রাত ২টা ১৭ মিনিট।
কলকাতার বেহালার একটি পুরোনো বাড়িতে ঘুম ভেঙে গেল অর্কর।
ঘরের চারদিকে নিস্তব্ধতা। জানলার বাইরে শীতের কুয়াশা। পাশের বিছানায় তার স্ত্রী মেঘলা গভীর ঘুমে। টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটা একটানা কেঁপে চলেছে।
অর্ক বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে নিল।
অচেনা নম্বর।
এই সময়ে কে ফোন করতে পারে?
ফোন কেটে দেওয়ার কথা ভেবেও শেষ পর্যন্ত কলটা ধরল সে।
“হ্যালো?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনও শব্দ নেই। তারপর একটা মেয়ের গলা শোনা গেল।
“অর্কদা?”
অর্কর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
এই গলাটা সে চেনে।
কুড়ি বছর ধরে চেনে।
যে মেয়েটির সঙ্গে একসময় প্রতিদিন কথা না বললে তার রাতের ঘুম হতো না। যে মেয়েটির জন্য সে নিজের শহর ছেড়েছিল, বন্ধুবান্ধব ছেড়েছিল, এমনকি নিজের নামটাকেও ঘৃণা করতে শিখেছিল।
রূপা।
কিন্তু রূপা তো মারা গেছে।
ঠিক বারো বছর আগে।
নিজের বিয়ের আগের রাতে রেললাইনের পাশ থেকে তার দেহ উদ্ধার হয়েছিল। পুলিশ বলেছিল, দুর্ঘটনা। পরিবার বলেছিল, আত্মহত্যা। আর অর্ক নিজের মনকে বুঝিয়েছিল, অতীতের কিছু দরজা আর কোনও দিন খোলা উচিত নয়।
তবু সেই গলাটা ভুলতে পারেনি সে।
“রূপা?” অর্কর গলা কেঁপে উঠল। “তুমি?”
ওপাশ থেকে মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল, “তুমি এখনও রাত জেগে থাকো?”
অর্কর হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
এই কথাটা রূপা ছাড়া আর কেউ জানে না। কলেজে পড়ার সময় অর্ক রাত জেগে বই পড়ত। রূপা মজা করে বলত, একদিন রাতের অন্ধকারেই তার সমস্ত জীবন শেষ হয়ে যাবে।
“এটা কীভাবে সম্ভব?” অর্ক ফিসফিস করে বলল। “তুমি তো…”
“মরে গেছি?”
ওপাশে একটা চাপা হাসি শোনা গেল।
“হ্যাঁ, অর্কদা। সবাই আমাকে মৃত বলেই জানে।”
অর্ক বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“তুমি কোথায়? এতদিন কোথায় ছিলে? আমাকে একটা ফোনও করোনি কেন?”
“সব প্রশ্নের উত্তর দেব। কিন্তু তার আগে একটা কাজ করতে হবে।”
“কী কাজ?”
“তোমার বাড়ির স্টোররুমে যাও। পুরোনো কাঠের আলমারির পেছনে একটা লাল বাক্স আছে। বাক্সটা খুলবে না। শুধু তার ওপর যে ছবিটা রাখা আছে, সেটা দেখবে।”
অর্ক হতভম্ব হয়ে গেল।
স্টোররুমের কথা রূপা জানবে কী করে? সেই ঘরটায় সে ছাড়া আর কেউ যায় না। আলমারিটাও বহু বছর ধরে সরানো হয়নি।
“তুমি এসব জানলে কী করে?”
“কারণ আমি তোমার বাড়িতে এসেছিলাম।”
“কবে?”
“আজ।”
অর্কর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“আজ? তুমি আমার বাড়িতে এসেছিলে?”
“হ্যাঁ। তুমি যখন ঘুমোচ্ছিলে, তখন।”
অর্ক তাড়াতাড়ি ঘরের দরজার দিকে তাকাল।
বাড়ির মূল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। জানলার ছিটকিনিও লাগানো। কোথাও জোর করে ঢোকার চিহ্ন নেই।
“তুমি কোথায় আছ এখন?”
রূপা উত্তর দিল না।
শুধু বলল, “ছবিটা দেখো, অর্কদা। তারপর আমাকে আবার ফোন কোরো।”
কল কেটে গেল।
অর্ক কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মেঘলাকে জাগানোর কথা ভেবে থেমে গেল।
মেঘলা কোনও দিন রূপার কথা জানতে চায়নি। বিয়ের আগে অর্ক নিজেই তাকে বলেছিল, তার জীবনে একসময় একজন ছিল। সেই সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে, আর সে অতীত নিয়ে আর কোনও আলোচনা করতে চায় না।
মেঘলা আর কোনও প্রশ্ন করেনি।
সেই নীরবতার জন্য অর্ক তার কাছে কৃতজ্ঞ ছিল।
কিন্তু আজকের ফোনের কথা কীভাবে বলবে?
সে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে স্টোররুমের দিকে এগোল।
বাড়িটা পুরোনো। করিডরের কাঠের মেঝেতে হাঁটলে শব্দ হয়। অর্ক ছোটবেলা থেকে এই বাড়িতে বড় হয়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা বাড়িটা তার নামে লিখে দিয়েছিলেন। মায়ের মৃত্যুর পর বিয়ে করে মেঘলাকে নিয়ে এখানেই থাকতে শুরু করে সে।
স্টোররুমের দরজাটা ঠেলে খুলতেই ধুলো আর পুরোনো কাগজের গন্ধ নাকে এল।
ঘরের এক কোণে কাঠের আলমারি।
অর্ক মোবাইলের আলো জ্বেলে আলমারির পেছনে তাকাল।
সত্যিই একটা লাল বাক্স রাখা আছে।
সে অবাক হয়ে গেল।
বাক্সটা আগে কখনও দেখেছে বলে মনে পড়ছে না। তার ওপর একটা সাদা-কালো ছবি।
ছবিতে তিনজন মানুষ।
একজন অর্ক।
একজন রূপা।
আর তৃতীয়জন—একটি ছোট্ট মেয়ে।
অর্কর কপালে ভাঁজ পড়ল।
ছবিটা সে চিনতে পারছে না। রূপার সঙ্গে কলেজে তোলা অনেক ছবি ছিল, কিন্তু এই ছবিটি কখনও দেখেনি। আর ছবির ছোট্ট মেয়েটিকে সে কোনও দিন দেখেছে বলেও মনে পড়ছে না।
ছবির পেছনে তারিখ লেখা—
১৮ নভেম্বর, ২০১৪।
রূপার মৃত্যুর ঠিক এক দিন আগে।
অর্কর হাত কেঁপে উঠল।
রূপার মৃত্যুর আগের দিন তোলা ছবি!
কিন্তু ছবিতে রূপার মুখে হাসি। অর্কর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে। আর ছোট্ট মেয়েটি তাদের মাঝখানে।
ছবির পেছনে আরও একটা বাক্য লেখা—
“যদি আমি হারিয়ে যাই, মেয়েটাকে খুঁজে নিও।”
অর্কর মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল।
কোন মেয়ে?
রূপার মেয়ে?
রূপার তো কোনও সন্তান ছিল না—অন্তত অর্ক এমনটাই জানত।
তাহলে এই শিশুটি কে?
ঠিক তখনই পেছনে দরজা খোলার শব্দ হলো।
অর্ক চমকে ঘুরে দাঁড়াল।
মেঘলা দরজায় দাঁড়িয়ে।
“এত রাতে এখানে কী করছ?”
অর্ক ছবিটা তাড়াতাড়ি পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল।
“কিছু না। পুরোনো একটা কাগজ খুঁজছিলাম।”
মেঘলা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“তোমার মুখ এত ফ্যাকাশে কেন?”
“ঘুম ভেঙে গেছে। তাই একটু হাঁটছিলাম।”
মেঘলা ঘরের ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকাল।
তারপর হঠাৎ বলল, “তুমি কি কোনও ফোন পেয়েছিলে?”
অর্কর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
“কেন?”
“ঘুমের মধ্যে একটা মেয়ের গলা শুনলাম। মনে হলো কেউ তোমাকে ডাকছে।”
অর্ক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “একটা ভুল নম্বর ছিল।”
মেঘলা কোনও কথা বলল না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা অর্কর অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিল।
“চলো, ঘুমিয়ে পড়ি,” মেঘলা বলল।
অর্ক তার সঙ্গে ঘরে ফিরে এল। কিন্তু সারা রাত তার আর ঘুম হলো না।
সকাল সাতটায় অফিসে যাওয়ার আগে সে আবার ছবিটা বের করল। মোবাইল দিয়ে ছবির পেছনের লেখা তুলে রাখল। তারপর অচেনা নম্বরটায় কল করল।
ফোন বন্ধ।
বারবার চেষ্টা করেও লাভ হলো না।
অফিসে পৌঁছে সে কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করল। অর্ক একটি বেসরকারি বিমা সংস্থায় কাজ করে। সারাদিন হিসাব, ফাইল, মিটিং—সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল।
কিন্তু দুপুরে তার ডেস্কে একটা খাম এসে পৌঁছল।
খামের ওপর তার নাম।
প্রেরকের নাম নেই।
ভেতরে একটি ছোট্ট চাবি আর একটা কাগজ।
লেখা—
“লাল বাক্সটা খুলতে হলে এই চাবি ব্যবহার করো। কিন্তু সাবধান, বাক্সের ভেতরে যা আছে, তা জানার পর তুমি আর আগের মানুষ থাকবে না।
আজ রাত ২টা ১৭ মিনিটে আবার ফোন আসবে।
এবার ফোন কেটো না।”
অর্ক চারদিকে তাকাল।
অফিসের কেউ কি তার সঙ্গে মজা করছে?
খামটা কে দিয়ে গেল, রিসেপশনের সিসিটিভি দেখলেই জানা যাবে। কিন্তু তার আগে একটা বিষয় নিশ্চিত হওয়া দরকার।
সে অফিসের নিরাপত্তাকর্মীকে জিজ্ঞেস করল, সকালে তার নামে কোনও কুরিয়ার বা চিঠি এসেছে কি না।
নিরাপত্তাকর্মী রেজিস্টার দেখে বলল, “না স্যার। আপনার নামে আজ কোনও কুরিয়ার আসেনি।”
অর্ক খামটা হাতে নিয়ে নিজের কেবিনে ফিরে এল।
তাহলে খামটা এল কোথা থেকে?
তার মনে পড়ল, রূপা ফোনে বলেছিল, সে আজ তার বাড়িতে এসেছিল। কিন্তু যদি সত্যিই এসে থাকে, তাহলে অফিসেও কি সে এসেছে?
না কি কেউ রূপার পরিচয় ব্যবহার করে তাকে ভয় দেখাচ্ছে?
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় অর্ক সিদ্ধান্ত নিল, আজ রাতেই লাল বাক্সটা খুলবে।
কিন্তু বাড়িতে ঢুকেই সে বুঝল, কিছু একটা অস্বাভাবিক।
বসার ঘরের টেবিলে একটি কাচের গ্লাস ভাঙা পড়ে আছে। মেঘলা সোফায় বসে, হাতে একটা কাগজ।
অর্ককে দেখেই সে উঠে দাঁড়াল।
“এটা কী?”
কাগজটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
সেটা একটা পুরোনো হাসপাতালের নথি।
রোগীর নাম—রূপা দত্ত।
ভর্তির তারিখ—১৭ নভেম্বর, ২০১৪।
ছাড়পত্রের তারিখ—উল্লেখ নেই।
অর্কর চোখ আটকে গেল নথির নিচের অংশে।
সেখানে লেখা—
“জন্ম নেওয়া কন্যাশিশুকে পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে।”
অর্কর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“এটা তুমি কোথায় পেলে?”
মেঘলা বলল, “স্টোররুমে। আলমারির নিচে পড়ে ছিল। আমি ঘরটা পরিষ্কার করছিলাম।”
অর্ক কিছু বলল না।
মেঘলা তার কাছে এগিয়ে এল।
“রূপা কে, অর্ক?”
“আমি তো তোমাকে বলেছি।”
“না। তুমি আমাকে শুধু বলেছিলে, তোমার জীবনে একজন ছিল। তুমি কখনও বলোনি, তার একটা মেয়ে ছিল।”
অর্কর মুখ শুকিয়ে গেল।
“আমি জানতাম না।”
“তাহলে ছবিতে যে মেয়েটা আছে, সে কে?”
অর্ক স্ত্রীর চোখের দিকে তাকাতে পারল না।
মেঘলা ধীরে ধীরে বলল, “আমি তোমাকে একটা কথা বলিনি। তোমার সঙ্গে বিয়ের আগে আমি রূপার নাম শুনেছিলাম। কিন্তু তখন তুমি বলেছিলে, সে মারা গেছে। তাই আর কিছু জানতে চাইনি।”
“তুমি রূপাকে চিনতে?”
“না। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস আগে একটা মেয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সে বলেছিল, তোমাকে বিয়ে না করতে।”
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।
“কে এসেছিল?”
“নিজের নাম বলেনি। শুধু একটা ছবি দেখিয়েছিল। ছবিতে তুমি আর রূপা ছিলে। আর বলেছিল, তুমি এমন একটা সত্যি লুকিয়ে রেখেছ, যা জানলে আমি তোমাকে কোনও দিন ক্ষমা করতে পারব না।”
অর্কর মাথা ঘুরতে লাগল।
“তুমি আমাকে কিছু বলোনি কেন?”
মেঘলা মৃদু হেসে বলল, “কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। ভেবেছিলাম, যদি কোনও সত্যি থাকে, একদিন তুমি নিজেই বলবে।”
অর্ক তার হাত ধরতে গেল। মেঘলা হাত সরিয়ে নিল।
“আমি তোমার শত্রু নই, অর্ক। কিন্তু তুমি যদি নিজের অতীত থেকে পালাতে থাকো, তাহলে একদিন সেই অতীত তোমার বর্তমানকে ধ্বংস করবে।”
কথাটা বলে মেঘলা নিজের ঘরে চলে গেল।
অর্ক অনেকক্ষণ বসার ঘরে বসে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, এতদিন সে যে জীবনটাকে সত্যি বলে জেনেছে, তার ভিতটাই হয়তো মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে।
রাত এগারোটা নাগাদ সে স্টোররুমে গেল।
লাল বাক্সটা আগের জায়গাতেই রয়েছে।
সে চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দিল।
ক্লিক করে বাক্সটা খুলে গেল।
ভেতরে ছিল তিনটি জিনিস।
একটি পুরোনো ডায়েরি।
একটি ছোট্ট শিশুর নীল রঙের জুতো।
আর একটি সিল করা খাম।
খামের ওপর লেখা—
“অর্কর জন্য। শুধু তখনই খুলবে, যখন রূপার ফোন আসবে।”
অর্কর শরীরের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
তার মানে, কেউ জানত রূপা আবার ফোন করবে।
সে ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“আমি রূপা। যদি কোনও দিন কেউ এই ডায়েরি পড়ে, তাহলে সে যেন জানে, আমি নিজের ইচ্ছায় অদৃশ্য হইনি।”
অর্ক দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।
ডায়েরির পাতায় পাতায় লেখা ছিল তাদের সম্পর্কের কথা, কলেজের দিন, প্রথম দেখা, একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু কয়েকটি পাতা পরে লেখার ধরন বদলে গেল।
“অর্ক জানে না, আমি মা হতে চলেছি। ওকে বলার সাহস পাচ্ছি না। কারণ ওর পরিবার আমাকে কখনও মেনে নেবে না। ওর বাবা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আমি যদি অর্কর জীবন থেকে সরে না যাই, তাহলে আমার পরিবারের ক্ষতি হবে।”
অর্কর বুকের মধ্যে একটা চাপা যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল।
তার বাবা, যিনি বারো বছর আগে মারা গেছেন, তিনি কি সত্যিই এমন করেছিলেন?
সে আরও পড়ল।
“আজ অর্কর সঙ্গে দেখা হলো। ও আমাকে বলল, কিছুদিনের জন্য শহরের বাইরে যাবে। আমি জানি না, ও সত্যি বলছে কি না। কিন্তু আমি ওকে হারাতে চাই না।
আমার সন্তানের জন্মের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি।
যদি অর্ক ফিরে না আসে, আমি একাই ওকে বড় করব।”
পরের পাতায় তারিখ—১৭ নভেম্বর, ২০১৪।
“আজ আমার মেয়ের জন্ম হয়েছে। আমি তার নাম রেখেছি তারা।
কিন্তু হাসপাতাল থেকে বেরোনোর আগেই সবকিছু বদলে গেল।
একজন লোক এসে বলল, অর্ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। সে আমাকে একটা কাগজ দেখাল, যেখানে অর্কর মৃত্যুর খবর লেখা।
আমি বিশ্বাস করিনি।
আমি জানি, অর্ক বেঁচে আছে।
আর যদি সে বেঁচে থাকে, তাহলে একদিন সে আমার মেয়েকে খুঁজে নেবে।”
অর্ক ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।
তার চোখে জল এসে গেছে।
তারা।
তার নিজের মেয়ে?
রূপার সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা সে কখনও কাউকে বলেনি। কিন্তু সম্পর্ক শেষ হওয়ার আগে রূপা একবার তাকে বলেছিল, তার জীবনে এমন একটা খবর আছে, যা জানলে অর্কর জীবন বদলে যাবে।
অর্ক ভেবেছিল, রূপা হয়তো অন্য কাউকে ভালোবাসে।
সে রাগ করে চলে গিয়েছিল।
তারপর আর কোনও দিন দেখা করেনি।
বারো বছর আগে রূপার মৃত্যুর খবর পেয়ে সে ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু কখনও জানতে পারেনি, রূপা মা হয়েছিল।
এত বড় সত্যি তার কাছ থেকে কে লুকিয়ে রেখেছিল?
আর তারা কোথায়?
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
রাত ২টা ১৭ মিনিট।
অর্কর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
অচেনা নম্বর।
সে ফোন ধরল।
“হ্যালো?”
ওপাশে সেই গলা।
“অর্কদা?”
অর্ক চোখ বন্ধ করল।
“রূপা, তুমি কোথায়?”
“তুমি ডায়েরিটা পড়েছ?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে জানো, তারা বেঁচে আছে।”
“কোথায় আমার মেয়ে? আমাকে বলো!”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর রূপা বলল, “তোমার মেয়ে তোমার বাড়িতেই আছে।”
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।
“কী বলছ?”
“যে মেয়েটাকে তুমি এতদিন নিজের বাড়িতে দেখেছ, যার সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলেছ, যে তোমাকে বাবা বলে ডাকে না—সেই মেয়েটাই তারা।”
অর্কর মাথার ভেতর যেন বিস্ফোরণ হলো।
তার বাড়িতে তো কোনও মেয়ে থাকে না!
সে আর মেঘলা ছাড়া এই বাড়িতে কেউ নেই।
“তুমি মিথ্যে বলছ!”
“না, অর্কদা। তুমি সত্যিটা দেখতে পাওনি। কারণ তোমাকে দেখতে দেওয়া হয়নি।”
“কে আমার মেয়েকে লুকিয়ে রেখেছে?”
রূপার গলা এবার খুব নিচু হয়ে গেল।
“মেঘলা।”
অর্কর সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।
“না! মেঘলা এমন করতে পারে না!”
“তাহলে ওকে জিজ্ঞেস করো, বিয়ের আগে যে মেয়েটা তোমাকে সতর্ক করতে এসেছিল, সে কে ছিল। আর জিজ্ঞেস করো, কেন তোমাদের বাড়ির পুরোনো ছবিতে এমন একটা শিশুর ছবি আছে, যার অস্তিত্ব তুমি অস্বীকার করছ।”
অর্ক দৌড়ে শোবার ঘরের দিকে গেল।
মেঘলা বিছানায় বসে আছে। তার হাতে একটি পুরোনো ছবি।
ছবিতে মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট মেয়েকে কোলে নিয়ে।
মেয়েটির বয়স পাঁচ কি ছয় বছর।
ছবির পেছনে লেখা—
“তারা ও মা। ২০২০।”
অর্কর গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না।
মেঘলা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে জল।
“তুমি সব জেনে গেছ?”
অর্ক কাঁপা গলায় বলল, “তারা কোথায়?”
মেঘলা ঠোঁট কামড়ে ধরল।
“আমি জানি না।”
“মিথ্যে বলো না!”
“আমি সত্যিই জানি না, অর্ক। আমি শুধু জানি, ছয় বছর আগে একটা ছোট্ট মেয়েকে আমার কাছে রেখে গিয়েছিল একজন মহিলা। সে বলেছিল, মেয়েটার মা বিপদে আছে। কয়েক দিন পর সে ফিরে এসে মেয়েটাকে নিয়ে যাবে।”
“তারপর?”
“তারপর সেই মহিলা আর ফিরে আসেনি।”
“তুমি পুলিশে খবর দাওনি কেন?”
মেঘলা মাথা নিচু করল।
“কারণ সেই মহিলা আমাকে বলেছিল, যদি পুলিশকে জানাই, তাহলে মেয়েটাকে মেরে ফেলা হবে।”
অর্কর চোখে জল এসে গেল।
“তুমি আমাকে জানাওনি কেন?”
মেঘলা তার দিকে তাকাল।
“কারণ তোমার বাবা মৃত্যুর আগে আমাকে একটা চিঠি দিয়ে গিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, তুমি যদি কোনও দিন রূপার মেয়ের কথা জানতে পারো, তাহলে তোমার জীবন বিপদের মধ্যে পড়বে।”
“আমার বাবা?”
“হ্যাঁ। উনি জানতেন, রূপা মা হয়েছে। উনি আরও জানতেন, সেই শিশুকে নিয়ে একটা বড় ষড়যন্ত্র চলছে।”
অর্ক পেছনে সরে গেল।
তার নিজের বাবা, রূপা, মেঘলা—সবাই যেন একই রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
“তারা এখন কোথায়?”
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি জানি না। কিন্তু কয়েক দিন আগে একটা চিঠি এসেছে। তাতে লেখা, তারা ফিরে আসবে।”
“কে পাঠিয়েছে?”
মেঘলা টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি খাম বের করল।
খামের ওপর লেখা—
“অর্ক সেনের জন্য। তোমার মেয়েকে ফিরে পেতে চাইলে ১৮ নভেম্বর রাত ২টা ১৭ মিনিটে পুরোনো সিনেমা হলের পেছনে এসো।”
অর্ক চিঠিটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।
আজ ১৭ নভেম্বর।
আর কয়েক ঘণ্টা পর ১৮ নভেম্বর।
ঠিক বারো বছর আগে এই তারিখেই রূপা নিখোঁজ হয়েছিল।
মেঘলা বলল, “তুমি যাবে না, অর্ক। এটা ফাঁদ হতে পারে।”
অর্ক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
“যদি সেখানে আমার মেয়ে থাকে, আমি যাব।”
“আর যদি কেউ তোমাকে মেরে ফেলে?”
অর্ক স্ত্রীর চোখের দিকে তাকাল।
“তাহলে অন্তত জানব, আমি আমার মেয়েকে খুঁজতে গিয়েছিলাম।”
মেঘলা তার হাত ধরে ফেলল।
“আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”
অর্ক স্ত্রীর হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
“আমিও না। কিন্তু এতদিন আমরা যে সত্যিটাকে এড়িয়ে গেছি, তার জন্য হয়তো কেউ একটা শিশুকে বারো বছর ধরে একা অপেক্ষা করতে বাধ্য করেছে।”
রাত ২টা বাজতে আর দশ মিনিট বাকি।
অর্ক কালো জ্যাকেট পরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। মেঘলা তাকে আটকায়নি। শুধু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “যদি রূপাকে দেখতে পাও, তাকে জিজ্ঞেস কোরো—সে কি সত্যিই মারা গিয়েছিল?”
অর্ক থমকে গেল।
“তুমি কী বলতে চাইছ?”
মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল, “আমি জানি না রূপা বেঁচে আছে কি না। কিন্তু একটা কথা জানি—বারো বছর আগে যে দেহটাকে তার বলে শনাক্ত করা হয়েছিল, তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ছিল।”
অর্ক আর কোনও কথা না বলে বেরিয়ে গেল।
পুরোনো সিনেমা হলটা বহু বছর ধরে বন্ধ। একসময় সেখানে বাংলা ছবি চলত। এখন ভাঙা দেওয়াল, আগাছায় ঢাকা উঠোন, মরচে ধরা গেট।
রাত ২টা ১৬ মিনিটে অর্ক সেখানে পৌঁছল।
এক মিনিট পর ফোন বেজে উঠল।
“তুমি এসেছ?” রূপার গলা।
“হ্যাঁ। এবার সামনে এসো।”
“সিনেমা হলের পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকো। ভেতরে একটা ঘর আছে। সেখানে তোমার জন্য সব উত্তর অপেক্ষা করছে।”
অর্ক দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ভাঙা পর্দা, ছেঁড়া আসন, মেঝেতে ধুলো। সে টর্চ জ্বেলে পেছনের করিডরে এগোল।
একটি ছোট ঘরের দরজা খোলা।
ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল। তার ওপর একটি কেক, একটি মোমবাতি আর একটি পুরোনো পুতুল।
পুতুলটা দেখে অর্কর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
বারো বছর আগে রূপা একবার তাকে বলেছিল, তাদের মেয়ে হলে সে এমন একটা পুতুল কিনে দেবে—নীল পোশাক পরা, বড় বড় চোখের।
টেবিলের পাশে একটা চেয়ার।
চেয়ারের ওপর রাখা সাদা খাম।
অর্ক খাম খুলল।
ভেতরে লেখা—
“বাবা,
তুমি আমাকে চেনো না। আমি তোমাকে চিনি না। কিন্তু মা বলেছে, তুমি আমাকে খুঁজতে আসবে।
আমি বারো বছর ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
আজ আমার জন্মদিন।
তুমি কি সত্যিই আসবে?
— তারা”
অর্কর চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
ঠিক তখনই ঘরের অন্য পাশের দরজাটা খুলে গেল।
একটি মেয়ে বেরিয়ে এল।
বয়স বারো। পরনে সাদা জামা। চুল কাঁধ পর্যন্ত। কপালের বাঁ দিকে ছোট্ট একটা দাগ।
অর্ক স্থির হয়ে গেল।
মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“তুমি কি আমার বাবা?”
অর্ক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
“তারা?”
মেয়েটির চোখে জল এসে গেল।
“মা বলেছিল, তুমি আমাকে চিনতে পারবে।”
অর্ক হাত বাড়িয়ে দিল।
তারা এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
কুড়ি নয়, বারো বছরের অপেক্ষা যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।
অর্ক কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তোমার মা কোথায়?”
তারা তার কাছ থেকে সরে এল।
তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে।
“মা নেই।”
অর্কর বুকের ভেতরটা থেমে গেল।
“কী বলছ?”
তারা ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর রাখা আরেকটি খাম তুলে দিল।
“মা আমাকে এটা দিতে বলেছে। বলেছে, তুমি পড়লে বুঝবে কেন সে তোমার কাছে ফিরে আসতে পারেনি।”
অর্ক খাম খুলল।
চিঠিতে লেখা—
“অর্ক,
তুমি যদি এই চিঠি পড়ো, তাহলে বুঝব, তারা তোমার কাছে পৌঁছেছে।
আমি জানি, তুমি আমাকে ঘৃণা করো। আমি জানি, তুমি ভাবো, আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু সত্যিটা অন্যরকম।
বারো বছর আগে যে রাতে আমাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই রাতে আমি তোমাকে ফোন করেছিলাম। তুমি ফোন ধরেছিলে। আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমাদের মেয়েকে বাঁচাও।
কিন্তু তুমি আমাকে চিনতে পারোনি।
কারণ ফোনের ওপাশে তুমি একা ছিলে না।
তোমার পাশে বসে ছিল এমন একজন মানুষ, যে আমার গলা নকল করতে পারত।
সেই রাতেই তারা তোমার কাছ থেকে আমাকে কেড়ে নিয়েছিল।
অর্ক, তোমার মেয়েকে আমি তোমার কাছে পাঠিয়েছি। কিন্তু সাবধান—যে মানুষটি তোমাকে বারো বছর ধরে আমার মৃত্যুর কথা বিশ্বাস করিয়েছে, সে এখনও তোমার খুব কাছেই আছে।
আর সে জানে, তুমি আজ রাতে কোথায় আসবে।
যদি তারা তোমার কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে বুঝবে, সেই মানুষটি তোমার জীবনে ফিরে এসেছে।
আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, অর্ক। কিন্তু ভালোবাসার চেয়েও বড় ছিল তোমাকে বাঁচিয়ে রাখা।
— রূপা”
চিঠি পড়া শেষ করে অর্ক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তারা তার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
“বাবা, মা বলেছিল, তোমাকে একটা কথা বলতে।”
“কী কথা, মা?”
তারা ফিসফিস করে বলল—
“যে মানুষটা তোমাকে বারো বছর ধরে আমার মায়ের মৃত্যুর গল্প শুনিয়েছে, সে-ই আমার মাকে শেষবার দেখেছিল।”
অর্কর চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি মুখ।
তার নিজের বড় ভাই—অভিজিৎ।
যে বারো বছর আগে রূপার মৃত্যুর খবর তাকে দিয়েছিল।
যে বলেছিল, রূপা আত্মহত্যা করেছে।
যে তার কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, “সব ভুলে যা, অর্ক। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে থাকার জন্য আসে না।”
অর্কর বুকের ভেতরটা বরফ হয়ে গেল।
কারণ অভিজিৎ এখন তার বাড়িতেই থাকে।
আর আজ সন্ধ্যায় ফোনে সে বলেছিল—
“ভাই, আজ রাতে বাড়িতে থাকিস। একটা জরুরি কথা আছে।”
ঠিক তখনই সিনেমা হলের বাইরে গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
তারপর ভারী পায়ের আওয়াজ।
তারা অর্কর হাত শক্ত করে ধরল।
“বাবা, ও এসে গেছে।”
“কে?”
মেয়েটি কাঁপতে কাঁপতে বলল—
“যে মানুষটা মাকে মেরেছিল।”
দরজার বাইরে থেকে পরিচিত একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“অর্ক, দরজা খোল। আমি জানি, তুই ভেতরে আছিস।”
অভিজিৎ।
অর্ক তার মেয়েকে নিজের পেছনে সরিয়ে দিল।
দরজার হাতল ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে অর্কর ফোনে আবার কল এল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
রূপা কলিং…
অর্কর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।
যে মেয়েটিকে সে বারো বছর ধরে মৃত বলে জেনেছে, সেই মেয়ের ফোন আবার আসছে।
কিন্তু এবার ফোনটা তার হাতে নয়।
ফোনটা বাজছে টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো পুতুলটার ভেতর থেকে।
চলবে…