দরজাটা খুলছিল খুব ধীরে।
আয়নার ওপারের অন্ধকার করিডরে দাঁড়িয়ে তিয়াসা দেখতে পেল, দরজার ফাঁক দিয়ে কমলা আলো বেরিয়ে আসছে। সেই আলোতে ভেসে উঠছে ধোঁয়ার রেখা, পোড়া কাঠের গন্ধ আর একটি শিশুর ছায়া।
তারার ছায়া।
কিন্তু মেয়েটি দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে তিয়াসার ঠিক পিছনে।
তিয়াসা ঘুরে তাকাতে চাইল।
সঙ্গে সঙ্গে আয়নার ভিতর থেকে চিৎকার ভেসে এল।
—পিছনে তাকাস না, দিদি!
তিয়াসা স্থির হয়ে গেল।
তার পিছনে কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। সেই নিঃশ্বাসে পোড়া কাপড়ের গন্ধ। ঘরের তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেল। মনে হল, তার পায়ের নীচে মেঝে নয়, আগুনে গরম হয়ে যাওয়া কোনও লোহার পাত।
তারপর সেই গভীর কণ্ঠস্বর আবার বলল—
—তুই কি সত্যিই জানতে চাস, সেদিন কী হয়েছিল?
তিয়াসা চোখ বন্ধ করল।
—হ্যাঁ।
—তাহলে চোখ খোল।
সে চোখ খুলতেই দেখল, সে আর নিজের ঘরে নেই।
তার সামনে পুরোনো হাওড়ার বাড়ি। দেয়ালে ফিকে নীল রং, কাঠের জানলা, বারান্দায় মায়ের লাগানো তুলসীগাছ। দূরে পাড়ার মণ্ডপ থেকে ঢাকের শব্দ আসছে। সপ্তমীর রাত।
তিয়াসা বুঝতে পারল, সে স্মৃতির মধ্যে এসে পড়েছে।
তার বয়স ষোলো। পরনে লাল-সাদা সালোয়ার। হাতে একটি নতুন আঁকার খাতা।
সামনের ঘর থেকে তারার গলা ভেসে এল।
—দিদি, তুই এসেছিস?
তিয়াসা ছোটবেলার নিজের দিকে তাকিয়ে রইল। সে যেন অন্য একটি দৃশ্যের দর্শক। ইচ্ছা করলেও স্মৃতির মানুষদের ছুঁতে পারছে না।
স্মৃতির তিয়াসা বিরক্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ, এসেছি। এবার কী হয়েছে?”
তারা দৌড়ে ঘরে এল। হাতে একটি ছোট্ট কাগজ। চোখে উত্তেজনা।
—দিদি, তোকে একটা জিনিস দেখাব।
—আবার কী?
—আয়নাটা কথা বলেছে!
তিয়াসা বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই আবার শুরু করেছিস? কতবার বলেছি, এসব বাজে কথা বলবি না।”
—কিন্তু দিদি, আমি সত্যি বলছি। আয়নার ভিতরে আর-একটা আমি আছে। ও আমার সঙ্গে কথা বলে।
—তুই সারাদিন ভূতের গল্প পড়িস, তাই এসব মনে হয়।
তারা চুপ করে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল, “ও বলেছে, তুই ওকে দেখতে পাবি।”
স্মৃতির তিয়াসা হেসে উঠল।
—আমি? কেন?
—কারণ ও তোকে চেনে।
—কীভাবে?
তারা উত্তর দিল না। শুধু কাগজটা তিয়াসার হাতে ধরিয়ে দিল।
কাগজে আঁকা একটি আয়না। আয়নার ভিতরে দুটি মেয়ে। একটির পাশে লেখা ‘তারা’, অন্যটির পাশে লেখা ‘তিয়াসা’।
আর ছবির নীচে ছোট্ট অক্ষরে লেখা—
একজন বাইরে। একজন ভিতরে।
তিয়াসার বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।
এই ছবিটা সে কোনও দিন দেখেনি। অন্তত তার মনে পড়ে না।
দৃশ্যটা বদলে গেল।
এবার রাত আরও গভীর। বাড়িতে কেউ নেই। বাইরে পুজোর আলো, দূরে বাজি ফাটার শব্দ। তারার ঘরে টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তারা।
—তুমি সত্যি আমার মতো দেখতে?—তারা জিজ্ঞেস করছে।
আয়নার ভিতরের মেয়েটি মাথা নাড়ল।
—আমার থেকেও বেশি।
—তুমি কোথায় থাকো?
—যেখানে তোমরা ফেলে রেখে যাও।
—আমি কি তোমার কাছে আসতে পারি?
—পারিস। তবে একা নয়।
—কার সঙ্গে?
আয়নার মেয়েটি মৃদু হাসল।
—তোর দিদির সঙ্গে।
তারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—দিদি তো আমাকে বিশ্বাস করে না।
—তাহলে ওকে বিশ্বাস করাতে হবে।
আয়নার কাচের উপর একটি হাত উঠে এল। কাচের ওপার থেকে হাতটি ঠেকল তারার হাতের সঙ্গে।
তারপর আয়নার মেয়েটি বলল—
—আগামীকাল রাতে তোদের দুজনকে একসঙ্গে চাই।
দৃশ্যটা আবার বদলে গেল।
এবার তিয়াসা নিজেকে দেখতে পেল বাড়ির বাইরে। সে বন্ধুর সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে। হাতে ফোন। বারবার বাড়ি থেকে ফোন আসছে, কিন্তু সে ধরছে না।
তারপর হঠাৎ তারার একটি বার্তা এল।
দিদি, বাড়ি ফিরে আয়। খুব দরকার।
তিয়াসা রেগে গিয়ে উত্তর দিল—
এখন পারব না। সব সময় বিরক্ত করিস কেন?
বার্তাটি পাঠানোর পর সে ফোন বন্ধ করে দিল।
কিন্তু কয়েক মিনিট পরে তার মুখের ভাব বদলে গেল। সে বন্ধুকে বলল, “আমি বাড়ি যাচ্ছি।”
স্মৃতির দৃশ্য দ্রুত এগিয়ে চলল।
তিয়াসা বাড়ি ফিরল।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে তারার ঘরের সামনে দাঁড়াল। দরজা খোলা। ঘরের ভিতরে আলো জ্বলছে। আয়নার সামনে তারা অপেক্ষা করছে।
—তুই এসেছিস!—তারা ছুটে এল।
তিয়াসা বিরক্ত গলায় বলল, “কী হয়েছে বল তো?”
—আমাকে বিশ্বাস করবি?
—আগে বল কী হয়েছে।
তারা তার হাত ধরে আয়নার সামনে নিয়ে গেল।
প্রথমে তিয়াসা কিছুই দেখতে পেল না। নিজের মুখ, পিছনে বোন, ঘরের দেওয়াল—সব স্বাভাবিক।
তারপর কাচের গভীরে অন্ধকার জমতে লাগল।
আয়নার ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা তিয়াসার প্রতিবিম্ব হঠাৎ চোখের পলক ফেলল না। অথচ আসল তিয়াসা চোখ পিটপিট করছে।
প্রতিবিম্বটি ধীরে ধীরে হাসল।
স্মৃতির তিয়াসা পিছিয়ে গেল।
—এটা কী?
তারা ফিসফিস করে বলল, “বলেছিলাম তো!”
আয়নার মেয়েটি হাত তুলল।
তারপর কাচের ওপার থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
—তিয়াসা, তুই কি কখনও ভেবেছিস, তোর বোনের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে তোর জীবনটা কেমন হত?
তিয়াসা রেগে গেল।
—তুই কে?
—আমি তুই।
—মিথ্যে!
—তাহলে তোর নিজের মুখ দেখে ভয় পাচ্ছিস কেন?
তিয়াসা আয়নাটিকে ধাক্কা দিল।
সঙ্গে সঙ্গে কাচের ভিতর থেকে বিকট শব্দ উঠল। ঘরের আলো নিভে গেল। তারার চিৎকার শোনা গেল।
তারপর—
আগুন।
তিয়াসা হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের ঘরে ফিরে এল।
তার দুই হাত কাঁপছে। কপালে ঘাম। ঘড়িতে রাত দুটো উনিশ।
আয়নার ভিতরে আবার তারার মুখ।
—সব মনে পড়ছে?
তিয়াসা মাথা নাড়ল।
—আমি সেদিন বাড়ি ফিরেছিলাম।
—হ্যাঁ।
—কিন্তু আগুন লাগল কীভাবে?
তারার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—আমি জানি না।
—তুই জানিস না?
—আগুন লাগার পর আমি আর কিছু মনে করতে পারি না। শুধু মনে আছে, তুই আমাকে টেনে ধরেছিলি। তারপর একটা দরজা খুলে গিয়েছিল।
—কোন দরজা?
—যেটা আয়নার পিছনে।
তিয়াসা কাচের দিকে তাকাল।
—তুই কি ওই দরজার ভিতরে গিয়েছিলি?
তারা উত্তর দিল না।
তার বদলে আয়নার গভীরে একটি দৃশ্য ফুটে উঠল। ধোঁয়ায় ঢাকা ঘর। মেঝেতে পড়ে আছে একটি ছোট্ট লাল ফিতে। জানলার পাশে একটি ছায়া দাঁড়িয়ে।
ছায়াটির মুখ নেই।
তিয়াসা কাচের দিকে এগিয়ে গেল।
—ওটা কে?
তারার চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।
—ওর কথা বলিস না।
—কেন?
—ও আমাদের মতো নয়।
—তাহলে কী?
আয়নার মেয়েটি ফিসফিস করে বলল—
—ও সেই মানুষ, যে কারও মুখ ধার করতে পারে। যে কোনও স্মৃতির ভিতরে ঢুকতে পারে। ওর নিজের কোনও মুখ নেই, কোনও নাম নেই। আমরা যাদের হারিয়েছি, তাদের মুখ ব্যবহার করে ও আমাদের কাছে আসে।
তিয়াসা ঠান্ডা হয়ে গেল।
—তাহলে তুইও কি ওর তৈরি?
তারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “আমি জানি না।”
এই প্রথম তিয়াসার মনে হল, আয়নার ভিতরের মেয়েটিও ভয় পায়।
পরদিন সকালে তিয়াসা আবার নিবারণবাবুর দোকানে গেল।
বৃদ্ধ তাকে দেখে যেন আগেই বুঝে ফেললেন, রাতটা তার ভালো কাটেনি।
—তুই দেখেছিস, তাই না?
তিয়াসা চমকে উঠল।
—আপনি জানতেন?
—আমি জানতাম, কোনও দিন এই দিন আসবে।
নিবারণবাবু দোকানের ভিতরের ঘর থেকে একটি কাপড়ে মোড়া বই বের করলেন। বইটির মলাট ছেঁড়া। নাম প্রায় মুছে গিয়েছে। শুধু কয়েকটি শব্দ পড়া যায়—
প্রতিচ্ছবি ও অদৃশ্য দ্বার।
—এই বইটা তোমার বাবা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তোমাকে কখনও দিতে হলে যেন পুরোটা পড়তে বলি।
তিয়াসা বইটি খুলল।
ভিতরের পাতায় পুরোনো বাংলা অক্ষরে লেখা—
“কিছু প্রতিফলক বস্তু মানুষের মুখের সঙ্গে সঙ্গে তার আকাঙ্ক্ষার ছায়াও ধারণ করে। কোনও কোনও সময় গভীর শোক, দীর্ঘদিনের অপরাধবোধ কিংবা অসম্পূর্ণ বিদায় সেই ছায়াকে পৃথক সত্তার রূপ দেয়। তখন প্রতিচ্ছবি আর নিছক প্রতিচ্ছবি থাকে না। সে কথা বলে, অপেক্ষা করে, কখনও কখনও পথও খুলে দেয়।”
তিয়াসা পড়তে লাগল।
বইতে এমন কিছু আয়নার কথা লেখা ছিল, যেগুলোকে বলা হত ‘স্মৃতিদ্বার’। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই আয়নাগুলোর সামনে দীর্ঘ সময় ধরে মৃত মানুষকে স্মরণ করলে প্রতিচ্ছবির মধ্যে অন্য এক জগৎ তৈরি হতে পারে। সেই জগতে হারানো মানুষের চেহারা দেখা যায়, কিন্তু তারা জীবিত মানুষের মতো স্বাধীন নয়। তাদের মুখ, কথা, আচরণ—সবই স্মৃতি আর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।
কিন্তু বইয়ের পরের অংশে সতর্কবার্তা ছিল।
“স্মৃতিদ্বারের ভিতরে প্রবেশ করলে মানুষ কখনও নিজের স্মৃতি হারায়, কখনও নিজের পরিচয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক হল সেই সত্তা, যার কোনও নিজস্ব প্রতিচ্ছবি নেই। সে অন্যের মুখ ব্যবহার করে। সে মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেয়—হারানো মানুষকে ফিরিয়ে দেবে। বিনিময়ে সে চায় জীবিত মানুষের স্থান।”
তিয়াসা বইটা বন্ধ করল।
—জীবিত মানুষের স্থান মানে?
নিবারণবাবু বললেন, “আমি জানি না। হয়তো স্মৃতির মধ্যে বন্দি করে রাখা। হয়তো অন্য কিছু। কিন্তু তোমার বাবা এই আয়নাটা নিয়ে ভয় পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আগুনের রাতে যা ঘটেছিল, সেটা দুর্ঘটনা হলেও তার ভিতরে অন্য কিছু জড়িয়ে ছিল।”
—বাবা কি জানতেন, তারা বেঁচে আছে?
—না। তিনি জানতেন না তারা কোথায়। কিন্তু মৃত্যুর পরে যে দেহ পাওয়া গিয়েছিল, সেটি তারার ছিল কি না—সে বিষয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেননি।
তিয়াসার হাত থেকে বইটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
—কী বললেন?
—তোমার বাবা বলেছিলেন, আগুনের পর দেহটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল যে পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়েছিল। তখন তোমাদের পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। তদন্তও বেশিদিন এগোয়নি।
—তাহলে আমার বোন…
—আমি বলছি না যে সে বেঁচে আছে। আমি শুধু বলছি, তোমাদের কাছে যে সত্যিটা পৌঁছেছিল, সেটাই হয়তো সম্পূর্ণ সত্যি ছিল না।
তিয়াসা কোনও কথা বলতে পারল না।
দীর্ঘ বারো বছর ধরে সে নিজের বোনকে মৃত বলে মেনে নিয়েছে। কিন্তু এখন সেই বিশ্বাসের ভিতটাই কেঁপে উঠেছে।
নিবারণবাবু তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “একটা কথা মনে রাখিস। আয়নার ভিতরে যা দেখবি, তাকে প্রমাণ বলে ধরে নিবি না। সত্যি জানতে হলে বাস্তবের প্রমাণও খুঁজতে হবে।”
তিয়াসা মাথা নাড়ল।
—আমি কী করব?
বৃদ্ধ একটু ভেবে বললেন, “আগুনের রাতের নথি খুঁজে বের কর। দমকলের রিপোর্ট, পুলিশের কাগজ, হাসপাতালের নথি—যা পাওয়া যায়। আর তোর মাকে আবার জিজ্ঞেস কর। তবে এবার শুধু প্রশ্ন করিস না। তাঁকে বলিস, তুই তাঁকে দোষ দিতে আসিসনি।”
সেই বিকেলেই তিয়াসা মায়ের কাছে গেল।
মা তখন গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে এসেছেন। দরজা খুলে মেয়েকে দেখে অবাক হলেন।
—হঠাৎ এলি যে?
তিয়াসা মায়ের হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেল।
—মা, আজ তোমাকে সব বলতে হবে।
মা চুপ করে রইলেন।
তিয়াসা বলল, “আমি তারাকে আয়নায় দেখছি।”
মায়ের মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল।
তিনি চেয়ারের হাতল আঁকড়ে ধরলেন।
—কী বললি?
—প্রতিদিন রাত দুটো সতেরোয়। ও আমার সঙ্গে কথা বলে। সেদিন কী হয়েছিল, সেটা জানতে চাইছে।
মা উঠে দাঁড়ালেন।
—তুই আর ওই আয়নার সামনে দাঁড়াবি না!
—কেন?
—কারণ ওটা তোর বোন নয়!
—তাহলে তুমি কাকে দেখতে?
মা স্থির হয়ে গেলেন।
তিয়াসা বুঝতে পারল, প্রশ্নটা ঠিক জায়গায় লেগেছে।
—বাবার চিঠি পড়েছি,—সে বলল।—তুমি নাকি তোমার মৃত দিদিকে আয়নায় দেখতে পেতে।
মা দুহাতে মুখ ঢাকলেন।
অনেকক্ষণ পরে বললেন, “আমি ভেবেছিলাম, ওটা শুধু আমার কল্পনা।”
—কী দেখেছিলে তুমি?
মা ধীরে ধীরে বসে পড়লেন।
—তোর মাসি যখন মারা যায়, তখন আমার বয়স মাত্র বারো। অসুখে মারা গিয়েছিল। শেষ দিনগুলোতে আমি ওর পাশে বসে থাকতাম। ও বলেছিল, বড় হলে আমাকে একটা লাল শাড়ি কিনে দেবে। কিন্তু ও আর বড় হয়নি।
মায়ের চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।
—তোর বাবা যখন সেই পুরোনো আয়নাটা বাড়িতে আনল, প্রথম কয়েক মাস কিছুই হয়নি। তারপর একদিন রাতে আমি আয়নায় আমার দিদিকে দেখতে পেলাম। সে আগের মতোই হাসছিল। বলল, সে আমাকে ছেড়ে যায়নি। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু পরে বারবার দেখলাম।
—তুমি কি ওর সঙ্গে কথা বলতে?
—হ্যাঁ। ও আমার কথা শুনত। আমার কষ্ট বুঝত। আমি তোকে আর তারাকে নিয়ে চিন্তা করলে ও আমাকে সান্ত্বনা দিত।
মা থামলেন।
—কিন্তু একদিন ও আমাকে বলল, আমি যদি ওকে ছুঁতে চাই, তাহলে আমাকে আয়নার সামনে একা দাঁড়াতে হবে। আমি ভয় পেয়ে যাই। তারপর আর কোনও দিন ওর কথা শুনিনি।
—তারার সঙ্গে কী হয়েছিল?
মা চোখ বন্ধ করলেন।
—তারা একদিন আমাকে বলেছিল, আয়নার ভিতরে আর-একটি তারা আছে। আমি ওকে বকেছিলাম। ভেবেছিলাম, ও ছোট বলে কল্পনা করছে। আগুনের আগের রাতে সে আমাকে বলেছিল, “মা, আয়নার মেয়েটা দিদিকে চায়।” আমি রাগ করে বলেছিলাম, “এসব কথা আর শুনব না।”
মা কাঁদতে লাগলেন।
—আমি যদি সেদিন ওর কথা শুনতাম!
তিয়াসা মায়ের হাত ধরল।
—মা, তুমি জানতেই না কী ঘটতে পারে।
—কিন্তু আমি জানতাম, ওই আয়নায় কিছু একটা আছে। তবু আমি ওটাকে ঘরে রেখেছিলাম। কারণ আমি আমার দিদিকে দেখতে চাইতাম।
তিয়াসা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমরা সবাই কাউকে না কাউকে ফিরে পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা আমাদের দোষ নয়।”
মা মেয়ের দিকে তাকালেন।
—তুই কি আয়নার দরজা খুলবি?
তিয়াসা উত্তর দিল না।
মা তার হাত আরও শক্ত করে ধরলেন।
—খুলিস না, মা। আমি আমার দিদিকে হারিয়েছি। তোর বাবাকেও হারিয়েছি। এবার তোকে হারাতে পারব না।
তিয়াসা মাকে জড়িয়ে ধরল।
—আমি সাবধানে থাকব।
কিন্তু সে জানত, সাবধান থাকা আর সত্যি থেকে পালিয়ে থাকা এক কথা নয়।
সেই রাতেই তিয়াসা পুরোনো বাড়ির আগুনের নথি খুঁজতে শুরু করল।
বাবার আলমারিতে কয়েকটি ফাইল ছিল। বেশিরভাগই পুরোনো বিল, চাকরির কাগজ আর বাড়ির দলিল। শেষের দিকে একটি বাদামি ফোল্ডার পেল সে। তার ওপরে লেখা—
সপ্তমীর রাত — ব্যক্তিগত নথি।
ফোল্ডারের ভিতরে দমকলের রিপোর্টের অনুলিপি, পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের কাগজ এবং একটি পুরোনো ছবি।
ছবিটা দেখে তিয়াসার বুকের ভিতর কেঁপে উঠল।
হাওড়ার সেই বাড়ি। আগুনের পরের সকাল। পোড়া দেওয়াল, ভাঙা জানলা, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাবা।
আর বাড়ির দোতলার জানলায়—একটি মেয়ে।
ছবির অন্য সবাই মাটিতে দাঁড়িয়ে। জানলার কাচ পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে। তবু সেই কালো কাচের পিছনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটি ছোট্ট মুখ।
তারার মুখ।
তিয়াসা ছবিটা উল্টে দেখল।
পিছনে বাবার হাতের লেখা—
“ছবিটি তোলার সময় জানলাটি ভিতর থেকে বন্ধ ছিল।”
তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
ছবির তারাটি কি সত্যিই তারা?
নাকি আয়নার ভিতরের সেই সত্তা?
হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটি বার্তা এল। অচেনা নম্বর।
আপনি কি তিয়াসা সেন?
সে উত্তর দিল, হ্যাঁ। কে বলছেন?
কিছুক্ষণ পরে উত্তর এল—
আমি সেই দমকলকর্মী, যে আপনার বাড়ির আগুনের রাতে প্রথম ঘরে ঢুকেছিল। এত বছর পরে আপনাকে একটা কথা জানানো দরকার।
তিয়াসার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
কী কথা?
উত্তর আসতে কয়েক মিনিট লাগল।
তারপর—
আমরা ঘরের ভিতরে দুটি শিশুর পায়ের ছাপ পেয়েছিলাম। কিন্তু দেহ উদ্ধার হয়েছিল মাত্র একটি।
তিয়াসা মোবাইলটা শক্ত করে ধরে রইল।
আরও একটি বার্তা এল।
আর একটা কথা। আগুন নেভানোর পর বাড়ির ভিতরে যে আয়নাটা ছিল, তার সামনে মেঝেতে ভেজা পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল। সেই ছাপগুলো ঘরের বাইরে যায়নি। সবগুলো গিয়ে শেষ হয়েছিল আয়নার সামনে।
তিয়াসা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
ঘরের অন্য প্রান্তে আয়নাটা দাঁড়িয়ে আছে।
কাচের উপর কোনও প্রতিচ্ছবি নেই।
না তিয়াসা, না ঘর, না আলো।
শুধু গভীর অন্ধকার।
তারপর সেই অন্ধকারের মধ্যে একটি ছোট্ট হাত দেখা গেল।
হাতটা কাচের ভিতর থেকে ধীরে ধীরে ওপরে উঠল।
আঙুলের ডগায় লাল ফিতে বাঁধা।
তারার সেই লাল ফিতে—যেটা তিয়াসা স্মৃতির মধ্যে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেছিল।
আয়নার ভিতর থেকে এবার তারার গলা নয়, অন্য একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
—তিয়াসা, দরজাটা খোলার সময় হয়েছে।
—তুমি কে?
কণ্ঠস্বরটা হাসল।
—যাকে তুই বারো বছর ধরে খুঁজছিস।
—তুমি কি তারা?
—আমি তারা।
এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল—
—আবার আমি তারা নই।
আয়নার ভিতরের অন্ধকারে ধীরে ধীরে একটি মুখ ফুটে উঠল।
সেই মুখ তিয়াসার নিজের।
কিন্তু তার চোখের নীচে কালো দাগ, ঠোঁটের কোণে পোড়া ক্ষত, আর কপালের এক পাশে রক্তের সরু রেখা।
প্রতিবিম্বটি ঠোঁট নেড়ে বলল—
“দিদি, এবার তোর জায়গায় আমি বাইরে আসব।”
ঘড়িতে রাত দুটো সতেরো।
আয়নার কাচে প্রথম ফাটল ধরল।
চলবে…