কলকাতার উত্তর শহরতলির একটি পুরোনো বাড়িতে সেদিন রাত দুটো সতেরো মিনিটে প্রথমবার আয়নাটা হেসে উঠেছিল।
হাসিটা খুব মৃদু। যেন কেউ অনেকক্ষণ কেঁদে হঠাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটিয়েছে।
কিন্তু ঘরের মধ্যে তখন একা ছিল তিয়াসা।
আর সে মোটেই হাসছিল না।
বিছানায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল সে। পরদিন সকালে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় জমা দিতে হবে নতুন প্রচারাভিযানের নকশা। কাজের চাপ এতটাই ছিল যে রাতের খাবার খাওয়ার কথাও তার মনে ছিল না। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটির দিকে তাকানোর সময়ও হয়নি।
হাসির শব্দটা শোনার পর সে মাথা তুলল।
ঘড়িতে রাত দুটো সতেরো।
তিয়াসা প্রথমে ভেবেছিল, পাশের ঘরে মা হয়তো কোনও ভিডিও দেখছেন। কিন্তু মা তো গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন দুদিন আগে। এই ফ্ল্যাটে সে একাই আছে।
—কে?
কোনও উত্তর এল না।
তিয়াসা ল্যাপটপ বন্ধ করে ঘুরে তাকাল।
আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্ব। এলোমেলো চুল, ক্লান্ত চোখ, কপালের পাশে ছোট্ট কালো তিল। সবই স্বাভাবিক।
তবু একটা জিনিস অস্বাভাবিক।
আয়নায় তার প্রতিবিম্বের ঠোঁটে হাসি লেগে আছে।
তিয়াসার নিজের মুখ গম্ভীর।
কিন্তু আয়নার মেয়েটি হাসছে।
প্রথমে তিয়াসা নড়তে পারল না। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে গেল। প্রতিবিম্বও উঠে দাঁড়াল। সে ডান হাত তুলল—প্রতিবিম্বও ডান হাত তুলল। সে মাথা বাঁ দিকে কাত করল—প্রতিবিম্বও তাই করল।
কিন্তু ঠোঁটের হাসিটা মিলিয়ে গেল না।
তিয়াসা কাঁপা গলায় বলল, “তুমি কে?”
প্রতিবিম্বের ঠোঁট নড়ল।
শব্দ বেরোল না।
তারপর আয়নার ভেতর থেকে কাচে কুয়াশা জমার মতো সাদা একটা দাগ ফুটে উঠল। সেই দাগের উপর ধীরে ধীরে কয়েকটি অক্ষর তৈরি হল।
আমাকে চিনতে পারছিস না?
তিয়াসার বুকের মধ্যে যেন কেউ বরফ ঢেলে দিল।
এই হাতের লেখা সে চেনে।
ছোটবেলায় স্কুলের খাতার শেষ পাতায়, জন্মদিনের কার্ডে, পুজোর ছুটিতে লেখা চিঠিতে—এই একই গোলগাল অক্ষর।
এই লেখা তার ছোট বোনের।
তারার।
যে বোন মারা গিয়েছিল বারো বছর আগে।
তিয়াসা তখন ষোলো। তারা মাত্র এগারো।
তাদের বাড়ি ছিল হাওড়ার এক পুরোনো পাড়ায়। বাবা রেলকর্মী, মা স্কুলশিক্ষিকা। সংসারে খুব বেশি বিলাসিতা ছিল না, কিন্তু দুই বোনের মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব। তারা ছিল চঞ্চল, দুষ্টু, সারাক্ষণ কথা বলত। তিয়াসা ছিল শান্ত, পড়াশোনায় ভালো, নিজের জগতে ডুবে থাকা মেয়ে।
তারা প্রায়ই বলত, “দিদি, তুই বড় হয়ে গেলে আমাকে ভুলে যাবি না তো?”
তিয়াসা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিত, “কী যে বলিস! একই বাড়িতে থাকি, তোকে ভুলব কী করে?”
তারা তখন গম্ভীর মুখে বলত, “সবাই তো এক বাড়িতে থাকে না। একদিন সবাই আলাদা হয়ে যায়।”
তখন এই কথার অর্থ বুঝত না তিয়াসা।
বারো বছর আগে, দুর্গাপুজোর সপ্তমীর রাতে, তাদের বাড়িতে আগুন লেগেছিল।
আগুনের কারণ নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। রান্নাঘরের পুরোনো বৈদ্যুতিক তার থেকে শর্ট সার্কিট হয়েছিল বলে দমকলের রিপোর্টে লেখা ছিল। তিয়াসা সেদিন বাড়ির বাইরে ছিল—বন্ধুর সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল। মা-বাবা ছিলেন আত্মীয়ের বাড়িতে। বাড়িতে একা ছিল তারা।
আগুন নেভানোর পর তারাকে আর জীবিত পাওয়া যায়নি।
তারার ঘরের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা আয়নাটা অবশ্য অক্ষত ছিল।
আশ্চর্যের বিষয়, আগুনে ঘরের প্রায় সবকিছু পুড়ে গেলেও আয়নার কাচে কোনও আঁচড় পড়েনি। শুধু তার কাঠের ফ্রেমের নীচে কালো দাগ পড়েছিল।
সেই আয়নাটাই পরে তাদের নতুন বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন মা।
তিয়াসা বহুবার বলেছিল, “ওটা ফেলে দাও। ওটা দেখলেই আমার সব মনে পড়ে।”
মা শুধু বলেছিলেন, “তোর বোনের শেষ জিনিস। ফেলে দিতে পারব না।”
তিয়াসা আর জোর করেনি।
কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ানো বন্ধ করে দিয়েছিল।
এত বছর পরে, কলকাতার নতুন ফ্ল্যাটে সেই আয়নাটি আবার তার সামনে দাঁড়িয়ে।
আর তার ভিতরে হাসছে মৃত বোন।
তিয়াসা হাত বাড়িয়ে আয়নায় লেখা শব্দগুলো ছুঁতে গেল।
আঙুল কাচে লাগতেই একটা ঠান্ডা স্রোত তার হাত বেয়ে কাঁধ পর্যন্ত উঠে গেল। সে চমকে হাত সরিয়ে নিল।
আয়নার মেয়েটি এবার ঠোঁট নাড়ল।
“দিদি।”
এইবার শব্দ শোনা গেল।
স্পষ্ট, পরিচিত, একেবারে তারার কণ্ঠস্বর।
তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।
—তুই… তুই সত্যি?
আয়নার মেয়েটি মাথা নাড়ল।
—আমি তোকে কত দিন ধরে ডাকছি।
—কোথায় ছিলি তুই?
প্রতিবিম্বের মুখ থেকে হাসি মুছে গেল।
—এইখানে।
—আয়নার ভিতরে?
—না। তুই যেখানেই তাকাস, আমি সেখানেই আছি। তুই শুধু দেখতে চাইতিস না।
তিয়াসা পিছিয়ে এল।
—এটা সম্ভব নয়। তুই মারা গিয়েছিস।
—তুই কি নিজের চোখে আমাকে মরতে দেখেছিলি?
প্রশ্নটা শুনে তিয়াসা থমকে গেল।
না। সে তারাকে মরতে দেখেনি। আগুনের পরে পুলিশ তাকে জানিয়েছিল, ঘরের ভিতর থেকে একটি দেহ উদ্ধার হয়েছে। পরে শনাক্তকরণের জন্য তাকে ডাকা হয়নি। মা-বাবাই সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন। তিয়াসা শুধু জানত, তার বোন আর নেই।
কিন্তু সে কি কখনও সত্যিটা জানতে চেয়েছিল?
চেয়েছিল।
প্রথম কয়েক মাস সে বারবার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তারাকে কোথায় পাওয়া গিয়েছিল, শেষ মুহূর্তে সে কী বলেছিল, আগুন লাগার সময় সে কোথায় ছিল। মা প্রতিবার কেঁদে ফেলতেন। বাবা রেগে যেতেন। একসময় সবাই তাকে বলেছিল, পুরোনো কথা ভুলে যেতে।
তারপর তিয়াসা সত্যিই প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছিল।
কিন্তু ভুলতে পারেনি।
—তুই আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস,—সে বলল।
প্রতিবিম্ব মাথা নাড়ল।
—আমি তোকে ভয় দেখাতে আসিনি। তোকে একটা কথা বলতে এসেছি।
—কী কথা?
আয়নার কাচের ওপরে এবার নতুন অক্ষর ফুটে উঠল।
সেদিন আগুন লাগেনি।
তিয়াসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর শব্দগুলো মিলিয়ে গেল। প্রতিবিম্বের মুখ আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। যেন কিছুই ঘটেনি।
ঘড়িতে তখন দুটো আঠারো।
তিয়াসা সারা রাত আর ঘুমোতে পারেনি।
সকালে সে প্রথমেই মাকে ফোন করল।
—মা, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব।
ওপাশ থেকে মায়ের ক্লান্ত গলা শোনা গেল।
—কী হয়েছে?
—তারার মৃত্যুর দিনটা তোমার মনে আছে?
কিছুক্ষণ নীরবতা।
—এসব কথা আবার কেন?
—আমাকে সত্যিটা বলো।
—কোন সত্যি?
—আগুন কীভাবে লেগেছিল?
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তিয়াসা, এত বছর পরে আবার এসব…
—মা, প্লিজ। আমি আর পারছি না। আমি জানতে চাই, সেদিন ঠিক কী হয়েছিল।
ওপাশে একটা অস্পষ্ট শব্দ হল। মনে হল, মা ফোনটা হাতে নিয়ে কোথাও বসে পড়েছেন।
তারপর বললেন, “আগুন লেগেছিল। তোর বোন বেরোতে পারেনি। এই তো সব জানিস।”
—তারাকে কি তুমি শেষবার দেখেছিলে?
মা উত্তর দিলেন না।
—মা?
—আমাকে এখন ফোন রাখতে হবে।
ফোন কেটে গেল।
তিয়াসা কিছুক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পুরোনো জিনিসপত্র রাখার বাক্সটা বের করল। সেখানে তারার কয়েকটি ছবি, স্কুলের পরিচয়পত্র, পুরোনো ডায়েরি এবং একটি ছোট্ট নীল খাতা ছিল।
খাতার প্রথম পাতায় লেখা—
আমার গোপন কথা। কেউ পড়বি না।
তিয়াসা জানত, তারা এই খাতায় প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখত। কিন্তু বোনের মৃত্যুর পরে সে আর খাতাটা খোলেনি।
কাঁপা হাতে পাতা উল্টাতে লাগল।
প্রথম দিকের পাতায় স্কুলের কথা, বন্ধুর কথা, পছন্দের খাবার, পুজোর জামার বর্ণনা। তারপর একটি পাতায় এসে তার চোখ আটকে গেল।
তারিখ—দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী, আগুন লাগার এক দিন আগে।
“আজ আবার আয়নার মেয়েটাকে দেখলাম। সে আমার মতো দেখতে, কিন্তু আমার মতো নয়। আমি হাত তুললে সেও হাত তোলে না। সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। গতকাল আমাকে বলেছে, আমি নাকি একদিন ওর জায়গায় চলে যাব। আমি দিদিকে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দিদি হাসবে।”
পরের পাতায় লেখা—
“আজ আয়নার মেয়েটা আমাকে একটা কথা বলেছে। বলেছে, আমাদের বাড়িতে একটা দরজা আছে, যেটা কেউ দেখতে পায় না। দরজাটা নাকি আয়নার পিছনে। আমি যদি দরজা খুলতে পারি, তাহলে আমি এমন একজনের সঙ্গে দেখা করতে পারব, যাকে সবাই হারিয়ে ফেলেছে।”
তারপর কয়েকটি পাতা ফাঁকা।
শেষের দিকে, আগুন লাগার দিনের তারিখে লেখা মাত্র দুটি লাইন—
আজ দিদি বাড়ি ফিরবে।
আমি ওকে সব বলব।
তিয়াসার হাত থেকে খাতাটা পড়ে গেল।
তারার মৃত্যুর আগের দিন সে সত্যিই বাড়ি ফিরেছিল। কিন্তু বোনের সঙ্গে কথা বলার বদলে ঝগড়া করেছিল। তারা তার নতুন আঁকার খাতা নিয়ে কিছু বলেছিল, তিয়াসা রেগে গিয়ে বলেছিল, “সব সময় আমার জিনিসে হাত দিবি না!”
তারপর সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
এটাই ছিল তারার সঙ্গে শেষ কথোপকথন।
তিয়াসা এত বছর ধরে সেই ঝগড়াটাকেই নিজের অপরাধ মনে করে এসেছে। তার মনে হত, যদি সেদিন সে একটু ভালোভাবে কথা বলত, যদি বোনকে জড়িয়ে ধরত, যদি বলত যে সে তাকে ভালোবাসে—তাহলে হয়তো সব বদলে যেত।
কিন্তু ডায়েরির কথাগুলো অন্য এক অন্ধকারের দিকে ইঙ্গিত করছে।
আয়নার মেয়েটি কে ছিল?
আর তারা কী বলতে চেয়েছিল?
সেদিন সন্ধ্যায় তিয়াসা অফিস থেকে ফেরার পথে একটি পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুকল। ছোটবেলায় বাবা তাকে এখানে নিয়ে আসতেন। দোকানের মালিক ছিলেন নিবারণবাবু, বয়স আশির কাছাকাছি। এখনও দোকানের এক কোণে বসে পুরোনো বইয়ের ধুলো ঝাড়েন।
তিয়াসা তারার ডায়েরির কথা সরাসরি বলল না। শুধু জিজ্ঞেস করল, “কাকু, আপনি কি কখনও শুনেছেন, আয়নার মধ্যে অন্য কাউকে দেখা যায়?”
নিবারণবাবু চশমার উপর দিয়ে তাকালেন।
—কেন জিজ্ঞেস করছ?
—এমনিই।
—আয়না নিয়ে কৌতূহল ভালো নয়, মা। বিশেষ করে পুরোনো আয়না।
—কেন?
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দোকানের দরজা বন্ধ করে দিলেন।
—তোমাদের হাওড়ার বাড়ির কথা মনে আছে? আগুন লাগার আগের কথা?
তিয়াসার বুক ধক করে উঠল।
—আপনি কী করে জানেন?
—তোমার বাবা আমার কাছে একবার এসেছিলেন। তোমাদের বাড়িতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটছিল। তিনি একটা বই খুঁজছিলেন—আয়না আর লোকবিশ্বাস নিয়ে লেখা পুরোনো বই।
—কী ঘটনা?
নিবারণবাবু ধীরে ধীরে বললেন, “তোমার বাবা বলেছিলেন, তোমার ছোট বোন নাকি মাঝরাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে কথা বলে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, বাচ্চাদের কল্পনা। কিন্তু একদিন তিনিও দেখেছিলেন।”
তিয়াসা ঠান্ডা হয়ে গেল।
—কী দেখেছিলেন?
—তোমার বোন ঘুমিয়ে ছিল। অথচ আয়নায় তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। আর তার পাশে আর-একটি মেয়ে। দুজনের মুখ এক। তোমার বাবা নাকি সেই দৃশ্য দেখে আয়নাটা সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তোমার মা বাধা দিয়েছিলেন।
—কেন?
—তোমার মা বলেছিলেন, আয়নাটা তোমাদের বাড়িতে আসার পর থেকেই নাকি তিনি তাঁর মৃত দিদিকে দেখতে পান।
তিয়াসা অবাক হয়ে গেল।
তার মায়ের কোনও দিদি ছিল, যিনি ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলেন—এই কথা সে জানত। কিন্তু আয়নার সঙ্গে সেই সম্পর্কের কথা কোনও দিন শোনেনি।
নিবারণবাবু একটা পুরোনো খাতা বের করলেন।
—আমি তখন এই বিষয় নিয়ে কিছু পড়াশোনা করেছিলাম। লোকবিশ্বাসে বলা হয়, কিছু আয়না শুধু মুখ দেখায় না। মানুষ যা হারিয়েছে, তার প্রতিচ্ছবিও দেখায়। কিন্তু প্রতিচ্ছবি আর মানুষ এক জিনিস নয়। প্রতিচ্ছবি তোমার আকাঙ্ক্ষা জানে। তোমার দুর্বলতা জানে। তুমি কী শুনতে চাও, সেটাও জানে।
—তাহলে ওরা কি ভূত?
—আমি জানি না। তবে একটা কথা জানি—যে প্রতিচ্ছবি তোমাকে নিজের কাছে টেনে নিতে চায়, তাকে কখনও অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে নেই।
তিয়াসা বেরিয়ে আসার সময় নিবারণবাবু তাকে থামালেন।
—আর একটা কথা। তোমাদের বাড়ির আগুনের ঘটনার পরে তোমার বাবা আমার কাছে আবার এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আয়নাটা আর কোনও দিন যেন কেউ না দেখে।
—তারপর?
—তারপর তিনি একটা খাম রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কোনও দিন যদি তুমি এসে তারার কথা জিজ্ঞেস করো, তখন যেন তোমাকে দিই।
বৃদ্ধ আলমারির ভিতর থেকে হলুদ হয়ে যাওয়া একটি খাম বের করলেন।
খামের ওপরে বাবার হাতের লেখা—
তিয়াসার জন্য। সত্য জানার সময় হলে।
তিয়াসার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
বাবা মারা গিয়েছেন আট বছর আগে। তিনি কি জানতেন, একদিন এই প্রশ্ন ফিরে আসবে?
সে খামটা নিয়ে বাড়ি ফিরল।
রাত দুটো সতেরো।
তিয়াসা আয়নার সামনে বসে আছে। আজ সে ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। টেবিলের উপর বাবার খাম, তারার ডায়েরি, একটি টর্চ আর মোবাইল ফোন।
খাম খুলে সে চিঠিটা বের করল।
“তিয়াসা,
তুই যখন এই চিঠি পড়বি, হয়তো আমি আর থাকব না। কিছু কথা তোকে বলা উচিত ছিল। কিন্তু তোকে আর তোর মাকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে গিয়ে আমি সত্যিটা লুকিয়েছি।
তোর বোনকে আমরা আগুনের মধ্যে হারাইনি—এ কথা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। কিন্তু আগুন লাগার আগে বাড়িতে যা ঘটেছিল, তা সাধারণ কিছু ছিল না।
তারার ঘরের আয়নায় আমরা এমন কিছু দেখেছিলাম, যা কোনও আয়নায় দেখা সম্ভব নয়। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। পরে নিজের চোখে দেখেছি। আয়নার ভিতরে দাঁড়িয়ে ছিল আর-একটি তারা। সে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। আসল তারা তখন আমার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।
আমি আয়নাটা ভেঙে ফেলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার মা আমাকে থামিয়েছিল। সে বলেছিল, আয়নার ভিতরের মেয়েটি নাকি তার মৃত দিদির কণ্ঠে কথা বলে। সে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, একদিন তার দিদিকে ফিরিয়ে দেবে।
আমি জানি না, সেই প্রতিশ্রুতি সত্যি ছিল কি না। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, আয়নাটা আমাদের প্রত্যেকের এমন কিছু দেখায়, যা আমরা ফিরে পেতে চাই।
তারার মৃত্যুর রাতে আমি বাড়িতে ছিলাম না। ফিরে এসে আগুন দেখেছি। তারপর থেকে তোমার মা আর কোনও দিন স্বাভাবিক হননি। আমিও নই।
একটা কথা মনে রাখিস। যদি কোনও দিন আয়নায় তারাকে দেখতে পাস, তাকে প্রশ্ন করিস না, সে কোথায় ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করিস, সে তোকে কী করতে বলছে।
কারণ যে ভালোবাসা তোকে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে নিতে চায়, তা ভালোবাসা নয়।
—বাবা।”
চিঠিটা পড়ে তিয়াসা অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
তারপর আয়নার দিকে তাকাল।
কাচে ধীরে ধীরে কুয়াশা জমছে।
অক্ষর ফুটে উঠল—
দিদি, তুই কি বাবার চিঠি পড়েছিস?
তিয়াসা কোনও উত্তর দিল না।
আরও কয়েকটি শব্দ ফুটে উঠল।
আমি তোকে সব বলতে চাই।
তিয়াসা গভীর শ্বাস নিল।
—কী বলতে চাস?
প্রতিবিম্বের মুখ দেখা গেল। তারার মুখ। সেই ছোটবেলার মুখ, যে হাসতে হাসতে দিদির বিছানায় লাফিয়ে উঠত, যে গোপনে চকোলেট লুকিয়ে রাখত, যে বৃষ্টির দিনে কাগজের নৌকা বানাত।
কিন্তু চোখ দুটো যেন অন্য কারও।
—সেদিন আমি একা ছিলাম না, দিদি।
তিয়াসার গলা শুকিয়ে গেল।
—তাহলে কে ছিল?
তারার প্রতিবিম্ব আয়নার কাচে হাত রাখল।
—তুই।
তিয়াসা উঠে দাঁড়াল।
—মিথ্যে কথা!
—তুই বাড়ি ফিরেছিলি। তুই আমার ঘরে এসেছিলি। তুই আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলি।
—আমি তো সেদিন ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলাম!
—তুই গিয়েছিলি। আবার ফিরেও এসেছিলি।
তিয়াসার মাথার মধ্যে যেন কেউ হাতুড়ি মারল। বহু বছরের স্মৃতির ভিতর একটা দরজা খুলতে চাইছে। সে মনে করার চেষ্টা করল—সপ্তমীর রাত, বাড়ির সামনে আগুনের লাল আলো, লোকজনের চিৎকার, পুলিশের গাড়ি।
কিন্তু তার আগের কিছুই স্পষ্ট নয়।
সে কি সত্যিই বাড়ি ফিরেছিল?
তারার প্রতিবিম্ব এবার হাসল না।
—দিদি, তুই যদি সত্যিটা জানতে চাস, কাল রাত দুটো সতেরোয় আয়নার সামনে দাঁড়াবি। ঘরের আলো নিভিয়ে দিবি। আর পিছনে তাকাবি না।
—কেন?
—কারণ দরজাটা খুলে যাবে।
—কোন দরজা?
প্রতিবিম্বের পিছনে অন্ধকার জমাট বাঁধতে লাগল। আয়নার ভিতরের ঘরটা যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। সেখানে আর ড্রেসিং টেবিল নেই, বিছানা নেই, জানলা নেই। শুধু একটা লম্বা করিডর। করিডরের শেষে একটি বন্ধ দরজা।
দরজার নীচ দিয়ে কমলা রঙের আলো বেরিয়ে আসছে।
আগুনের মতো আলো।
তারার কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলল—
“দিদি, তুই যদি দরজাটা না খোলিস, তাহলে আমি কোনও দিন জানতে পারব না, সেদিন সত্যিই কী হয়েছিল।”
তিয়াসা কাচের দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে সে অনুভব করল, কেউ তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করছে।
কণ্ঠস্বরটা তারার নয়।
বরং অনেক গভীর, অনেক পুরোনো।
“তিয়াসা… তোর বোন তোকে সব বলেনি।”
তারপর আয়নার ভিতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
ঘড়িতে রাত দুটো সতেরো।
আর আয়নার ওপারে বন্ধ দরজাটা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।
চলবে…