Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মৃত মানুষ (প্রথম পর্ব: যে মানুষটি নিজের শ্রাদ্ধে এসেছিল)।

রাত তখন ১১টা ৪০ মিনিট।

উত্তর কলকাতার পুরোনো বাড়িটায় সেদিন অনেক বছর পর আলো জ্বলেছিল। বাড়ির প্রতিটি জানালা বন্ধ, সদর দরজায় বিশাল লোহার তালা, আর উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বকুলগাছটার শুকনো ডালগুলো বাতাসে এমনভাবে দুলছিল, যেন কেউ অন্ধকারের মধ্যে হাত নেড়ে ডাকছে।

বাড়িটার নাম ছিল ‘শান্তিনিকেতন’।

নাম শুনে শান্তির কথা মনে হলেও, গত পঁচিশ বছরে এই বাড়িতে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল, যার কথা আশপাশের মানুষ আজও ফিসফিস করে বলে।

বাড়ির মালিক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শশাঙ্কশেখর রায়। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি একমাত্র ছেলে ঋত্বিককে নিয়ে থাকতেন। কিন্তু পঁচিশ বছর আগে এক বর্ষার রাতে ঋত্বিক হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়।

পুলিশ অনেক খুঁজেছিল। নদীতে তল্লাশি হয়েছিল, রেলস্টেশনে খোঁজ চলেছিল, সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল। কিন্তু ঋত্বিকের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

শশাঙ্কশেখর সেই আঘাত সহ্য করতে পারেননি। বছর পাঁচেক পরে তিনিও মারা যান। বাড়িটা তালাবন্ধ হয়ে পড়ে থাকে। আত্মীয়স্বজনের কেউ আর সেখানে থাকতে চাননি।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রতি বছর ঋত্বিকের মৃত্যুদিবসে বাড়ির দোতলার বারান্দায় একটা আলো জ্বলতে দেখা যেত।

আর আলো জ্বলার ঠিক পরেই শোনা যেত একজন পুরুষের গলা—

“বাবা, দরজাটা খোলো। আমি ফিরে এসেছি।”

প্রথম দিকে প্রতিবেশীরা ভেবেছিল, হয়তো বাড়িতে কেউ ঢুকে পড়েছে। পুলিশও এসেছিল। কিন্তু দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা কাউকে পায়নি।

তবু আলো জ্বলত।

কণ্ঠস্বর শোনা যেত।

আর প্রতি বছর একই তারিখে, একই সময়ে।

পঁচিশ বছর পর সেই বাড়িতে ফিরল শশাঙ্কশেখরের নাতনি, নন্দিতা রায়।

নন্দিতার বয়স আটাশ। পেশায় সাংবাদিক। কলকাতার একটি সংবাদমাধ্যমে অপরাধ ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন তৈরি করত সে। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর কথা তার মনে নেই। পরিবার তাকে বলেছিল, তার বাবা ঋত্বিক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর কোনও ছবি, কোনও স্মৃতিচিহ্ন, এমনকি কোনও সমাধিও সে কখনও দেখেনি।

নন্দিতা বড় হওয়ার পর বহুবার প্রশ্ন করেছিল। প্রতিবারই তার মা মাধবী কথাটা এড়িয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু তিন দিন আগে মাধবী মারা যাওয়ার পর নন্দিতার হাতে একটি চিঠি এসে পৌঁছায়।

চিঠিটা লেখা হয়েছিল তার মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগে।

খামের ওপর নন্দিতার নাম। ভেতরে এক পাতার চিঠি।

“নন্দু,

আমি সারা জীবন তোমার কাছ থেকে একটা সত্যি লুকিয়ে রেখেছি। তোমার বাবা মারা যাননি। তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি— এটাই সত্যি।

তোমার ঠাকুরদা মৃত্যুর আগে আমাকে একটা কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ঋত্বিক যদি কোনও দিন ফিরে আসে, তাহলে যেন তাকে বাড়িতে ঢুকতে না দিই।

আমি এত বছর সেই কথার অর্থ বুঝিনি।

এখন বুঝতে পারছি, আমি আর বেশি দিন বাঁচব না। তুমি যদি সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে ১৭ অক্টোবর রাত ১১টা ৪০ মিনিটে শান্তিনিকেতন বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়াবে।

কেউ তোমাকে ডাকলে উত্তর দেবে না।

আর মনে রেখো, তোমার বাবা যদি ফিরে আসেন, তাঁর মুখের দিকে তাকাবে না।

— মা”

নন্দিতা চিঠিটা পড়ে প্রথমে ভেবেছিল, মায়ের মৃত্যুর আগে মানসিক বিভ্রান্তি হয়েছিল। কিন্তু পরের দিনই সে জানতে পারে, শান্তিনিকেতন বাড়িটা আইনগতভাবে তার নামে রয়েছে। ঠাকুরদা বহু বছর আগে উইল করে বাড়িটি নাতনির নামে লিখে গিয়েছিলেন।

বাড়িটা বিক্রি করার আগে সে একবার দেখতে চেয়েছিল।

সেই কারণেই সেদিন রাতে সে সেখানে এসেছিল।

বাড়ির সদর দরজার তালা খুলতে বেশ কষ্ট হল। ভেতরে ঢুকতেই ধুলো আর পুরোনো কাঠের গন্ধে তার দম বন্ধ হয়ে এল। টর্চের আলোয় দেখা গেল দেওয়ালে ঝুলছে বিবর্ণ ছবি। একটিতে শশাঙ্কশেখর, অন্যটিতে তাঁর স্ত্রী। মাঝখানে একটি পারিবারিক ছবি— শশাঙ্কশেখর, মাধবী, ছোট্ট নন্দিতা এবং এক তরুণ।

তরুণটির মুখে মৃদু হাসি।

নন্দিতা ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

এটাই কি তার বাবা?

সে ছবিটা নামিয়ে ধুলো মুছল। পেছনে কালো কালিতে লেখা—

“ঋত্বিকের শেষ জন্মদিন। ১৭ অক্টোবর, ২০০১।”

নন্দিতা তারিখটা দেখে থমকে গেল।

আজও ১৭ অক্টোবর।

ঠিক পঁচিশ বছর আগে এই দিনেই তার বাবা নিখোঁজ হয়েছিলেন।

আর চিঠিতে লেখা ছিল, রাত ১১টা ৪০ মিনিটে বারান্দায় দাঁড়াতে হবে।

ঘড়ির দিকে তাকাল সে।

রাত ১০টা ৫৫।

তার হাতে এখনও পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময়।

নন্দিতা বাড়ির প্রতিটি ঘর ঘুরে দেখল। নিচতলার বসার ঘরে পুরোনো আসবাব। রান্নাঘরে ভাঙা বাসন। ঠাকুরঘরে ধুলো জমে থাকা প্রদীপ। কিন্তু দোতলায় উঠে সে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করল।

সব ঘরে ধুলো জমে আছে, অথচ শেষ ঘরটার দরজার সামনে মেঝে পরিষ্কার।

যেন কেউ নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করে।

দরজায় হাত রাখতেই ভেতর থেকে একটা মৃদু শব্দ এল।

খসখস…

নন্দিতা থেমে গেল।

তারপর আবার শব্দ।

খসখস… খসখস…

সে দরজা ঠেলে খুলল।

ঘরটা অন্য সব ঘরের মতো নয়। এখানে ধুলো নেই। বিছানার চাদর পরিষ্কার। টেবিলের ওপর সাজানো কয়েকটি বই। জানালার পাশে একটা কাঠের চেয়ার। দেওয়ালে ঝুলছে একটা পুরোনো ঘড়ি।

আর বিছানার ওপর রাখা রয়েছে একটি খাম।

নন্দিতা খামটা খুলল।

ভেতরে একটি হাসপাতালের নথির ফটোকপি। তাতে লেখা—

রোগীর নাম: ঋত্বিক রায়।

ভর্তির তারিখ: ১৮ অক্টোবর, ২০০১।

অবস্থাঃ মৃত।

কিন্তু হাসপাতালের নামের জায়গাটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।

নন্দিতা কাগজটা উল্টে দেখল। পেছনে লাল কালিতে লেখা—

“মৃত্যুর শংসাপত্র তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মৃতদেহ কখনও হাসপাতাল থেকে বের হয়নি।”

নন্দিতার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

তার বাবা যদি সত্যিই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর দেহ কোথায় গেল?

আর ঠাকুরদা কেন মাকে বলেছিলেন, ঋত্বিক ফিরে এলে যেন তাকে বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়া হয়?

হঠাৎ ঘরের পুরোনো ফোনটা বেজে উঠল।

নন্দিতা চমকে পিছিয়ে গেল।

ফোনটা ছিল কালো রঙের ল্যান্ডলাইন। বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই, টেলিফোনের তারও বহু বছর আগে কেটে দেওয়া হয়েছে। তবু ফোনটা বেজে চলেছে।

ট্রিং… ট্রিং… ট্রিং…

নন্দিতা কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে রিসিভার তুলল।

—হ্যালো?

ওপাশে একটা পুরুষের নিঃশ্বাসের শব্দ।

তারপর পরিচিত অথচ অচেনা একটি কণ্ঠস্বর।

“নন্দু?”

নন্দিতার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

এই ডাকটা সে কোনও দিন শোনেনি। তবু তার মনে হল, এই কণ্ঠস্বর সে চেনে। যেন বহু বছর ধরে কেউ তার স্মৃতির এক অন্ধকার কোণে এই ডাকটা লুকিয়ে রেখেছিল।

—কে বলছেন?

“আমাকে চিনতে পারছিস না?”

—আপনি কে?

ওপাশের মানুষটি মৃদু হেসে বলল—

“আমি তোর বাবা।”

নন্দিতার হাত থেকে রিসিভার পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেল।

—এটা কীভাবে সম্ভব? আপনি তো…

“মরে গেছি? সবাই তোকে তাই বলেছে, তাই না?”

নন্দিতা কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কোথায়?”

“তুই যে ঘরে দাঁড়িয়ে আছিস, তার জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখ।”

নন্দিতা ধীরে ধীরে জানালার দিকে এগোল।

জানালাটা দোতলায়। বাইরে বকুলগাছের শুকনো ডাল। দূরে রাস্তার আলো। আর সেই আলো-অন্ধকারের মাঝখানে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

সাদা পাঞ্জাবি। কালো প্যান্ট। মুখ নিচু।

লোকটা মাথা তুলল।

নন্দিতা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না।

ছবির সেই তরুণের মুখ।

তার বাবা।

কিন্তু পঁচিশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষটির মুখে একটুও বয়সের ছাপ নেই।

যেন সময় তাকে ছুঁতেই পারেনি।

নন্দিতা জানালা থেকে পিছিয়ে এল।

ফোনের ওপাশে লোকটি বলল, “আমার জন্য দরজা খোল, নন্দু।”

নন্দিতা কিছু বলতে পারল না।

“তুই কি মায়ের চিঠি পড়েছিস?”

সে কাঁপা গলায় বলল, “হ্যাঁ।”

“তাহলে জানিস, আমি ফিরে আসব।”

“কিন্তু মা লিখেছেন, আপনার মুখের দিকে তাকাতে বারণ করেছেন।”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর লোকটি বলল—

“তোর মা আমাকে শেষবার দেখেছিল পঁচিশ বছর আগে। সে জানত না, আমি ফিরে আসব। কিন্তু তুই তো আমার মেয়ে। তুই কি আমাকে একবারও দেখতে চাইবি না?”

নন্দিতার চোখে জল চলে এল।

বাবা বলে ডাকার মতো কোনও স্মৃতি তার নেই। ছোটবেলায় অন্য বাচ্চাদের বাবার হাত ধরে স্কুলে যেতে দেখলে তার মন খারাপ হত। জন্মদিনে অন্যরা বাবার কাছ থেকে উপহার পেত, সে পেত মায়ের স্নেহ আর ঠাকুরদার নীরবতা।

আজ যদি সত্যিই তার বাবা ফিরে এসে থাকেন, তাহলে কি সে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে?

ঠিক তখনই নন্দিতার ফোনে একটা বার্তা এল।

অজানা নম্বর।

“জানালার বাইরে যে মানুষটিকে দেখছ, সে তোমার বাবা নয়।”

নন্দিতা চমকে উঠল।

দ্বিতীয় বার্তা এল।

“তোমার বাবা ১৮ অক্টোবর, ২০০১-এ মারা গিয়েছিলেন। তাঁর দেহ আমি নিজে দেখেছি।”

তৃতীয় বার্তায় একটি ছবি।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা একজন মানুষ। মুখে অক্সিজেনের মাস্ক। পাশে দাঁড়িয়ে এক তরুণী নার্স।

ছবির রোগীটি ঋত্বিক।

আর নার্সটি—

নন্দিতা ছবিটা বড় করে দেখল।

তার মা মাধবী।

ছবির নিচে লেখা—

“এই ছবিটি তোলার পর তোমার বাবা মারা যান। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর ছয় ঘণ্টা পর হাসপাতালের সিসিটিভিতে তাঁকে হেঁটে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।”

নন্দিতা ফোনটা শক্ত করে ধরল।

একই মানুষ একই সময়ে মৃত এবং জীবিত— এটা কীভাবে সম্ভব?

ল্যান্ডলাইনের ওপাশ থেকে আবার বাবার গলা ভেসে এল।

“নন্দু, তুই কি আমার কথা শুনছিস?”

নন্দিতা উত্তর দিল না।

“দরজা খোল। সময় শেষ হয়ে আসছে।”

—কীসের সময়?

“রাত ১১টা ৪০ মিনিট।”

নন্দিতা ঘড়ির দিকে তাকাল।

১১টা ৩৭।

আর তিন মিনিট।

সে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দার দিকে এগোল। মায়ের চিঠির নির্দেশ মনে পড়ছিল— কেউ ডাকলে উত্তর দেবে না।

কিন্তু বারান্দায় পৌঁছতেই সে দেখল, রেলিংয়ের ওপারে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

লোকটি মাথা নিচু করে আছে। তার পিঠ নন্দিতার দিকে।

—বাবা?

শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে যেতেই নন্দিতা নিজের মুখ চেপে ধরল।

লোকটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

তার মুখ ঋত্বিকের মতোই। কিন্তু চোখ দুটো অদ্ভুত ফাঁকা। যেন চোখের ভেতরে কোনও মণি নেই, শুধু কালো গর্ত।

লোকটি হাসল।

“তুই আমাকে বাবা বলে ডাকলি?”

নন্দিতা পিছিয়ে গেল।

“তাহলে এখন থেকে তোর আর কোনও ভয় নেই।”

লোকটি এক পা এগিয়ে এল।

“কারণ আজ থেকে তুইও আমাদের সঙ্গে থাকবি।”

নন্দিতা চিৎকার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না।

ঠিক তখনই বাড়ির নিচে সদর দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল।

ধাম!

ধাম!

ধাম!

একজন মহিলা চিৎকার করে উঠলেন—

“নন্দিতা! দরজা খোলো! আমি পুলিশ থেকে এসেছি!”

বারান্দার মানুষটা মুহূর্তে থেমে গেল।

তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—

“ওরা এসে গেছে।”

তারপর নন্দিতার দিকে তাকিয়ে বলল—

“মনে রাখিস, নন্দু। আজ রাতের পর তুই যদি কাউকে আমার কথা বলিস, তাহলে তোর মা দ্বিতীয়বার মরবে।”

পরক্ষণেই লোকটা বারান্দা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

নন্দিতা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

বারান্দায় কেউ নেই।

নিচে দরজায় আবার ধাক্কা পড়ল।

“নন্দিতা! দরজা খুলুন!”

সে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সদর দরজা খুলল।

বাইরে একজন মহিলা পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। পরনে সাধারণ পোশাক, গলায় পরিচয়পত্র।

—আপনি নন্দিতা রায়?

—হ্যাঁ। কী হয়েছে?

মহিলা অফিসার নিজের পরিচয় দিলেন।

—আমি ইন্সপেক্টর অনন্যা সেন। আপনার মায়ের মৃত্যুর তদন্তের দায়িত্বে আছি।

নন্দিতা চমকে উঠল।

—কিন্তু আমার মা তো অসুস্থ ছিলেন। তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

অনন্যা কয়েক মুহূর্ত নন্দিতার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন, “আপনার মা মারা যাওয়ার আগে থানায় একটা অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁর স্বামী আজ রাতে ফিরে আসবেন।”

নন্দিতার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

—আমার বাবা?

—আপনার বাবার মৃত্যুর কোনও সরকারি নথি নেই। পঁচিশ বছর আগে তাঁকে নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। পরে একটি হাসপাতালের কাগজের ভিত্তিতে তাঁর মৃত্যুর কথা ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু সেই হাসপাতাল জানিয়েছে, তাদের কাছে ঋত্বিক রায় নামে কোনও রোগী কখনও ভর্তি হননি।

নন্দিতা হতবাক।

—তাহলে আমার মা কীভাবে জানলেন, তিনি ফিরে আসবেন?

অনন্যা বললেন, “সেটাই জানতে এসেছি। আপনার মা আমাকে একটা ভিডিও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আপনি বাড়িতে এলে যেন সেটা আপনাকে দেখাই।”

তিনি ব্যাগ থেকে একটি পেনড্রাইভ বের করলেন।

দুজন বসার ঘরে গেলেন। নন্দিতা পুরোনো ল্যাপটপে পেনড্রাইভটি চালাল।

ভিডিওতে মাধবী বসে আছেন। মুখ শুকনো, চোখ ক্লান্ত। তবু তিনি স্পষ্টভাবে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন।

“নন্দু, যদি তুমি এই ভিডিও দেখো, তাহলে বুঝব আমি আর নেই। তোমার বাবার ব্যাপারে আমি তোমাকে সত্যিটা বলতে চাই।

পঁচিশ বছর আগে তোমার বাবা নিখোঁজ হননি। তাঁকে আমাদের বাড়ির দোতলার একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। আমি জানতাম, তিনি সেখানে আছেন। কিন্তু আমি তাঁকে মুক্ত করতে পারিনি।

কারণ সেই ঘরে যে মানুষটা বন্দি ছিল, সে তোমার বাবা ছিল না।”

নন্দিতা নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

ভিডিওতে মাধবী কাঁদতে শুরু করলেন।

“তোমার বাবা ঋত্বিক সেই রাতেই নিখোঁজ হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মতো দেখতে আরেকজন মানুষ আমাদের বাড়িতে এসেছিল। সে বলেছিল, সে ঋত্বিক। শশাঙ্কশেখর প্রথমে তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, লোকটি তাঁর ছেলে নয়।

তবু তিনি তাকে বাড়ি থেকে বের করেননি।

কারণ সেই লোকটি এমন একটা কথা জানত, যা শুধু আমাদের পরিবারের মানুষদের জানার কথা।”

মাধবী একটু থামলেন। তারপর ক্যামেরার দিকে ঝুঁকে বললেন—

“নন্দু, তুমি জন্মানোর আগে তোমার একটা যমজ বোন ছিল।”

নন্দিতা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

তার যমজ বোন?

কিন্তু সে তো কোনও দিন এমন কথা শোনেনি!

ভিডিওতে মাধবী বললেন, “তোমাদের জন্মের পর তোমার বোনকে হাসপাতাল থেকে অন্য এক পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তোমার বাবা তাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। তারপর আর ফেরেননি।

যে মানুষটা তাঁর মতো দেখতে আমাদের বাড়িতে এসেছিল, সে দাবি করেছিল, সে তোমার বোনকে খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু তার বিনিময়ে তাকে একটা জিনিস দিতে হবে— এই বাড়ির পুরোনো দলিল।

তোমার ঠাকুরদা দলিল দিতে রাজি হননি। তারপর এক রাতে সেই মানুষটা নিখোঁজ হয়ে যায়।

আমরা ভেবেছিলাম, সব শেষ।

কিন্তু তার পরের বছর থেকে প্রতি ১৭ অক্টোবর রাত ১১টা ৪০ মিনিটে সে ফিরে আসতে শুরু করে।”

ভিডিওর শেষ অংশে মাধবী ক্যামেরার খুব কাছে মুখ নিয়ে এলেন।

“নন্দু, আজ রাতে যদি সে ফিরে আসে, মনে রেখো— সে তোমার বাবার মতো দেখতে হলেও তোমার বাবা নয়। আর যদি সে তোমার বোনের কথা বলে, তাকে বিশ্বাস করবে না।

কারণ তোমার বোন কখনও হারিয়ে যায়নি।

সে এই বাড়িতেই আছে।”

ভিডিও শেষ হয়ে গেল।

ঘরের মধ্যে নীরবতা।

নন্দিতা ধীরে ধীরে অনন্যার দিকে তাকাল।

—আমার বোন এই বাড়িতে আছে মানে?

অনন্যা উত্তর দিলেন না। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে দোতলার দিকে তাকালেন।

—আপনি কি বাড়ির সব ঘর দেখেছেন?

—হ্যাঁ।

—একটা ঘরও বাদ পড়েনি তো?

নন্দিতা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “দোতলার শেষ ঘরটা ছাড়া সব ঘর দেখেছি। ওখানে একটা আলমারি আছে। সেটা খোলা যায়নি।”

অনন্যা বললেন, “আমাকে দেখান।”

দুজন দোতলায় উঠলেন। শেষ ঘরের দেওয়ালে রাখা বিশাল কাঠের আলমারিটা সরাতে গিয়ে দেখা গেল, তার পেছনে একটা ছোট দরজা রয়েছে। দরজাটা বাইরে থেকে রং করে দেওয়ালের সঙ্গে মিশিয়ে রাখা হয়েছিল।

অনন্যা টর্চের আলো ফেললেন।

দরজার নিচে একটা সরু ফাঁক। সেখান দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসছে।

—এটা আগে দেখেছেন?

নন্দিতা মাথা নাড়ল।

অনন্যা পকেট থেকে ছোট সরঞ্জাম বের করে তালা খুললেন।

দরজা খুলতেই একটা সরু সিঁড়ি দেখা গেল, যা বাড়ির নিচের দিকে নেমে গেছে।

সিঁড়ির শেষ প্রান্তে একটা ঘর।

ঘরের মাঝখানে কাঠের খাট। পাশে পানির জগ। দেওয়ালে আঁচড়ের দাগ।

আর খাটের ওপর বসে আছে একজন তরুণী।

তার বয়স নন্দিতার কাছাকাছি। পরনে সাদা পোশাক। চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই।

নন্দিতা তাকে দেখেই থমকে গেল।

কারণ তরুণীটির মুখ অবিকল তার নিজের মতো।

একই চোখ। একই নাক। একই ঠোঁট। এমনকি বাঁ গালের পাশে ছোট্ট তিলটাও একই জায়গায়।

তরুণীটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

তারপর মৃদু হেসে বলল—

“এত দেরি করলি কেন, নন্দু?”

নন্দিতার চোখে জল এসে গেল।

—তুমি… তুমি কে?

তরুণীটি উঠে দাঁড়াল।

—আমি তোর বোন।

—কিন্তু মা তো বলেছিলেন, তুমি হারিয়ে গিয়েছিলে!

—মা মিথ্যে বলেননি। আমাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

নন্দিতা তার দিকে এগিয়ে গেল।

—তোমার নাম কী?

তরুণীটি বলল, “আমার নাম নীলাঞ্জনা। তবে বাবা আমাকে নীলু বলে ডাকত।”

নন্দিতা কেঁদে ফেলল।

—বাবা কোথায়?

নীলাঞ্জনা তার হাত ধরল।

—বাবা এখনও এই বাড়িতে আছে।

—কোথায়?

নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ঘরের পেছনের দেওয়ালের দিকে তাকাল।

—ওই দেওয়ালের ওপারে।

অনন্যা টর্চের আলো ফেললেন। দেওয়ালটা অন্য অংশের তুলনায় নতুন। যেন পরে ইট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

নন্দিতা দেওয়ালের কাছে গিয়ে হাত রাখল।

ভেতর থেকে মৃদু শব্দ এল।

টক… টক… টক…

কেউ যেন দেওয়ালের ওপাশ থেকে আঙুল দিয়ে আঘাত করছে।

তারপর ভেসে এল একটা পুরুষের কণ্ঠস্বর—

“নীলু, ওকে কিছু বলিস না। ও এখনও প্রস্তুত নয়।”

নন্দিতা চমকে পিছিয়ে গেল।

কণ্ঠস্বরটা তার পরিচিত।

এই কণ্ঠস্বর সে কিছুক্ষণ আগেই শুনেছে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটির কণ্ঠস্বর।

কিন্তু এবার কণ্ঠস্বরের মধ্যে একটা দুর্বলতা, একটা অসহায়তা।

যেন কেউ সত্যিই দেওয়ালের ওপাশে আটকে আছে।

নন্দিতা কাঁপা গলায় বলল—

—বাবা?

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“হ্যাঁ, নন্দু। আমি তোর বাবা।”

অনন্যা তৎক্ষণাৎ নন্দিতার হাত ধরে পিছিয়ে নিলেন।

—কেউ দেওয়াল ভাঙবে না!

নীলাঞ্জনা শান্ত গলায় বলল—

“দেওয়াল ভাঙলে বিপদ হবে না, ইন্সপেক্টর। বিপদ হবে যদি আপনারা ওকে বের করে আনেন।”

অনন্যা তার দিকে তাকালেন।

—কেন?

নীলাঞ্জনা বলল—

“কারণ দেওয়ালের ওপাশে যে মানুষটা আছে, সে আমার বাবা নয়।”

নন্দিতা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল—

—তাহলে কে?

নীলাঞ্জনা এবার তার দিকে তাকিয়ে এমন একটা কথা বলল, যা শুনে নন্দিতার মনে হল, এই বাড়ির প্রতিটি ইটের মধ্যে একটা করে মিথ্যে লুকিয়ে আছে।

“ওই দেওয়ালের ওপাশে যে মানুষটা বন্দি, সে পঁচিশ বছর ধরে নিজের মৃত্যুর অপেক্ষা করছে। আর যে মানুষটাকে তুমি বারান্দায় দেখেছিলে, সে তোমার বাবার হত্যাকারী।”

ঠিক তখনই দেওয়ালের ওপাশ থেকে তিনবার জোরে আঘাত এল।

ধাম!

ধাম!

ধাম!

তারপর একটা চিৎকার—

“নীলু! ওকে বল, যেন আমার আসল নামটা মনে করে!”

নন্দিতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর দেওয়ালের ওপাশ থেকে ভেসে এল সেই নাম, যা শুনে অনন্যা সেনের মুখের রং বদলে গেল।

“আমার নাম ঋত্বিক নয়…

আমার নাম শশাঙ্কশেখর রায়!”

নন্দিতা পিছিয়ে গেল।

তার ঠাকুরদা তো বহু বছর আগে মারা গেছেন!

তাহলে দেওয়ালের ওপাশে কে বন্দি?

আর যদি তিনি সত্যিই শশাঙ্কশেখর হন, তবে পঁচিশ বছর আগে যে মানুষটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, সে আসলে কে?

দোতলার ঘড়িতে তখন রাত ১১টা ৪০ মিনিট।

আর বাড়ির সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *