Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী – (দ্বিতীয় পর্ব: মৃতের সাক্ষী)।

১. যে নামটি মনে পড়ে না

“মেঘলাই আমাকে মেরেছিল।”

ট্রেনের শেষ কামরায় দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির কথাটা অর্কের মাথার ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

একদিকে মৃত বাবার মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা টিকিট পরীক্ষক। অন্যদিকে জানালার ওপারে দেখা সেই ছোট্ট ছেলে, যে দাবি করছে সে অর্কের ভাই। আর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘলা, যে বলছে তার ভাইকে সে নিজের হাতে কবর দিয়েছে।

তিনটি বক্তব্যের মধ্যে কোনটি সত্যি?

ট্রেনটি দ্রুত এগিয়ে চলেছে। অথচ অদ্ভুতভাবে অর্কের মনে হচ্ছে, প্ল্যাটফর্মটি যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। হলুদ বাতি, বন্ধ টিকিট কাউন্টার, দূরে অন্ধকারে ডুবে থাকা গাছ—সবকিছুই একই রকম।

শুধু মেঘলা আর সেখানে নেই।

“মেঘলা!” অর্ক চিৎকার করে উঠল।

কোনও উত্তর এল না।

টিকিট পরীক্ষক তার কাঁধে হাত রাখলেন।

“চল, ভিতরে আয়।”

অর্ক হাত সরিয়ে দিল।

“আপনি আমার বাবা নন।”

লোকটি মৃদু হাসলেন।

“তা হলে তোর মনে আছে, তোর বাবা কেমন দেখতে ছিলেন?”

অর্ক উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল।

তার বাবার মুখ মনে পড়ছে। কপালের ডান দিকে ছোট্ট একটি কাটা দাগ, নাকের ওপর চশমা, হাসলে গালের কাছে ভাঁজ পড়ত। কিন্তু এই লোকটির মুখেও ঠিক সেই একই দাগ, একই চশমা, একই ভাঁজ।

অর্কের বাবা মারা যাওয়ার আগের দিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তাকে বলেছিলেন, “কোনও দিন যদি নিজের স্মৃতির ওপর সন্দেহ হয়, তবে সেই মানুষটাকে বিশ্বাস করিস না, যে তোকে সব উত্তর একসঙ্গে দিয়ে দিতে চায়।”

সেদিন কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি অর্ক।

আজ বুঝতে পারছে, কথাটা এই রাতের জন্যই বলা হয়েছিল কি না, তা সে জানে না।

“আমার বাবা পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন,” অর্ক বলল। “আমি তাঁর শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলাম।”

টিকিট পরীক্ষক মাথা নাড়লেন।

“ঠিক। তুই তাঁর শরীরকে কবর দিয়েছিলি। কিন্তু তোর মনে কি তাঁর সব স্মৃতি আছে?”

অর্ক চুপ করে গেল।

লোকটি বললেন, “তোর বাবার সঙ্গে শেষবার কী কথা হয়েছিল, মনে আছে?”

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

হাসপাতালের সাদা ঘর। জানালার পাশে অক্সিজেনের নল। বাবার হাত তার হাতে।

তারপর একটি কণ্ঠস্বর—

‘নীলকে ফিরিয়ে আনিস না।’

অর্ক চোখ খুলল।

“নীল কে?”

টিকিট পরীক্ষকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুই নামটা মনে করতে পেরেছিস?”

“আমি কোনও নীলকে চিনি না।”

“তাহলে তোর স্মৃতির দরজা এখনও বন্ধ।”

লোকটি কামরার দিকে এগিয়ে গেলেন।

“চল। তোকে এমন কিছু দেখাতে হবে, যা দেখার পর তুই আর আগের মতো থাকতে পারবি না।”

অর্ক তাঁর পিছু নিল না। বরং জানালার বাইরে তাকাল।

ট্রেনটি কোথাও যাচ্ছে না। অন্তত তার পরিচিত পৃথিবীর কোনও জায়গায় নয়। জানালার বাইরে কখনও বিস্তীর্ণ নদী, কখনও শ্মশান, কখনও জনমানবহীন শহর দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি দৃশ্য কয়েক সেকেন্ডের জন্য ফুটে উঠছে, তারপর অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে।

হঠাৎ একটি দৃশ্যের সামনে এসে ট্রেনের গতি কমে গেল।

একটি ছোট্ট বাড়ি।

বাড়ির উঠোনে দুটো শিশু খেলছে।

একজন অর্ক।

অন্যজন তারই মতো দেখতে, শুধু একটু ছোট।

দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন মহিলা হাসছেন।

অর্কের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

মহিলাটি তার মা।

কিন্তু ছবিতে থাকা দ্বিতীয় শিশুটিকে সে চেনে না।

টিকিট পরীক্ষক পিছন থেকে বললেন, “তোর মনে পড়ছে?”

অর্ক কাঁপা গলায় বলল, “ও কে?”

“তোর ভাই।”

“তার নাম কী?”

লোকটি উত্তর দিলেন না।

জানালার দৃশ্যটি বদলে গেল। এবার দেখা গেল, বাড়ির উঠোনে একটি ছোট্ট কাঠের বাক্স রাখা। অর্কের মা বাক্সটির পাশে বসে কাঁদছেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে অর্কের বাবা, হাতে একটি লাল সুতো।

ছোট্ট অর্ক মায়ের আঁচল ধরে বলছে, “মা, ও কোথায় গেল?”

মা কোনও উত্তর দিচ্ছেন না।

তারপর বাবা অর্ককে কোলে তুলে নিয়ে বলছেন, “ও আর ফিরবে না।”

দৃশ্যটি মিলিয়ে গেল।

অর্ক জানালার কাচে হাত রাখল।

“আমার ভাইয়ের কী হয়েছিল?”

টিকিট পরীক্ষক বললেন, “এই প্রশ্নের উত্তর জানতেই তো তুই এসেছিস।”

২. মেঘলার ফিরে আসা

ট্রেনের ভেতরে কোনও যাত্রী কথা বলছে না। প্রত্যেকেই নিজের আসনে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। কারও হাতে পুরোনো চিঠি, কারও কোলে শিশুর খেলনা, কারও মুঠোয় শুকনো ফুল।

একজন বৃদ্ধ নিজের পাশে খালি আসনের সঙ্গে কথা বলছেন। একজন তরুণী বারবার ফোনের পর্দা জ্বালিয়ে দেখছেন, অথচ ফোনে কোনও নেটওয়ার্ক নেই। এক বৃদ্ধা নিজের আঁচলে ঢাকা একটি ছবিকে আদর করছেন।

অর্ক বুঝতে পারল, এই যাত্রীরা প্রত্যেকেই কাউকে খুঁজছেন।

কিন্তু কাউকে কি সত্যিই খুঁজে পাওয়া যায়?

সে একটি খালি আসনে বসতে যাচ্ছিল, এমন সময় সামনের কামরার দরজায় মেঘলাকে দেখতে পেল।

মেয়েটি দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাত ধরে টেনে নিল।

“আপনি এখানে কেন উঠলেন?”

“আমার ভাইয়ের কথা জানতে হবে।”

“ও আপনার ভাই নয়!”

“আপনি কী করে জানেন?”

মেঘলা চারদিকে তাকাল। তারপর নিচু গলায় বলল, “কারণ এই ট্রেনে যে শিশুটি নিজেকে আপনার ভাই বলে পরিচয় দিচ্ছে, সে আমার ভাইয়ের মুখ ধার করেছে।”

অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।

“আপনার ভাইয়ের মুখ?”

“নীলের মৃত্যু হয়েছিল সাত বছর আগে। আমি নিজে তাকে কবর দিয়েছি। কিন্তু তার মৃত্যুর আগের রাতে যে ঘটনা ঘটেছিল, সেটা কাউকে বলতে পারিনি।”

“কী ঘটনা?”

মেঘলা জানালার পাশে বসে পড়ল।

“সেদিন নীল আমাকে বলেছিল, আমাদের বাড়িতে আরেকজন থাকে। এমন একজন, যাকে শুধু সে দেখতে পায়। সে নীলের সঙ্গে খেলা করে, গল্প বলে, আর বারবার বলে যে তাকে তার বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে হবে।”

“আপনি কী করেছিলেন?”

“আমি ভেবেছিলাম, ছোটদের কল্পনা। ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু রাত দুটো নাগাদ আমার ঘুম ভেঙে যায়। দেখি, নীল বিছানায় নেই। বাড়ির সদর দরজা খোলা। আমি বাইরে বেরিয়ে ওকে খুঁজতে গিয়ে দেখি, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা ট্রেন।”

“কিন্তু আপনার বাড়ির সামনে তো রেললাইন নেই!”

“সেটাই তো। ট্রেনটা রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। তার দরজার সামনে সেই লোকটা—যাকে শুধু নীল দেখতে পেত। সে নীলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।”

“আপনি নীলকে ফিরিয়ে আনেননি?”

মেঘলা মাথা নিচু করল।

“আমি ছুটে গিয়েছিলাম। নীলকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলাম। তারপর ট্রেনটা অদৃশ্য হয়ে যায়। ভেবেছিলাম, সব শেষ। কিন্তু পরদিন সকালে নীল নিখোঁজ।”

“আপনি বললেন, ওকে কবর দিয়েছেন।”

“হ্যাঁ। দুদিন পর নদীর ধারে ওর দেহ পাওয়া যায়।”

অর্ক চুপ করে রইল।

মেঘলা বলল, “কিন্তু দেহটা পাওয়ার সময় ওর চোখ খোলা ছিল। আর ওর মুঠোয় ছিল একটা রেলটিকিট। তাতে লেখা ছিল—‘ফেরার যাত্রা’।”

অর্কের পকেটের টিকিটটি যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

“আপনি কি টিকিটটা দেখেছিলেন?”

“হ্যাঁ। আমি সেটা নিজের কাছে রেখেছিলাম। কিন্তু যেদিন থেকে আমি এই ট্রেনে উঠেছি, সেদিন থেকে টিকিটটা আমার কাছে নেই।”

অর্ক নিজের টিকিট বের করল।

“এটা কি সেই টিকিট?”

মেঘলা টিকিটটি দেখেই পিছিয়ে গেল।

“না। এটা অন্য টিকিট।”

“পার্থক্য কী?”

মেঘলা কাঁপা গলায় বলল, “আপনার টিকিটে যাত্রীর নাম লেখা আছে। নীলের টিকিটে কোনও নাম ছিল না।”

“তাহলে?”

“ওর টিকিটে লেখা ছিল—‘যে এখনও জন্মায়নি’।”

অর্কের মাথার মধ্যে যেন কিছু একটা ভেঙে গেল।

“কী বলছেন আপনি?”

মেঘলা তার চোখের দিকে তাকাল।

“আমি জানি না নীল আসলে কে ছিল। আমি শুধু জানি, ও আমার ছোট ভাই ছিল। আর ওর মৃত্যুর পর থেকে আমি এমন সব জায়গায় ঘুরেছি, যেখানে জীবিত মানুষদের যাওয়ার কথা নয়।”

অর্ক হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আপনি সাত বছর ধরে এই ট্রেনে আছেন। তা হলে আজ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলেন কীভাবে?”

মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগে ট্রেনের আলো নিভে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর আলো ফিরলে দেখা গেল, কামরার সব যাত্রী উঠে দাঁড়িয়েছেন।

তাঁরা একসঙ্গে অর্কের দিকে তাকিয়ে আছেন।

একজন বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন, “নতুন যাত্রী এসেছে।”

অন্যজন বললেন, “তার নাম লেখা হয়েছে।”

তৃতীয়জন ফিসফিস করলেন, “এবার দরজা খুলবে।”

মেঘলা অর্কের হাত শক্ত করে ধরল।

“চোখ বন্ধ করুন।”

“কেন?”

“ওরা আপনার মুখ মনে রাখতে চাইছে।”

“তাতে কী হবে?”

মেঘলা উত্তর দিল না। সে অর্ককে নিয়ে কামরার শেষ প্রান্তে ছুটল। সেখানে একটি ছোট দরজা ছিল, যার ওপর লেখা—‘কর্মচারীদের প্রবেশ নিষেধ’।

দরজাটি খুলতেই দেখা গেল, ভেতরে সরু একটি করিডর।

মেঘলা অর্ককে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।

তারপর দরজা বন্ধ করে বলল, “এবার যা বলব, মন দিয়ে শুনুন। এই ট্রেনে তিনটি নিয়ম আছে।”

অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল, “কী নিয়ম?”

“প্রথমত, কোনও যাত্রীকে তার নাম ধরে ডাকবেন না। দ্বিতীয়ত, যে মুখ আপনার পরিচিত বলে মনে হবে, তার চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকাবেন না। তৃতীয়ত, ট্রেন থামলে কখনও প্রথম দরজা দিয়ে নামবেন না।”

“কেন?”

মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগেই করিডরের অন্য প্রান্ত থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“কারণ প্রথম দরজার ওপারে সেই জায়গা, যেখানে মানুষ নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটাকে হারিয়ে ফেলে।”

অর্ক ঘুরে তাকাল।

করিডরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। পরনে কালো কোট, গলায় লাল মাফলার। মুখটি অর্কের কাছে অপরিচিত, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শুনে অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

এই কণ্ঠস্বর সে আগে শুনেছে।

বহু বছর আগে।

একটি দুর্ঘটনার রাতে।

৩. যে রাতের কথা কেউ বলে না

অর্কের বয়স তখন মাত্র দশ। শীতের এক রাতে তার বাবা-মা তাকে নিয়ে গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিলেন। রাস্তায় ঘন কুয়াশা। গাড়ির পেছনের আসনে অর্ক ঘুমিয়ে পড়েছিল।

হঠাৎ ব্রেক কষার শব্দ।

তারপর ধাতব কিছু ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ।

অর্কের মনে আছে, সে চোখ খুলে দেখেছিল গাড়িটি রাস্তার পাশে কাত হয়ে পড়ে আছে। সামনের কাচ ভেঙে গেছে। তার মা চিৎকার করছেন।

বাবা তাকে কোলে তুলে গাড়ির বাইরে নিয়ে এসেছিলেন।

তারপর?

তারপর কিছুই মনে নেই।

বাড়ি ফিরে সবাই বলেছিল, ছোট্ট অর্ক দুর্ঘটনার ধাক্কায় কয়েক ঘণ্টার স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছে। তার বাবা-মা বেঁচে গিয়েছিলেন। গাড়ির চালকও বেঁচে ছিলেন।

কিন্তু দুর্ঘটনার পর থেকে অর্কের বাবা-মা আর কখনও সেই রাত নিয়ে কথা বলেননি।

এখন সেই একই কণ্ঠস্বর আবার তার সামনে।

“তুমি কে?” অর্ক জিজ্ঞেস করল।

যুবকটি হাসল।

“তুমি আমাকে চিনতে পারছ না?”

“না।”

“চিনতে পারবে। একটু সময় দাও।”

মেঘলা অর্কের কানে ফিসফিস করে বলল, “ওর দিকে তাকাবেন না।”

কিন্তু অর্ক চোখ সরাতে পারছিল না।

যুবকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“তোমার বয়স যখন দশ ছিল, তুমি একটা ছেলেকে কথা দিয়েছিলে—কোনও দিন তাকে একা ছেড়ে যাবে না।”

অর্কের মাথার ভেতর ঝড় উঠল।

একটি ছেলের মুখ।

দুটি হাত।

রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট শরীর।

আর অর্কের নিজের কণ্ঠস্বর—

‘তুই ভয় পাস না। আমি তোকে বাড়ি নিয়ে যাব।’

যুবকটি বলল, “তুমি কথা রাখোনি, অর্ক।”

“আমি তোকে চিনি না!”

“তুমি আমাকে ভুলে গেছ। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।”

মেঘলা হঠাৎ যুবকটির সামনে দাঁড়াল।

“ওকে ছেড়ে দাও।”

যুবকটি তার দিকে তাকাল।

“তুমি এখনও নিজের অপরাধ স্বীকার করোনি, মেঘলা।”

মেঘলার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“চুপ কর।”

“তুমি নীলকে বাঁচাতে পারতে।”

“চুপ কর!”

“তুমি দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলে।”

মেঘলা দুহাতে কান চেপে ধরল।

অর্ক তার কাঁধ ধরে বলল, “কী হয়েছে? আপনি কী লুকোচ্ছেন?”

মেঘলা কাঁদতে শুরু করল।

“আমি নীলকে মরতে দিইনি। আমি শুধু—”

তার কথা শেষ হল না।

করিডরের আলো আবার নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে যুবকটির কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“তোমরা দুজনেই একই ভুল করেছ। তোমরা দুজনেই এমন একজনকে বাঁচাতে চেয়েছ, যে তোমাদের পৃথিবীতে কোনও দিন পুরোপুরি ছিল না।”

তারপর একটি দরজা খোলার শব্দ।

আলো ফিরে এলে যুবকটি আর নেই।

মেঘলা মেঝেতে বসে পড়েছে। তার দুই হাত কাঁপছে।

অর্ক তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।

“আপনি কী করেছিলেন?”

মেঘলা চোখ তুলে তাকাল।

“আমি নীলকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য একজনকে হারিয়েছিলাম।”

“কাকে?”

“আমার আরেক ভাইকে।”

অর্কের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমে গেল।

“আপনার আরেক ভাই?”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“নীলের জন্মের আগে আমার একটি ছোট ভাই ছিল। তার নাম ছিল ঋত্বিক। মাত্র চার বছর বয়সে সে মারা যায়। আমাদের বাড়ির কাছের একটি পুকুরে পড়ে গিয়েছিল। নীল তখনও জন্মায়নি।”

“তাহলে নীলের সঙ্গে এই ট্রেনের সম্পর্ক কী?”

“আমি জানি না। কিন্তু নীলের মৃত্যুর পর যখন প্রথম এই ট্রেনে উঠেছিলাম, তখন প্রতিটি কামরায় আমি ঋত্বিককে দেখেছিলাম। সে আমাকে ডাকছিল। বলছিল, ‘দিদি, আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো।’”

অর্ক বলল, “আপনি কি তার সঙ্গে গিয়েছিলেন?”

“না। আমি নীলকে খুঁজছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, যদি নীলকে ফিরিয়ে আনতে পারি, তাহলে ঋত্বিকও ফিরে আসবে।”

“কিন্তু তা হয়নি।”

মেঘলা চোখ মুছল।

“না। বরং যতবার আমি ট্রেন থেকে নামার চেষ্টা করেছি, ততবার ঋত্বিকের মুখটা আরও অস্পষ্ট হয়ে গেছে। এখন তার মুখটাও ঠিকমতো মনে করতে পারি না।”

অর্ক ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, এই ট্রেন শুধু মৃতদের আটকে রাখে না। এটি জীবিতদের স্মৃতিও কেড়ে নেয়।

যে মানুষ যত বেশি মরিয়া হয়ে কাউকে ফিরিয়ে আনতে চায়, ট্রেন তার কাছ থেকে তত বেশি স্মৃতি নিয়ে নেয়।

“আমরা এখান থেকে বেরোব কীভাবে?” অর্ক জিজ্ঞেস করল।

মেঘলা তার দিকে তাকাল।

“একটা উপায় আছে।”

“কী?”

“ট্রেনের শেষ স্টেশনে পৌঁছতে হবে।”

“সেই স্টেশন কোথায়?”

“যেখানে কোনও প্ল্যাটফর্ম নেই, কোনও রেললাইন নেই, কোনও সময়সূচি নেই।”

“তারপর?”

মেঘলা ধীরে ধীরে বলল, “সেখানে প্রত্যেক যাত্রীকে নিজের সবচেয়ে বড় মিথ্যেটা স্বীকার করতে হয়।”

অর্ক কিছু বলল না।

কারণ তার মনে হচ্ছিল, সে নিজেও এমন একটি মিথ্যার মধ্যে বেঁচে আছে, যার কথা সে নিজেই জানে না।

৪. শেষ স্টেশনের ঘোষণা

হঠাৎ ট্রেনের স্পিকারে কর্কশ আওয়াজ হল।

“সম্মানিত যাত্রীবৃন্দ, আপনাদের জানানো যাচ্ছে, পরবর্তী স্টেশন—স্মৃতিপুর। যাঁদের নাম ঘোষণা করা হবে, তাঁরা প্রস্তুত থাকবেন।”

অর্ক আর মেঘলা একে অপরের দিকে তাকাল।

“স্মৃতিপুর?” অর্ক বলল।

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“আমি এই নাম আগে শুনিনি।”

স্পিকারে আবার ঘোষণা হল।

“প্রথম যাত্রী—মেঘলা রায়।”

মেঘলা চোখ বন্ধ করল।

“ওরা আমাকে ডাকছে।”

“আপনি যাবেন না,” অর্ক বলল।

“আমাকে যেতেই হবে।”

“কেন?”

“কারণ সাত বছর আগে আমি এই স্টেশনে পৌঁছেছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পালিয়ে এসেছিলাম।”

অর্ক তার হাত ধরল।

“এবার একা যাবেন না।”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“আপনি বুঝতে পারছেন না। স্মৃতিপুরে কেউ কাউকে সঙ্গে নিতে পারে না। সেখানে প্রত্যেককে একাই দাঁড়াতে হয়।”

ট্রেনের গতি কমতে শুরু করেছে।

জানালার বাইরে অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোনও শহর নেই, কোনও বাড়ি নেই। শুধু অসংখ্য দরজা, যেগুলো শূন্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি দরজার পেছনে ক্ষীণ আলো।

একটি দরজার ওপারে অর্ক নিজের শৈশব দেখতে পেল।

আরেকটির ওপারে তার বাবা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন।

তৃতীয় দরজার ওপারে তার মা কাঁদছেন।

আর সবচেয়ে দূরের দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছোট্ট ছেলেটি, যে নিজেকে তার ভাই বলে দাবি করেছে।

ছেলেটি হাত নেড়ে ডাকছে।

অর্ক এবার তার মুখের দিকে তাকাল।

ছেলেটি হঠাৎ ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ থাকার ইশারা করল।

তারপর কাচের ওপারে নিজের হাত দিয়ে কয়েকটি অক্ষর লিখল—

‘বাবা মিথ্যে বলেছে।’

অর্কের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

ট্রেনটি থেমে গেল।

দরজা খুলে গেল।

কিন্তু বাইরে কোনও স্টেশন নেই।

শুধু একটি বিস্তীর্ণ অন্ধকার মাঠ, তার মাঝখানে একটি পুরোনো ঘড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটা বারোটা দশে আটকে।

মেঘলা উঠে দাঁড়াল।

“আমার সময় হয়েছে।”

অর্ক বলল, “আমি আপনার সঙ্গে যাব।”

মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।

“আপনি যদি আমার সঙ্গে যান, তাহলে আপনার নিজের স্মৃতির দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।”

“তা হলে কী করব?”

“আপনার বাবার কথা মনে করার চেষ্টা করুন। সেই দুর্ঘটনার রাতের কথা। আপনি যা ভুলে গেছেন, তার মধ্যেই হয়তো এই ট্রেনের রহস্য লুকিয়ে আছে।”

মেঘলা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

নামার আগে একবার পিছনে তাকাল।

“আর একটা কথা, অর্ক। আপনার ভাই যদি সত্যিই থাকে, তবে তাকে ফিরিয়ে আনার আগে জানতে হবে, সে কেন হারিয়ে গিয়েছিল।”

“আপনি কি জানেন, আমার ভাইয়ের নাম কী?”

মেঘলা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “আমি জানি। কিন্তু আপনি নিজে মনে করতে না পারলে আমার মুখে নামটা শুনে কোনও লাভ হবে না।”

সে ট্রেন থেকে নেমে অন্ধকার মাঠের দিকে এগিয়ে গেল।

কয়েক পা যেতেই তার শরীর কুয়াশার মধ্যে মিশে গেল।

ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

অর্ক জানালার কাচে হাত রাখল।

দূরে মেঘলাকে দেখা যাচ্ছে। সে একটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দরজাটি খুলে গেল। ওপার থেকে একজন ছোট্ট ছেলে বেরিয়ে এল।

মেঘলা তাকে জড়িয়ে ধরল।

অর্ক বুঝতে পারল না, ছেলেটি নীল, না ঋত্বিক।

তারপর দুজনেই দরজার ওপারে মিলিয়ে গেল।

ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।

স্পিকারে ঘোষণা হল—

“পরবর্তী যাত্রী—অর্ক সেন।”

অর্কের বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হল।

“আপনার গন্তব্য—জন্মের আগের রাত।”

টিকিট পরীক্ষক তার পাশে এসে দাঁড়ালেন।

“এবার তোর পালা, অর্ক।”

অর্ক পিছিয়ে গেল।

“আমি কোথাও নামব না।”

“তুই নামবি। কারণ তোর স্মৃতির দরজা খুলতে হলে তোকে সেই রাতেই ফিরতে হবে, যেদিন তুই প্রথমবার নিজের ভাইকে হারিয়েছিলি।”

“আমার ভাইয়ের কী হয়েছিল?”

টিকিট পরীক্ষক তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই তাকে হারাসনি। তুই তাকে পৃথিবীতে আসতেই দিসনি।”

অর্কের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।

“কী?”

“তোর জন্মের আগের রাতে, তোর মা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তের ফলেই তুই আজ এখানে।”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“না। আমার মা কখনও—”

“তোর মা তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তোকে বাঁচানোর জন্য তাঁকে আরেকটি সন্তানকে বেছে নিতে হয়েছিল।”

ট্রেনের জানালার বাইরে এবার একটি হাসপাতাল দেখা গেল।

সাদা আলোয় ভরা একটি ঘর।

একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলা বিছানায় শুয়ে আছেন।

অর্ক তার মাকে চিনতে পারল।

বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে তার বাবা কাঁদছেন। তাঁর হাতে দুটি ছোট্ট সাদা কাপড়।

একটি কাপড়ের মধ্যে নড়ছে একটি শিশু।

অন্যটি স্থির।

তারপর ডাক্তার এসে বললেন, “একজনকে বাঁচানো গেছে। অন্যজনকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না।”

অর্ক কাচের সঙ্গে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

সে বুঝতে পারল, তার স্মৃতির ভেতরে এমন একটি অধ্যায় আছে, যা তাকে কোনও দিন জানতে দেওয়া হয়নি।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে দৃশ্যের মধ্যে থাকা মৃত শিশুটি চোখ খুলল।

শিশুটির চোখ কালো নয়, নীলও নয়।

তার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে চলন্ত ট্রেন।

শিশুটি কাচের ওপার থেকে অর্কের দিকে তাকিয়ে হাসল।

তারপর ঠোঁট নেড়ে বলল—

“দাদা, আমি তোকে খুঁজে পেয়েছি।”

ট্রেনের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে অর্ক অনুভব করল, কেউ তার হাত ধরে আছে।

একটি ছোট্ট হাত।

বরফের মতো ঠান্ডা।

আর সেই হাতের মালিক ফিসফিস করে বলল—

“এবার তোর মনে পড়বে, দাদা। কারণ তুই আমাকে মেরে ফেলেছিলি।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *