রাত বারোটা তেরো।
ট্রেনের জানলার বাইরে কোনও স্টেশন নেই, কোনও গাছ নেই, এমনকি আকাশও নেই। শুধু এক অদ্ভুত ধূসর অন্ধকার—যেন পৃথিবীর সমস্ত রাত এক জায়গায় জমে পাথর হয়ে গিয়েছে।
অর্কের ছোট্ট হাতটা শক্ত করে ধরে আছে আর-একটি হাত।
হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির মুখ তার নিজের শৈশবের মুখের মতো। একই কপাল, একই চোখ, একই ঠোঁটের কোণে ছোট্ট তিল। শুধু চোখ দুটো অস্বাভাবিক গভীর। সেখানে কোনও শিশুর সরলতা নেই—আছে বহু বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকা এক নিঃসঙ্গতার ছায়া।
—এবার মনে পড়ছে, দাদা?
অর্ক হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইল। পারল না।
—তুই কে?
শিশুটি হাসল।
—এই প্রশ্নটাই তো তুই এত বছর ধরে এড়িয়ে যাচ্ছিস।
—আমি তোকে চিনি না!
—চিনিস। শুধু নিজের জীবনটা বাঁচানোর জন্য আমাকে ভুলে গিয়েছিস।
শিশুটির কথায় কামরার আলো একবার জ্বলে উঠল, আবার নিভে গেল।
দূরে কোথাও একটা ঘণ্টা বাজল।
তারপর জানলার কাচে ফুটে উঠল এক দৃশ্য।
একটি হাসপাতালের ঘর। বাইরে প্রবল বৃষ্টি। বিছানায় শুয়ে অর্কের মা। তাঁর কোলের কাছে দুটো ছোট্ট কাপড়ের পুঁটলি। একটিতে সদ্যোজাত অর্ক কাঁদছে। অন্যটি নিশ্চুপ।
ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে অর্কের বাবা। তাঁর চোখে অসহায় আতঙ্ক।
ডাক্তার বলছেন, “দুঃখিত। দ্বিতীয় শিশুটিকে আমরা বাঁচাতে পারিনি।”
কিন্তু দৃশ্যটা সেখানেই শেষ হল না।
নিশ্চুপ শিশুটির আঙুল নড়ে উঠল।
একবার।
তারপর আবার।
অর্কের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ও নড়ছে! আমার অন্য ছেলেটা নড়ছে!”
ডাক্তার ছুটে এলেন। শিশুটিকে পরীক্ষা করলেন। দীর্ঘ কয়েক মিনিট পর তাঁর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
“না, ওটা স্নায়ুর প্রতিক্রিয়া। শিশুটি মৃত।”
অর্কের বাবা এগিয়ে গিয়ে কাপড়ের পুঁটলিটা তুলে নিলেন। তাঁর হাত কাঁপছিল।
ঠিক সেই সময় অর্কের ছোট্ট হাতটি বাড়িয়ে দিল আর-একটি হাত।
সে হাতটা তার মৃত ভাইয়ের হাত।
অর্কের মনে পড়ল—সে তখন খুব ছোট। পৃথিবী সম্পর্কে কিছুই জানত না। শুধু মনে হয়েছিল, তার পাশে যে শিশুটি এসেছে, তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সবাই কাঁদছে। কেউ তাকে বলছে না কেন।
শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার আগে অর্ক একবার তার আঙুল ছুঁয়েছিল।
আর সেই মুহূর্তে তার নিজের বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত টান অনুভব করেছিল সে। যেন তার ভেতর থেকে কিছু একটা খুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তারপর বহু বছর ধরে সে একই স্বপ্ন দেখেছে—একটি শিশু অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে ডাকছে, “দাদা, আমাকে একা রেখে যাস না।”
কিন্তু সে কখনও বুঝতে পারেনি, স্বপ্নটা কোথা থেকে আসে।
দৃশ্য মিলিয়ে গেল।
অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে মেঝেতে বসে পড়ল।
—আমি তোকে মারিনি!—কাঁপা গলায় বলল সে।—আমি তখন শিশু ছিলাম। আমি কী করে তোকে মারব?
শিশুটি তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
—তুই আমার মৃত্যুর কারণ ছিলি না, দাদা। কিন্তু আমাকে ভুলে যাওয়ার জন্য তুই নিজের চারপাশে একটা দেওয়াল তুলে দিয়েছিলি। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই দেওয়ালটা আরও উঁচু হয়েছে। তুই ভাবতিস, তোর জীবনে কিছু একটা নেই। কিন্তু কী নেই, সেটা জানতে চাইতিস না।
—তোর নাম কী?
শিশুটি চুপ করে রইল।
—বল! তোর নাম কী?
কামরার অন্য প্রান্ত থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
“ঋত্বিক।”
অর্ক ঘুরে তাকাল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা।
সেই পরিচিত ধূসর শার্ট, কপালের কাছে পাকা চুল, চোখের নীচে ক্লান্তির ছাপ। অর্কের মনে পড়ল, বাবার মৃত্যুর দিনও তাঁর মুখে ঠিক এই রকম ক্লান্তি ছিল।
কিন্তু তিনি তো মারা গিয়েছেন পাঁচ বছর আগে!
—বাবা?
লোকটি এগিয়ে এলেন।
—হ্যাঁ, অর্ক। আমি তোর বাবা।
অর্ক উঠে দাঁড়াল। চোখে জল এসে গিয়েছে।
—তুমি এখানে কেন? তুমি কি সত্যিই…
—আমি সেই মানুষ, যাকে তুই মনে রেখেছিস। আবার সেই মানুষও, যাকে তুই কোনও দিন পুরোপুরি বুঝতে পারিসনি।
অর্ক বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
—এই ট্রেনে তুমি কী করছ?
বাবা উত্তর দিলেন না। বরং ঋত্বিকের দিকে তাকালেন।
—ওর নাম ঋত্বিক। তোর যমজ ভাই।
শিশুটি মুখ নামিয়ে নিল।
—জন্মের সময় ওকে বাঁচানো যায়নি। তোর মা ওকে কোলে নেওয়ার আগেই ও চলে গিয়েছিল। তোর মা অনেক বছর নিজেকে ক্ষমা করতে পারেননি। আর আমি…
বাবার গলা ভেঙে গেল।
—আমি তোদের দুজনকে একসঙ্গে পৃথিবীতে আনতে পারিনি বলে নিজেকে দোষ দিয়েছিলাম। তোর মাকে সামলাতে গিয়ে তোর সামনে কখনও ঋত্বিকের কথা তুলিনি। ভেবেছিলাম, ভুলে গেলে কষ্ট কমবে।
—কিন্তু তুমি আমাকে বলোনি কেন?
—কারণ আমি নিজেই সত্যিটাকে সহ্য করতে পারিনি।
বাবা চোখ নামিয়ে নিলেন।
—তোর মা মাঝরাতে উঠে খালি দোলনাটার পাশে বসে থাকত। তুই একটু বড় হওয়ার পর দোলনাটা সরিয়ে ফেলতে বলেছিলাম। ভেবেছিলাম, ওটা সরিয়ে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়নি। শুধু আমরা তিনজন আলাদা আলাদা ভাবে কষ্টটা লুকিয়ে রেখেছিলাম।
অর্কের বুকের মধ্যে জমে থাকা অভিমান ধীরে ধীরে অন্য কিছুর রূপ নিল।
—তাহলে এই ট্রেন?
বাবা জানলার দিকে তাকালেন।
—এই ট্রেন শুধু মৃতদের নিয়ে যায় না। এই ট্রেন তাদেরও ডাকে, যারা কোনও হারানো মানুষকে ভুলতে পারে না। যাদের মনে হয়, আর একবার দেখা হলে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। তারা ট্রেনে ওঠে। তারপর স্মৃতির বদলে স্মৃতির ছায়া দেখতে থাকে।
—তুমি কি সত্যিই এখানে আছ, বাবা?
বাবা মৃদু হাসলেন।
—আমি মারা গিয়েছি, অর্ক। আমার শরীর পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তোর স্মৃতিতে আমি আছি। এই ট্রেনে আমার যে রূপ দেখছিস, তার কিছুটা তোর স্মৃতি, কিছুটা তোর অপরাধবোধ। আর কিছুটা হয়তো এমন কিছু, যার ব্যাখ্যা তুই কোনও দিন পাবি না।
তিনি একটু থামলেন।
—এই ট্রেনের সবচেয়ে বড় কৌশল জানিস? ও এমন মুখ দেখায়, যাদের জন্য তুই পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে দিতে রাজি। তারপর বলে, আর একবার হাত বাড়ালেই সব ফিরে পাবি।
—তাহলে ঋত্বিক সত্যি নয়?
বাবা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
ঋত্বিক নিজেই বলল, “আমি তোর স্মৃতির বানানো কোনও মিথ্যে নই, দাদা। আমি সত্যিই ছিলাম। কিন্তু এই ট্রেনে যে আমাকে দেখছিস, আমি ঠিক সেই শিশুটিও নই, যে জন্মের সময় চলে গিয়েছিল।”
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।
ঋত্বিক বলল, “আমার কোনও বড় হওয়া নেই। কোনও স্কুল নেই, কোনও জন্মদিন নেই, কোনও ভবিষ্যৎ নেই। তোর মনে আমার যে মুখ তৈরি হয়েছে, এই ট্রেন সেই মুখটাই ধার করেছে। আমি কখনও বড় হইনি। তুই বড় হয়েছিস। তাই তোর চোখে আমি চিরকাল ছোট।”
—তুই কি আমার সঙ্গে ফিরতে চাস?
ঋত্বিকের চোখে জল চিকচিক করে উঠল।
—আমি তো কোনও দিন তোর সঙ্গে পৃথিবীতে ছিলামই না, দাদা। তুই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবি কোথায়?
এই প্রশ্নের কোনও উত্তর অর্কের কাছে ছিল না।
ঠিক তখনই কামরার দরজায় ঝড়ের মতো এসে দাঁড়াল মেঘলা।
তার চুল এলোমেলো, মুখ ফ্যাকাশে। ডান হাতে শক্ত করে ধরে আছে একটা পুরোনো ডায়েরি।
—অর্ক! তাড়াতাড়ি চল। ট্রেন থামার আগেই আমাদের নামতে হবে!
—কোথায়?
—শেষ স্টেশনে। সেখানে নাম লেখানো হয়। যে নিজের হারানো মানুষের নাম লিখে ফেলে, সে আর ফিরতে পারে না।
বাবা মাথা নাড়লেন।
—মেঘলা ঠিক বলছে। এই ট্রেন মানুষের কাছ থেকে স্মৃতি কেড়ে নিয়ে তাকে নিজের যাত্রী বানায়। শেষ স্টেশনে পৌঁছলে আর কোনও ফিরে যাওয়ার পথ থাকে না।
অর্ক মেঘলার দিকে তাকাল।
—তুমি নীলকে পেয়েছ?
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
—পেয়েছি। কিন্তু যাকে পেয়েছি, সে আমার ভাইয়ের মুখ পরে আছে। আমার নীল আমাকে চিনত। আমার রাগ, আমার জেদ, আমার ভয়—সব জানত। এই ট্রেনের নীল শুধু আমাকে অপরাধী করে রাখতে চায়।
—তাহলে তুমি কেন এত দিন ধরে ওকে খুঁজছিলে?
মেঘলা ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।
—কারণ নীলের মৃত্যুর আগে আমি ওকে বাঁচাতে পারিনি। ওর শেষ কয়েকটা দিন আমি ওকে বিশ্বাস করিনি। ও যখন বলত, রাতে কেউ তাকে ডাকছে, আমি বকতাম। ভাবতাম, ও মনোযোগ পাওয়ার জন্য এসব বানাচ্ছে। যেদিন ও হারিয়ে গেল, সেদিনও আমি ওর সঙ্গে ঝগড়া করেছিলাম।
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
—দুদিন পরে নদীর ধারে ওর দেহ পাওয়া গেল। তারপর থেকে আমি নিজেকে বোঝাতে পারিনি যে আমি ওকে হারিয়েছি। মনে হতো, যদি আবার দেখা পাই, যদি ওকে বলতে পারি যে আমি ওর কথা বিশ্বাস করি, তাহলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
—আর ঋত্বিক?
মেঘলা চোখ মুছল।
—ঋত্বিক ছিল আমার ছোট ভাই। নীলের আগের সন্তান। পুকুরে পড়ে মারা গিয়েছিল, যখন আমি খুব ছোট। সবাই বলত, আমি নাকি ওর সঙ্গে খেলছিলাম। এক মুহূর্তের জন্য ওকে চোখের আড়াল করেছিলাম। তারপর থেকে আমি বিশ্বাস করেছি, ওর মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। নীলকে হারানোর পর সেই পুরোনো অপরাধবোধ আবার ফিরে এসেছিল।
অর্ক ধীরে ধীরে বুঝতে পারল—তাদের দুজনের জীবনই আলাদা হলেও যন্ত্রণাটা একই জায়গায় এসে মিলেছে।
তারা দুজনেই মৃতদের ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে।
কিন্তু তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটি কাউকে ফিরিয়ে দেয় না। সে শুধু শোকের মধ্যে বন্দি করে রাখে।
হঠাৎ লাউডস্পিকারে ঘোষণা শোনা গেল।
“যাত্রীদের জানানো যাচ্ছে, শেষ স্টেশন আসন্ন। যাঁরা চিরকালের জন্য থাকতে চান, তাঁরা নিজেদের নাম লিখে দিন। যাঁরা ফিরতে চান, তাঁরা তাঁদের হারানো মানুষকে ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিন।”
কামরার আলো লাল হয়ে উঠল।
দরজার পাশে একটি ছোট্ট টেবিল দেখা গেল। তার ওপর মোটা কালো খাতা। পাশে কালির দোয়াত ও কলম।
খাতার প্রথম পাতায় অসংখ্য নাম লেখা।
কিছু নামের পাশে তারিখ। কিছু নামের পাশে শুধু একটি শব্দ—“অপেক্ষা”।
মেঘলা এগিয়ে গিয়ে খাতার দিকে তাকাল।
—এখানে আমার নাম আছে।
অর্ক দেখল, একটি পাতায় লেখা:
মেঘলা রায় — যাত্রা শুরু: সাত বছর আগে। ফেরার ইচ্ছা: অসম্পূর্ণ।
তার নীচে আরও একটি নাম:
অর্ক সেন — যাত্রা শুরু: আজ রাত ১২টা ১০। ফেরার ইচ্ছা: অস্বীকার।
আর তার পাশে ছোট্ট অক্ষরে লেখা:
ঋত্বিক — কোনও যাত্রার টিকিট নেই।
অর্কের গা শিউরে উঠল।
—ওর কোনও টিকিট নেই কেন?
বাবা বললেন, “কারণ ও এই ট্রেনের যাত্রী নয়। ও কখনও পৃথিবী থেকে কোনও যাত্রা শুরু করেনি। ট্রেন ওকে ব্যবহার করছে তোর শূন্যতাকে জীবন্ত করে তোলার জন্য।”
—তাহলে ওকে ছেড়ে গেলে ও কোথায় যাবে?
ঋত্বিক মৃদু হাসল।
—আমি কোথাও যাব না, দাদা। আমি তোর স্মৃতির মধ্যে থাকব। তুই যদি আমাকে মনে রাখিস, আমি থাকব। কিন্তু তুই যদি আমাকে নিয়ে এই ট্রেনে আটকে থাকিস, তাহলে তোর জীবনটা শেষ হয়ে যাবে—যে জীবনটা আমি কোনও দিন পেতে পারিনি।
অর্কের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
—আমি তোকে ভুলতে চাই না।
—আমাকে ভুলতে হবে না। শুধু আমাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনটা নষ্ট করিস না।
এই কথাটা শুনে অর্কের মনে হল, যেন বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি জানলা খুলে গিয়েছে। ভিতরে আলো ঢুকছে না, কিন্তু বাতাস আসছে। সেই বাতাসে কষ্ট আছে, শোক আছে, তবু শ্বাস নেওয়া যায়।
মেঘলা তখন খাতার দিকে তাকিয়ে আছে।
—আমার নামটা মুছে ফেলা যাবে?
বাবা বললেন, “নাম মুছতে হয় না। নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়।”
—কীভাবে?
—যাকে হারিয়েছ, তাকে সত্যি সত্যি হারিয়েছ—এ কথা মেনে নিয়ে।
মেঘলা চোখ বন্ধ করল।
তার সামনে যেন আবার সেই রাত ফিরে এল। নদীর ধারে ভিড়, পুলিশের টর্চের আলো, ভিজে মাটির গন্ধ। সাদা কাপড়ে ঢাকা ছোট্ট শরীর। নীলের কপালে লেগে থাকা কাদার দাগ।
সে এত বছর ধরে নিজেকে দোষ দিয়েছে। কিন্তু নীলের মৃত্যু তার হাতে ঘটেনি। সে ভাইকে বাঁচাতে পারেনি—এটাই সত্যি। কিন্তু না-পারা আর ইচ্ছা করে ক্ষতি করা এক নয়।
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “নীল, আমি তোকে খুব ভালোবাসতাম। তোর কথা বিশ্বাস না করার জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু তুই চলে গিয়েছিস। আমি তোকে ফিরিয়ে আনতে পারব না। আমি এবার বাড়ি ফিরব।”
কামরার অন্ধকারের মধ্যে একটা শিশুর অবয়ব দেখা গেল।
নীল।
সে আগের মতোই রোগা, চোখে দুষ্টু হাসি। তার হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজের নৌকা।
—দিদি?
মেঘলা কেঁপে উঠল।
—নীল!
শিশুটি কাছে এল না। শুধু বলল, “তুমি তো বলেছিলে, বড় হয়ে আমাকে নদীর ধারে নিয়ে যাবে।”
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে হাসল।
—হ্যাঁ। বলেছিলাম।
—তাহলে এবার চলো না?
মেঘলা এক পা এগোল।
অর্ক চিৎকার করে উঠল, “মেঘলা! মনে রেখো, এটা তোমার সত্যিকারের ভাই নয়!”
মেঘলা থেমে গেল।
সামনের শিশুটির মুখ ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। চোখের হাসি মিলিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে ছড়িয়ে পড়ল অস্বাভাবিক এক বাঁকা হাসি। তার হাতের কাগজের নৌকাটি কালো হয়ে ছাইয়ের মতো ঝরে পড়ল।
—তুমি আবার আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ, দিদি?—কণ্ঠস্বর বদলে গেল।—তুমি তো সব সময়ই আমাকে ছেড়ে যাও!
মেঘলা চোখ বন্ধ করল।
—না, নীল। আমি তোকে ছেড়ে যাচ্ছি না। আমি তোর স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকতে যাচ্ছি।
শিশুটির মুখে হঠাৎ ভয়ংকর ক্রোধ ফুটে উঠল।
কামরার জানলা কেঁপে উঠল। মেঝের নীচে যেন শত শত মানুষ একসঙ্গে নখ দিয়ে আঁচড়াতে লাগল।
লাউডস্পিকারে বিকৃত গলায় ঘোষণা হল—
“যাত্রী মেঘলা রায়, আপনার সিদ্ধান্ত বাতিল করুন। আপনি এখনও আপনার ভাইকে ফিরিয়ে আনতে পারেন।”
মেঘলা পিছিয়ে এল।
—না।
“আপনি কি আপনার ভাইকে আর একবার দেখতে চান না?”
—চাই। প্রতিদিন চাই। কিন্তু তাই বলে আমি মিথ্যেকে সত্যি বলে মানব না।
সে খাতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নামের নীচে লিখল—
আমি ফিরতে চাই।
কালির অক্ষরগুলো প্রথমে কাঁপল। তারপর পাতার উপর থেকে ধীরে ধীরে উঠে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
মেঘলার নামের পাশে লেখা “অপেক্ষা” শব্দটি মুছে গেল।
ট্রেনের ভিতর একটা প্রচণ্ড ধাক্কা লাগল।
মেঘলা মেঝেতে পড়ে গেলেও তার শরীরের চারপাশে নরম সাদা আলো ছড়িয়ে পড়ল।
অর্ক তাকে ধরে তুলল।
—তুমি পারবে। আর একটু।
মেঘলা তার হাত চেপে ধরল।
—তুমিও পারবে, অর্ক। ঋত্বিককে ছেড়ে দেওয়া মানে ওকে অস্বীকার করা নয়।
এবার অর্কের পালা।
সে খাতার সামনে দাঁড়াল। কলম হাতে নিল। কিন্তু লিখতে পারল না।
তার সামনে ঋত্বিক দাঁড়িয়ে।
—দাদা, তুই চলে গেলে আমি আবার একা হয়ে যাব।
অর্কের হাত থেমে গেল।
শিশুটির চোখে এমন এক অসহায়তা, যা সহ্য করা কঠিন। সে জানে, এই মুখ তার কল্পনার তৈরি নয় শুধু; এর মধ্যে আছে সত্যিকারের এক হারানোর ইতিহাস। তার জীবনে এক ভাই ছিল, যাকে সে কোনও দিন কোলে নিতে পারেনি, যার সঙ্গে খেলতে পারেনি, যার সঙ্গে ঝগড়া করতে পারেনি। সেই অনুপস্থিতি তার শৈশবের অজানা শূন্যতা হয়ে থেকে গিয়েছে।
কিন্তু অর্ক বুঝতে পারল—শূন্যতাকে পূরণ করার জন্য জীবন থামিয়ে দেওয়া যায় না।
সে হাঁটু গেড়ে বসে ঋত্বিকের চোখের সমান হল।
—তুই জানিস, আমি তোকে কেমন করে মনে রাখব?
ঋত্বিক মাথা নাড়ল।
—কেমন করে?
—আমি তোকে আমার জীবনের একটা সত্যি হিসেবে মনে রাখব। তুই আমার ভাই। তুই পৃথিবীতে বেশি দিন থাকতে পারিসনি, কিন্তু তুই ছিলি। আমি তোর কথা জানব। মাকে জিজ্ঞেস করব। বাবার পুরোনো কাগজপত্র খুঁজব। তোর জন্য একটা গাছ লাগাব। আর যখন কোনও শিশুকে একা কাঁদতে দেখব, তাকে অবহেলা করব না। এভাবেই তোকে আমার জীবনে রাখব।
ঋত্বিকের মুখে প্রথমবার সত্যিকারের হাসি ফুটল।
—তাহলে তুই আমাকে ভুলবি না?
—না। কিন্তু তোকে নিয়ে এই ট্রেনে থাকবও না।
শিশুটি ধীরে ধীরে অর্কের হাত ছেড়ে দিল।
—যা, দাদা। তোর অনেক জীবন বাকি।
অর্ক কলম তুলে নিল।
নিজের নামের নীচে লিখল—
আমি ফিরতে চাই। আমি আমার হারানো মানুষদের মনে রাখব, কিন্তু তাদের মৃত্যুকে আমার জীবনের শেষ হতে দেব না।
শেষ শব্দটি লেখা মাত্র খাতাটি প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
ট্রেনের ভিতর বাতাসের ঝড় উঠল।
জানলার বাইরে এবার অন্ধকারের মধ্যে আলো দেখা যাচ্ছে। দূরে একটি ছোট্ট স্টেশন। প্ল্যাটফর্মে হলুদ বাতি। সিগন্যালের লাল আলো সবুজ হয়ে উঠছে।
লাউডস্পিকারে আরেকবার ঘোষণা শোনা গেল—
“শেষ স্টেশন। যাঁরা ফিরবেন, তাঁরা এখনই নেমে পড়ুন।”
অর্ক বাবার দিকে তাকাল।
—তুমিও চলো, বাবা।
বাবা মৃদু হাসলেন।
—আমি আর ফিরতে পারব না, অর্ক।
—কেন? তুমি তো আমার বাবা!
—সেই কারণেই তোকে ফিরতে হবে। বাবা হয়ে ছেলেকে আটকে রাখা যায় না। আমি তোর স্মৃতিতে থাকব, কিন্তু তোর জীবনের জায়গা নিয়ে নয়।
অর্ক বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
এত বছর পর যেন সত্যিই বাবাকে জড়িয়ে ধরল সে। তাঁর শরীরের উষ্ণতা নেই, তবু পরিচিত গন্ধটা যেন ফিরে এল—পুরোনো বই, সাবানের গন্ধ আর বর্ষার দিনে ভিজে জামার গন্ধ।
—আমি তোমাকে খুব মিস করি, বাবা।
—জানি।
—তোমার ওপর রাগও হয়।
—সেটাও জানি।
বাবা অর্কের মাথায় হাত রাখলেন।
—রাগ করিস। প্রশ্ন করিস। ভুলে যাস না। কিন্তু নিজের জীবনটা বাঁচিস। মানুষকে ভালোবাসা মানে তাকে চিরকাল ধরে রাখার চেষ্টা নয়। কখনও কখনও ভালোবাসা মানে তাকে যেতে দেওয়া।
ট্রেনের দরজা খুলে গেল।
প্ল্যাটফর্মে নামার আগে অর্ক শেষবারের মতো পিছনে তাকাল।
ঋত্বিক দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে বাবা। আরও দূরে মেঘলার ভাই নীলের অস্পষ্ট ছায়া। তাদের মুখে কোনও আতঙ্ক নেই। শুধু এমন এক শান্তি, যা দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে আসে।
ঋত্বিক হাত নাড়ল।
—দাদা, আবার দেখা হবে?
অর্ক চোখের জল মুছে বলল, “স্বপ্নে দেখা হলে গল্প করব। কিন্তু এবার তুই আমাকে আর আটকে রাখিস না।”
ঋত্বিক হাসল।
তারপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ট্রেনটা চলতে শুরু করল। ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল তার আলো। শেষ পর্যন্ত শুধু একটা ক্ষীণ বাঁশির শব্দ ভেসে এল। তারপর সব নীরব।
অর্ক আর মেঘলা দাঁড়িয়ে রইল ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে।
দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িতে সময় রাত বারোটা দশ।
শালবনি রোড স্টেশন।
হলুদ বাতির নীচে হরিপদ দত্ত বসে আছেন। তাঁর হাতে একটা লণ্ঠন। যেন কিছুই ঘটেনি, যেন রাতের মধ্যে কোনও অদ্ভুত ট্রেন এসে যায়নি।
অর্ক দৌড়ে তাঁর কাছে গেল।
—স্টেশনমাস্টারবাবু!
হরিপদ মাথা তুললেন। তাঁর চোখে বিস্ময়।
—আপনি? আপনি কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?
—আপনি আমাদের দেখেননি?
—কাদের?
অর্ক পিছনে তাকাল। মেঘলা তার পাশে দাঁড়িয়ে। কিন্তু তার শরীর যেন কুয়াশার মতো স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে।
—মেঘলা!
মেঘলা শান্তভাবে হাসল।
—আমার মনে হয়, আমার সময় শেষ।
—না! তুমি তো ফিরতে চেয়েছিলে!
—ফিরেছি, অর্ক। তবে সবাই একইভাবে ফেরে না।
অর্ক বুঝতে পারল না।
মেঘলা বলল, “আমার দেহ হয়তো বহু বছর আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। আমি সেই রাতের পর থেকে এই ট্রেনের সঙ্গে বাঁধা পড়েছিলাম। আজ প্রথমবার নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পেরেছি। আমার আর অপেক্ষা করতে হবে না।”
—তাহলে তুমি কোথায় যাবে?
মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল।
—যেখানে আর কাউকে খুঁজে বেড়াতে হয় না।
তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ফুটে উঠল।
—অর্ক, তুমি ফিরে গিয়ে নীলের গল্প লিখবে। শুধু তার মৃত্যুর গল্প নয়। ও কেমন ছিল, কীভাবে হাসত, কী নিয়ে রাগ করত—সেসব লিখবে। মানুষকে শুধু তাদের মৃত্যুর মধ্যে আটকে রেখো না।
অর্ক মাথা নাড়ল।
—লিখব।
মেঘলা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার চারপাশে ভোরের আগের কুয়াশার মতো সাদা আলো ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত পর সে আর সেখানে নেই।
অর্ক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
হরিপদ দত্ত লণ্ঠনটা উঁচু করে বললেন, “চলুন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।”
অর্ক হাঁটতে শুরু করল। স্টেশনের বাইরে ভোরের হাওয়া বইছে। দূরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর এই সাধারণ পৃথিবীটাকে তার অচেনা মনে হল।
কিন্তু সে বেঁচে আছে।
এটাই এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় সত্যি।
তিন মাস পরে।
কলকাতার একটি ছোট সংবাদপত্রের অফিসে বসে অর্ক কম্পিউটারের সামনে লিখছিল। তার সামনে ছড়িয়ে আছে পুরোনো নথি, হাসপাতালের কাগজের অনুলিপি, বাবার ডায়েরি এবং মায়ের হাতে লেখা কয়েকটি চিঠি।
মা প্রথমে কথা বলতে চাননি। কিন্তু একদিন অর্ক তাঁর সামনে বসে বলেছিল, “আমি ঋত্বিকের কথা জানতে চাই। আমি ওকে ফিরিয়ে আনতে চাই না। শুধু জানতে চাই, ও কে ছিল।”
সেদিন মা অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন। তারপর আলমারির ভিতর থেকে বের করেছিলেন একটি ছোট্ট সাদা কম্বল। কম্বলের কোণে সেলাই করা ছিল দুটি নাম—অর্ক ও ঋত্বিক।
অর্ক কম্বলটা হাতে নিয়ে বুঝেছিল, তার পরিবার শোককে ভুলে যায়নি। তারা শুধু শোকের কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল।
সেই নীরবতা ভাঙতে সময় লেগেছে।
অর্কের লেখা প্রতিবেদনটির শিরোনাম—
“যে ভাইকে কোনও দিন বড় হতে দেখিনি: হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির গল্প।”
লেখার এক জায়গায় সে লিখেছে:
“কিছু মানুষ আমাদের জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য আসে। কেউ কেউ আসার আগেই চলে যায়। তবু তাদের অনুপস্থিতি আমাদের জীবনের মধ্যে থেকে যায়। আমরা তাদের ফিরিয়ে আনতে পারি না, কিন্তু তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করাও উচিত নয়। শোকের সঙ্গে বেঁচে থাকা মানে মৃতকে ভুলে যাওয়া নয়; বরং তার স্মৃতিকে এমন জায়গা দেওয়া, যেখানে সে আমাদের বাঁচতে বাধা দেয় না।”
লেখাটা শেষ করে অর্ক জানলার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টি পড়ছে।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হল, দূরে কোথাও ট্রেনের বাঁশি বাজল।
সে চমকে উঠল।
তারপর নিজেই মৃদু হাসল।
জীবনের প্রতিটি অদ্ভুত শব্দের মধ্যে ভূত খুঁজতে নেই। কখনও কখনও ট্রেন সত্যিই ট্রেন, বৃষ্টি সত্যিই বৃষ্টি, আর স্মৃতি শুধু স্মৃতি।
তবু সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার আগে সে একটি কাজ করেছিল।
নিজের টেবিলের পাশে ছোট্ট একটি টবে শিউলি গাছ লাগিয়েছিল। টবের গায়ে সাদা কাগজে লিখেছিল—
ঋত্বিকের জন্য।
গাছটি বড় হতে সময় লাগবে। ফুল ফুটতেও সময় লাগবে। অর্ক জানে, প্রতিদিন জল দিতে হবে, যত্ন নিতে হবে। কিন্তু সে আর কোনও কিছুকে এক রাতের মধ্যে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে না।
সে অপেক্ষা করবে।
বেঁচে থাকার মতো করে।
সেই রাতের পর শালবনি রোড স্টেশনে আর কখনও কোনও অস্বাভাবিক ট্রেন দেখা যায়নি—অন্তত সরকারি নথিতে তার উল্লেখ নেই।
তবে স্টেশনমাস্টার হরিপদ দত্ত অবসর নেওয়ার আগে তাঁর ডায়েরিতে একটি শেষ কথা লিখেছিলেন।
“মানুষ ভাবে, ভূতেরা মৃতদের নিয়ে যায়। আমি বহু বছর স্টেশনে কাজ করে বুঝেছি, মৃতেরা সব সময় কাউকে নিতে আসে না। কখনও কখনও তারা শুধু অপেক্ষা করে—যতক্ষণ না জীবিত মানুষটি বুঝতে পারে, তার ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে।”
ডায়েরির শেষ পাতায় আরও একটি বাক্য ছিল।
“রাত বারোটা দশে যদি কখনও অচেনা ট্রেনের বাঁশি শোনো, মনে রেখো—সব যাত্রায় ওঠা বাধ্যতামূলক নয়। কিছু ট্রেনকে চলে যেতে দিতে হয়।”
তারপর আর কোনও লেখা নেই।
শুধু পাতার নীচে ছোট্ট একটি নাম—
ঋত্বিক।
— সমাপ্ত —