Categories
গল্প বিবিধ

শেষ বীজের আশ্চর্য বাগান।

১. ছোট্ট বাক্সের ভিতরে

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার একটি গ্রামে থাকত এগারো বছরের মেয়ে পিউ। তার বাবা বাজারে সবজি বিক্রি করতেন, আর মা বাড়ির উঠোনে শাকপাতা ও কয়েক রকমের ফুলের গাছ লাগাতেন। তাদের বাড়িটি ছিল ছোট, কিন্তু উঠোনের এক কোণে মায়ের যত্নে তৈরি বাগানটি ছিল পিউয়ের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

সেই বাগানে গাঁদা, জবা, তুলসী, লঙ্কা, বেগুন আর কয়েকটি টমেটোর গাছ ছিল। স্কুল থেকে ফিরে পিউ প্রথমেই বাগানে যেত। কখনও গাছে জল দিত, কখনও শুকনো পাতা সরাত, আবার কখনও নতুন কুঁড়ি দেখে মাকে ডেকে আনত।

একদিন পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে পিউ একটি ছোট টিনের বাক্স পেল। বাক্সটির গায়ে মরচে পড়েছিল। খুলতেই দেখা গেল, ভিতরে কয়েকটি কাগজের পুঁটলি। প্রতিটি পুঁটলিতে আলাদা আলাদা বীজ রাখা।

পিউ অবাক হয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করল, —মা, এগুলো কীসের বীজ?

মা বাক্সটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—এগুলো তোর ঠাকুমার জমানো বীজ। উনি নিজের বাগানের গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে রেখে দিতেন। বলতেন, ভালো বীজ কখনও অবহেলায় ফেলে দিতে নেই।

পিউ একটির পর একটি পুঁটলি খুলে দেখতে লাগল। কোথাও গোল ছোট বীজ, কোথাও লম্বাটে, কোথাও আবার শুকনো ফলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বীজ।

একটি পুঁটলির ওপর বিবর্ণ কালিতে লেখা ছিল—‘দেশি ফুল’।

পিউ জিজ্ঞাসা করল, —এই বীজগুলো থেকে কি আবার গাছ হবে?

মা বললেন, —বীজ ভালো থাকলে, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অবশ্যই হতে পারে। তবে কোন বীজ কতটা ভালো আছে, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

সেদিন থেকেই পিউয়ের মাথায় নতুন চিন্তা ঢুকে গেল। এই বীজগুলো থেকে যদি আবার গাছ জন্মায়, তাহলে ঠাকুমার পুরোনো বাগানের কিছু স্মৃতি কি ফিরিয়ে আনা যাবে?

২. হারিয়ে যাওয়া গাছের গল্প

রাতে খাওয়ার পরে পিউ ঠাকুমার পাশে বসে বাক্সটির কথা তুলল। ঠাকুমা তখন অনেক বয়স্ক। ধীরে ধীরে কথা বলতেন, কিন্তু পুরোনো দিনের গল্প বলতে ভালোবাসতেন।

পিউ জানতে চাইল, —ঠাকুমা, তুমি এই বীজগুলো কোথা থেকে পেয়েছিলে?

ঠাকুমা বললেন, —কিছু নিজের গাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম। কিছু পেয়েছিলাম প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। তখন আমাদের পাড়ায় প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ছোটখাটো বাগান ছিল। কেউ লাউ লাগাত, কেউ শিম, কেউ আবার নানা রঙের ফুল। এক বাড়ির গাছের বীজ অন্য বাড়িতে যেত। এভাবেই অনেক গাছ ছড়িয়ে পড়ত।

পিউ বলল, —এখন তো অনেক বাড়িতে আর বাগান নেই।

ঠাকুমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—জায়গা কমেছে, মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। অনেকে বাজার থেকে চারা কিনে লাগায়। তাতে দোষ নেই। কিন্তু নিজের গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করার অভ্যাসটা কমে গেছে।

পিউ বাক্সের দিকে তাকিয়ে বলল, —আমি কি এই বীজগুলো লাগিয়ে দেখতে পারি?

ঠাকুমা হাসলেন।

—অবশ্যই পারিস। তবে মনে রাখিস, সব বীজ থেকে গাছ হবে না। কোনো বীজ নষ্টও হতে পারে। গাছ জন্মালেও সব গাছ একই রকম হবে না। যত্ন নিতে হবে, আর ফলাফল দেখে শিখতে হবে।

পিউয়ের মনে হলো, সে যেন একটি গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু এই গুপ্তধন সোনা বা রুপোর নয়। এর মূল্য লুকিয়ে রয়েছে ভবিষ্যতের সবুজ পাতায়।

৩. প্রথম চারা

পরদিন স্কুল থেকে ফিরে পিউ কাজ শুরু করল। বাড়ির উঠোনে কয়েকটি পুরোনো টব ছিল। মা সেগুলো পরিষ্কার করে দিলেন। পিউ মাটি তৈরি করল এবং ঠাকুমার নির্দেশ অনুযায়ী কয়েকটি বীজ আলাদা পাত্রে লাগাল।

সে প্রতিটি পাত্রে ছোট কাগজের লেবেল লাগিয়ে দিল। কোন পাত্রে কোন বীজ আছে, কোথা থেকে পাওয়া গেছে, কবে লাগানো হয়েছে—সব লিখে রাখল।

কয়েক দিন কেটে গেল।

প্রতিদিন সকালে পিউ ছুটে এসে টবগুলোর দিকে তাকাত। প্রথম সপ্তাহে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। দ্বিতীয় সপ্তাহেও কয়েকটি পাত্রে মাটি একই রকম রইল।

একদিন পিউ মন খারাপ করে বলল, —মা, বীজগুলো বুঝি নষ্ট হয়ে গেছে!

মা বললেন, —হতে পারে। আবার কিছু বীজের অঙ্কুর বেরোতে বেশি সময়ও লাগতে পারে। মাটিতে অতিরিক্ত জল দিস না। একটু ধৈর্য ধর।

পিউ অপেক্ষা করতে লাগল।

এক সকালে সে দেখতে পেল, একটি টবের মাটি ফুঁড়ে ছোট্ট সবুজ অঙ্কুর মাথা তুলেছে।

তার আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, যেন উঠোনে নতুন অতিথি এসেছে।

—ঠাকুমা! দেখো! গাছ বেরিয়েছে!

ঠাকুমা ধীরে ধীরে এসে টবটির সামনে বসলেন। অঙ্কুরটির দিকে তাকিয়ে তাঁর মুখে কোমল হাসি ফুটে উঠল।

—দেখলি, পুরোনো বীজের মধ্যেও নতুন জীবনের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকতে পারে।

সেই দিন পিউ তার খাতায় লিখল—‘প্রথম অঙ্কুর দেখা গেল।’

৪. একা বাগান নয়

পিউয়ের ছোট্ট পরীক্ষার কথা স্কুলে ছড়িয়ে পড়ল। তার বন্ধু রিমি একদিন জিজ্ঞাসা করল, —তুই কি সত্যিই পুরোনো বীজ থেকে গাছ জন্মাচ্ছিস?

পিউ বলল, —কিছু বীজ থেকে অঙ্কুর বেরিয়েছে। কিছু এখনও বেরোয়নি।

রিমি বলল, —আমাদের বাড়িতেও ঠাকুমার রাখা কয়েকটি বীজ আছে। আমি নিয়ে আসব?

পিউয়ের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

—অবশ্যই! তবে আগে জেনে নিতে হবে সেগুলো কীসের বীজ। আর সব বীজ একসঙ্গে না লাগিয়ে আলাদা করে পরীক্ষা করব।

কয়েক দিনের মধ্যে অয়ন, সোহম এবং আরও কয়েকজন বন্ধু তাদের বাড়ি থেকে বীজ নিয়ে এল। কারও কাছে শিমের বীজ, কারও কাছে লাউয়ের বীজ, কারও কাছে আবার পুরোনো ফুলের বীজ।

বীজের উৎস ও পরিচয় জানা থাকলে তা নথিভুক্ত করা হলো। যেগুলোর পরিচয় জানা গেল না, সেগুলোর নাম দেওয়া হলো ‘অজানা নমুনা’। তারা অনুমান করে কোনো বীজের নাম লিখল না।

স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষিকা মধুমিতাদেবী বিষয়টি শুনে তাদের উৎসাহ দিলেন।

তিনি বললেন, —তোমরা একটি ছোট বীজ-সংগ্রহ প্রকল্প শুরু করতে পারো। তবে বীজের পরিচয়, সংগ্রহের সময়, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং অঙ্কুরোদ্গমের ফলাফল লিখে রাখতে হবে।

পিউ জিজ্ঞাসা করল, —ম্যাডাম, আমরা কি স্কুলের এক কোণে বাগান করতে পারি?

শিক্ষিকা বললেন, —প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে, স্কুলের কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে করা যেতে পারে।

এভাবেই একটি টিনের বাক্সের গল্প ধীরে ধীরে অনেকের কাজে পরিণত হতে শুরু করল।

৫. বাধার দিন

স্কুলের বাগান তৈরি করার অনুমতি পাওয়া গেল। স্কুলের পেছনে একটি ছোট জায়গা পরিষ্কার করা হলো। শিক্ষকেরা গাছ লাগানোর উপযোগী স্থান নির্বাচন করতে সাহায্য করলেন। কোথায় রোদ বেশি পড়ে, কোথায় জল জমে থাকে, কোথায় বেড়া দেওয়া দরকার—সব খুঁটিয়ে দেখা হলো।

শুরুতে কাজ ভালোই চলছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরে সমস্যা দেখা দিল।

কিছু চারা শুকিয়ে যেতে লাগল। কয়েকটি টবের মাটি অতিরিক্ত ভিজে থাকছিল। কিছু গাছের পাতায় পোকা দেখা গেল।

বন্ধুরা চিন্তিত হয়ে পড়ল।

সোহম বলল, —আমাদের বাগানটা বুঝি নষ্ট হয়ে যাবে।

পিউও হতাশ হলো। সে ভেবেছিল, বীজ লাগালেই সব গাছ সুন্দর হয়ে উঠবে। এখন বুঝতে পারছে, গাছ বাঁচিয়ে রাখার কাজ আরও কঠিন।

মধুমিতাদেবী এসে গাছগুলো দেখলেন।

তিনি বললেন, —প্রথমেই সব গাছের জন্য একই ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক নয়। কোথায় জল বেশি হচ্ছে, কোন গাছ কতটা রোদ পাচ্ছে, পাতায় কী ধরনের ক্ষতি দেখা যাচ্ছে—এসব আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ছাত্রছাত্রীরা আবার খাতা খুলল।

তারা লক্ষ্য করল, এক কোণে বৃষ্টির জল জমে থাকছে। কয়েকটি টব এমন জায়গায় রাখা হয়েছে, যেখানে পর্যাপ্ত আলো পৌঁছায় না। কিছু গাছে জল দেওয়ার সময়ও ঠিক রাখা হয়নি।

তারা জায়গার ব্যবস্থা বদলাল, জল নিষ্কাশনের দিকে নজর দিল এবং শিক্ষিকার পরামর্শ অনুযায়ী গাছের যত্ন নিতে শুরু করল।

সব চারা বাঁচল না। কয়েকটি গাছ হারিয়ে গেল।

পিউ মন খারাপ করলেও খাতায় সেই ফলাফলও লিখে রাখল।

ঠাকুমা বললেন, —যে গাছ বাঁচল না, তার কথাও লিখে রাখবি। শুধু সাফল্যের গল্প লিখলে শেখা সম্পূর্ণ হয় না।

৬. বীজ বিনিময়ের দিন

বাগান একটু বড় হওয়ার পরে পিউ একটি নতুন প্রস্তাব দিল। গ্রামের মানুষ নিজেদের বাড়ির গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে একে অন্যের সঙ্গে বিনিময় করতে পারেন।

প্রথমে অনেকে বিষয়টি নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখালেন না। কেউ বললেন, বীজ সংগ্রহ করার সময় কোথায়? কেউ বললেন, বাজার থেকে চারা কিনলেই তো হয়।

তবু পিউ হাল ছাড়ল না।

সে মধুমিতাদেবীর সাহায্যে স্কুলে একটি ‘বীজ পরিচয় ও বিনিময় দিবস’ আয়োজনের পরিকল্পনা করল। সেখানে বীজ নিয়ে আসা প্রত্যেককে যতটা সম্ভব তার পরিচয় এবং সংগ্রহের উৎস জানাতে বলা হলো।

অনুষ্ঠানের দিন স্কুলের উঠোনে ছোট ছোট টেবিল সাজানো হলো। কোথাও সবজির বীজ, কোথাও ফুলের বীজ, কোথাও আবার শুকনো ফলের মধ্যে রাখা বীজ প্রদর্শন করা হলো।

এক বৃদ্ধা নিজের বাড়ির বহু পুরোনো একটি ফুলগাছের বীজ নিয়ে এলেন। তিনি বললেন, তাঁর মা সেই গাছ লাগাতেন। বহু বছর ধরে তিনি নিজের গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে রেখেছেন।

পিউ বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, —আপনি এত বছর ধরে বীজগুলো সংরক্ষণ করেছেন?

বৃদ্ধা বললেন, —সব বীজ যে এখনও ভালো আছে, তা বলতে পারব না। তবে যত্ন করে রেখেছি। তোমরা চাইলে কিছু বীজ পরীক্ষা করে দেখতে পারো।

সেদিন অনেক মানুষ বীজ বিনিময় করলেন। কেউ নতুন বীজ পেলেন, কেউ নিজের বাগানের গল্প বললেন, কেউ আবার গাছের যত্নের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন।

পিউ বুঝল, বীজের মূল্য শুধু তার থেকে জন্মানো গাছের মধ্যে নেই। বীজের সঙ্গে মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জ্ঞানও জড়িয়ে থাকে।

৭. একটি বিশেষ গাছ

ঠাকুমার টিনের বাক্সে থাকা ‘দেশি ফুল’ লেখা পুঁটলিটির কয়েকটি বীজ থেকে অবশেষে একটি গাছ জন্মেছিল। গাছটি ধীরে ধীরে বড় হলো। তার পাতার আকৃতি অন্য গাছগুলোর থেকে আলাদা ছিল।

পিউ প্রতিদিন সেটির যত্ন নিত। তবে সে জানত না গাছটি ঠিক কোন প্রজাতির।

একদিন গাছে ছোট ছোট কুঁড়ি দেখা দিল। কয়েক দিন পরে ফুল ফুটল। ফুলগুলো ছিল হালকা বেগুনি রঙের, মাঝখানে সূক্ষ্ম হলুদ অংশ।

পিউ আনন্দে ঠাকুমাকে ডাকল।

ঠাকুমা ফুলটি দেখে বললেন, —এই রংটা আমার মনে আছে। ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির পেছনে এমন ফুল ফুটত। কিন্তু নামটা আর মনে করতে পারছি না।

পিউ ফুলটির ছবি তুলল এবং শিক্ষিকার সাহায্যে গাছটি শনাক্ত করার চেষ্টা করল। তারা বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল, পরিচিত মানুষের কাছেও জানতে চাইল। তবু নিশ্চিত পরিচয় পাওয়া গেল না।

মধুমিতাদেবী বললেন, —নাম না জানলে অনুমান করে লিখবে না। আপাতত ‘অশনাক্ত ফুলগাছ’ হিসেবে নথিভুক্ত করো। পরে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা যেতে পারে।

পিউ কথাটি মেনে নিল।

ফুলটি ফুটে থাকার সময় স্কুলের অনেক ছাত্রছাত্রী সেটি দেখতে এল। কেউ ছবি আঁকল, কেউ গাছটির উচ্চতা মাপল, কেউ ফুল ফোটার তারিখ লিখে রাখল।

গাছটির পরিচয় তখনও অজানা ছিল, কিন্তু সেটি তাদের কৌতূহল আর অনুসন্ধানের নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল।

৮. গ্রামের বাগান

এক বছরের মধ্যে স্কুলের বাগানটি গ্রামের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠল। শিশুরা সেখানে গাছের বৃদ্ধি দেখতে আসত। শিক্ষকরা বিজ্ঞান ও পরিবেশের পাঠ বোঝাতে বাগান ব্যবহার করতেন। গ্রামের কয়েকজন মানুষও নিজেদের বাড়িতে ছোট বাগান তৈরি করতে শুরু করলেন।

পিউয়ের বাবা প্রথমে এসব কাজকে শিশুদের শখ বলে মনে করতেন। কিন্তু একদিন তিনি দেখলেন, স্কুলের বাগান থেকে উৎপন্ন কিছু শাকসবজি শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে স্কুলের রান্নাঘরে ব্যবহার করা হয়েছে। বাগানের যত্ন নিতে গিয়ে শিশুরা মাটি, জল, আলো এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধি সম্পর্কে হাতে-কলমে শিখছে।

বাড়ি ফিরে তিনি মেয়েকে বললেন, —তোর এই বাগান শুধু ফুল দেখার জায়গা নয়। এখানে তোরা কত কিছু শিখছিস!

পিউ বলল, —হ্যাঁ বাবা। আমরা শিখেছি, বীজ লাগানোই শেষ কাজ নয়। গাছের প্রয়োজন বুঝতে হয়। আর যে বীজের পরিচয় জানি না, তার নাম বানিয়ে লেখা যায় না।

বাবা হাসলেন।

—তাহলে তুই শুধু গাছ লাগাতে শেখিসনি, সত্যি কথা বলার শিক্ষাও পেয়েছিস।

পিউ মাথা নাড়ল।

বাগানের পাশে একটি ছোট ফলকে লেখা হলো—

‘প্রতিটি বীজ একটি সম্ভাবনা। যত্ন, জ্ঞান ও ধৈর্য তাকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়।’

৯. ঠাকুমার শেষ উপহার

শীতের এক সকালে ঠাকুমা পিউকে নিজের কাছে ডাকলেন। তাঁর হাতে ছিল আরেকটি ছোট কাপড়ের পুঁটলি।

—এটা তোর জন্য রেখেছি।

পিউ পুঁটলিটি খুলে দেখল, তার মধ্যে কয়েকটি বীজ।

—এগুলো কীসের?

ঠাকুমা বললেন, —এগুলো আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। নামটা মনে আছে—এক ধরনের শাক। তবে ঠিক কোন জাত, সেটা নিশ্চিত নই। তুই চাইলে এগুলোও পরীক্ষা করে দেখতে পারিস।

পিউ পুঁটলিটি হাতে নিয়ে বলল, —আমি যত্ন করে রাখব। কিন্তু সব বীজ যে অঙ্কুরিত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

ঠাকুমা হাসলেন।

—নিশ্চয়তা না থাকলেও চেষ্টা করা যায়। শুধু মনে রাখিস, বীজ বাঁচিয়ে রাখার অর্থ কেবল পুরোনো জিনিস আঁকড়ে থাকা নয়। যা কাজে লাগে, যা থেকে শেখা যায়, তা পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

পিউ ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরল।

তার মনে হলো, এই ছোট্ট পুঁটলির মধ্যে শুধু বীজ নেই। রয়েছে পরিবারের ইতিহাস, ভালোবাসা এবং ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস।

১০. নতুন ঋতুর অপেক্ষা

পরের বসন্তে স্কুলের বাগানে নতুন চারা লাগানো হলো। পুরোনো বীজ থেকে জন্মানো কিছু গাছ ফুল দিল, কিছু গাছে ফল ধরল, আবার কিছু বীজ আর অঙ্কুরিত হলো না।

পিউ সব ফলাফল নথিভুক্ত করল। কোন বীজ থেকে গাছ হলো, কোনটি হলো না, কোন গাছের জন্য কী ধরনের যত্ন দরকার—সব লেখা রইল খাতায়।

বাগানটি আর শুধু পিউয়ের প্রকল্প ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল গ্রামের শিশুদের শেখার জায়গা।

একদিন এক ছোট্ট ছাত্র এসে পিউকে বলল, —দিদি, আমি আমার বাড়িতেও বীজ লাগাব। আমার ঠাকুমার কাছেও অনেক পুরোনো বীজ আছে।

পিউ হেসে বলল, —লাগাবি, তবে আগে বীজগুলো কীসের তা জানার চেষ্টা করবি। আর গাছের যত্ন নিতে ভুলবি না।

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

সন্ধ্যায় পিউ বাগানের পাশে বসে ছিল। বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছিল। মাটির ওপর পড়ে থাকা একটি শুকনো ফুলের মধ্যে কয়েকটি বীজ দেখা যাচ্ছিল।

সে সেগুলো সাবধানে সংগ্রহ করল।

তার মনে হলো, জীবনের অনেক বড় কাজের শুরু হয় খুব ছোট কিছু দিয়ে। একটি বীজ, একটি প্রশ্ন, একটি যত্নশীল হাত—এসবের মধ্যেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।

ঠাকুমার সেই পুরোনো টিনের বাক্সটি এখন আর একা আলমারিতে পড়ে নেই। তার বীজ থেকে জন্মেছে গাছ, গাছ থেকে এসেছে নতুন বীজ, আর সেই বীজের গল্প ছড়িয়ে পড়েছে অনেক বাড়িতে।

পিউ জানত, সব বীজ বাঁচবে না, সব গাছ ফুল দেবে না। তবু সে বীজ সংগ্রহ করে যাবে, গাছ লাগাবে, আর যা শিখবে তা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেবে।

কারণ তার কাছে বাগান মানে শুধু সবুজ পাতা আর রঙিন ফুল নয়। বাগান মানে ধৈর্য, দায়িত্ব, স্মৃতি এবং আগামী দিনের জন্য কিছু ভালো রেখে যাওয়ার চেষ্টা।

শিক্ষা: ছোট কোনো সম্পদকেও অবহেলা করা উচিত নয়। জ্ঞান, যত্ন ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি ছোট বীজও ভবিষ্যতের জন্য বড় সম্ভাবনার জন্ম দিতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *