শহরের পুরোনো পাড়ায় প্রতি বৃহস্পতিবার একটি ছোট্ট হাট বসত। সেখানে সবজি, মাটির বাসন, খেলনা, কাপড়—কত কী বিক্রি হত! সেই হাটের এক কোণে বসতেন এক অদ্ভুত ফেরিওয়ালা। তাঁর নাম ছিল মাধব। অন্যদের মতো তাঁর ঝুড়িতে কোনও পণ্য থাকত না। থাকত কিছু রঙিন কাগজ, ছোট ছোট কাঠের বাক্স আর হাতে লেখা কয়েকটি কার্ড।
তিনি হাটে এসে ডাক দিতেন, “স্বপ্ন কিনবেন? কারও স্বপ্ন হারিয়ে গেলে আমার কাছে আসুন!”
লোকজন তাঁকে দেখে হাসত। কেউ বলত, “স্বপ্ন আবার কেনা যায় নাকি?”
মাধব হেসে উত্তর দিতেন, “স্বপ্ন কেনা যায় না। তবে স্বপ্নের পথে হাঁটার সাহস জোগানো যায়।”
একদিন সেই হাটে এল বারো বছরের ছেলে ঋজু। তার বাবা একটি ছোট দোকানে কাজ করতেন, মা বাড়িতে অন্যের পোশাক সেলাই করতেন। সংসারে অভাব ছিল। ঋজুর খুব ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে যন্ত্র তৈরি করবে। ভাঙা খেলনা খুলে তার ভিতরের কলকবজা দেখা, পুরোনো ব্যাটারি দিয়ে ছোট পাখা চালানো—এসব ছিল তার নেশা।
কিন্তু স্কুলের বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার কথা উঠতেই সে পিছিয়ে গেল। তার সহপাঠীরা দামি যন্ত্রপাতি কিনেছে, কেউ বানিয়েছে ঝকঝকে রোবট, কেউ তৈরি করেছে আলো জ্বালানোর মডেল। ঋজুর হাতে ছিল কেবল কিছু বাতিল তার, পুরোনো মোটর আর ভাঙা খেলনার অংশ।
সেদিন হাটে মাধবের ডাক শুনে সে এগিয়ে গেল।
“আপনি কি সত্যিই স্বপ্ন বিক্রি করেন?” ঋজু জিজ্ঞাসা করল।
মাধব বললেন, “তোমার স্বপ্নটা কী?”
ঋজু মাথা নিচু করে বলল, “আমি এমন একটা যন্ত্র বানাতে চাই, যা সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে। কিন্তু আমার কাছে ভালো জিনিস কেনার টাকা নেই।”
মাধব ঝুড়ি থেকে একটি কাঠের বাক্স বের করলেন। বাক্সের ভিতরে ছিল কয়েকটি ছোট লেন্স, পুরোনো তার, একটি ছোট মোটর, কিছু স্ক্রু আর একটি হাতে আঁকা নকশা।
“এগুলো বিক্রি করার জিনিস নয়,” তিনি বললেন। “এগুলো কাজে লাগানোর জিনিস। তুমি চাইলে নিয়ে যেতে পারো।”
ঋজু অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু এর দাম কত?”
“দাম একটাই। যা শিখবে, তা একদিন অন্য কাউকে শেখাবে।”
ঋজু বাক্সটি নিয়ে বাড়ি ফিরল। পরের কয়েক সপ্তাহ সে স্কুলের শিক্ষককে প্রশ্ন করল, লাইব্রেরির বই পড়ল, নিজের হাতে নকশা বদলাল। প্রথম যন্ত্রটি কাজ করল না। দ্বিতীয়বার মোটর ঘুরল, কিন্তু আলো জ্বলল না। তৃতীয়বার তার জুড়ে দেওয়ার সময় একটি সংযোগ খুলে গেল।
অনেকেই বলল, “এত চেষ্টা করে কী হবে? বাজার থেকে একটা মডেল কিনে নিলেই তো পারতে!”
ঋজু থামল না। শেষ পর্যন্ত সে এমন একটি ছোট সৌরচালিত যন্ত্র বানাল, যা সূর্যের আলোয় একটি ছোট পাখা ঘোরাতে পারত। যন্ত্রটি খুব সুন্দর ছিল না, কিন্তু প্রতিটি অংশ সে নিজে বুঝে তৈরি করেছিল।
বিজ্ঞান প্রদর্শনীর দিন বিচারকেরা তার মডেল দেখে আগ্রহী হলেন। তাঁরা ঋজুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এত কম উপকরণ দিয়ে তুমি কীভাবে এটি বানালে?”
ঋজু বলল, “আমি বুঝেছি, যন্ত্র বানানোর আগে দামি জিনিস দরকার হয় না। দরকার হয় সমস্যাটা বোঝার ইচ্ছা আর বারবার চেষ্টা করার ধৈর্য।”
সে প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার পেল কি না, তা নিয়ে তার আর বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। কারণ সে নিজের হাতে এমন কিছু তৈরি করেছিল, যা আগে কেবল তার কল্পনায় ছিল।
পরের বৃহস্পতিবার ঋজু আবার হাটে গেল। কিন্তু মাধবকে সেখানে পেল না। তাঁর জায়গায় বসেছিলেন এক বৃদ্ধা। তিনি জানালেন, মাধব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তাই আপাতত হাটে আসতে পারছেন না।
ঋজু বাড়ি ফিরে তার পুরোনো যন্ত্রপাতির বাক্স খুলল। সেখানে পড়ে থাকা ভালো অবস্থার অংশগুলি আলাদা করল। পরের সপ্তাহে সে হাটের এক পাশে একটি ছোট টেবিল পেতে বসল। একটি কাগজে লিখল—
“ভাঙা জিনিস দিয়ে নতুন কিছু বানানো শেখানো হয়। কোনও খরচ নেই।”
প্রথম দিন এল মাত্র দুজন শিশু। পরের সপ্তাহে এল পাঁচজন। ধীরে ধীরে আরও অনেকে আসতে শুরু করল। কেউ বানাল কাগজের পাখা, কেউ তৈরি করল ছোট বৈদ্যুতিক ঘণ্টা, কেউ পুরোনো বোতল দিয়ে জল মাপার পাত্র বানাল।
কয়েক মাস পরে মাধব সুস্থ হয়ে হাটে ফিরলেন। নিজের পুরোনো জায়গায় এসে তিনি দেখলেন, ঋজুর টেবিল ঘিরে একদল শিশু ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে।
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “দেখছি, আমার স্বপ্নের দোকানটা তুমি নিজের মতো করে সাজিয়ে ফেলেছ!”
ঋজু উত্তর দিল, “আপনি আমাকে কোনও স্বপ্ন বিক্রি করেননি। আপনি শুধু বুঝিয়েছিলেন, আমার স্বপ্নটা নিয়ে কাজ শুরু করার অধিকার আমারও আছে।”
মাধবের চোখে জল চিকচিক করে উঠল।
সেদিন হাটের লোকেরা প্রথমবার বুঝল, স্বপ্নের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী তিনি নন, যিনি স্বপ্নের কথা বলেন। সবচেয়ে বড় মানুষ তিনি, যিনি অন্য কাউকে নিজের স্বপ্ন গড়ে তোলার সুযোগ করে দেন।
শিক্ষা: স্বপ্ন পূরণের জন্য সব সময় দামি উপকরণ বা বিশেষ সুযোগের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং এমন একজন মানুষের উৎসাহ, যিনি আমাদের নিজেদের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস করতে শেখান। আর সত্যিকারের সাহায্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই সাহায্য আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।