শহরের পুরোনো নাট্যমঞ্চটির নাম ছিল ‘রঙ্গমহল’। একসময় সেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাটক হত। দর্শকদের ভিড়ে সামনের রাস্তা পর্যন্ত জমজমাট হয়ে থাকত। কিন্তু সময় বদলেছে। সিনেমা হল, টেলিভিশন আর মোবাইলের যুগে নাট্যমঞ্চের জনপ্রিয়তা কমতে কমতে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
রঙ্গমহলের টিকিটঘরে কাজ করতেন প্রভাসবাবু। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে তিনি দর্শকদের হাতে টিকিট তুলে দিয়েছেন। তাঁর কাছে প্রতিটি টিকিট ছিল একটি গল্পের প্রবেশপত্র। কেউ প্রথমবার নাটক দেখতে আসত, কেউ পরিবার নিয়ে, আবার কেউ প্রিয় অভিনেতার অভিনয় দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াত।
কিন্তু সেদিন সকালে নাট্যমঞ্চের মালিক এসে জানালেন, আর্থিক ক্ষতির কারণে আগামী রবিবারের পর রঙ্গমহল চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।
খবরটি শুনে প্রভাসবাবু চুপ করে রইলেন। এত বছর ধরে যে জায়গাটিকে নিজের জীবনের অংশ বলে মনে করেছেন, সেটি আর থাকবে না—এই কথা মেনে নিতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল।
পরদিন থেকে তিনি লক্ষ করলেন, টিকিটের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। পুরোনো দর্শকেরা খবর পেয়ে শেষবারের মতো নাটক দেখতে আসতে চাইছেন। ফোনে, কাউন্টারে, এমনকি চিঠি পাঠিয়েও অনেকে টিকিট চাইছেন।
শেষ দিনের জন্য নির্ধারিত নাটকটির নাম ছিল ‘ফিরে দেখা’। বহু বছর আগে এই নাটকেই অভিনয় করে বিখ্যাত হয়েছিলেন অভিনেতা অমরেশ সেন। বর্তমানে তিনি অসুস্থতার কারণে অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন।
রবিবারের শোয়ের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেল। শুধু একটি টিকিট বাকি রইল। সেটি ছিল প্রথম সারির মাঝখানের আসনের।
প্রভাসবাবু টিকিটটি কাউন্টারের কাচের নিচে রেখে দিলেন। কেন জানি না, তাঁর মনে হচ্ছিল, টিকিটটি কোনও বিশেষ মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে।
শনিবার বিকেলে এক কিশোর কাউন্টারে এল। তার নাম ঈশান। পরনে সাধারণ জামাকাপড়, হাতে একটি পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।
সে জিজ্ঞাসা করল, “কাকু, কালকের নাটকের একটা টিকিট হবে?”
প্রভাসবাবু বললেন, “সব বিক্রি হয়ে গেছে। শুধু একটি আছে। কিন্তু সেটি প্রথম সারির। দামও একটু বেশি।”
ঈশান ব্যাগ থেকে কয়েকটি নোট ও কয়েন বের করল। সব মিলিয়ে টিকিটের দামের চেয়ে কম।
“আর কিছু টাকা নেই কাকু,” সে বলল। “আমি অনেক দিন ধরে এই নাটকটা দেখতে চাইছি।”
প্রভাসবাবু তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এত আগ্রহ কেন?”
ঈশান একটু ইতস্তত করে বলল, “আমার দাদু আগে নাটক করতেন। তিনি বলতেন, রঙ্গমহলের মঞ্চে একদিন অভিনয় করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু সংসারের দায়িত্বে আর হয়ে ওঠেনি। দাদু এখন আর ভালো দেখতে পান না। তবু এই নাট্যমঞ্চের গল্প আমাকে প্রায়ই শোনান। কাল আমি নাটকটা দেখে তাঁকে সব বলব।”
প্রভাসবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর টিকিটটি তুলে ঈশানের হাতে দিয়ে বললেন, “টাকাটা থাক। টিকিটটি তোমার।”
ঈশান অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু কাকু, আপনি কি নিজের পকেট থেকে টাকা দেবেন?”
“না,” প্রভাসবাবু হেসে বললেন, “আজ এই টিকিটের দাম আমি অন্যভাবে পেলাম।”
রবিবার সন্ধ্যায় নাট্যমঞ্চ দর্শকে পূর্ণ হয়ে গেল। মঞ্চে আলো জ্বলল, পর্দা উঠল, অভিনেতারা অভিনয় শুরু করলেন। দর্শকদের মধ্যে ঈশানও বসেছিল। নাটকের প্রতিটি দৃশ্য সে মন দিয়ে দেখছিল।
শেষ দৃশ্যে নায়ক দীর্ঘদিন পর নিজের বাড়িতে ফিরে আসে। মঞ্চের সংলাপ শুনে ঈশানের চোখ ভিজে উঠল। সে যেন নিজের দাদুর না-পাওয়া স্বপ্নের কথা ভাবছিল।
নাটক শেষ হলে দর্শকেরা দাঁড়িয়ে হাততালি দিলেন। অনেকের চোখে জল। অভিনেতারা মঞ্চে এসে শেষবারের মতো দর্শকদের অভিবাদন জানালেন।
পর্দা নামার পর ঈশান টিকিটঘরের কাছে ফিরে এল। তার হাতে সেই টিকিটটি।
সে বলল, “কাকু, দাদুর জন্য নাটকের কিছু সংলাপ লিখে নিয়েছি। বাড়ি গিয়ে তাঁকে পড়ে শোনাব। আজ বুঝলাম, একটা গল্প শুধু মঞ্চে শেষ হয় না।”
প্রভাসবাবু টিকিটটি হাতে নিলেন। তার পেছনে ঈশান নিজের হাতে লিখেছে—‘স্বপ্ন দেখার জন্য কোনও মঞ্চই ছোট নয়।’
প্রভাসবাবু টিকিটটি যত্ন করে নিজের ডায়েরিতে রেখে দিলেন।
পরদিন রঙ্গমহলের দরজায় তালা পড়ল। নামিয়ে ফেলা হল পুরোনো সাইনবোর্ড। টিকিটঘরের জানালাও বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু প্রভাসবাবুর ডায়েরিতে রয়ে গেল সেই শেষ টিকিটটি। তিনি জানতেন, একদিন হয়তো কেউ আর রঙ্গমহলের কথা মনে রাখবে না। তবু একটি কিশোরের মনে নাটকের প্রতি যে ভালোবাসা জন্মেছে, সেটি অন্য কোনও মঞ্চে, অন্য কোনও গল্পে আবার আলো জ্বালাতে পারে।
বহু বছর পর ঈশান নিজেই একটি ছোট নাট্যদল গড়ে তুলেছিল। তাদের প্রথম নাটকের নাম ছিল ‘শেষ টিকিট’। মঞ্চের এক কোণে সে একটি পুরোনো টিকিট বাঁধিয়ে রেখেছিল—রঙ্গমহলের স্মৃতিতে।
দর্শকদের কেউ জানতেন না, সেই টিকিটের পেছনে লেখা কয়েকটি শব্দ একদিন এক কিশোরের স্বপ্নকে নতুন পথ দেখিয়েছিল।
শিক্ষা: কোনও স্বপ্নের মূল্য শুধু তার সফলতায় নয়, অন্যের মনে সেই স্বপ্নের আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।