Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল খামের শেষ চিঠি (প্রথম পর্ব: যে চিঠি কুড়ি বছর পরে এল)।

বৃষ্টির রাত। জানলার কাচ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকালেই এক মুহূর্তের জন্য আলোয় ভেসে উঠছে পুরোনো বাড়িটার ছাদ, শ্যাওলা ধরা দেওয়াল আর সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটা।

রাত তখন সাড়ে দশটা।

অনন্যা সেন নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। কলকাতার একটি প্রকাশনা সংস্থায় সম্পাদকের কাজ করে সে। দিনের অধিকাংশ সময় কাটে অন্যের লেখা পড়ে, ভুল সংশোধন করে, গল্পের চরিত্রের সুখ-দুঃখ নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু নিজের জীবনের গল্পটা যে এতদিন ধরে কেউ আড়াল থেকে লিখে চলেছে, তা সে কল্পনাও করেনি।

হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।

“দিদি, তোর নামে একটা চিঠি এসেছে।”

ছোট ভাই অয়ন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে একটা নীল রঙের খাম।

অনন্যা অবাক হয়ে তাকাল।

“চিঠি? আমার নামে?”

“হ্যাঁ। ডাকপিয়ন দিয়ে গেছে। আজকাল আবার কে চিঠি লেখে বল তো!”

অয়ন হেসে খামটা টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল।

অনন্যা প্রথমে বিশেষ গুরুত্ব দিল না। ভেবেছিল, হয়তো কোনও প্রকাশকের চিঠি কিংবা কোনও পুরোনো পরিচিতের পাঠানো নিমন্ত্রণপত্র। কিন্তু খামটা হাতে তুলতেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

খামের ওপর সাদা কালিতে লেখা—

অনন্যা সেন, ১৭/বি, দক্ষিণের বাড়ি, শান্তিপুর, নদিয়া।

লেখাটা অদ্ভুত পরিচিত।

এই হাতের লেখা সে শেষ দেখেছিল কুড়ি বছর আগে। তখন তার বয়স মাত্র এগারো। ছোট্ট একটি মেয়ে, যে প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির পেছনের পুকুরঘাটে বসে কারও জন্য অপেক্ষা করত।

যে মানুষটি একদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কোনও দিন তাকে ছেড়ে যাবে না।

তারপর এক বর্ষার রাতে মানুষটি নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।

অনন্যার হাত কাঁপতে শুরু করল।

খামের পেছনে প্রেরকের নাম লেখা ছিল না। শুধু ছোট্ট একটি বাক্য—

“যদি সত্যিটা জানতে চাও, তবে আজ রাত বারোটায় পুরোনো ডাকঘরে এসো।”

অনন্যা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

পুরোনো ডাকঘর!

শান্তিপুরের সেই পরিত্যক্ত ডাকঘর, যেখানে কুড়ি বছর আগে তার বাবা শেষবার গিয়েছিলেন। তারপর আর কখনও ফিরে আসেননি।

বাড়ির সবাই বলেছিল, তার বাবা অরিন্দম সেন হয়তো নদীতে পড়ে মারা গিয়েছেন। কেউ বলেছিল, তিনি সংসার ছেড়ে পালিয়েছেন। আবার কেউ ফিসফিস করে বলেছিল, তিনি নাকি এমন কিছু জেনে গিয়েছিলেন, যা জানা তাঁর উচিত ছিল না।

কিন্তু কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

শুধু পাওয়া গিয়েছিল তাঁর ভেজা ছাতা। পুরোনো ডাকঘরের সামনের ভাঙা সিঁড়িতে পড়েছিল সেটি।

অনন্যার মা সেই ঘটনার পর থেকে আর কখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি। কয়েক বছর আগে অসুস্থতায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি শুধু একটি কথাই বলতেন—

“তোর বাবা খারাপ মানুষ ছিল না, অনু। ওকে ভুল বুঝিস না।”

কিন্তু কেন ভুল বুঝতে নিষেধ করতেন, তা কোনও দিন বলেননি।

অনন্যা আবার খামটা খুলল।

ভেতরে একটি হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ। তাতে লেখা—

“অনু,

তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তার মানে আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারলাম না। এতদিন তোকে সত্যি বলতে পারিনি। তোর মায়ের কাছে আমি অপরাধী, তোর কাছেও। কিন্তু যে অপরাধের জন্য আমাকে দোষী করা হয়েছিল, সেই অপরাধ আমি করিনি।

আজ রাত বারোটায় পুরোনো ডাকঘরে আসিস। একা আসবি। কাউকে বিশ্বাস করিস না।

বিশেষ করে সেই মানুষটাকে নয়, যে এতদিন তোকে বাবার মতো আগলে রেখেছে।

— বাবা।”

চিঠির শেষ শব্দটা পড়ে অনন্যার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

বাবা!

এটা কি সত্যিই তাঁর বাবার লেখা?

আর যদি তাই হয়, তবে তিনি কোথায় ছিলেন এতগুলো বছর?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যে মানুষটি এতদিন তাকে বাবার মতো আগলে রেখেছে, সে কে?

অনন্যার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি মুখ।

সৌমেন কাকু।

বাবার ছোটবেলার বন্ধু। বাবার নিখোঁজ হওয়ার পর তিনিই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অনন্যার পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে মায়ের চিকিৎসা—সবকিছুতেই তাঁর অবদান ছিল। অয়ন তাঁকে নিজের বাবার মতোই ভালোবাসে। অনন্যাও তাঁকে কখনও সন্দেহ করেনি।

কিন্তু চিঠিতে কেন তাঁর কথা লেখা?

অনন্যা ফোন তুলে সৌমেন কাকুকে কল করতে গিয়েও থেমে গেল।

চিঠিতে স্পষ্ট লেখা—কাউকে বিশ্বাস করিস না।

বিশেষ করে সেই মানুষটাকে নয়, যে এতদিন তোকে বাবার মতো আগলে রেখেছে।

তার মানে কি সৌমেন কাকু কিছু জানেন?

নাকি তিনিই সবকিছুর পেছনে?

ঠিক তখনই বাড়ির নিচে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

অনন্যা জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। বৃষ্টির পর্দার আড়ালে কালো রঙের একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়ির হেডলাইট নিভে গেছে, কিন্তু ভেতরে কেউ একজন বসে আছে বলে মনে হচ্ছে।

কয়েক সেকেন্ড পর গাড়ির দরজা খুলল।

একজন লোক ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে এল।

লোকটিকে চিনতে অনন্যার এক মুহূর্তও লাগল না।

সৌমেন কাকু!

এত রাতে তিনি এখানে কেন?

অনন্যা তাড়াতাড়ি চিঠিটা বইয়ের ভেতর লুকিয়ে রাখল। তারপর দরজা খুলে নিচে নামল।

বসার ঘরে পৌঁছতেই সৌমেন কাকু ভেজা ছাতা বন্ধ করে সোফায় বসলেন। তাঁর মুখে স্বাভাবিক হাসি, কিন্তু চোখদুটো যেন অস্বাভাবিক স্থির।

“কী রে অনু, ঘুমাসনি এখনও?”

“না। কাজ করছিলাম। তুমি এত রাতে?”

“একটু দরকার ছিল।”

সৌমেন কাকু পকেট থেকে মোবাইল বের করে টেবিলে রাখলেন। তারপর চারদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, “আজ ডাকপিয়ন এসেছিল?”

অনন্যার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

“হ্যাঁ। কেন?”

“কোনও চিঠি দিয়েছে?”

“কেন বলো তো?”

সৌমেন কাকু কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর মৃদু হেসে বললেন, “এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। আজকাল অনেক প্রতারক চিঠি পাঠিয়ে টাকা আদায় করে। সাবধানে থাকিস।”

অনন্যা নিজের গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল।

“চিঠিতে কী লেখা আছে, সেটা না জেনে সাবধান হব কী করে?”

কথাটা শুনে সৌমেন কাকুর হাসি মিলিয়ে গেল।

“চিঠি খুলেছিস?”

অনন্যা কোনও উত্তর দিল না।

বাইরে আবার বিদ্যুৎ চমকাল। সেই আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেল, সৌমেন কাকুর ডান হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে।

সৌমেন কাকু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

“অনু, একটা কথা মনে রাখিস। অতীতের কিছু দরজা বন্ধ থাকাই ভালো। সব সত্যি জানলে মানুষ শান্তি পায় না। অনেক সময় সত্যিই মানুষের জীবন নষ্ট করে দেয়।”

“তুমি কি আমার বাবার কথা বলছ?”

প্রশ্নটা শুনে সৌমেন কাকু স্থির হয়ে গেলেন।

দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড পর তিনি বললেন, “তোর বাবার কথা আর তুলিস না।”

“কেন?”

“কারণ মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায় না।”

“কিন্তু আমার বাবা কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন?”

সৌমেন কাকুর মুখের রং বদলে গেল।

তিনি কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। বাইরে বেরোনোর আগে একবার ঘুরে তাকালেন।

“আজ রাতে কোথাও যাবি না, অনু। বিশেষ করে পুরোনো ডাকঘরের দিকে নয়।”

অনন্যার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল।

সে তো এখনও কাউকে বলেনি যে চিঠিতে পুরোনো ডাকঘরে যাওয়ার কথা লেখা আছে!

সৌমেন কাকু কি চিঠিটা পড়েছেন?

নাকি তিনি আগেই জানতেন?

গাড়ির শব্দ দূরে মিলিয়ে যাওয়ার পর অনন্যা ছুটে নিজের ঘরে গেল। বইয়ের ভেতর থেকে চিঠিটা বের করে আবার পড়ল।

তারপর ফোনে সময় দেখল।

রাত এগারোটা পনেরো।

বারোটা বাজতে আর পঁয়তাল্লিশ মিনিট।

অনন্যা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।

সে যাবে।

যদি এ চিঠি প্রতারণা হয়, তবে সত্যিটা জেনে ফিরে আসবে। আর যদি সত্যিই তার বাবা বেঁচে থাকেন, তবে কুড়ি বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটবে।

কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে অয়নকে জানানো দরকার।

সে ভাইয়ের ঘরে গেল। অয়ন তখন হেডফোন কানে দিয়ে কম্পিউটারে কিছু দেখছিল।

“অয়ন, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।”

“এখন? এই বৃষ্টির রাতে?”

“একটা জরুরি কাজ আছে। ফিরতে দেরি হতে পারে।”

অয়ন হেডফোন খুলে তাকাল।

“কী হয়েছে দিদি? তোর মুখটা এমন লাগছে কেন?”

অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুই কি বাবাকে মনে করতে পারিস?”

অয়ন হেসে ফেলল।

“আমার বয়স তখন মাত্র তিন। বাবার মুখটাও ঠিক মনে নেই। কেন হঠাৎ এসব জিজ্ঞেস করছিস?”

“এমনিই।”

অয়ন তার হাত ধরে বলল, “দিদি, তুই চিন্তা করিস না। বাবা নেই, কিন্তু সৌমেন কাকু তো আছেন। মা-ও বলত, উনি আমাদের কখনও বিপদে পড়তে দেবেন না।”

অনন্যা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

যদি অয়ন জানত, সেই মানুষটিকে নিয়েই আজ তার মনে সবচেয়ে বড় সন্দেহ তৈরি হয়েছে!

“অয়ন, আমি যদি তোকে বলি, আমাদের বাবার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে এমন কিছু আছে, যা আমরা জানি না?”

অয়ন গম্ভীর হয়ে গেল।

“তাহলে সেটা খুঁজে বের করব। কিন্তু তুই একা কোথাও যাবি না। আমিও যাব।”

“না। তুই বাড়িতে থাক। আমি একটু পরেই ফিরে আসব।”

অয়ন আর কিছু বলল না। তবে অনন্যা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সে তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন বুঝতে পারছে দিদি তাকে কিছু লুকোচ্ছে।

রাত এগারোটা চল্লিশ।

অনন্যা একটি কালো রেইনকোট পরে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রাস্তার বাতিগুলো বৃষ্টিতে ঝাপসা। দু-একটি দোকান বন্ধ করার সময় হয়েছে। রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই।

পুরোনো ডাকঘরটা বাড়ি থেকে প্রায় কুড়ি মিনিটের পথ।

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে কতবার সেখানে গিয়েছে সে! বাবা তখন ডাকঘরের কর্মচারী ছিলেন না, কিন্তু ডাকঘরের পুরোনো ভবনটির সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত একটা সম্পর্ক ছিল। মাঝে মাঝে কাজের কথা বলে সেখানে যেতেন। অনন্যাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে তাকে একটি কাঠের বেঞ্চে বসিয়ে গল্প শোনাতেন।

একবার অনন্যা জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, তুমি এখানে এত আসো কেন?”

বাবা হেসে বলেছিলেন, “কিছু চিঠি আছে, যেগুলো ঠিক ঠিকানায় পৌঁছয় না, মা। সেগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।”

তখন সে কথাটার মানে বুঝতে পারেনি।

আজ মনে হচ্ছে, বাবা হয়তো সত্যিই কোনও চিঠির অপেক্ষা করতেন।

পুরোনো ডাকঘরের কাছে পৌঁছে অনন্যা থামল।

বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে আছে। মূল দরজার কাঠ পচে গেছে, জানলার কাচ ভাঙা। ছাদের কার্নিশ থেকে জল পড়ছে। আশপাশে ঝোপঝাড় বেড়ে উঠেছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, দরজার সামনে একটা নতুন সাদা ফুল রাখা।

ফুলটা ভিজে যায়নি।

অর্থাৎ কেউ খুব সম্প্রতি এখানে এসেছে।

অনন্যা দরজায় হাত দিতেই সেটি কিঁচকিঁচ শব্দ করে খুলে গেল।

ভেতরে ঢুকে সে মোবাইলের টর্চ জ্বালাল।

ধুলো জমা কাউন্টার, ভাঙা চেয়ার, ছাদের কোণে মাকড়সার জাল। সবকিছু আগের মতোই। শুধু দেয়ালের পুরোনো ঘড়িটা এখনও ঝুলছে।

ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে রাত বারোটা পাঁচে।

অনন্যা ধীরে ধীরে ভেতরে এগোল।

“কেউ আছেন?”

তার কণ্ঠস্বর ফাঁকা ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো।

কোনও উত্তর এল না।

ঠিক তখনই পেছনের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

ধড়াম!

অনন্যা চমকে ঘুরে দাঁড়াল। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করা হয়েছে কি না বোঝার উপায় নেই। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হাতল টানল। দরজা খুলল না।

“কে আছেন? দরজা খুলুন!”

কোনও উত্তর নেই।

হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“অনু?”

অনন্যার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।

এই কণ্ঠস্বর সে চিনতে পারে।

এ কণ্ঠস্বর তার শৈশবের গল্পে, ঘুমপাড়ানি গানে, বহু রাতের কান্নায় মিশে আছে।

“বাবা?”

অন্ধকারের শেষ প্রান্তে একটা দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে ক্ষীণ হলুদ আলো বেরিয়ে এল। সেই আলোর সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ।

মুখে পাকা দাড়ি, মাথার চুল এলোমেলো, পরনে পুরোনো ধূসর পাঞ্জাবি। মুখে বয়সের ছাপ গভীর, কিন্তু চোখদুটো ঠিক একই রকম।

অনন্যা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেল।

“বাবা… তুমি?”

লোকটি এক পা এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখে জল।

“অনু, তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস।”

অনন্যা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। কুড়ি বছরের জমে থাকা কান্না যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।

“তুমি কোথায় ছিলে এতদিন? মা তোমার জন্য কেঁদে কেঁদে মারা গেল! আমি কত খুঁজেছি তোমাকে! সবাই বলেছিল তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেছ!”

লোকটি চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

“আমি তোকে ছেড়ে যাইনি, মা। আমি ফিরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে ফিরতে দেওয়া হয়নি।”

অনন্যা মুখ তুলে তাকাল।

“কে তোমাকে ফিরতে দেয়নি?”

লোকটি উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। তিনি অনন্যার কাঁধ ধরে তাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিলেন।

“তুই এখানে একা এসেছিস?”

“হ্যাঁ।”

“কেউ তোকে অনুসরণ করেনি তো?”

“না। কিন্তু সৌমেন কাকু জানত আমি এখানে আসব।”

বাবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“সৌমেন?”

“হ্যাঁ। তুমি চিঠিতে লিখেছিলে, কাউকে বিশ্বাস না করতে। বিশেষ করে সেই মানুষটাকে নয়, যে আমাকে বাবার মতো আগলে রেখেছে। তুমি কি সৌমেন কাকুর কথা বলেছিলে?”

অরিন্দম সেন ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ।”

অনন্যা পিছিয়ে গেল।

“কেন? উনি তো আমাদের সাহায্য করেছেন। মায়ের চিকিৎসা করিয়েছেন। আমার পড়াশোনার খরচ দিয়েছেন। অয়নকে নিজের ছেলের মতো দেখেছেন!”

“সেই কারণেই তো ওকে কেউ সন্দেহ করেনি।”

“কিন্তু উনি তোমার বন্ধু ছিলেন!”

অরিন্দমের চোখে হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা ফুটে উঠল।

“বন্ধু? সব বিশ্বাসঘাতক শত্রুর মুখোশ পরে আসে না, অনু। কিছু মানুষ বন্ধুর মুখোশ পরে সারাজীবন পাশে থাকে।”

অনন্যার মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।

“তুমি কী বলতে চাইছ?”

অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগে পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন। ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে—অরিন্দম, সৌমেন এবং আরেকজন অচেনা ব্যক্তি। পেছনে সেই পুরোনো ডাকঘর।

ছবির নীচে তারিখ লেখা—১৭ জুলাই, ২০০৬।

অনন্যা ছবিটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।

অচেনা মানুষটির মুখ সে চেনে।

কুড়ি বছর ধরে প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগে যে লোকটি তাদের বাড়িতে এসে মায়ের সঙ্গে দেখা করতেন, যে লোকটি নিজেকে বাবার পুরোনো সহকর্মী বলে পরিচয় দিতেন, যে লোকটির নাম শুনলেই মা দরজা বন্ধ করে দিতেন—

তিনি ছবিতে দাঁড়িয়ে আছেন।

ছবির পেছনে তাঁর নাম লেখা।

দেবব্রত মল্লিক।

অনন্যার গলা শুকিয়ে গেল।

“এই লোকটা কে?”

অরিন্দম মৃদু স্বরে বললেন, “এই মানুষটার জন্যই আমার জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর তোর মায়ের মৃত্যুর পেছনেও এমন একটি সত্যি আছে, যা তুই এখনও জানিস না।”

অনন্যা ছবিটা আঁকড়ে ধরল।

“মায়ের মৃত্যু? মা তো অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিল!”

“তোর মা অসুস্থ ছিল, এটা সত্যি। কিন্তু তার অসুস্থতার কারণ কী ছিল, সেটা তুই জানিস না।”

“তুমি সব খুলে বলো, বাবা। আমি আর কিছু অন্ধকারে রাখতে চাই না।”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—

“কুড়ি বছর আগে এই ডাকঘরে একটা খাম এসেছিল। খামের ভেতরে এমন কিছু নথি ছিল, যা কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের অপরাধ প্রমাণ করতে পারত। সেই নথি আমি পুলিশের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই সবকিছু বদলে গেল। আমাকে চোর, প্রতারক আর খুনের আসামি বানানো হলো।”

“খুন?”

“হ্যাঁ, অনু। সেই রাতে একজন মানুষ মারা গিয়েছিল। আর তার মৃত্যুর দায় আমার ঘাড়ে চাপানো হয়েছিল।”

“কে মারা গিয়েছিল?”

অরিন্দম ঠোঁট খুললেন, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে একটা গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ হলো।

দুজনেই চমকে উঠলেন।

তারপর দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ।

একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

“অনু, আমি জানি তুই ভেতরে আছিস। দরজা খুলে দে।”

সৌমেন কাকু!

অনন্যা বাবার দিকে তাকাল। অরিন্দমের চোখে আতঙ্ক।

“ও এখানে কীভাবে এল?”

“আমি জানি না!”

বাইরে আবার ধাক্কা পড়ল।

“অনু, শোন! লোকটা তোর বাবা নয়!”

অনন্যা জমে গেল।

অরিন্দম তার হাত শক্ত করে ধরলেন।

“ওর কথা শুনবি না!”

বাইরে থেকে সৌমেন কাকুর গলা আরও জোরে শোনা গেল—

“তুই যার সঙ্গে কথা বলছিস, সে অরিন্দম সেন নয়! তোর বাবা কুড়ি বছর আগেই মারা গিয়েছে!”

অনন্যা বাবার মুখের দিকে তাকাল।

লোকটির চোখে জল। তিনি ফিসফিস করে বললেন—

“অনু, ওকে দরজা খুলতে দিস না। ও যদি ভেতরে ঢোকে, তাহলে আজ রাতেই তুই সত্যিটা জানার আগেই সব শেষ হয়ে যাবে।”

বাইরে তখন দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ছে।

ধড়াম! ধড়াম! ধড়াম!

অনন্যা একবার দরজার দিকে, একবার বাবার দিকে তাকাল।

তারপর হঠাৎ অরিন্দমের কবজির দিকে চোখ পড়তেই সে চমকে উঠল।

সেখানে একটি পুরোনো ঘড়ি বাঁধা।

ঘড়িটার কাচ ভাঙা। কাঁটা থেমে আছে ঠিক রাত বারোটা পাঁচে।

ছোটবেলায় বাবার হাতে এই ঘড়িটাই দেখেছিল সে।

কিন্তু ছবিতে, যেখানে বাবাকে শেষবার জীবিত দেখা গিয়েছিল, সেই ছবিতেও ঘড়িটা ছিল।

অনন্যা কাঁপা গলায় বলল, “বাবা… তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?”

অরিন্দম উত্তর দিলেন না।

শুধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—

“তুই কি সত্যিই জানতে চাস, তোর বাবা কোথায় ছিল?”

ঠিক তখনই ঘরের আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে অনন্যা অনুভব করল, কেউ একজন তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলছে—

“কারণ যে মানুষটাকে তুই বাবা বলে ডাকছিস, সে তোকে চেনে কুড়ি বছর আগের নামেও না…”

অনন্যা চিৎকার করতে গিয়েও পারল না।

দরজার বাইরে সৌমেন কাকুর গলা থেমে গেছে।

আর তার ঠিক পেছনে, অন্ধকারের মধ্যে, আরেকজনের নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে।

কেউ একজন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।

যে মানুষটিকে সে দেখতে পাচ্ছে না।

কিন্তু যার হাতে ধরা আছে আরেকটি নীল খাম।

খামের ওপর লেখা—

“অনন্যা সেনের জন্য। খুলবে শুধু তখনই, যখন প্রথম চিঠির মানুষটিকে চিনতে পারবে।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *