকেল চারটায় অরিন্দম ও মেঘলা সেখানে পৌঁছলেন।

ঘরের ভিতরে বসে ছিলেন সাদা চুলের এক বৃদ্ধ। পাশে একটি লাঠি, টেবিলে কয়েকটি পুরোনো ফাইল।

“আপনি অরিন্দম?” বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন।

“হ্যাঁ।”

“তোমাকে দেখে তোমার বাবার কথা মনে পড়ছে।”

অরিন্দম সরাসরি বলল, “আমার যমজ ভাই কোথায়?”

ড. শৈলেন বসু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোমার ভাই জন্মের পর মারা যায়নি। সে জীবিত ছিল। কিন্তু জন্মের সময় তার শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। তাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তোমার বাবা-মায়ের মধ্যে একটি গুরুতর বিরোধ শুরু হয়।”

“কী নিয়ে?”

“তোমার বাবা চেয়েছিলেন, দুই সন্তানকে একসঙ্গে বড় করতে। কিন্তু তোমার মা তখন দীর্ঘদিনের একটি অসুস্থতায় ভুগছিলেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তোমার বাবার এক আত্মীয় নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি অরুণকে দত্তক নিতে চেয়েছিলেন।”

অরিন্দমের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“তাহলে আমার ভাইকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল?”

“হ্যাঁ। কিন্তু ব্যাপারটি সঠিক আইনি প্রক্রিয়ায় হয়নি। তোমার মা শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলাতে চেয়েছিলেন। তখন পরিবারের মধ্যে ঝামেলা শুরু হয়। কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষ বিষয়টি গোপন রাখেন।”

“আমার বাবার ভূমিকা কী ছিল?”

ডাক্তার চোখ নামিয়ে বললেন, “তোমার বাবা প্রথমে রাজি হয়েছিলেন। পরে অনুতপ্ত হন। তিনি অরুণকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে শিশুটিকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”

“কোথায়?”

“এ তথ্য আমার কাছে নেই। আমি শুধু চিকিৎসার নথি দেখেছিলাম। পরে আমাকে চুপ থাকতে বলা হয়।”

অরিন্দম টেবিলে হাত রাখল।

“আপনি এত বছর চুপ ছিলেন কেন?”

“আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমার চাকরি, সুনাম, পরিবার—সব হারানোর ভয় ছিল। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, নীরব থেকেও আমি অন্যায়ের অংশ হয়েছি।”

তিনি একটি ফাইল এগিয়ে দিলেন।

“এখানে তোমার ভাইকে স্থানান্তরের কাগজ রয়েছে। ঠিকানাটি পুরোনো, কিন্তু শেষ যে প্রতিষ্ঠানটির নাম আছে, সেটি শালবনপুরের কাছেই।”

অরিন্দম কাগজটি পড়ল।

প্রতিষ্ঠানের নাম—শিশু কল্যাণ নিবাস।

ঠিকানার পাশে লাল কালিতে লেখা ছিল—‘পরবর্তীকালে বন্ধ’।

মেঘলা বলল, “আমাদের সেখানে যেতে হবে।”

ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

“যাও। কিন্তু মনে রেখো, তোমার ভাইয়ের জীবন তোমার কল্পনার মতো নাও হতে পারে। তাকে খুঁজে পেলেই তোমরা আবার ছোটবেলার মতো হয়ে যাবে, এমন নয়।”

অরিন্দম ধীরে বলল, “আমি তাকে ফিরে পেতে চাই না শুধু। আমি জানতে চাই, তার সঙ্গে কী ঘটেছিল।”

ডাক্তার তার দিকে তাকালেন।

“তাহলে তুমি সত্য জানার জন্য প্রস্তুত।”

৪. শিশু কল্যাণ নিবাস

শিশু কল্যাণ নিবাস ছিল শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে একটি পুরোনো ভবন। একসময় সেখানে অনাথ ও পরিত্যক্ত শিশুদের রাখা হতো। এখন ভবনটি সরকারি দপ্তরের গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অরিন্দম ও মেঘলা সেখানে পৌঁছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর সঙ্গে কথা বললেন।

প্রথমে কেউ পুরোনো নথি খুঁজে দিতে রাজি হলো না। পরে ড. শৈলেন বসুর দেওয়া কাগজ দেখে একজন কর্মী পুরোনো রেজিস্টারের ঘরে তাঁদের নিয়ে গেলেন।

ধুলোমাখা আলমারি থেকে একটি রেজিস্টার বের করা হলো।

অরুণ রায়ের নাম সেখানে রয়েছে।

কিন্তু তার পাশে একটি নোট লেখা—

‘দত্তক গ্রহণকারী পরিবার শিশুটিকে অন্য জেলায় স্থানান্তর করেছে।’

পরিবারের নাম: সেনগুপ্ত পরিবার।

ঠিকানা: কলকাতা।

অরিন্দমের মনে পড়ল, তার বাবার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন দেবাশিস সেনগুপ্ত। তিনি কলকাতায় থাকতেন এবং বহু বছর আগে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

“আমাদের কলকাতায় ফিরতে হবে,” অরিন্দম বলল।

কর্মচারী তাঁদের থামিয়ে দিলেন।

“একটা কথা বলি? এই নথির সঙ্গে আরেকটি কাগজ আছে। সেটি বহু বছর আগে কেউ এখানে জমা দিয়েছিল।”

কাগজটি ছিল একটি চিঠি।

‘অরুণ,

তুমি হয়তো কোনও দিন জানতে পারবে না, তোমার জন্মের পর কী ঘটেছিল। কিন্তু মনে রেখো, তোমার মা তোমাকে ছেড়ে দিতে চাননি। তিনি শেষ পর্যন্ত তোমাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন।

যদি কোনও দিন তোমার ভাই তোমাকে খুঁজতে আসে, তাকে বলবে, তোমাদের আলাদা করার সিদ্ধান্ত তোমাদের কোনও দোষের জন্য নেওয়া হয়নি।

তোমাদের দু’জনের জীবনই তোমাদের নিজেদের।

— এক অপরাধী মানুষ।’

চিঠির নীচে কোনও নাম নেই।

অরিন্দম চিঠিটি পড়ে দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল।

“এই চিঠি কে লিখেছিল?” মেঘলা জিজ্ঞাসা করল।

কর্মচারী বললেন, “জানি না। তবে চিঠিটি এখানে জমা পড়েছিল ২০০৪ সালে।”

অরিন্দম মাথা তুলল।

“২০০৪? আমি তখন আট বছরের। দিদি তখন হাসপাতালের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। আর এই চিঠির তারিখের সঙ্গে ১৩০৭ নম্বর ট্রেনের কোনও সম্পর্ক আছে কি?”

মেঘলা বলল, “হয়তো সরাসরি নয়। কিন্তু তোমার পরিবারের ইতিহাস আর নন্দিতার তদন্তের মধ্যে কোনও যোগ থাকতে পারে।”

অরিন্দম কাগজটি পকেটে রাখল।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি ছবি এল।

অচেনা নম্বর থেকে পাঠানো।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি বৃদ্ধ লোক জানলার পাশে বসে আছেন। তাঁর হাতে একটি ছোট্ট খেলনা ট্রেন।

ছবির নীচে লেখা—

‘তোমার ভাইকে খুঁজতে হলে কালো সেতুতে ফিরে যাও। সেখানে তোমার দিদি অপেক্ষা করছে।’

অরিন্দম মেঘলার দিকে তাকাল।

“আমাদের আবার কালো সেতুতে যেতে হবে।”

৫. কালো সেতুর নীচে

পরদিন ভোরে তাঁরা কালো সেতুর কাছে পৌঁছলেন।

সেতুটি এখন পরিত্যক্ত। পুরোনো রেললাইন তুলে নেওয়া হয়েছে, শুধু কিছু মরচে ধরা কাঠের স্লিপার পড়ে আছে। নিচে সরু নদী। বর্ষার জল কমে গিয়ে পাথর দেখা যাচ্ছে।

অরিন্দম চারদিকে তাকাল।

“এখানে তো কোনও ট্রেন চলতে পারে না।”

মেঘলা বলল, “সরকারি লাইনে নয়। কিন্তু সাত বছর আগের দুর্ঘটনার নথি অনুযায়ী, ওই রাতে এখানে একটি বিশেষ ট্রেন ছিল।”

তারা সেতুর নীচে নামল।

একটি ভাঙা কংক্রিটের স্তম্ভের পাশে অরিন্দম একটি ধাতব ফলক দেখতে পেল। ফলকটি মাটির মধ্যে অর্ধেক পোঁতা।

সে মাটি সরিয়ে ফলকটি বের করল।

তাতে লেখা—

‘দুর্ঘটনাস্থল: ১৩ অক্টোবর, ২০১৯। তদন্তাধীন।’

অরিন্দমের মাথায় তারিখটি ঘুরতে লাগল। নন্দিতা নিখোঁজ হয়েছিল সাত বছর আগে, ২০১৯ সালে। অথচ যাত্রী তালিকায় ১৩ অক্টোবর, ২০২৬-এর তারিখও রয়েছে।

একই তারিখের পুনরাবৃত্তি।

একই সময়।

রাত ১২টা ১৭ মিনিট।

মেঘলা নদীর ধারে কিছু দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেল।

একটি ছোট ধাতব বাক্স পাথরের নীচে লুকিয়ে রাখা। বাক্সের তালা ভাঙা, ভিতরে কয়েকটি কাগজ এবং একটি অডিও রেকর্ডার।

অরিন্দম রেকর্ডারটি চালু করল।

প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর একজন পুরুষের কণ্ঠ।

“আমার নাম দেবব্রত দত্ত। আমি শালবনপুর স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার। আজ ১৩ অক্টোবর, ২০১৯। রাত ১১টা ৪৫ মিনিট।”

মেঘলা চোখ বন্ধ করল। বাবার কণ্ঠ সে কোনও দিন ভুলতে পারেনি।

রেকর্ডিং চলতে লাগল।

“আজ একটি বিশেষ ট্রেনকে নির্ধারিত লাইনের বদলে পুরোনো লাইনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশটি লিখিত নয়। আমাকে বলা হয়েছে, ট্রেনে কয়েকজন যাত্রীকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু যাত্রী তালিকায় তাঁদের নাম নেই। আমি আপত্তি জানিয়েছি।”

তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

“ট্রেনটি এখন স্টেশন ছেড়েছে। চালককে শেষ মুহূর্তে সিগন্যাল বদলানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি আশঙ্কা করছি, সামনে বিপদ রয়েছে। যদি এই রেকর্ডিং কেউ পায়, তবে জানবে—এই দুর্ঘটনা কোনও সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না।”

রেকর্ডিংয়ে হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল। তারপর শব্দ থেমে গেল।

মেঘলা কাঁদতে শুরু করল।

“বাবা জানতেন! তিনি দুর্ঘটনা আটকাতে পারেননি!”

অরিন্দম রেকর্ডারটি বন্ধ করল না। শেষ অংশে আবার কণ্ঠ শোনা গেল।

“আরেকটি কথা। নন্দিতা রায়কে এই ঘটনার সঙ্গে জড়ানো হয়েছে। কিন্তু সে কোনও অপরাধ করেনি। সে শুধু যাত্রীদের তালিকা দেখেছিল। তাকে বাঁচাতে হলে আসল নথি খুঁজে বের করতে হবে।”

তারপর দেবব্রত দত্তের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।

“যদি অরিন্দম রায় কখনও এই রেকর্ডিং শোনে, তাকে বলবে, তার ভাই জীবিত। কিন্তু তার ভাইকে খুঁজে পাওয়ার আগে তাকে জানতে হবে, কেন তাদের আলাদা করা হয়েছিল। কারণ এই ঘটনায় একই মানুষ বারবার নিজের পরিচয় বদলেছে।”

রেকর্ডিং শেষ।

অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

“একই মানুষ বারবার নিজের পরিচয় বদলেছে—এর অর্থ কী?”

মেঘলা বলল, “হয়তো কেউ মিথ্যা নামে কাজ করছিল।”

“কিন্তু কে?”

ঠিক তখন সেতুর ওপর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“আমি।”

দু’জনেই উপরে তাকাল।

একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন।

লম্বা চুল। কপালে ছোট্ট কালো টিপ।

নন্দিতা।

এবার তাঁর হাতে কোনও কাগজ নেই, জানলার কাচও নেই। তিনি সরাসরি তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন।

অরিন্দম ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“দিদি?”

নন্দিতা সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেন।

“হ্যাঁ, ভাই। আমি নন্দিতা।”

অরিন্দম ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল।

নন্দিতা কাঁদতে লাগলেন। সাত বছরের বিচ্ছেদ যেন সেই মুহূর্তে সমস্ত বাঁধ ভেঙে দিল।

“তুমি কোথায় ছিলে?” অরিন্দম বলল। “কেন ফিরে এলে না?”

নন্দিতা তার মুখ দু’হাতে ধরে বললেন, “সব বলব। কিন্তু আগে তোমাকে একটা কথা জানতে হবে।”

“কী কথা?”

নন্দিতা মেঘলার দিকে তাকালেন।

“দেবব্রত দত্তের মৃত্যু কোনও দুর্ঘটনায় হয়নি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।”

মেঘলা পিছিয়ে গেল।

“কী বলছেন?”

নন্দিতা ধীরে বললেন, “আর যে মানুষটি এই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, সে এখনও জীবিত।”

৬. শেষ যাত্রার আসল যাত্রী

নন্দিতা তাঁদের কালো সেতুর পাশের একটি ছোট বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বাড়িটি ছিল পরিত্যক্ত রেলওয়ে কর্মচারীদের থাকার জায়গা। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না, সেখানে কেউ থাকে।

ঘরের ভিতরে পুরোনো কাগজ, মানচিত্র এবং কয়েকটি কম্পিউটার রাখা। দেওয়ালে বিভিন্ন তারিখের সংবাদপত্রের কাটিং।

অরিন্দম বলল, “তুমি এত বছর এখানে ছিলে?”

“না। আমি বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে ছিলাম। এই বাড়িটি ব্যবহার করতাম শুধু প্রমাণ রাখার জন্য।”

মেঘলা বাবার রেকর্ডিংটি টেবিলে রাখল।

“আমার বাবার সঙ্গে কী হয়েছিল?”

নন্দিতা চেয়ারে বসে পড়লেন।

“দেবব্রতবাবু দুর্ঘটনার রাতে ট্রেনটিকে ভুল লাইনে পাঠানোর নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি জানতেন, ট্রেনে এমন কয়েকজন মানুষ ছিলেন, যাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছিল। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন একটি বড় আর্থিক দুর্নীতির গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। সেই সাক্ষীকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার নামে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।”

অরিন্দম বলল, “তাহলে ট্রেনের রহস্য আসলে একটি গোপন পরিবহণ ব্যবস্থা?”

“প্রথমে তাই ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনার পর ঘটনাটি আরও জটিল হয়ে যায়। ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। কয়েকজন মারা যান, কয়েকজন বেঁচে যান। বেঁচে যাওয়া লোকদের মধ্যে দেবব্রতবাবুও ছিলেন। তিনি দুর্ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।”

মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে তাঁকে কে হত্যা করল?”

নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “রেলওয়ের তৎকালীন এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিকাশ সেন। তিনি বিশেষ ট্রেনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার দায় চাপা দিতে তিনি নথি বদলান, সাক্ষীদের আলাদা করে দেন এবং কয়েকজনকে নিখোঁজ বলে দেখানোর ব্যবস্থা করেন।”

“তিনি এখন কোথায়?” অরিন্দম জিজ্ঞাসা করল।

“অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে কলকাতায় থাকেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ তখন আমাদের হাতে ছিল না।”

নন্দিতা একটি ফাইল বের করলেন।

“এই ফাইলে ট্রেনের আসল যাত্রী তালিকা, সিগন্যাল পরিবর্তনের নির্দেশ এবং দুর্ঘটনার পরে তৈরি করা ভুয়ো রিপোর্টের অনুলিপি আছে। দেবব্রতবাবু এগুলো সংগ্রহ করেছিলেন।”

মেঘলা ফাইলটি খুলে বাবার স্বাক্ষর দেখল।

“তাহলে এত বছর ধরে যে ট্রেনকে আমরা দেখেছি, তার রহস্য কী?”

নন্দিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“সবকিছু একসঙ্গে ঘটেনি। প্রথম দিকে আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, ওই ট্রেন আবার ফিরে আসে। দুর্ঘটনার রাতের কিছু দৃশ্য আমার মনে এত গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, বারবার মনে হতো, আমি ট্রেনটিকে দেখছি। দীর্ঘদিন ঘুমের অভাব, ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে থাকলে মানুষের উপলব্ধিতে এমন প্রভাব পড়তে পারে। পরে বুঝেছি, স্টেশনের কিছু পুরোনো কর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে এই ভয়কে ব্যবহার করত।”

অরিন্দম বলল, “তাহলে জানলার ভিতরে তোমাকে দেখা যাওয়া?”

“সেটি কীভাবে ঘটেছিল, আমি নিশ্চিত নই। স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রজেকশন ব্যবস্থা ছিল। পরে কেউ সেটিকে ব্যবহার করেছে কি না, তা তদন্ত করতে হবে। আর কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা এখনও আমাদের জানা নেই। কিন্তু অজানা বলেই তাকে অতিপ্রাকৃত বলে মেনে নেওয়ার দরকার নেই।”

মেঘলা বলল, “আমার বাবাকে আমি শেষবার দেখেছিলাম সেই ট্রেনে।”

নন্দিতা তার হাত ধরলেন।

“তুমি তাঁকে দেখেছিলে বলে তোমার কষ্ট বা স্মৃতি মিথ্যা হয়ে যায় না। কিন্তু সেই দৃশ্যের অর্থ বোঝার জন্য আমাদের প্রমাণ দরকার। আমরা জানি, তিনি দুর্ঘটনার পর বেঁচে ছিলেন। আমরা জানি, তাঁর রেকর্ডিং রয়েছে। কিন্তু তাঁর শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য আরও তদন্ত দরকার।”

অরিন্দম হঠাৎ বলল, “আমার ভাই অরুণ কোথায়?”

নন্দিতা মাথা নীচু করলেন।

“আমি জানি, সে বেঁচে আছে। তাকে কলকাতার একটি পরিবার দত্তক নিয়েছিল। কিন্তু পরে সেই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি বহু বছর ধরে তাকে খুঁজেছি।”

“তাহলে কাল রাতে যে ছেলেটিকে দেখলাম?”

“আমি জানি না। তুমি সত্যিই তাকে দেখেছ, নাকি ক্লান্তি ও মানসিক চাপের কারণে তোমার চোখে এমন দৃশ্য এসেছে, তা এখন বলা সম্ভব নয়। তবে তোমার ভাইয়ের অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। সেটাই আমাদের অনুসন্ধানের ভিত্তি হওয়া উচিত।”

অরিন্দম চুপ করে গেল।

তার এত দিনের রহস্যের একটি বড় অংশের উত্তর মিলেছে। কিন্তু সবচেয়ে ব্যক্তিগত প্রশ্নটির উত্তর এখনও বাকি।

তার ভাই কোথায়?

আর সেই ভাই কি এখনও তাকে মনে রেখেছে?

৭. বিকাশ সেনের মুখোমুখি

নন্দিতার দেওয়া নথিগুলি যাচাই করার জন্য অরিন্দম তার সাংবাদিক বন্ধু সৌরভের সাহায্য নিল। পাশাপাশি একজন আইনজীবীর মাধ্যমে পুলিশকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানো হলো। নথির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পুরোনো রেলওয়ে রেকর্ড, হাসপাতালের কাগজ এবং সরকারি তদন্তের ফাইল সংগ্রহ করা শুরু হলো।

তদন্তকারীরা প্রথমে বিষয়টিকে পুরোনো, প্রমাণহীন অভিযোগ বলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেবব্রত দত্তের রেকর্ডিং, সিগন্যাল রেজিস্টার এবং নন্দিতার সংগ্রহ করা নথির মধ্যে মিল পাওয়া গেল।

এরপর বিকাশ সেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হলো।

অরিন্দম ও নন্দিতা আইনজীবীর উপস্থিতিতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।

বিকাশ সেনের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। পরিপাটি পোশাক, শান্ত মুখ, কথাবার্তায় আত্মবিশ্বাস। প্রথমে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করলেন।

“এই নথি জাল হতে পারে,” তিনি বললেন। “আমি কোনও গোপন ট্রেন চালানোর নির্দেশ দিইনি।”

অরিন্দম টেবিলে সিগন্যাল পরিবর্তনের নথি রাখল।

“এখানে আপনার স্বাক্ষর রয়েছে।”

“স্বাক্ষর জাল করা কঠিন নয়।”

নন্দিতা এবার কথা বললেন।

“দেবব্রত দত্ত আপনাকে ফোন করেছিলেন দুর্ঘটনার আগে। সেই ফোনের রেকর্ডও রয়েছে।”

বিকাশ সেনের মুখের ভাব সামান্য বদলে গেল।

“আমি বহু বছর আগে অবসর নিয়েছি। এত পুরোনো ঘটনা আমার মনে নেই।”

অরিন্দম বলল, “আপনি কি দেবব্রত দত্তকে চিনতেন?”

“অনেক কর্মচারীকে চিনতাম।”

“তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে কিছু জানেন?”

“না।”

নন্দিতা একটি ছবি বের করলেন। ছবিতে বিকাশ সেনের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দেবব্রত দত্ত। ছবিটি দুর্ঘটনার কয়েক মাস আগে তোলা।

“আপনি বলেছিলেন, তাঁকে মনে নেই। কিন্তু এই ছবিতে আপনারা একসঙ্গে আছেন।”

বিকাশ সেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ছবি দিয়ে অপরাধ প্রমাণ হয় না।”

“ঠিক বলেছেন,” অরিন্দম বলল। “তাই আমরা ছবি নয়, সব প্রমাণ একসঙ্গে তদন্তকারীদের হাতে দিয়েছি।”

বিকাশ সেন এবার আর কিছু বললেন না।

সেদিন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে পুরোনো দুর্ঘটনার নথি বদল, প্রমাণ নষ্ট করা এবং সম্ভাব্য অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়।

নন্দিতা বাইরে এসে বললেন, “এটা শেষ নয়।”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“আমি জানি। কিন্তু এবার অন্তত সত্যটা কাগজে রয়েছে। কেউ সহজে মুছে ফেলতে পারবে না।”

৮. অরুণের সন্ধানে

দুর্ঘটনার তদন্ত নতুন করে শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে অরিন্দম একটি ফোন পেল।

ফোন করেছিলেন কলকাতার এক বৃদ্ধ আইনজীবী। তাঁর কাছে দেবাশিস সেনগুপ্তের পুরোনো নথি ছিল। তিনি জানালেন, অরুণ রায়কে দত্তক নেওয়ার পরে তাঁর নাম বদলে রাখা হয়েছিল—অরুণাভ সেনগুপ্ত।

বহু বছর আগে দেবাশিসবাবুর পরিবার অন্য শহরে চলে যায়। অরুণাভ বড় হয়ে একজন সংগীতশিক্ষক হন। পরে তিনি উত্তরবঙ্গে চলে যান।

বর্তমান ঠিকানা ছিল শিলিগুড়ির কাছে একটি ছোট সংগীত বিদ্যালয়।

অরিন্দম আর দেরি করল না। নন্দিতাকে সঙ্গে নিয়ে সে উত্তরবঙ্গে গেল।

সংগীত বিদ্যালয়টি ছিল একটি পুরোনো বাড়ির একতলায়। দরজার বাইরে ছোট একটি ফলকে লেখা—‘সুরবীথি সংগীতশিক্ষা কেন্দ্র’।

ভিতর থেকে হারমোনিয়ামের সুর ভেসে আসছিল।

একজন যুবক ছাত্রদের গান শেখাচ্ছিলেন। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। মুখের গঠন অরিন্দমের মতো, চোখের কোণে একই ভাঁজ।

লোকটি ক্লাস শেষ করে তাঁদের দিকে এগিয়ে এলেন।

“আপনারা কাকে খুঁজছেন?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

নন্দিতা এগিয়ে এলেন।

“অরুণাভ?”

লোকটি থমকে গেল।

“আপনি আমার নাম জানেন কীভাবে?”

নন্দিতার চোখে জল এসে গেল।

“আমি তোমার দিদি নন্দিতা। আর এই যে দাঁড়িয়ে আছে, সে তোমার যমজ ভাই অরিন্দম।”

অরুণাভ দীর্ঘক্ষণ তাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন, “আমার তো কোনও ভাই নেই।”

অরিন্দম পকেট থেকে পুরোনো ছবিটি বের করল।

দুই শিশুর ছবি।

“এই ছবিটি দেখো।”

অরুণাভ ছবিটি হাতে নিয়ে বসে পড়লেন। তাঁর আঙুল কাঁপছিল।

“এটা কোথায় পেলে?”

“শালবনপুর স্টেশনে।”

অরুণাভ ছবির পিছনের লেখাটি পড়লেন।

‘অরিন্দম ও অরুণের জন্য, মা।’

তাঁর চোখে জল এসে গেল।

“ছোটবেলায় আমি প্রায়ই একটি স্বপ্ন দেখতাম,” তিনি বললেন। “একটি ছেলে আমার পাশে বসে খেলনা ট্রেন নিয়ে খেলছে। আমি তাকে দাদা বলে ডাকছি। কিন্তু বড় হওয়ার পর সবাই বলেছে, এগুলো আমার কল্পনা।”

অরিন্দম ধীরে তাঁর পাশে বসল।

“আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু তোমাকে আমার ভাই বলে মেনে নিতে হবে, এমন কোনও দাবি করতে আসিনি। তুমি চাইলে আমরা একসঙ্গে বসে নথিগুলো দেখতে পারি। তুমি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে।”

অরুণাভ তার দিকে তাকালেন।

“তুমি এত বছর আমাকে খুঁজেছ?”

“আমি জানতামই না, তোমাকে খুঁজতে হবে। সত্যিটা আমিও সম্প্রতি জেনেছি।”

নন্দিতা দু’জনের হাত একসঙ্গে ধরলেন।

“তোমাদের আলাদা করা হয়েছিল বড়দের সিদ্ধান্তে। তোমাদের কারও দোষ ছিল না।”

অরুণাভ ধীরে বললেন, “আমি কি তোমাদের সঙ্গে কলকাতায় যেতে পারি?”

অরিন্দমের মুখে প্রথমবারের মতো স্বস্তির হাসি ফুটল।

“অবশ্যই। তবে তোমার কাজ, তোমার জীবন—সবকিছু তোমার নিজের থাকবে। আমরা শুধু নতুন করে পরিচিত হব।”

অরুণাভ মাথা নাড়লেন।

“আমার মনে হয়, সেটাই ঠিক।”

৯. শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী

এক বছর পরে শালবনপুর স্টেশনে একটি ছোট স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হলো। সাত বছর আগের দুর্ঘটনায় নিহতদের নাম সংগ্রহ করে একটি স্মারক ফলক তৈরি করা হয়েছে। যাঁরা নিখোঁজ হয়েছিলেন, তাঁদের নামও সেখানে লেখা।

দেবব্রত দত্তের নামের পাশে লেখা—

‘সত্য প্রকাশের জন্য যিনি নিজের নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করেছিলেন।’

তদন্তে বহু বাধা এসেছে। কিছু নথি এখনও পাওয়া যায়নি। কয়েকজন সাক্ষী মারা গেছেন। বিকাশ সেনের বিরুদ্ধে মামলার বিচারও শেষ হয়নি। কিন্তু দুর্ঘটনাটি আর কোনও গুজব নয়। সরকারি তদন্তের নথিতে এখন তার উল্লেখ রয়েছে।

মেঘলা বাবার স্মারকের সামনে একটি ফুল রাখল।

“বাবা, আমি জানি না তোমার শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল। কিন্তু তোমার কণ্ঠ আমি শুনেছি। তোমার সংগ্রামের প্রমাণ পেয়েছি। তুমি হারিয়ে যাওনি—তোমার সত্য এত দিন চাপা ছিল।”

নন্দিতা তার কাঁধে হাত রাখলেন।

অরিন্দম ও অরুণাভ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

অরুণাভ বলল, “তুমি কি এখনও সেই ট্রেনটিকে দেখতে পাও?”

অরিন্দম মৃদু হাসল।

“না। এখন আর কোনও ট্রেনকে ভয় পাই না।”

“তাহলে সব রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে?”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“না। কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও নেই। কিন্তু আমি বুঝেছি, প্রতিটি অজানা ঘটনার ব্যাখ্যা অলৌকিক কিছু হতে হবে না। কখনও অপরাধ, কখনও ভয়, কখনও স্মৃতির ভুল—আর কখনও এমন তথ্য, যা আমরা এখনও জানি না।”

অরুণাভ বলল, “তুমি কি আমাকে দাদা বলে ডাকতে পারবে?”

অরিন্দম তার কাঁধে হাত রাখল।

“আমি ছোটবেলায় তোকে চিনতাম কি না, তা মনে নেই। কিন্তু আজ থেকে তোকে চিনতে আমার কোনও অসুবিধা নেই।”

দু’জনেই হেসে উঠল।

ঠিক তখনই স্টেশনের মাইক্রোফোনে ঘোষণা শোনা গেল—

“যাত্রীদের জানানো যাচ্ছে, রামপুর জংশনগামী শেষ লোকাল ট্রেনটি কয়েক মিনিটের মধ্যে প্ল্যাটফর্ম নম্বর দুইয়ে প্রবেশ করবে।”

সবাই স্বাভাবিকভাবে প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু অরিন্দমের চোখ একবার চলে গেল দূরের পুরোনো লাইনের দিকে। যে লাইনটি বহু বছর আগে তুলে ফেলা হয়েছে, সেখানে এখন শুধু ঘাস জন্মেছে।

কুয়াশার মধ্যে সে যেন এক মুহূর্তের জন্য একটি ট্রেনের আলো দেখতে পেল।

শেষ কামরার জানলায় একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটি পুরোনো রেলওয়ে পরিচয়পত্র।

অরিন্দম চোখ মুছে আবার তাকাল।

কেউ নেই।

শুধু বাতাসে ঘাস নড়ছে।

সে আর কাউকে ডাকল না। কোনও ছবি তুলল না। কাউকে বললও না যে সে কী দেখেছে।

কারণ, এবার সে জানত—দেখা আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।

কিছুক্ষণ পরে নন্দিতা এসে তার পাশে দাঁড়ালেন।

“কী দেখছিস?”

অরিন্দম হেসে বলল, “কিছু না। পুরোনো লাইনের দিকে তাকাচ্ছিলাম।”

নন্দিতা তার হাত ধরলেন।

“চল। ট্রেন এসে গেছে।”

চারজন একসঙ্গে প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে লাগল—অরিন্দম, নন্দিতা, অরুণাভ আর মেঘলা।

সেদিন রাত ১২টা ১৭ মিনিটে কোনও অদ্ভুত ট্রেন আসেনি।

কোনও অচেনা কণ্ঠ মাইক্রোফোনে কথা বলেনি।

কোনও মৃত মানুষ জানলার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকেনি।

এসেছিল একটি সাধারণ লোকাল ট্রেন। তার কামরায় ছিল ক্লান্ত যাত্রী, ঘুমন্ত শিশু, বাড়ি ফেরার তাড়া আর জীবনের স্বাভাবিক শব্দ।

অরিন্দম ট্রেনে উঠে জানলার পাশে বসল।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

সাত বছর ধরে যে রহস্য তাকে তাড়া করেছে, তার সমস্ত উত্তর সে পায়নি। কিন্তু সে তার দিদিকে ফিরে পেয়েছে, ভাইকে চিনেছে, আর বাবার অতীত সম্পর্কে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

সবচেয়ে বড় কথা, সে আর নিজের স্মৃতি বা ভয়ের হাতে বন্দি নয়।

ট্রেনটি অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে চলল।

অরিন্দম জানলার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। তার পাশে বসে আছে অরুণাভ। সামনের সিটে নন্দিতা ও মেঘলা কথা বলছে।

চারটি মানুষ। চারটি আলাদা জীবন। আর একটি নতুন শুরু।

অরিন্দম চোখ বন্ধ করল।

এবার তার মনে কোনও অজানা ট্রেনের হুইসেল বাজল না।

বাজল বাড়ি ফেরার স্বাভাবিক শব্দ।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *