Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল খামের শেষ চিঠি (তৃতীয় পর্ব : যে ছেলেটি নিজের নাম ভুলে গিয়েছিল)।

অনন্যা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

ছবির ছেলেটির চোখ দুটো অদ্ভুত রকমের পরিচিত। যেন বহু বছর আগে দেখা কোনও মুখ, যা স্মৃতির গভীরে চাপা পড়ে ছিল। তার কপালের বাঁ দিকে ছোট্ট একটা কাটা দাগ। অনন্যার নিজের কপালেও ঠিক একই জায়গায় এমন একটি দাগ রয়েছে।

ছোটবেলায় গাছ থেকে পড়ে এই দাগ হয়েছিল তার। মা বলেছিলেন, জন্মের সময় থেকেই নাকি দাগটা ছিল। কিন্তু ছবির ছেলেটির কপালে একই দাগ এল কীভাবে?

প্রতাপ মুখোপাধ্যায় ফোনটা হাতে নিয়ে ছবিটি ভালো করে দেখলেন।

“ছেলেটার নাম জানো?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

অনন্যা মাথা নাড়ল।

“জানি না। শুধু এই বার্তাটা এসেছে।”

“নম্বরটা দেখাও।”

প্রতাপবাবু নম্বরটি নিজের ফোনে তুলে নিলেন। তারপর কয়েকবার কল করার চেষ্টা করলেন। প্রতিবারই ফোন বন্ধ।

তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, “এই বার্তা যে পাঠিয়েছে, সে তোমার পরিবারের অনেক কিছু জানে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—কেউ যদি তোমাকে বলে অয়ন তোমার ভাই নয়, তার মানেই কথাটা সত্যি নয়।”

অনন্যা চুপ করে রইল।

“কিন্তু যদি সত্যিই অয়ন আমার ভাই না হয়?”

প্রতাপবাবু কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “তাহলে এতদিনের পরিচিত জীবনটাকে নতুন করে বুঝতে হবে। তবে তার আগে প্রমাণ দরকার।”

অনন্যা জানলার বাইরে তাকাল। রাতের বৃষ্টির পর রাস্তায় জল জমে আছে। দূরে একটা চায়ের দোকান খুলছে। পৃথিবীটা স্বাভাবিকভাবে জেগে উঠছে, অথচ তার নিজের জীবন যেন এক অচেনা গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে।

“আমি বাড়ি যাব,” সে বলল। “মায়ের ডায়েরিটা খুঁজে বের করব।”

প্রতাপবাবু বাধা দিলেন না।

“আমি তোমার সঙ্গে যাব।”

“না। আপনি গেলে সৌমেন কাকু সন্দেহ করবেন।”

“সৌমেনকে তুমি এখনও বিশ্বাস করো?”

অনন্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“জানি না। ছোটবেলা থেকে উনিই আমাদের দেখেছেন। কিন্তু এখন কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছি না।”

প্রতাপবাবু মাথা নাড়লেন।

“সেটাই ভালো। অন্ধ বিশ্বাসের চেয়ে প্রশ্ন করা ভালো। তবে নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে যেয়ো না।”

বাড়ি ফেরার পথে অনন্যা বারবার ছবির ছেলেটির মুখ মনে করার চেষ্টা করল। কেন জানি তার মনে হচ্ছিল, ছেলেটিকে সে শুধু ছবিতে দেখেনি। হয়তো কোনও স্বপ্নে, হয়তো শৈশবের কোনও বিস্মৃত দুপুরে।

কিন্তু যতই মনে করার চেষ্টা করল, ততই স্মৃতিগুলো কুয়াশার মতো অস্পষ্ট হয়ে গেল।

বাড়িতে পৌঁছে সে দেখল, মূল দরজা খোলা। বসার ঘরে সৌমেন কাকু বসে আছেন। তাঁর চোখ লাল, মুখে ক্লান্তির ছাপ।

অনন্যাকে দেখেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

“কোথায় ছিলি সারারাত?”

অনন্যা স্থির চোখে তাঁর দিকে তাকাল।

“পুরোনো ডাকঘরে।”

সৌমেন কাকুর মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল।

“তুই সেখানে গিয়েছিলি?”

“হ্যাঁ।”

“আমি তোকে নিষেধ করেছিলাম!”

“কেন? সেখানে কী আছে?”

সৌমেন কাকু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “তোর বাবা।”

অনন্যার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল।

“তুমি জানো বাবা বেঁচে আছে?”

“আমি জানি না সে বেঁচে আছে কি না। কিন্তু আমি জানি, তোর বাবার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটা সাধারণ কোনও ঘটনা ছিল না।”

“তাহলে এতদিন আমাকে বলোনি কেন?”

“কারণ তোর মা আমাকে কথা দিয়েছিল, তুই যেন এই বিষয়টা নিয়ে আর কোনও দিন অনুসন্ধান না করিস।”

“মা কেন এমন কথা বলবে?”

সৌমেন কাকু চোখ নামিয়ে নিলেন।

“কারণ তোর মা ভয় পেত।”

“কাকে?”

“যে মানুষগুলো তোর বাবাকে সরিয়ে দিয়েছিল, তাদের।”

অনন্যা এগিয়ে এল।

“তাহলে তুমি তাদের চেনো?”

সৌমেন কাকু উত্তর দিলেন না।

“তুমি কি দেবব্রত মল্লিককে চেনো?”

এবার তিনি চমকে উঠলেন।

“এই নাম তোকে কে বলেছে?”

“উত্তর দাও।”

সৌমেন কাকু দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, “দেবব্রত মল্লিক ছিল তোর বাবার সহকর্মী। কিন্তু সে শুধু সহকর্মী ছিল না। সে এমন কিছু জানত, যা জানলে অনেক বড় মানুষের মুখোশ খুলে যেত।”

“কী জানত?”

“সরকারি টাকা চুরি, জাল নথি তৈরি, আর একটা শিশুকে অন্য পরিবারের কাছে তুলে দেওয়ার কথা।”

অনন্যার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“কোন শিশুকে?”

সৌমেন কাকু এবার তার দিকে তাকালেন।

“তোর ভাইকে।”

অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল।

“আমার ভাই কি সত্যিই ছিল?”

“ছিল।”

“তার কী হয়েছিল?”

সৌমেন কাকুর চোখে জল এসে গেল।

“তোর মা যেদিন হাসপাতালে ছেলেটার জন্ম দিয়েছিল, সেদিন আমি ওখানে ছিলাম। অরিন্দমও ছিল। ছেলেটা সুস্থ ছিল। কিন্তু রাতের মধ্যে হাসপাতালের কাগজপত্র বদলে গেল। সকালে সবাইকে জানানো হলো, শিশুটি মারা গেছে।”

“তাহলে মা তাকে দেখেনি কেন?”

“তোর মাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তাকে বলা হলো, শিশুটির দেহ দাফন করা হয়েছে।”

“আর বাবা?”

“অরিন্দম সেটা বিশ্বাস করেনি। সে তদন্ত শুরু করেছিল। তারপরই সে নিখোঁজ হয়ে যায়।”

অনন্যা কাঁপা গলায় বলল, “তুমি কি জানো, আমার ভাই কোথায়?”

সৌমেন কাকু অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমি জানি না সে এখন কোথায়। কিন্তু আমি জানি, সে বেঁচে ছিল।”

“তুমি কীভাবে জানো?”

“কারণ সেই রাতেই আমি একটা শিশুকে হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

অনন্যা পিছিয়ে গেল।

“তুমি?”

“হ্যাঁ।”

“কোথায় নিয়ে গিয়েছিলে?”

সৌমেন কাকু উত্তর দেওয়ার আগে বাইরে একটা মোটরবাইকের শব্দ হলো। তারপর বাড়ির গেট খোলার আওয়াজ।

অয়ন ফিরেছে।

সৌমেন কাকু হঠাৎ অনন্যার হাত ধরে বললেন, “তুই যা-ই শুনিস, অয়নকে ঘৃণা করিস না।”

অনন্যা হাত ছাড়িয়ে নিল।

“কেন? অয়ন কি জানে সে কে?”

“না। অন্তত আমি তাকে কিছু বলিনি।”

“তাহলে অয়ন আমার ভাই নয়?”

সৌমেন কাকু চোখ বন্ধ করলেন।

“অয়ন তোর ভাই। কিন্তু রক্তের সম্পর্কের অর্থ সবসময় একই হয় না।”

এই উত্তর শুনে অনন্যার সমস্ত সন্দেহ আরও গভীর হলো।

সে আর কিছু না বলে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল।

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই তার মনে পড়ল প্রতাপবাবুর কথা—মায়ের আলমারির গোপন খোপে ডায়েরি আছে।

মায়ের ঘরটি বহুদিন ধরে বন্ধ। সেখানে ঢুকলে এখনও মায়ের গন্ধ পাওয়া যায় বলে অনন্যা খুব একটা যায় না। আলমারিতে মায়ের শাড়ি, পুরোনো বই, কিছু চিঠি আর একটি কাঠের বাক্স রাখা।

সে আলমারির নিচের তাকে হাতড়াতে লাগল। শাড়ির স্তূপ সরাতেই পেছনের দিকে একটা অস্বাভাবিক ফাঁক চোখে পড়ল। কাঠের পাতটা চাপ দিতেই খুলে গেল একটি গোপন খোপ।

ভেতরে একটি ছোট ডায়েরি, কয়েকটি পুরোনো ছবি আর একটি হাসপাতালের কাগজ।

অনন্যা প্রথমে ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম কয়েক পাতা সাধারণ লেখা—বাড়ির হিসাব, বাজারের তালিকা, অয়নের ছোটবেলার কথা। তারপর একটি পাতায় এসে তার চোখ আটকে গেল।

তারিখ: ১৮ জুলাই, ২০০৬।

“আজ আমার পৃথিবীটা ভেঙে গেল। অরিন্দম বাড়ি ফেরেনি। পুলিশ বলছে, সে পালিয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, আমার স্বামী পালিয়ে যাওয়ার মানুষ নয়।

আমার ছেলে কোথায়, কেউ জানে না। সবাই বলছে, সে মারা গেছে। কিন্তু আমি তার মুখটাও দেখতে পাইনি।

সৌমেন বলেছে, সে আমাকে সাহায্য করবে। দেবব্রত মল্লিক নাকি হাসপাতালে ছিল। আমি জানি না, কাকে বিশ্বাস করব।

আজ রাতে জানলার বাইরে একজন দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখ অরিন্দমের মতো। কিন্তু সে আমাকে দেখে পালিয়ে গেল।

যদি সত্যিই অরিন্দম বেঁচে থাকে, তাহলে সে কেন আমার কাছে ফিরে আসে না?”

অনন্যার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

সে পরের পাতায় গেল।

তারিখ: ২১ জুলাই, ২০০৬।

“আজ আমি এমন একটা সত্যি জেনেছি, যা কাউকে বলতে পারব না। আমার ছেলেকে যে মৃত বলে জানানো হয়েছে, সে আসলে অন্য কোথাও রয়েছে। কিন্তু কোথায়, তা জানি না।

সৌমেন আমাকে বলেছে, ছেলেটিকে নিরাপদে রাখা হয়েছে। আমি তাকে বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু তার চোখে এমন একটা ভয় দেখেছি, যা আমার বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়।

অরিন্দম যদি ফিরে আসে, আমি তাকে সব বলব।

কিন্তু যদি সে না ফেরে, তাহলে আমার মেয়েকে এই সত্যিটা জানতে হবে।”

অনন্যা তাড়াতাড়ি পরের পাতা উল্টে দিল।

তারিখ: ২৯ জুলাই, ২০০৬।

“আজ আমি ছেলেটিকে দেখেছি।

আমার সন্তান বেঁচে আছে।

কিন্তু তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না।

যে মানুষটি তাকে নিয়ে গেছে, সে বলেছে, ছেলেটিকে বাঁচাতে হলে আমাকে তাকে ভুলে যেতে হবে। আমি কীভাবে নিজের সন্তানকে ভুলে যাব?

আমি শুধু চাই, আমার দুই সন্তান একদিন একে অপরকে চিনতে পারুক।

তাদের দু’জনের কপালেই একই দাগ। অরিন্দম বলেছিল, এ দাগ আমাদের পরিবারের চিহ্ন হয়ে থাকবে।

কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি। কারণ যে মানুষটি আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে, সে বলেছে, একদিন সে আমার মেয়েকেও নিয়ে যাবে।”

অনন্যা ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।

একই দাগ!

ছবির ছেলেটির কপালেও সেই দাগ রয়েছে।

তার মানে ছবির ছেলেটিই কি তার হারিয়ে যাওয়া ভাই?

কিন্তু মায়ের ডায়েরিতে আরেকটি অদ্ভুত কথা লেখা—যে মানুষটি ছেলেকে নিয়ে গেছে, সে একদিন অনন্যাকেও নিয়ে যাবে।

কে সেই মানুষ?

দেবব্রত মল্লিক?

সৌমেন কাকু?

নাকি অন্য কেউ?

ডায়েরির শেষ পাতায় একটি ঠিকানা লেখা ছিল—

নদীর ধারের নীল বাড়ি, শ্মশানঘাটের পাশের রাস্তা, শান্তিপুর।

ঠিকানার নিচে মায়ের কাঁপা হাতে লেখা একটি বাক্য—

“যদি কখনও নিজের ভাইকে খুঁজতে যাও, মনে রাখিস, সে নিজের নাম ভুলে গেছে।”

অনন্যা ঘড়ির দিকে তাকাল।

দুপুর গড়িয়ে গেছে। অচেনা নম্বরের বার্তায় বলা হয়েছিল বিকেল পাঁচটায় নদীর ধারের পুরোনো বাড়িতে যেতে।

এখন তার হাতে সময় খুব কম।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

“দিদি?”

অয়নের গলা।

অনন্যা তাড়াতাড়ি ডায়েরিটা বন্ধ করে বিছানার নিচে সরিয়ে রাখল।

“কী হয়েছে?”

অয়ন ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তার মুখে অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য।

“তুই আজ কোথায় গিয়েছিলি?”

অনন্যা চুপ করে রইল।

“সৌমেন কাকু আমাকে সব বলেছেন,” অয়ন বলল। “তুই নাকি বাবার খোঁজ করতে গিয়েছিলি।”

“তুই বাবার কথা জানিস?”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“না। কিন্তু একটা কথা তোকে বলার আছে।”

সে পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিতে একটি হাসপাতালের ঘর। বিছানায় শুয়ে এক মহিলা—অনন্যার মা। পাশে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ, যার মুখ অরিন্দম সেনের মতো। তাঁর কোলে একটি নবজাতক।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা তারিখটি দেখে অনন্যা শিউরে উঠল।

১৭ জুলাই, ২০০৬।

সেই দিনই তার ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল।

“ছবিটা তুই কোথায় পেলি?” অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

অয়ন বলল, “সৌমেন কাকুর ঘরে। আমি একটা ফাইল খুঁজছিলাম। ছবিটা একটা পুরোনো বাক্সের ভেতরে ছিল। আর তার সঙ্গে এই কাগজটা।”

সে আরেকটি কাগজ বের করল।

সেটি ছিল একটি হাসপাতালের জন্মনিবন্ধনের নকল। শিশুটির নামের জায়গায় লেখা—

অয়ন সেন।

কিন্তু কাগজের নিচে আরেকটি নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। অনন্যা আলোয় কাগজটা ধরে দেখল। মুছে যাওয়া কালির নিচে অক্ষরগুলো এখনও অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

নামটি ছিল—

অভ্র সেন।

অয়ন ধীরে ধীরে বলল, “দিদি, আমি জানি না কেন আমার নাম বদলানো হয়েছিল। কিন্তু আজ একটা কথা বুঝেছি। আমার জন্মের গল্পটা আমাদের যেভাবে বলা হয়েছে, সেটা সত্যি নয়।”

অনন্যা ভাইয়ের হাত ধরল।

“তুই আমার ভাই। তাতে কোনও সন্দেহ নেই।”

অয়নের চোখে জল এসে গেল।

“কিন্তু আমি যদি সেই শিশু না হই, যাকে মা হারিয়েছিল?”

অনন্যা উত্তর খুঁজে পেল না।

অয়ন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “দিদি, তুই কি সত্যিই আরেকজন ভাইকে খুঁজতে যাবি?”

অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “হ্যাঁ। কারণ মা চেয়েছিল, আমরা একদিন একে অপরকে চিনতে পারি।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“তাহলে আমিও যাব।”

“না, অয়ন। আমি একা যাব।”

“কেন?”

“কারণ যদি বিপদ হয়, অন্তত তুই নিরাপদে থাকবি।”

অয়ন হালকা হেসে বলল, “তুই ছোটবেলা থেকেই আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করিস। কিন্তু দিদি, এবার আমাকেও সত্যিটা জানতে দে।”

অনন্যা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, তাকে আর আটকানো যাবে না।

বিকেল চারটে পঞ্চান্ন মিনিটে দু’জনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

নদীর ধারের পুরোনো বাড়িটা শান্তিপুরের এক নির্জন প্রান্তে। একসময় নীল রঙে রাঙানো ছিল বলে লোকেরা তাকে নীল বাড়ি বলে ডাকে। এখন দেওয়ালের রং উঠে গেছে, জানলায় মরচে, উঠোনে আগাছা।

বাড়ির সামনে পৌঁছে অনন্যা দেখল, দরজার পাশে একটি সাদা ফুল রাখা।

ঠিক সেই ফুল, যা সে আগের রাতে ডাকঘরের সামনে দেখেছিল।

দরজাটা সামান্য খোলা।

অয়ন ফিসফিস করে বলল, “দিদি, ভেতরে কেউ আছে।”

অনন্যা দরজায় ধাক্কা দিল।

“কেউ আছেন?”

ভেতর থেকে একটা গলা এল—

“এসো, অনন্যা।”

দু’জনেই থমকে গেল।

লোকটি অনন্যার নাম জানে।

তারা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল। ভেতরে একটা পুরোনো টেবিল, দুটি চেয়ার, দেওয়ালে কয়েকটি বিবর্ণ ছবি। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছেলেটি, যার ছবি অনন্যা ফোনে দেখেছিল।

কপালের বাঁ দিকে একই দাগ।

চোখে অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

ছেলেটি ঘুরে দাঁড়াল।

তার চোখ প্রথমে অনন্যার দিকে, তারপর অয়নের দিকে গেল।

দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না।

শেষ পর্যন্ত ছেলেটিই নীরবতা ভাঙল।

“তুমি অনন্যা?”

“হ্যাঁ।”

“আর তুমি অয়ন?”

অয়ন মাথা নাড়ল।

ছেলেটি মৃদু হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে যন্ত্রণা বেশি ছিল।

“তোমাদের দু’জনকে একসঙ্গে দেখার জন্য আমি কুড়ি বছর অপেক্ষা করেছি।”

অনন্যার চোখে জল এসে গেল।

“তুমি কি আমার ভাই?”

ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমার নাম এখন অভ্র। কিন্তু এই নামটাও আমার নিজের কি না, তা আমি জানি না।”

অয়ন এগিয়ে এল।

“তোমাকে ছোটবেলায় কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?”

অভ্র জানলার বাইরে তাকাল।

“একটা আশ্রমে। আমাকে বলা হয়েছিল, আমার বাবা-মা মারা গিয়েছেন। আমি সেখানেই বড় হয়েছি। আমার কাছে শুধু একটা পুরোনো ছবি ছিল—একজন মহিলার কোলে একটা ছোট মেয়ে। সেই ছবির পেছনে লেখা ছিল, ‘অনু আর অভ্র—দুই আলো।’”

অনন্যা কেঁদে ফেলল।

“ওটা মা লিখেছিল!”

অভ্র চোখ বন্ধ করল।

“আমি জানতাম, আমার একটা বোন আছে। কিন্তু আমাকে বলা হয়েছিল, সে অনেক আগেই মারা গেছে।”

“কে বলেছিল?”

অভ্র উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির বাইরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

একটা তালা লাগানোর শব্দ হলো।

অয়ন ছুটে দরজার দিকে গেল। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ।

তারপর ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এলেন।

সৌমেন কাকু।

কিন্তু তাঁর হাতে একটা পিস্তল।

অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল।

“সৌমেন কাকু?”

সৌমেন কাকু দরজা বন্ধ করে ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এলেন।

“আমি দুঃখিত, অনু। কিন্তু তোমাদের আর সত্যি জানার সুযোগ দেওয়া যায় না।”

অয়ন চিৎকার করে উঠল, “আপনি কী করছেন?”

সৌমেন কাকু তার দিকে তাকালেন।

“তুইও সব জেনে গেছিস। তাই তোকে আর বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়।”

অনন্যা ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

“আপনি আমাদের এতদিন আগলে রেখেছেন! আপনি আমাদের পরিবারের মানুষ!”

সৌমেন কাকুর চোখে এক মুহূর্তের জন্য জল দেখা গেল।

“হ্যাঁ। আমি তোমাদের ভালোবাসতাম। কিন্তু ভালোবাসা সব অপরাধ মুছে দিতে পারে না।”

“আপনি কী অপরাধ করেছেন?”

সৌমেন কাকু পিস্তলটা নামিয়ে একটা চেয়ারে বসলেন।

“তোমার জন্মের আগেই এই গল্প শুরু হয়েছিল। তোমার বাবা অরিন্দম সেন এমন একটি হিসাবের খাতা পেয়েছিল, যেখানে কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের অপরাধের প্রমাণ ছিল। সেই খাতায় শিশু পাচারের একটি চক্রের নামও ছিল। তারা নবজাতকদের হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নিয়ে অন্য পরিবারের কাছে বিক্রি করত।”

অনন্যার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

“আমার ভাইকেও?”

“হ্যাঁ। তোমার ভাই ছিল সেই চক্রের প্রথম শিকারদের একজন। কিন্তু তোমার বাবা তাকে খুঁজে পেয়েছিল। সে ভেবেছিল, শিশুটিকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। তারপরই সবকিছু বদলে গেল।”

“তুমি তাদের সাহায্য করেছিলে?”

সৌমেন কাকু চোখ নামিয়ে বললেন, “প্রথমে করেছিলাম। আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমার নিজের পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আমি হাসপাতালের নথি বদলাতে সাহায্য করেছিলাম। কিন্তু পরে যখন বুঝলাম, তারা শিশুটিকে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেবে, তখন আমি তাকে নিয়ে পালাই।”

অভ্র বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

“তাহলে আপনিই আমাকে আশ্রমে রেখে এসেছিলেন?”

সৌমেন কাকু মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। তোমাকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু তোমাকে ফিরিয়ে আনার সাহস আমার কোনও দিন হয়নি।”

অয়ন কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে আমার পরিচয় কী?”

সৌমেন কাকু তার দিকে তাকালেন।

“তুইও এই চক্রের শিকার। তোর জন্মের আসল পরিচয় নিয়ে আমি এখনও নিশ্চিত নই। তোর নাম বদলানো হয়েছিল, কাগজপত্র বদলানো হয়েছিল। কিন্তু তুই এই বাড়িতে এসেছিলি যখন তোর বয়স মাত্র তিন। তোমার মা-বাবা তোকে নিজেদের সন্তান হিসেবেই বড় করেছেন।”

“তাহলে আমার আসল বাবা-মা কে?”

সৌমেন কাকু চুপ করে গেলেন।

অনন্যা বলল, “আর আমার বাবা?”

“অরিন্দম সব জানত। সে দেবব্রত মল্লিকের সঙ্গে প্রমাণ নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেই রাতে ডাকঘরে একজন মারা যায়। তার দেহের পরিচয় বদলে দেওয়া হয়। তারপর থেকে অরিন্দমের নামে খুনের অভিযোগ চাপানো হয়।”

“কিন্তু তুমি তো বলেছিলে বাবা বেঁচে আছে!”

“আমি বলেছিলাম, অরিন্দমকে হয়তো হত্যা করা হয়নি। কারণ আমি তার মৃতদেহ কখনও দেখিনি।”

অভ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“তাহলে আপনি আমাদের এখানে ডেকেছেন কেন?”

সৌমেন কাকু তার দিকে তাকালেন।

“কারণ তোমাদের বাবা আমাকে একটা কাজ দিয়ে গিয়েছিল। সে বলেছিল, একদিন যদি তোমরা তিনজন একসঙ্গে হও, তবে তোমাদের কাছে শেষ নীল খামটা পৌঁছে দিতে।”

তিনি পকেট থেকে একটি নীল খাম বের করলেন।

খামের ওপর লেখা—

“অনন্যা, অয়ন ও অভ্রের জন্য।”

অনন্যা কাঁপা হাতে খামটা নিতে গেল। কিন্তু সৌমেন কাকু হাত সরিয়ে নিলেন।

“আগে একটা কথা বলো। তোমরা কি সত্যিটা জানার পরও একে অপরকে ভাইবোন বলে মেনে নেবে? যদি জানতে পারো, তোমাদের মধ্যে একজনের জন্মের পেছনে এমন একটা অপরাধ লুকিয়ে আছে, যা তোমাদের পুরো পরিবারকে ধ্বংস করেছে?”

অনন্যা অভ্রের দিকে তাকাল। তারপর অয়নের দিকে।

“আমরা কেউ এই অপরাধ করিনি। আমাদের জন্ম আমাদের হাতে ছিল না। আমরা একে অপরকে ছেড়ে যাব না।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

অভ্রের চোখে জল এসে গেল।

সৌমেন কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে খামটা টেবিলে রাখলেন।

“তাহলে পড়ো।”

অনন্যা খাম খুলল।

ভেতরে মাত্র একটি পাতার চিঠি।

লেখাটি তার মায়ের।

“আমার তিন সন্তান,

যদি তোমরা এই চিঠি একসঙ্গে পড়ো, তাহলে বুঝব, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ইচ্ছেটা পূরণ হয়েছে।

অনু, তুমি আমার প্রথম আলো।

অয়ন, তুমি আমার ঘরে এসেছিলে যখন আমার পৃথিবী ভেঙে পড়েছিল। তোমাকে আমি জন্ম দিইনি, কিন্তু তোমাকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম নিজের সন্তান হিসেবেই।

অভ্র, তোমাকে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তোমার মুখের দিকে শেষবার তাকানোর সুযোগও আমাকে দেওয়া হয়নি।

আমি জানি না, তোমাদের জন্মের রহস্য কী। আমি শুধু জানি, তোমরা তিনজন আমার সন্তান।

কিন্তু তোমাদের বাবার একটা সত্যি আমি এতদিন লুকিয়ে রেখেছি। সে শুধু তোমাদের বাঁচাতে পালিয়ে যায়নি। সে নিজের অপরাধের প্রমাণও লুকিয়ে রেখেছিল।

সেই প্রমাণ রয়েছে এমন একটি জায়গায়, যেখানে তোমরা কেউ কখনও খোঁজ করোনি।

তোমাদের বাড়ির পুরোনো পুকুরঘাটের নিচে।

সেখানে একটি লোহার বাক্স আছে। বাক্সের চাবি রয়েছে তোমাদের বাবার ঘড়ির ভেতরে।

যদি সত্যিই জানতে চাও, কে তোমাদের পরিবারকে ভেঙে দিয়েছিল, তবে সেই বাক্স খুঁজে বের করো।

কিন্তু সাবধান। বাক্স খোলার পর তোমরা বুঝতে পারবে, তোমাদের মধ্যে একজন এমন মানুষের সন্তান, যার নাম শুনলে তোমরা নিজেরাই নিজেদের ঘৃণা করতে শুরু করবে।

তবুও মনে রেখো—অপরাধ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না। অপরাধ করে মানুষ নিজেই।

তোমাদের মা।”

চিঠি পড়া শেষ হলে ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

অনন্যা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“বাবার ঘড়ি কোথায়?”

সৌমেন কাকু পিস্তলটা টেবিলে রাখলেন। তারপর পকেট থেকে একটি পুরোনো ঘড়ি বের করলেন।

ঘড়ির কাচ ভাঙা। কাঁটা থেমে আছে রাত বারোটা পাঁচে।

অনন্যা চিনতে পারল।

এটাই সেই ঘড়ি, যা ডাকঘরে অরিন্দমের মতো দেখতে মানুষটির হাতে ছিল।

সৌমেন কাকু ঘড়িটা তার হাতে দিয়ে বললেন, “ঘড়ির পেছনের ঢাকনাটা খুলে দেখো।”

অনন্যা নখ দিয়ে ঢাকনাটা খোলার চেষ্টা করল। প্রথমে খুলল না। তারপর অয়ন একটা ছোট ছুরি দিয়ে আলতো করে চাপ দিতেই ঢাকনা খুলে গেল।

ভেতরে একটি ক্ষুদ্র চাবি।

আর চাবির নিচে ভাঁজ করা কাগজের টুকরো।

অনন্যা কাগজটা খুলে পড়ল।

মাত্র তিনটি শব্দ—

“অয়নকে বিশ্বাস কোরো না।”

অনন্যার চোখ ধীরে ধীরে ভাইয়ের দিকে উঠল।

অয়ন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে।

“দিদি, আমি জানি না এটা কে লিখেছে!”

অভ্র পিছিয়ে গেল।

সৌমেন কাকু চোখ বন্ধ করে বললেন, “এবার তোমাদের সত্যিটা জানার সময় হয়েছে।”

“কী সত্যি?” অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

সৌমেন কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“অয়ন, তোর আসল নাম শুধু অয়ন নয়। তুই সেই শিশুটির পরিচয় নিয়ে বড় হয়েছিস, যাকে কুড়ি বছর আগে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু তুই অরিন্দম সেনের সন্তান কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“আমি তো কিছুই জানি না!”

“আমি জানি। কিন্তু একটা কথা জানি—তোর জন্মের আসল নথিতে বাবার নাম হিসেবে লেখা ছিল দেবব্রত মল্লিক।”

ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।

অনন্যা ধীরে ধীরে অয়নের দিকে তাকাল।

অয়নের মুখ ফ্যাকাশে।

“না… এটা মিথ্যে!”

অভ্র এক পা পিছিয়ে গেল।

সৌমেন কাকু বললেন, “আমি চাইনি তোমরা এভাবে জানো। কিন্তু এখন আর কিছু লুকিয়ে লাভ নেই।”

অয়ন কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে কি আমি…”

“তুই অপরাধীর সন্তান হতে পারিস,” সৌমেন কাকু বললেন। “কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুই অপরাধী।”

অনন্যা ভাইয়ের দিকে এগিয়ে গেল। অয়ন তার হাত সরিয়ে নিল।

“আমাকে ছুঁস না, দিদি।”

“অয়ন!”

“যদি আমার বাবা সেই মানুষ হয়, যে আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করেছে, তাহলে আমি কীভাবে তোমাদের সামনে দাঁড়াব?”

অনন্যার চোখে জল এসে গেল।

“তোর জন্মের জন্য তুই দায়ী নোস!”

অয়ন মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।

ঠিক সেই সময় বাড়ির বাইরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

সৌমেন কাকু জানলার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন।

“ওরা এসে গেছে!”

“কারা?” অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

“যারা এত বছর ধরে এই রহস্য লুকিয়ে রেখেছে। তারা জানে, তোমরা সত্যির কাছাকাছি পৌঁছে গেছ।”

দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল।

“পুলিশ! দরজা খুলুন!”

সৌমেন কাকু পিস্তলটা তুলে নিলেন। কিন্তু এবার তিনি সেটি অনন্যার দিকে তাক করলেন না।

বরং দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, “আমি আত্মসমর্পণ করছি!”

অনন্যা হতভম্ব হয়ে গেল।

“আপনি কী করছেন?”

সৌমেন কাকু ঘুরে তাকালেন।

“আমি অনেক বছর ধরে পালিয়ে বেড়িয়েছি, অনু। আজ আর পালাব না। আমি যে অপরাধ করেছি, তার শাস্তি আমার প্রাপ্য। কিন্তু তোমাদের সত্যিটা জানার অধিকার আছে।”

তিনি দরজা খুলে দিলেন।

পুলিশের সঙ্গে ঘরে ঢুকলেন প্রতাপ মুখোপাধ্যায়।

তাঁর চোখ সরাসরি সৌমেন কাকুর দিকে।

“অবশেষে আপনি স্বীকার করলেন।”

সৌমেন কাকু মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। আমি সব বলব।”

প্রতাপবাবু বললেন, “তাহলে আগে বলুন, অরিন্দম সেন কোথায়?”

সৌমেন কাকু ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন—

“অরিন্দম মারা যায়নি।”

অনন্যার বুক ধক করে উঠল।

“তাহলে বাবা কোথায়?”

সৌমেন কাকু তার দিকে তাকালেন।

“সে তোমাদের কাছেই ছিল। তোমরা তাকে চিনতে পারোনি।”

“কী বলতে চাইছেন?”

সৌমেন কাকু উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে একজন পুলিশকর্মী ছুটে এলেন।

“স্যার! একটা খবর আছে। ডাকঘরের যে মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে, তার পরিচয় জানা গেছে।”

প্রতাপবাবু দ্রুত জিজ্ঞেস করলেন, “কার?”

পুলিশকর্মী বললেন—

“দেবব্রত মল্লিকের।”

ঘরের মধ্যে কেউ কথা বলল না।

প্রতাপবাবু ধীরে ধীরে অনন্যার দিকে তাকালেন।

“তাহলে ডাকঘরে যে মানুষটিকে তোমরা অরিন্দম ভেবেছিলে, সে দেবব্রত মল্লিক ছিল।”

অনন্যা ফিসফিস করে বলল, “কিন্তু তার মুখ তো বাবার মতো ছিল!”

প্রতাপবাবু বললেন, “কারণ অরিন্দম আর দেবব্রত দেখতে প্রায় একই রকম ছিল। কিন্তু আসল অরিন্দম কোথায়, সেটা এখনও অজানা।”

সৌমেন কাকু মাথা নিচু করে বললেন, “আমি জানি সে কোথায়।”

সবাই তাঁর দিকে তাকাল।

“কোথায়?” অনন্যা প্রায় চিৎকার করে উঠল।

সৌমেন কাকু ধীরে ধীরে বললেন—

“তোমাদের বাড়ির পুকুরঘাটের কাছে।”

অনন্যার মনে পড়ল, মায়ের চিঠিতে লেখা ছিল পুকুরঘাটের নিচে লোহার বাক্স আছে।

“তাহলে সেখানে গেলেই বাবাকে পাব?”

সৌমেন কাকু মাথা নাড়লেন।

“না। সেখানে পাবে তোমার বাবার শেষ চিঠি। আর সেই চিঠিতে লেখা আছে, সে কেন নিজের পরিচয় বদলে তোমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।”

“কিন্তু তুমি তো বললে বাবা বেঁচে আছে!”

সৌমেন কাকু চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি বলেছি, সে মারা যায়নি। কিন্তু সে এখন কোথায় আছে, সেটা আমি জানি না।”

অনন্যা আর অপেক্ষা করতে পারল না।

সে অয়ন আর অভ্রকে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল। প্রতাপবাবু কয়েকজন পুলিশকর্মীকে সঙ্গে পাঠালেন।

রাত নামার আগেই তারা পৌঁছে গেল নিজেদের বাড়িতে।

পুকুরঘাটে শ্যাওলা জমেছে। ছোটবেলায় অনন্যা এখানে বাবার সঙ্গে বসে গল্প শুনত। অয়ন এখানে সাঁতার শিখেছিল। মা এখানে সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালাতেন।

ঘাটের শেষ সিঁড়ির নিচে হাত ঢোকাতেই অনন্যার আঙুলে ধাতব কিছু ঠেকল।

একটা ছোট লোহার বাক্স।

চাবিটা তালায় ঢুকতেই খুলে গেল।

ভেতরে একটি ডায়েরি, কয়েকটি ছবি, একটি পুরোনো পরিচয়পত্র এবং একটি চিঠি।

অনন্যা কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।

“আমার অনু,

যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব, আমি আর তোদের কাছে ফিরে যেতে পারিনি।

আমি জানি, তুই আমাকে খুঁজেছিস। জানি, তোর মা আমার জন্য অপেক্ষা করেছে। কিন্তু আমি ফিরে আসতে পারিনি, কারণ আমি যে সত্যিটা জেনেছিলাম, সেটা শুধু আমার জীবন নয়, তোদের জীবনও শেষ করে দিতে পারত।

তোর ভাইকে আমি হারাইনি। তাকে আমি নিজের হাতে অন্য এক মানুষের কাছে তুলে দিয়েছিলাম। কারণ সেই মানুষটি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে আমার ছেলেকে বাঁচাবে।

কিন্তু আমি জানতাম না, সেই মানুষটির নিজেরও একটি গোপন উদ্দেশ্য ছিল।

অনু, তুই যদি সত্যিই জানতে চাস, তোর বাবা কে, তাহলে প্রথমে জানতে হবে, কে তোকে জন্ম দিয়েছিল।

কারণ তুই আমার মেয়ে হলেও, তোর জন্মের গল্পটা আমি তোকে কখনও বলিনি।

তোর জন্মের রাতে হাসপাতালের যে নার্স তোকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল, তার নাম ছিল মাধবী দত্ত।

সে এখনও বেঁচে আছে।

তাকে খুঁজে বের করিস।

সে তোকে এমন একটা সত্যি বলবে, যা জানার পর তুই বুঝতে পারবি, কেন আমি তোকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিয়েছিলাম।

আর একটা কথা—যে মানুষটাকে তুই এতদিন অয়ন বলে চিনেছিস, সে হয়তো তোর ভাই। কিন্তু যে মানুষটি তোর পাশে দাঁড়িয়ে সত্যি খুঁজছে, সেই অভ্রের পরিচয়ও এখনও সম্পূর্ণ জানা যায়নি।

তিনটি নাম, তিনটি জন্ম, আর একটি পরিবার।

শেষ সত্যিটা জানতে হলে মাধবীকে খুঁজে বের করিস।

— তোর বাবা, অরিন্দম সেন।”

চিঠি পড়া শেষ করে অনন্যা মাথা তুলে তাকাল।

অয়ন আর অভ্র পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। দু’জনের মুখেই অসংখ্য প্রশ্ন।

অনন্যা বুঝতে পারল, তাদের গল্প এখনও শেষ হয়নি।

বরং আসল রহস্যের দরজা এবার খুলতে শুরু করেছে।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাক্সের তলায় রাখা পরিচয়পত্রটি তার চোখে পড়ল।

পরিচয়পত্রে ছবি তার নিজের।

নাম লেখা—

মাধবী দত্ত।

অনন্যার হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল।

সে ফিসফিস করে বলল, “এটা কী করে সম্ভব?”

অয়ন কাগজটা তুলে নিল।

“দিদি, এই ছবিটা তো তোর!”

অভ্র কাগজের পেছনটা উল্টে দেখল। সেখানে হাতে লেখা একটি বাক্য—

“অনন্যা সেনের আসল জন্মপরিচয়: মাধবী দত্তের কন্যা।”

অনন্যা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে ঘাটের সিঁড়িতে বসে পড়ল।

তার বাবা কে, সে জানে না।

তার ভাই কে, সে জানে না।

এমনকি যে মাকে সে নিজের মা বলে জেনেছে, তাঁর সঙ্গে তার জন্মের সম্পর্কও হয়তো অন্যরকম।

কুড়ি বছরের জীবনটা কি তবে এক বিশাল মিথ্যে?

ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে ফোন বেজে উঠল।

অনন্যা দৌড়ে গিয়ে ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর—

“অনন্যা? আমি মাধবী দত্ত বলছি।”

অনন্যার গলা শুকিয়ে গেল।

“আপনি… আপনি আমাকে চেনেন?”

বৃদ্ধা কেঁদে ফেললেন।

“চিনি, মা। তোর জন্মের সময় আমি তোকে নিজের হাতে কোলে নিয়েছিলাম।”

“তাহলে আমার আসল মা কে?”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর বৃদ্ধা বললেন—

“তোর আসল মা সেই নারী, যাকে তুই কুড়ি বছর ধরে মৃত বলে জানিস।”

অনন্যার শরীর অবশ হয়ে গেল।

“কী বলছেন?”

মাধবী দত্ত কাঁপা গলায় বললেন—

“তোর মা মারা যায়নি, অনন্যা। সে বেঁচে আছে। আর আজ এত বছর পর সে নিজেই তোকে খুঁজছে।”

ফোনের ওপাশে একটা দরজা খোলার শব্দ হলো।

তারপর আরেকটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল।

সেই কণ্ঠস্বর অনন্যার কাছে অচেনা নয়।

কারণ সেই কণ্ঠস্বরই একদিন তাকে ঘুম পাড়াত।

“অনু… মা…”

অনন্যার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

সে কাঁপতে কাঁপতে বলল—

“মা?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“হ্যাঁ, মা। আমি বেঁচে আছি। কিন্তু তুই যদি আমাকে খুঁজতে আসিস, তাহলে একা আসবি না। কারণ তোর বাবাকে যারা মেরেছিল, তারা এবার তোকে মারতে আসবে।”

ফোন কেটে গেল।

অনন্যা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে অয়ন ও অভ্রের দিকে তাকাল।

তিনজনের জীবন জড়িয়ে গেছে এমন এক রহস্যে, যার শেষ কোথায় কেউ জানে না।

কিন্তু অনন্যা এবার আর পিছিয়ে যাবে না।

সে তার বাবাকে খুঁজবে।

তার মাকে খুঁজবে।

তার দুই ভাইয়ের সত্যিকারের পরিচয় জানবে।

আর যে মানুষগুলো এত বছর ধরে তাদের পরিবারকে মিথ্যের আড়ালে আটকে রেখেছে, তাদের মুখোশ খুলবেই।

কারণ এবার আর কোনও নীল খাম তার জীবন নির্ধারণ করবে না।

এবার সে নিজেই সত্যির দরজা খুলবে।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *