অন্ধকারের মধ্যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও যেন অনন্যার কাছে অপরিচিত লাগছিল।
এক মুহূর্ত আগে যে মানুষটিকে সে নিজের বাবা ভেবে জড়িয়ে ধরেছিল, সেই মানুষটি এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে। বাইরে সৌমেন কাকু দরজা ভাঙার চেষ্টা করছেন। আর তার পেছনে, অন্ধকারের মধ্যে, কেউ একজন নিঃশব্দে নিঃশ্বাস ফেলছে।
অনন্যা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
“কে?”
কোনও উত্তর এল না।
মোবাইলের টর্চ জ্বালানোর চেষ্টা করল সে। প্রথমবার আলো জ্বলল না। দ্বিতীয়বারও না। তৃতীয়বার আলো জ্বলতেই ঘরের কোণটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
সেখানে কেউ নেই।
শুধু মেঝের ওপর পড়ে আছে একটি নীল খাম।
অনন্যা ঝুঁকে খামটি তুলল। খামের ওপর তার নাম। হাতের লেখাটি প্রথম চিঠির মতোই, কিন্তু এবার অক্ষরগুলো আরও কাঁপা, যেন লেখার সময় লেখকের হাত স্থির ছিল না।
সে খাম খুলতেই একটি ছোট কাগজ বেরিয়ে এল।
তাতে লেখা—
“যে মানুষটি তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে তোর বাবার স্মৃতি জানে। তোর বাবার অভ্যাস জানে। এমনকি তোর শৈশবের ঘটনাও জানে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে অরিন্দম সেন।
সত্যি জানতে চাইলে তাকে তিনটি প্রশ্ন করিস।
প্রথম প্রশ্ন: তোর জন্মের দিন তোর মা কী বলেছিল?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: তোর বাবা শেষবার বাড়ি ছাড়ার আগে কোন গানটি গেয়েছিল?
তৃতীয় প্রশ্ন: যে শিশুটিকে তোর বাবা একদিন নিজের হাতে কবর দিয়েছিল, তার নাম কী?”
অনন্যার হাত থেকে কাগজটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
প্রথম দুটি প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। কিন্তু তৃতীয় প্রশ্নটি তার মাথার ভেতর বিস্ফোরণের মতো আঘাত করল।
কোন শিশুকে কবর দিয়েছিলেন তার বাবা?
তাদের তো মাত্র দু’জন ভাইবোন—অনন্যা আর অয়ন।
তবে কি তাদের আরও কোনও ভাই বা বোন ছিল?
নাকি এই চিঠি তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য লেখা?
সে দ্রুত সামনে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে তাকাল।
“তুমি আমার বাবা হলে, আমার তিনটে প্রশ্নের উত্তর দাও।”
লোকটি নিশ্চুপ।
“আমার জন্মের দিন মা কী বলেছিল?”
অরিন্দমের মতো দেখতে মানুষটি চোখ বন্ধ করলেন।
“তোর মা বলেছিল, তুই আমাদের জীবনে আলো হয়ে এসেছিস।”
অনন্যা স্থির হয়ে গেল।
এ কথাটা সত্যি। ছোটবেলায় মা তাকে বহুবার বলেছিলেন।
“দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দাও। বাবা শেষবার বাড়ি ছাড়ার আগে কোন গান গেয়েছিল?”
লোকটি এবার কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “তোর মা যে গানটা খুব ভালোবাসত—‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।’”
অনন্যার চোখে জল এসে গেল।
সেই গানটাই তার বাবা প্রায়ই গাইতেন।
কিন্তু নীল খামের শেষ প্রশ্নটির উত্তর?
অনন্যা ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল, “যে শিশুটিকে বাবা নিজের হাতে কবর দিয়েছিল, তার নাম কী?”
এই প্রশ্ন শুনে লোকটির মুখের সমস্ত অভিব্যক্তি বদলে গেল।
তিনি পিছিয়ে গেলেন।
“কে তোকে এসব বলেছে?”
“আমার প্রশ্নের উত্তর দাও!”
“অনু, এসব কথা বিশ্বাস করিস না। কেউ তোকে ভুল পথে চালিত করছে।”
“তুমি যদি সত্যিই আমার বাবা হও, তবে উত্তর দিতে পারছ না কেন?”
লোকটি এবার তার দিকে এগিয়ে এলেন।
“কারণ কিছু স্মৃতি মানুষকে বাঁচতে দেয় না।”
“আর কিছু মিথ্যে মানুষকে সারাজীবন অন্ধকারে রাখে!”
অনন্যার নিজের গলার দৃঢ়তা শুনে সে নিজেই অবাক হয়ে গেল।
ঠিক সেই সময় দরজার বাইরে থেকে সৌমেন কাকুর কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
“অনু! তুই যদি আমার কথা শুনতে পাস, তাহলে মনে রাখিস—তোর মায়ের আলমারির গোপন খোপে একটা ডায়েরি আছে। তোর বাবা নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের ডায়েরি। সেখানে সব লেখা আছে।”
তারপরই একটা বিকট শব্দ হলো।
দরজার পুরোনো কাঠ ভেঙে পড়ল।
অনন্যা চমকে উঠল।
কিন্তু দরজার ওপারে সৌমেন কাকু দাঁড়িয়ে ছিলেন না।
দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশ পোশাক পরা একজন বৃদ্ধ। তাঁর চুল সাদা, চোখের নিচে গভীর কালি। হাতে একটি রিভলভার।
তিনি ঘরে ঢুকেই অরিন্দমের মতো দেখতে লোকটির দিকে তাকালেন।
“শেষ পর্যন্ত ফিরে এলে, অরিন্দম?”
লোকটি মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
বৃদ্ধ পুলিশ অফিসার ঠান্ডা গলায় বললেন, “কুড়ি বছর ধরে তোমাকে খুঁজেছি। ভেবেছিলাম, তুমি দেশ ছেড়ে পালিয়েছ। কিন্তু তুমি এখানেই ছিলে।”
অনন্যা হতভম্ব হয়ে বলল, “আপনি কে?”
“আমার নাম প্রতাপ মুখোপাধ্যায়। আমি তখন এই জেলার পুলিশ বিভাগের তদন্তকারী অফিসার ছিলাম। তোমার বাবার নিখোঁজ হওয়ার মামলাটা আমার হাতেই ছিল।”
“তাহলে আপনি জানেন, আমার বাবা কোথায়?”
প্রতাপবাবু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন, “তোমার বাবা কোথায়, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে তোমাকে জানতে হবে, তোমার বাবা কে ছিলেন।”
তিনি পকেট থেকে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র বের করে অনন্যার হাতে দিলেন।
পরিচয়পত্রে ছবি ছিল অরিন্দম সেনের। কিন্তু ছবির নিচে নাম লেখা—
দেবব্রত মল্লিক।
অনন্যার মাথা ঘুরে উঠল।
“এটা কী করে সম্ভব?”
প্রতাপবাবু বললেন, “কুড়ি বছর আগে অরিন্দম সেন আর দেবব্রত মল্লিক একই মামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দু’জনের মুখের মিল ছিল অবিশ্বাস্য। একজন ছিলেন ডাকঘরের হিসাবরক্ষক, অন্যজন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি অর্থ তছরুপের অভিযোগ উঠেছিল।”
“কিন্তু এই লোকটি তো আমার বাবার মতো দেখতে!”
“এই কারণেই মামলাটা এত জটিল হয়েছিল। সেদিন রাতে ডাকঘরে একজন মারা গিয়েছিলেন। মৃতদেহের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কাগজপত্রে নাম বদলানো হয়। সাক্ষীদের মুখ বন্ধ করা হয়। আর শেষ পর্যন্ত অরিন্দম সেনকে খুনি ঘোষণা করা হয়।”
অনন্যা লোকটির দিকে তাকাল।
“তুমি কে? তুমি কি দেবব্রত মল্লিক?”
লোকটি এবার ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।
“আমি অরিন্দম।”
প্রতাপবাবু হেসে উঠলেন। সে হাসিতে আনন্দ ছিল না।
“এখনও একই মিথ্যে বলছ! তুমি যদি অরিন্দম হও, তাহলে সেই শিশুটির নাম বলো, যাকে নিজের হাতে কবর দিয়েছিলে।”
লোকটির চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।
অনন্যা আবার সেই প্রশ্নের কথা মনে করল।
একটি শিশুকে কবর দিয়েছিলেন তার বাবা।
কে ছিল সে?
কেন তার অস্তিত্বের কথা পরিবারের কেউ জানে না?
প্রতাপবাবু এবার অনন্যার দিকে ফিরলেন।
“তোমার মা মৃত্যুর আগে আমার কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন, একদিন নীল খাম তোমার কাছে পৌঁছবে। তখন তোমাকে সত্যিটা জানতে দিতে হবে।”
“আপনি এতদিন অপেক্ষা করলেন কেন?”
“কারণ তোমার মা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করেছিলেন, তুমি নিজে সত্যির সন্ধান না করা পর্যন্ত আমি কিছু বলব না।”
“কিন্তু মা তো মারা গিয়েছেন!”
“হ্যাঁ। আর তাঁর মৃত্যুর আগের রাতে তিনি যে কথাটা আমাকে বলেছিলেন, সেটা আজও ভুলতে পারিনি।”
প্রতাপবাবু থামলেন।
“তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মেয়েকে বাঁচাবেন। ও যেন কখনও সেই মানুষের মুখোমুখি না হয়, যে নিজের অপরাধ ঢাকতে একটি শিশুর পরিচয় মুছে দিয়েছিল।’”
অনন্যা ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“কোন শিশুর পরিচয়?”
প্রতাপবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই অরিন্দমের মতো দেখতে লোকটি চিৎকার করে উঠলেন।
“চুপ করুন! আপনি জানেন না, আপনি কী বলছেন!”
প্রতাপবাবু রিভলভারটা তার দিকে তাক করলেন।
“আর একটা শব্দ নয়!”
লোকটি পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের সঙ্গে ঠেকে দাঁড়ালেন।
“অনু, আমার কথা শোন। এই মানুষগুলো সবাই মিথ্যে বলছে। আমি তোর বাবা। তোর মায়ের শেষ ইচ্ছা ছিল, আমি যেন তোকে একবার দেখতে পাই।”
“তাহলে এতদিন আসোনি কেন?”
লোকটি চুপ।
“মা যখন অসুস্থ ছিল, তখন আসোনি কেন? আমি যখন বাবার ছবি বুকে নিয়ে কেঁদেছি, তখন আসোনি কেন? অয়ন যখন স্কুলে বাবার নাম বলতে গিয়ে চুপ করে যেত, তখন আসোনি কেন?”
লোকটির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“আমি পারিনি, অনু।”
“কেন?”
“কারণ আমি যদি ফিরে আসতাম, তোরাও বাঁচতিস না।”
অনন্যা স্তব্ধ।
“কে তোমাদের মারতে চাইত?”
লোকটি উত্তর দিলেন না।
প্রতাপবাবু এবার বললেন, “এখন আর সময় নেই। আমাদের এখান থেকে বেরোতে হবে। যারা এত বছর ধরে এই সত্যি চাপা দিয়ে রেখেছে, তারা জানে তুমি আজ রাতে এখানে এসেছ।”
“কারা তারা?”
“দেবব্রত মল্লিক একা ছিল না। তার সঙ্গে আরও দু’জন ছিল। একজনের মৃত্যু হয়েছে। একজন নিখোঁজ। আর তৃতীয়জন এখনও জীবিত।”
“কে?”
প্রতাপবাবু সরাসরি উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু বললেন, “তোমার বাড়ির সবচেয়ে কাছের মানুষ।”
অনন্যার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
সৌমেন কাকু?
অয়ন?
নাকি অন্য কেউ?
ঠিক তখনই বাইরে আবার গাড়ির শব্দ শোনা গেল। একসঙ্গে একাধিক গাড়ি এসে থামল ডাকঘরের সামনে।
প্রতাপবাবু জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন।
“ওরা এসে গেছে।”
“কারা?”
“যাদের হাতে এই মামলার আসল নথি আছে। তারা চায় না তুমি সেই নথি খুঁজে পাও।”
তিনি অনন্যার হাত ধরে পেছনের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু অরিন্দমের মতো দেখতে লোকটি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন।
“তুমি যাবে না?” অনন্যা জিজ্ঞেস করল।
লোকটি মাথা নাড়লেন।
“আমার যাওয়ার পথ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।”
“কিন্তু তুমি তো আমার বাবা!”
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “বাবা হওয়া শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, অনু। কখনও কখনও সত্যিটা জেনে নেওয়াই সবচেয়ে বড় সম্পর্ক।”
অনন্যা তাঁর হাত ধরতে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে থেকে গুলির শব্দ হলো।
প্রতাপবাবু চিৎকার করে উঠলেন, “নিচু হও!”
অনন্যা মেঝেতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জানলার কাচ ভেঙে টুকরো ছড়িয়ে পড়ল ঘরের ভেতর।
পরের মুহূর্তেই দরজা দিয়ে তিনজন কালো পোশাক পরা লোক ঢুকে পড়ল।
তাদের মধ্যে একজনের হাতে পিস্তল।
“মেয়েটাকে নিয়ে চলো!”
প্রতাপবাবু পাল্টা গুলি চালালেন। ঘরের মধ্যে ধোঁয়া আর চিৎকারে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।
অনন্যা হামাগুড়ি দিয়ে পেছনের দরজার দিকে এগোল। কিন্তু যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকাল।
অরিন্দমের মতো দেখতে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন ঘরের মাঝখানে। তাঁর সামনে পিস্তল তাক করা।
“এত বছর পরও তুমি বেঁচে আছ, দেবব্রত?” একজন আক্রমণকারী বলল।
লোকটি উত্তর দিলেন, “আমি দেবব্রত নই।”
“তাহলে তোমার নাম কী?”
লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন—
“আমি সেই মানুষ, যার পরিচয় তোমরা কুড়ি বছর আগে চুরি করেছিলে।”
তারপর গুলির শব্দ।
অনন্যা চিৎকার করে উঠল।
লোকটি মেঝেতে পড়ে গেলেন।
প্রতাপবাবু অনন্যাকে টেনে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে আনলেন। দু’জনে একটা সরু গলির মধ্যে ছুটতে লাগলেন। পিছনে পায়ের শব্দ, চিৎকার, আরও কয়েকটি গুলির আওয়াজ।
শেষ পর্যন্ত তাঁরা একটা পুরোনো বাড়ির ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন।
অনন্যা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ওঁকে বাঁচাতে হবে! উনি আমার বাবা!”
প্রতাপবাবু তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“এখন ফিরে গেলে তুমিও মরবে।”
“কিন্তু আমি ওঁকে এভাবে ফেলে যেতে পারি না!”
“অনু, তুমি এখনও বুঝতে পারছ না। ওঁকে গুলি করা হয়েছে, কিন্তু ওঁর পরিচয়টাই আসল রহস্য। তুমি যদি এখনই জানতে চাও তোমার বাবা কে, তাহলে তোমাকে তোমার মায়ের ডায়েরি খুঁজে বের করতে হবে।”
“কোথায় পাব?”
“তোমাদের বাড়িতে। আলমারির গোপন খোপে।”
অনন্যা হঠাৎ থেমে গেল।
“সৌমেন কাকু কেন আমাকে ডায়েরির কথা বললেন? উনি কি আমাদের সাহায্য করছেন?”
প্রতাপবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সৌমেন তোমাদের সাহায্য করেছে, কারণ সে অপরাধবোধে ভুগছে। কিন্তু সে পুরো সত্যি বলেনি। সে জানে, তোমার বাবা নিখোঁজ হওয়ার রাতে কী ঘটেছিল।”
“তাহলে ওঁকে জিজ্ঞেস করলেই তো হয়!”
“না। কারণ তোমার বাবার নিখোঁজ হওয়ার রাতে সৌমেন সেখানে ছিল না।”
অনন্যা হতবাক হয়ে তাকাল।
“তাহলে সে কী করে জানে?”
প্রতাপবাবু জানলার বাইরে তাকালেন।
“কারণ সেই রাতে যে শিশুটিকে কবর দেওয়া হয়েছিল, সেই শিশুটিকে সৌমেন নিজের হাতে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল।”
অনন্যার মনে হলো, চারপাশের দেওয়ালগুলো ঘুরছে।
“কোন শিশু?”
প্রতাপবাবু এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“তোমার জন্মের আগে তোমার বাবা-মায়ের একটি ছেলে হয়েছিল। শিশুটি জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায় বলে সবাইকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তার মৃতদেহ কখনও তোমার মা দেখেননি। আর সেই শিশুটির নাম লেখা ছিল এমন একটি জন্মনিবন্ধনে, যেখানে বাবার নাম অরিন্দম সেন নয়।”
অনন্যার মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না।
“তাহলে আমার কি আরেকজন ভাই ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“সে কি সত্যিই মারা গিয়েছিল?”
প্রতাপবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন—
“না। অন্তত আমরা যে নথি পেয়েছি, তাতে তার মৃত্যুর কোনও প্রমাণ নেই।”
অনন্যার চোখে জল জমল।
“সে কোথায়?”
প্রতাপবাবু পকেট থেকে আরেকটি নীল খাম বের করলেন।
“এই প্রশ্নের উত্তর তোমার মা লিখে গিয়েছিলেন। কিন্তু চিঠিটা তোমাকে এখনই পড়তে দেব না।”
“কেন?”
“কারণ এই চিঠি পড়ার আগে তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
“কী সিদ্ধান্ত?”
প্রতাপবাবু বললেন, “তুমি কি তোমার বাবাকে খুঁজতে চাও, নাকি তোমার ভাইকে?”
অনন্যা নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। দূরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
তার জীবনের কুড়ি বছরের অন্ধকার যেন এক রাতেই ভেঙে পড়েছে। বাবা হয়তো বেঁচে আছেন, হয়তো মৃত। তার পরিচয় নিয়ে মিথ্যে বলা হয়েছে। তার মায়ের মৃত্যুর পেছনে অজানা রহস্য। আর তার নিজের একটি ভাই ছিল, যার অস্তিত্ব তার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
সে ধীরে ধীরে বলল, “আমি দু’জনকেই খুঁজব।”
প্রতাপবাবু মাথা নাড়লেন।
“তাহলে প্রস্তুত হও। কারণ তুমি যাকে খুঁজছ, সে তোমার আশপাশেই আছে।”
“কে?”
প্রতাপবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর ফোন বেজে উঠল।
তিনি ফোন ধরলেন।
ওপাশ থেকে কয়েকটি কথা শুনে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“কী বলছেন? অরিন্দম সেনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে?”
অনন্যা চমকে উঠল।
প্রতাপবাবু ধীরে ধীরে ফোন নামালেন।
“ডাকঘরের ভেতর থেকে একটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। মুখ দেখে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। কিন্তু তার পকেটে তোমার মায়ের লেখা একটা চিঠি পাওয়া গেছে।”
“কী লেখা আছে তাতে?”
প্রতাপবাবু কাঁপা গলায় বললেন—
“যদি অরিন্দমের মৃত্যু হয়, তাহলে বুঝতে হবে, আসল অরিন্দম এখনও বেঁচে আছে।”
অনন্যার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
তাহলে ডাকঘরে যে মানুষটিকে গুলি করা হলো, তিনি কে?
আর আসল অরিন্দম সেন কোথায়?
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।
“তোমার ভাইকে খুঁজতে হলে আজ বিকেল পাঁচটায় নদীর ধারের পুরোনো বাড়িতে এসো। একা আসবে। আর কাউকে বিশ্বাস কোরো না। এমনকি প্রতাপ মুখোপাধ্যায়কেও নয়।”
বার্তার শেষে একটি ছবি।
ছবিতে একটি তরুণ ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স আনুমানিক বাইশ। চোখ, নাক, মুখের গড়নে অদ্ভুত মিল অনন্যার সঙ্গে।
ছবির পেছনে লেখা—
“তোমার ভাই অয়ন নয়।”
অনন্যার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
অয়ন যদি তার ভাই না হয়, তাহলে সে কে?
আর যে ছেলেটি ছবিতে দাঁড়িয়ে আছে, সে কি সত্যিই তার হারিয়ে যাওয়া ভাই?
সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি তখনও অনন্যার অজানা—
যদি অয়ন তার ভাই না হয়, তবে কুড়ি বছর ধরে সে কার সঙ্গে একই বাড়িতে বড় হয়েছে?
চলবে…