Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : আয়নার ওপারে যে মেয়েটি(তৃতীয় পর্ব: যে মেয়েটি কখনও মারা যায়নি)

আয়নার কাচে ফাটলটা ক্রমশ বড় হচ্ছিল।

প্রথমে সরু একটা রেখা। তারপর সেই রেখা থেকে শাখার মতো আরও কয়েকটি ফাটল বেরিয়ে এসে গোটা কাচে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ল। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, কোনও শব্দ হচ্ছিল না। যেন কাচ ভাঙছে না, বরং অন্য কোনও জগৎ থেকে কেউ ধীরে ধীরে দরজাটা খুলছে।

তিয়াসা পিছিয়ে এল।

আয়নার ভিতরে তার নিজের মুখ। কপালে রক্তের রেখা, ঠোঁটের কোণে পোড়া ক্ষত, চোখের নীচে গভীর কালো ছায়া। সেই মুখ তার মতো হলেও তার নয়।

প্রতিবিম্বটি বলল, “ভয় পাচ্ছিস কেন, দিদি? এত দিন তো আমাকেই খুঁজছিলি।”

তিয়াসা কাঁপা গলায় বলল, “তুই কে?”

—আমি তুই।

—মিথ্যে বলিস না!

—তাহলে আয়নার দিকে তাকিয়ে বল, তুই কোনও দিন নিজের বোনকে বাঁচাতে চেয়েছিলি না।

কথাটা তিয়াসার বুকের মধ্যে গিয়ে বিঁধল।

সে চোখ বন্ধ করল। মনে পড়ল, আগুনের আগের রাতে সে তারার সঙ্গে ঝগড়া করেছিল। মনে পড়ল, বাড়ি ফিরে আয়নার ভিতরে নিজের মুখ দেখে সে ভয় পেয়েছিল। মনে পড়ল, সেই রাতের পরের ঘটনাগুলো তার স্মৃতিতে যেন ছেঁড়া ছেঁড়া ছবির মতো রয়ে গিয়েছে।

কিন্তু একটি বিষয় এখনও পরিষ্কার নয়।

দমকলকর্মী বলেছে, ঘরে দুটি শিশুর পায়ের ছাপ ছিল। অথচ দেহ পাওয়া গিয়েছিল একটি।

তাহলে অন্য শিশুটি কে?

তিয়াসা মোবাইল তুলে সেই অচেনা নম্বরে ফোন করল।

ফোন ধরতেই একজন বৃদ্ধ পুরুষের গলা শোনা গেল।

—হ্যালো?

—আপনি কি সেই দমকলকর্মী? আপনি আমাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

—হ্যাঁ। আমার নাম প্রদীপ মণ্ডল। আমি তখন দমকলের কর্মী ছিলাম। এখন অবসর নিয়েছি।

—আপনি কী দেখেছিলেন, আমাকে সব বলুন।

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর প্রদীপবাবু বললেন, “অনেক বছর ধরে কাউকে কথাটা বলিনি। কারণ যা দেখেছিলাম, তা কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। সেদিন আমরা যখন বাড়িতে ঢুকি, তখন আগুন অনেকটা নেভানো হয়ে গিয়েছিল। দোতলার একটি ঘর প্রায় পুরো পুড়ে গিয়েছিল। ঘরের মধ্যে একটা ছোট্ট দেহ পড়ে ছিল। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ওটাই আপনার বোন।”

—কিন্তু?

—কিন্তু ঘরের মেঝেতে দুটি আলাদা পায়ের ছাপ ছিল। একটি ছোট শিশুর। অন্যটি একটু বড় মেয়ের। আশ্চর্যের বিষয়, পায়ের ছাপগুলো ধোঁয়া আর ছাইয়ের মধ্যেও পরিষ্কার ছিল। আমরা অনুসরণ করে দেখেছিলাম, দুটো ছাপই গিয়ে শেষ হয়েছে আয়নার সামনে।

তিয়াসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

—আয়নাটা কি অক্ষত ছিল?

—হ্যাঁ। কাঠের ফ্রেম পুড়ে কালো হয়েছিল, কিন্তু কাচে কোনও ক্ষতি হয়নি। আমি নিজে আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন আমার মনে হয়েছিল, কাচের ভিতরে কেউ নড়ে উঠল। আমি ঘুরে তাকিয়েছিলাম। কেউ ছিল না।

—আপনি কি আমার বাবাকে এসব বলেছিলেন?

—বলেছিলাম। উনি আমাকে চুপ থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। বলেছিলেন, পরিবারটা এমনিতেই ভেঙে পড়েছে। আর একটা অস্বাভাবিক কথা ছড়িয়ে পড়লে আপনার মায়ের অবস্থা আরও খারাপ হবে।

তিয়াসা চোখ বন্ধ করল।

—দেহটা কি আমার বোনের ছিল?

প্রদীপবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আমি বলতে পারব না। পরে শুনেছিলাম, শনাক্তকরণের জন্য পরিবারের কাউকে আর আলাদা করে ডাকা হয়নি। কিন্তু একটা কথা মনে আছে। দেহটা উদ্ধার করার সময় তার একটি হাতে লাল ফিতের টুকরো ছিল। অথচ আপনার বাবার কাছে পরে শুনেছিলাম, আপনার বোনের লাল ফিতেটা আগুন লাগার আগেই হারিয়ে গিয়েছিল।

ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা রইল।

তারপর প্রদীপবাবু বললেন, “আপনি যদি সত্যিটা খুঁজতে চান, একটা জায়গায় যান। পুরোনো বাড়ির পিছনে একটা বন্ধ ঘর ছিল। বাড়িটা ভাঙার আগে আমি একবার সেখানে গিয়েছিলাম। ঘরের দেওয়ালে একটা ছোট্ট দরজা ছিল। আপনার বাবা সেটাকে ইট দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন।”

—কোন দরজা?

—আমি জানি না। তবে আপনার বাবা বলেছিলেন, “ওপাশে কিছু নেই।” অথচ দরজাটার ওপার থেকে তখন কারও কাঁদার শব্দ আসছিল।

ফোনটা কেটে গেল।

তিয়াসা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

তারপর আয়নার দিকে তাকাল।

প্রতিবিম্বটি আর হাসছে না।

তার চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য সত্যিকারের ভয় ফুটে উঠল।

—তুই ওর সঙ্গে কথা বললি কেন?—প্রতিবিম্বটি ফিসফিস করে বলল।

তিয়াসা বুঝল, সে ঠিক পথেই এগোচ্ছে।

—কারণ আমি সত্যিটা জানতে চাই।

প্রতিবিম্বটি কাচে হাত রাখল।

—সত্যি জানলে তুই আমাকে আর ভালোবাসবি না।

—তুই যদি সত্যিই তারা হোস, তাহলে সত্যি জানলেও তোকে ভালোবাসব।

এই উত্তর শুনে আয়নার মেয়েটির মুখ বদলে গেল।

এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে শিশুসুলভ অভিমান দেখা গেল।

তারপর মুখের উপর কালো ছায়া নেমে এল।

—তাহলে আয়নার দরজা খুলে দেখ। কে তোর বোন, আর কে নয়।


পরদিন দুপুরে তিয়াসা হাওড়ার পুরোনো বাড়িতে গেল।

বাড়িটা আর নেই। বহু বছর আগেই সেটি ভেঙে বহুতল তৈরি হয়েছে। কিন্তু পিছনের সরু গলিটা এখনও আছে। গলির শেষে একটা পরিত্যক্ত গুদামঘর। একসময় সেখানে বাড়ির পুরোনো আসবাব রাখা হত।

প্রদীপবাবুর কথা মনে করে তিয়াসা গুদামঘরের মালিকের সঙ্গে কথা বলল। বৃদ্ধ মালিক প্রথমে কিছুতেই ভিতরে ঢুকতে দিতে চাননি। পরে বাবার নাম শুনে রাজি হলেন।

ঘরের ভিতরে ধুলো, ভাঙা চেয়ার, মরচে ধরা আলমারি আর পুরোনো কাঠের বাক্সের স্তূপ।

দেয়ালের এক পাশে নতুন ইটের গাঁথুনি দেখা গেল। আশপাশের দেওয়ালের তুলনায় ইটগুলো আলাদা। তিয়াসা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। ইটের ফাঁকে পুরোনো সিমেন্টের দাগ।

—এই দেওয়ালের ওপারে কী আছে?—সে জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধ বললেন, “আগে নাকি একটা ছোট ঘর ছিল। বাড়ি ভাঙার সময় দরজাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কেন, তা জানি না।”

তিয়াসা মোবাইলের আলো জ্বেলে দেওয়াল পরীক্ষা করল। নীচের দিকে একটা ছোট্ট ধাতব পাত আটকে আছে। ধুলো সরাতেই দেখা গেল, সেটি আসলে একটি পুরোনো তালার মুখ।

দেওয়ালের মধ্যে দরজা!

সে তালাটাকে নাড়তেই একটা ক্ষীণ শব্দ হল।

তারপর ভিতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

তিয়াসার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল।

কিন্তু এবার সে পালাল না।

বৃদ্ধ লোকটি ভয়ে পিছিয়ে গেলেন।

—মা, এখানে আর দাঁড়িও না। এটা ভালো জায়গা নয়।

তিয়াসা বলল, “আপনি বাইরে যান। আমি একটু দেখে আসছি।”

—তুমি একা যাবে?

—হ্যাঁ।

বৃদ্ধ আর বাধা দিলেন না। তিনি বাইরে চলে গেলেন।

তিয়াসা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “তারা?”

ভিতর থেকে কোনও উত্তর এল না।

সে আবার বলল, “আমি তিয়াসা। আমি সত্যিটা জানতে এসেছি।”

দরজার ওপাশে যেন কেউ ধীরে ধীরে হাঁটছে।

তারপর একটা মেয়ের গলা শোনা গেল।

—দিদি?

এই কণ্ঠস্বরটা তিয়াসার পরিচিত। আয়নার ভিতরের কণ্ঠস্বরের মতো ঠান্ডা নয়। এতে ভয় আছে, কাঁপুনি আছে, বেঁচে থাকার আকুতি আছে।

তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।

—তারা, তুই ভিতরে আছিস?

—দিদি, দরজাটা খোল।

তিয়াসা তালাটা টানল। নড়ল না। সে পাশের ভাঙা কাঠের টুকরো দিয়ে তালায় আঘাত করল। দু-তিনবার আঘাত করার পর তালাটা খুলে পড়ল।

দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই তার মুখে ধুলো এসে লাগল।

ঘরটা ছোট। দেওয়ালে কোনও জানলা নেই। মেঝেতে একটা পুরোনো কম্বল, ভাঙা জলের বোতল, কয়েকটা শুকনো বিস্কুটের প্যাকেট। কোণে বসে আছে একটি মেয়ে।

বয়স বারো-তেরোর বেশি নয়।

চুল এলোমেলো। গায়ে ময়লা পোশাক। মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। কিন্তু চোখ দুটো—

সেই চোখ তিয়াসা চেনে।

তারার চোখ।

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়াল।

—দিদি!

তিয়াসা ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

মেয়েটির শরীর উষ্ণ।

তার বুক ওঠানামা করছে।

সে জীবিত।

তিয়াসা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুই বেঁচে আছিস! তুই সত্যিই বেঁচে আছিস!”

তারা তার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদল।

—আমি তোকে কত দিন ধরে ডাকছি, দিদি!

—তুই এখানে কী করে এলি? আগুনের রাতে কী হয়েছিল?

তারা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু দুর্বলতায় তার গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না।

তিয়াসা তাকে বাইরে নিয়ে এল। বৃদ্ধ মালিক জল দিলেন। কিছুক্ষণ পরে তারা একটু সুস্থ হল।

তারপর সে বলতে শুরু করল।


“সেদিন আয়নার মেয়েটা আমাকে বলেছিল, দিদি বাড়ি ফিরলে আমরা তিনজন একসঙ্গে থাকব। আমি ওকে বিশ্বাস করেছিলাম। আমি জানতাম না, ও আসলে কী চায়।”

তারা ধীরে ধীরে কথা বলছিল।

“দিদি, তুই যখন বাড়ি ফিরলি, তখন আয়নার ভিতরের মেয়েটা তোর মুখ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, ও তোর কোনও রকম ছায়া। কিন্তু ও তোর মতো কথা বলছিল, তোর মতো হাঁটছিল। শুধু একটা জিনিস আলাদা ছিল—ওর পায়ের ছাপ ছিল না।”

তিয়াসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

“তুই আয়নায় তাকানোর পর ও তোর হাত ধরেছিল। তারপর ঘরের আলো নিভে গিয়েছিল। আমি তোকে টেনে সরাতে গিয়েছিলাম। তখন আয়নার কাচটা দরজার মতো খুলে গেল। তুই ভিতরে পড়ে গেলি।”

—আমি?

তারা মাথা নাড়ল।

“আমি তোকে ধরেছিলাম। কিন্তু তোর হাত আমার হাত থেকে ছুটে গেল। তারপর আয়নার ভিতর থেকে তোরই গলা শুনলাম। তুই বলছিলি, আমাকে বাঁচা, তারা! আমাকে বের করে নে!”

তিয়াসার মাথা ঘুরে উঠল।

—তারপর?

“আমি ভিতরে ঢুকতে গিয়েছিলাম। কিন্তু অন্য মেয়েটা আমাকে ধরে ফেলল। ও বলল, তুই যদি ভিতরে যাস, তাহলে তুই আর কখনও ফিরতে পারবি না। আমি ওর হাত ছাড়িয়ে পালাতে চেয়েছিলাম। তখন ঘরে আগুন ধরে গেল।”

তারা চোখ বন্ধ করল।

“আগুনটা কোথা থেকে এসেছিল, জানি না। কিন্তু আগুনের মধ্যেও আয়নার ভিতরের দরজাটা খোলা ছিল। আমি দেখলাম, তুই ওপারে দাঁড়িয়ে কাঁদছিস। আমি তোকে ডাকছিলাম। তারপর কেউ আমাকে টেনে নিয়ে গেল।”

—কে?

তারা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“একজন লোক। তার মুখ ছিল না। সে আমার মুখে হাত রেখে বলল, ‘তুই বাইরে থাকবি, কিন্তু তোর দিদি ভিতরে থাকবে।’ তারপর সব অন্ধকার হয়ে গেল।”

তিয়াসা স্তব্ধ হয়ে গেল।

—তাহলে আগুনের রাতে যে দেহ পাওয়া গিয়েছিল…

“সেটা আমি ছিলাম না, দিদি।”

তারার চোখে জল জমল।

“আমি জানি না সেটা কার দেহ ছিল। আমি শুধু জানি, তারপর থেকে আমাকে এই ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। কখনও মনে হত, কয়েক ঘণ্টা কেটেছে। কখনও মনে হত, অনেক বছর। কেউ আমাকে খাবার দিয়ে যেত। আমি তার মুখ দেখতে পেতাম না।”

—তুই পালিয়ে আসতে পারিসনি কেন?

—কারণ দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। আর রাতে ওই লোকটা আসত। সে বলত, আমি যদি কাউকে সব কথা বলি, তাহলে তুই আর কোনও দিন ফিরতে পারবি না।

তিয়াসা তার বোনের হাত শক্ত করে ধরল।

—এখন আর কেউ তোকে আটকে রাখতে পারবে না।

তারা মাথা নাড়ল।

—পারবে, দিদি। কারণ ওই লোকটা এখনও আছে।

ঠিক তখনই গুদামঘরের বাইরে থেকে একটা শব্দ এল।

কেউ যেন ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে আসছে।

তারা তিয়াসার হাত চেপে ধরল।

তার মুখের রং বদলে গেল।

—ও এসেছে।


গুদামঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে প্রথমে সাধারণ একজন বৃদ্ধ বলে মনে হয়েছিল। সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর চুল, হাতে একটা লাঠি।

কিন্তু তার মুখের দিকে তাকাতেই তিয়াসার বুক হিম হয়ে গেল।

লোকটির মুখ স্থির নয়।

এক মুহূর্তে তার মুখে বাবার চেহারা ফুটে উঠছে। পরের মুহূর্তে মায়ের। তারপর নিবারণবাবুর। তারপর তিয়াসার নিজের মুখ।

যেন এক মুখের উপর আর-এক মুখ পরানো হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত মুখটা স্থির হল তারার মুখে।

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

—তিয়াসা, অবশেষে তুই সত্যিটা জেনে গেছিস।

তিয়াসা তারার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

—তুমি কে?

—আমাকে অনেক নামে ডাকা হয়েছে। কিন্তু কোনও নামই আমার নয়।

—তুমি আমার বোনকে এখানে আটকে রেখেছিলে?

—আমি ওকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।

—কীসের থেকে?

—মৃত্যুর থেকে। বিস্মৃতির থেকে। তোদের পরিবারের মিথ্যে থেকে।

তিয়াসা রাগে কাঁপতে লাগল।

—তুমি মিথ্যে বলছ!

লোকটি হাসল।

—তুই কি জানিস, তোর বোন কেন বেঁচে আছে? কারণ সে তোকে ছেড়ে যেতে পারেনি। আর তুই কেন আয়নায় আমাকে দেখতে পাস? কারণ তুইও তাকে ছেড়ে যেতে পারিসনি।

তিয়াসা কিছু বলতে পারল না।

লোকটি ধীরে ধীরে ঘরের ভিতরে ঢুকল।

—তোর বাবা আমাকে থামাতে চেয়েছিল। সে আয়নাটা সরিয়ে দিয়েছিল, দরজা বন্ধ করেছিল। কিন্তু সে জানত না, দরজা বন্ধ করলেই পথ বন্ধ হয় না।

—তুমি আমার বাবাকে চিনতে?

—আমি তোদের সবাইকে চিনি। তোদের বাড়িতে যখনই কেউ মৃতকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে, আমি সেখানে ছিলাম।

লোকটি তারার দিকে তাকাল।

—তারা, তুই কি দিদিকে সব বলেছিস?

তারা কাঁপছিল।

—সব নয়।

—তাহলে বল।

তারা মাথা নাড়ল।

—না।

লোকটির মুখে প্রথমবার ক্রোধ ফুটে উঠল।

তার চারপাশের বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেল। দেওয়ালের ছায়াগুলো লম্বা হতে লাগল। তিয়াসা দেখল, লোকটির পায়ের নীচে কোনও ছায়া নেই।

লোকটি বলল, “তাহলে আমি বলি।”

সে তিয়াসার দিকে তাকাল।

“আগুনের রাতে তুই আয়নার ভিতরে পড়ে গিয়েছিলি। কিন্তু তোর শরীর মারা যায়নি। তুই অচেতন হয়ে পড়েছিলি। আমি তোর স্মৃতিকে আয়নার ভিতরে আটকে রেখেছিলাম। তোর শরীরকে বাইরে রেখে দিয়েছিলাম, যাতে সবাই ভাবে তুই বেঁচে আছিস।”

তিয়াসা হতভম্ব।

—কী বলছ?

—তুই এখন যে জীবনটাকে নিজের জীবন বলে জানিস, তার অনেকটাই তোর স্মৃতির তৈরি। তুই যে বাড়ি ছেড়েছিস, যে স্কুলে পড়েছিস, যে চাকরি করছিস—সবই তোর মনে তৈরি করা এক দীর্ঘ স্বপ্ন।

তিয়াসা মাথা নাড়ল।

—না। এটা সত্যি হতে পারে না।

—তাহলে বল, তোর প্রথম চাকরির দিন কী হয়েছিল? তোর বাবার মৃত্যুর আগের রাতে তিনি তোকে কী বলেছিলেন? তোর মায়ের হাতে যে পোড়া দাগ আছে, সেটা কীভাবে হয়েছিল?

তিয়াসা উত্তর দিতে পারল না।

কিছু স্মৃতি তার মনে পরিষ্কার। কিছু স্মৃতি ঝাপসা। আর কিছু স্মৃতি যেন অন্য কারও জীবনের ঘটনা।

লোকটি বলল, “তুই আয়নার ওপারে আটকে আছিস। তোর বোন বাইরে ছিল। কিন্তু তুই তাকে মনে করতে পারিসনি, কারণ আমি তোদের স্মৃতির মধ্যে দেয়াল তুলে দিয়েছিলাম।”

তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।

—তাহলে আমি কি মৃত?

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—তুই কী, সেটা এখনই জানা দরকার নেই। দরকার হল, তুই কী বেছে নিবি।

সে হাত বাড়িয়ে দিল।

তার তালুতে একটি ছোট্ট চাবি।

—এই চাবি দিয়ে তুই দরজাটা খুলতে পারবি। ওপারে গেলে তুই তোর আসল জীবন দেখতে পাবি। কিন্তু তোর বোনকে ছেড়ে যেতে হবে।

তারা চিৎকার করে উঠল।

—দিদি, ওর কথা শুনিস না!

লোকটি বলল, “তুই যদি দরজা না খুলিস, তাহলে তোরা দুজনেই এই জায়গায় আটকে থাকবি। তোর বোনের শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাবে। আর তুই নিজের স্মৃতির ভিতরে হারিয়ে যাবি।”

তিয়াসা চাবিটার দিকে তাকাল।

তার সামনে দুটি পথ।

একদিকে তারার হাত। অন্যদিকে সেই সত্যি, যার মুখোমুখি হতে সে বারো বছর ধরে ভয় পেয়েছে।

সে ধীরে ধীরে হাত বাড়াল।

লোকটির মুখে হাসি ফুটল।

কিন্তু তিয়াসা চাবি নিল না।

সে বলল, “আমি আমার বোনকে ছেড়ে যাব না। আর তোমার কথায় নিজের স্মৃতিকে সত্যি বলে মেনে নেব না।”

লোকটির হাসি মিলিয়ে গেল।

—তাহলে তুই কখনও জানতে পারবি না, তুই কে।

তিয়াসা তারার হাত ধরল।

—আমি তিয়াসা। আমি তারার দিদি। আর আমরা দুজনেই সত্যিটা জানতে চাই।

এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে গুদামঘরের দেওয়াল কেঁপে উঠল।

দূরে কোথাও কাচ ভাঙার শব্দ হল।

লোকটির মুখের উপর ফাটল ধরতে শুরু করল। তারার মুখ ভেঙে বেরিয়ে এল তিয়াসার মুখ। তারপর সেই মুখও বদলে গেল। একের পর এক পরিচিত মুখ ভেসে উঠল—বাবা, মা, নিবারণবাবু, ছোটবেলার তিয়াসা।

শেষে সব মুখ মুছে গিয়ে রইল এক ফাঁকা অন্ধকার।

সেই অন্ধকারের ভিতর থেকে কণ্ঠস্বর এল—

“তাহলে তোকে সত্যিই ফিরতে হবে।”


গুদামঘরের মেঝে হঠাৎ দু-ভাগ হয়ে গেল।

নীচে দেখা গেল লম্বা এক করিডর। করিডরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরোনো আয়না। কাচের ভিতরে একটি ঘর, আর ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে ষোলো বছরের তিয়াসা।

তার হাতে আঁকার খাতা।

তার চোখে রাগ।

আর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট তারা।

তিয়াসা বুঝতে পারল, এটাই সেই রাতের শেষ স্মৃতি।

যে স্মৃতিটা এত দিন তার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

লোকটির কণ্ঠস্বর আবার শোনা গেল—

“তুই যদি সত্যিটা দেখতে চাস, এই করিডর দিয়ে হাঁট। কিন্তু মনে রাখিস, যে দরজা একবার খোলে, সে দরজা সব সময় বন্ধ করা যায় না।”

তারা তিয়াসার হাত শক্ত করে ধরল।

—দিদি, আমরা একসঙ্গে যাব।

তিয়াসা মাথা নাড়ল।

দুজনেই করিডরে পা রাখল।

তাদের পিছনে গুদামঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

সামনে আয়না।

আয়নার ভিতরে ছোটবেলার তিয়াসা মুখ তুলে তাকাল।

তারপর ঠোঁট নেড়ে বলল—

“তারা, তুই দরজাটা বন্ধ কর। দিদি আর ফিরবে না।”

তিয়াসা থমকে গেল।

কারণ এই কণ্ঠস্বরটা তার নিজের।

আর সে জানে—সেদিন রাতে সে ঠিক এই কথাটাই বলেছিল।

কিন্তু কেন বলেছিল?

কাকে বাঁচাতে চেয়েছিল?

আর কাকে ফেলে এসেছিল?

করিডরের শেষ মাথায় আয়নার কাচে আগুনের লাল আলো জ্বলে উঠল।

তিয়াসা তারার হাত আরও শক্ত করে ধরল।

তারপর তারা দুজনে একসঙ্গে আয়নার ভিতরে পা রাখল।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *