Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মৃত মানুষ (দ্বিতীয় পর্ব: দেওয়ালের ওপাশে যে বন্দি)।

অন্ধকারের মধ্যে প্রথমে শোনা গেল একটা দীর্ঘশ্বাস।

তারপর দেওয়ালের ওপাশ থেকে আবার তিনবার আঘাত এল।

ধাম! ধাম! ধাম!

—নন্দু! তুই কি শুনতে পাচ্ছিস? ওরা তোকে মিথ্যে বলছে!

নন্দিতা দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। ইন্সপেক্টর অনন্যা সেন তাঁর টর্চ জ্বালানোর চেষ্টা করলেন। কয়েকবার সুইচ টেপার পর আলো জ্বলল বটে, কিন্তু সেই আলোয় ঘরের পরিবেশ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল।

নীলাঞ্জনা একটুও ভয় পাচ্ছিল না।

সে যেন জানত, ঠিক এই মুহূর্তে কী ঘটতে চলেছে।

নন্দিতা তার হাত ধরে বলল, “নীলু, দেওয়ালের ওপাশে কে আছে?”

নীলাঞ্জনা উত্তর দিল না।

—তুমি কি সত্যিই আমার বোন?

মেয়েটি এবার নন্দিতার চোখের দিকে তাকাল।

—তুই কি নিজের মুখটা আয়নায় দেখেছিস?

—কী বলতে চাইছ?

—আমাদের দুজনের মুখ এক। কিন্তু আমাদের স্মৃতি এক নয়। তুই নিজের ছোটবেলার কোনও স্মৃতি মনে করতে পারিস?

নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার ছোটবেলার স্মৃতি খুব অস্পষ্ট। মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়া, স্কুলের প্রথম দিন, ঠাকুরদার সঙ্গে বারান্দায় বসে গল্প শোনা— এসব মনে পড়ে। কিন্তু বাবার কোনও স্মৃতি নেই।

একটাও নেই।

—আমার বাবার মুখ মনে পড়ে না, —নন্দিতা ধীরে ধীরে বলল।

নীলাঞ্জনা মৃদু হাসল।

—কারণ তুই বাবাকে কোনও দিন দেখিসনি।

—কিন্তু ছবিতে তো দেখেছি!

—ছবি দেখেছিস। মানুষটাকে নয়।

নন্দিতা কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় অনন্যা কঠোর গলায় বললেন, “এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলে লাভ নেই। আমাদের জানতে হবে দেওয়ালের ওপাশে কে আছে।”

তিনি দেওয়ালটা পরীক্ষা করতে লাগলেন। ইটের গাঁথুনি নতুন হলেও একেবারে শক্ত নয়। কোথাও কোথাও সিমেন্ট খসে পড়েছে। দেওয়ালের বাঁ দিকে একটা সরু লোহার দরজার আভাস দেখা যাচ্ছিল, যেটা রং দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।

অনন্যা পকেট থেকে ছোট্ট যন্ত্র বের করে দরজার চারপাশে পরীক্ষা করলেন।

—এখানে একটা গোপন দরজা আছে।

নন্দিতা বলল, “খুলুন।”

—না। আগে জানতে হবে, ভেতরে কী আছে।

ঠিক তখনই দেওয়ালের ওপাশ থেকে কণ্ঠস্বর এল।

—অনন্যা, তুমি কি এখনও আমাকে বিশ্বাস করো না?

অনন্যা থমকে গেলেন।

নন্দিতা তাঁর মুখের দিকে তাকাল।

—আপনি ওনাকে চেনেন?

অনন্যা কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বললেন, “আমি এই কণ্ঠস্বর আগে শুনেছি।”

—কোথায়?

—আমার বাবার শেষ রাতে।

নন্দিতা হতবাক।

অনন্যা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।

“আমি তখন ছোট। আমার বাবা পুলিশে ছিলেন। পঁচিশ বছর আগে তিনি একটি নিখোঁজ ব্যক্তির মামলা তদন্ত করছিলেন। সেই ব্যক্তির নাম ঋত্বিক রায়। তদন্ত চলাকালীন এক রাতে বাবা বাড়ি ফিরে বলেছিলেন, এই মামলায় এমন কিছু আছে, যা প্রকাশ পেলে অনেক বড় মানুষের নাম সামনে আসবে।

পরদিন সকালে বাবাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, হৃদ্‌রোগে মৃত্যু। কিন্তু মৃত্যুর আগের রাতে তিনি আমাকে একটা কথা বলেছিলেন।”

অনন্যা থামলেন।

—কী কথা?

—তিনি বলেছিলেন, ‘যদি কোনও দিন শান্তিনিকেতন বাড়িতে যাও, দেওয়ালের ওপাশের মানুষটার কথা শুনবে। সে মিথ্যে বলবে, কিন্তু তার মিথ্যের মধ্যেই সত্যি লুকিয়ে থাকবে।’

নন্দিতা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

—তাহলে আপনি এত বছর ধরে এই বাড়ির কথা জানতেন?

—হ্যাঁ। কিন্তু প্রমাণ ছিল না। আপনার মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর জমা দেওয়া নথিগুলো পরীক্ষা করে আমি এখানে আসার সিদ্ধান্ত নিই।

নীলাঞ্জনা এবার দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেল।

—দরজাটা খুলুন। আর দেরি করলে ও আবার ঘুমিয়ে পড়বে।

অনন্যা চমকে উঠলেন।

—আবার ঘুমিয়ে পড়বে মানে?

নীলাঞ্জনা উত্তর দিল না। সে দেওয়ালের বাঁ দিকের একটা ইটের ওপর আঙুল রাখল। তারপর পরপর তিনবার চাপ দিল।

টিক!

ভেতরে একটা যান্ত্রিক শব্দ হল।

দেওয়ালের সরু দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

দরজার ওপাশে একটা অন্ধকার ঘর।

ঘরের মধ্যে একটা লোহার খাট। দেওয়ালে শিকল। মেঝেতে পুরোনো কম্বল। আর খাটের ওপর বসে আছেন একজন বৃদ্ধ।

সাদা চুল। শুকনো মুখ। চোখের নিচে গভীর কালি। হাতের কবজিতে লোহার শিকলের দাগ।

তিনি মাথা তুলে তাকালেন।

নন্দিতা তাঁর মুখ দেখেই পিছিয়ে গেল।

ছবিতে দেখা সেই মুখ।

শশাঙ্কশেখর রায়।

তার ঠাকুরদা।

যিনি পঁচিশ বছর আগে মারা গিয়েছিলেন বলে তাকে জানানো হয়েছিল।

বৃদ্ধটি নন্দিতার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, “নন্দু, কাছে আয়।”

নন্দিতা নড়তে পারল না।

—আপনি… আপনি আমার ঠাকুরদা?

বৃদ্ধের চোখে জল এসে গেল।

—তুই আমাকে চিনতে পারছিস না, তাই তো?

নন্দিতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

—আপনি তো মারা গিয়েছিলেন।

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

—হ্যাঁ। সবাইকে তাই বিশ্বাস করানো হয়েছিল।

—কিন্তু আপনার শ্রাদ্ধ হয়েছিল!

—আমার নামে শ্রাদ্ধ হয়েছিল। আমার দেহের নয়।

নন্দিতার মনে হল, পৃথিবীর সমস্ত পরিচিত শব্দের অর্থ বদলে যাচ্ছে।

অনন্যা ঘরের ভেতরে ঢুকে বৃদ্ধের শিকল পরীক্ষা করলেন। শিকলের তালা বাইরে থেকে বন্ধ। দীর্ঘদিন ধরে কেউ তাঁকে এখানে আটকে রেখেছিল।

—আপনাকে কে বন্দি করেছে?

বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।

—যে মানুষটা প্রতি বছর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার নাতনিকে ডাকে।

—সে কে?

বৃদ্ধের ঠোঁট কেঁপে উঠল।

—আমার ছেলে।

নন্দিতা অবাক হয়ে বলল, “ঋত্বিক?”

—না।

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

—ঋত্বিক আমার ছেলে ছিল। কিন্তু যে লোকটা তার মুখ নিয়ে এই বাড়িতে ফিরে আসে, সে আমার ছেলে নয়।

—তাহলে সে কে?

বৃদ্ধ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—

—সে আমার বড় ভুলের ফল।

নন্দিতা কাছে এগিয়ে গেল।

—সব খুলে বলুন, ঠাকুরদা। আমার বাবা কোথায়?

বৃদ্ধ নন্দিতার হাত ধরলেন। তাঁর হাত বরফের মতো ঠান্ডা।

—তোর বাবা বেঁচে আছে কি না, আমি জানি না। কিন্তু তোর মাকে যে মানুষটা শেষ পর্যন্ত সত্যি বলতে বাধ্য করেছিল, সে এই বাড়ির কেউ নয়।

—কে?

—একজন চিকিৎসক। নাম ডক্টর অমিয় সেন।

অনন্যা চমকে উঠলেন।

—অমিয় সেন? আমার বাবার তদন্তের নথিতে এই নাম ছিল!

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

—সে এই বাড়িতে বহুবার এসেছিল। বলেছিল, মানুষের স্মৃতি বদলানো যায়। কোনও ঘটনা মুছে ফেলা যায় না, কিন্তু মানুষকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, যাতে সে নিজের স্মৃতিকেই বিশ্বাস করতে না পারে।

নন্দিতার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—আমার সঙ্গে এমন কিছু করা হয়েছিল?

বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ।”

নন্দিতা চেয়ারের ওপর বসে পড়ল।

তার ছোটবেলার অস্পষ্ট স্মৃতি, বাবার মুখ মনে না থাকা, মায়ের বারবার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া— সবকিছু যেন নতুন অর্থ পেল।

—কেন?

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, “কারণ তুই এমন একটা ঘটনা দেখেছিলি, যেটা তোর দেখা উচিত ছিল না।”

—কী ঘটনা?

—তোর বয়স তখন তিন বছর। এক রাতে তুই তোর বাবাকে বাড়ির পেছনের ঘরে ঢুকতে দেখেছিলি। তার কিছুক্ষণ পর আরেকজন মানুষ বেরিয়ে আসে। দুজনের মুখ এক। তুই ভেবেছিলি, দুজনই তোর বাবা।

নন্দিতা মাথা চেপে ধরল।

তার মনের ভেতর যেন অস্পষ্ট একটা দৃশ্য ভেসে উঠছে।

একটা লাল আলো।

একটা বন্ধ দরজা।

দুইজন মানুষ।

একজন কাঁদছে। অন্যজন হাসছে।

তারপর কেউ তার কানে ফিসফিস করে বলছে, “কিছু দেখিসনি, নন্দু। সব ভুলে যা।”

নন্দিতা চোখ বন্ধ করে ফেলল।

—আমি মনে করতে পারছি…

বৃদ্ধ তার হাত চেপে ধরলেন।

—জোর করে মনে করার চেষ্টা করিস না। স্মৃতি ফিরে এলে তার সঙ্গে এমন কিছু সত্যি ফিরতে পারে, যা তুই সহ্য করতে পারবি না।

কিন্তু নন্দিতা থামল না।

তার মনে পড়ল, ছোট্ট একটা ঘরে সে দাঁড়িয়ে আছে। মেঝেতে রক্ত। তার বাবা একটা চেয়ারে বসে। সামনে আরেকজন মানুষ, যার মুখও তার বাবার মতো।

আর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার মা মাধবী।

মা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন—

“একজনকে বাঁচাতে হলে অন্যজনকে মরতে হবে।”

তারপর একটা গুলির শব্দ।

নন্দিতা চিৎকার করে উঠল।

—না!

অনন্যা তাকে ধরে ফেললেন।

—শান্ত হন!

নন্দিতা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আমি দেখেছিলাম। আমি সত্যিই দেখেছিলাম!”

বৃদ্ধের চোখে জল।

—হ্যাঁ, নন্দু। তুই দেখেছিলি।

—কে গুলি চালিয়েছিল?

বৃদ্ধ মুখ নামিয়ে বললেন, “তোর মা।”

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

নন্দিতা বিশ্বাস করতে পারছিল না।

তার মা, যিনি সারাজীবন তাকে আগলে রেখেছিলেন, তিনিই কি কাউকে হত্যা করেছিলেন?

—কাকে গুলি করেছিলেন?

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

নীলাঞ্জনা এগিয়ে এসে বলল, “ঠাকুরদা, এখন আর লুকিয়ে লাভ নেই। ওকে সত্যিটা জানতে দিন।”

বৃদ্ধ নীলাঞ্জনার দিকে তাকালেন।

—তুই এতদিন কোথায় ছিলি?

—এই বাড়িতেই।

—কীভাবে?

নীলাঞ্জনা ঘরের পেছনের দেওয়াল দেখাল।

—এই ঘরের সঙ্গে আরেকটা গোপন পথ আছে। আমি ছোটবেলায় সেটা খুঁজে পেয়েছিলাম। তারপর থেকে এখানেই আসতাম। ঠাকুরদাকে খাবার দিতাম। ওঁর সঙ্গে কথা বলতাম। কিন্তু মা বলেছিল, আপনাকে মুক্ত করলে সবাই বিপদে পড়বে।

নন্দিতা অবাক হয়ে তাকাল।

—তুমি এত বছর এই বাড়িতে ছিলে? আমি তো কোনও দিন তোমাকে দেখিনি!

নীলাঞ্জনা মৃদু হাসল।

—তুই আমাকে দেখেছিস। শুধু মনে রাখতে পারিসনি।

নন্দিতার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—কীভাবে?

—প্রতি বছর তোর জন্মদিনে আমি তোর ঘরে একটা উপহার রেখে যেতাম। তুই সকালে সেটা পেতিস। মা বলতেন, ঠাকুরদা পাঠিয়েছেন।

নন্দিতা স্মৃতি হাতড়াতে লাগল।

ছোটবেলায় তার জন্মদিনে সত্যিই অদ্ভুত কিছু উপহার আসত। কখনও কাঠের পুতুল, কখনও নীল ফিতে, কখনও হাতে আঁকা ছবি। কিন্তু মা বলতেন, ঠাকুরদার পুরোনো বন্ধু পাঠিয়েছেন।

সে কখনও সন্দেহ করেনি।

নীলাঞ্জনা বলল, “তুই যখন বড় হতে থাকলি, তখন তোর স্মৃতি মুছে দেওয়ার ওষুধ বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু তোর বোনের কথা যেন মনে না পড়ে, সে জন্য তোকে এই বাড়ি থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।”

নন্দিতা চোখের জল মুছে বলল, “আমার বোনকে কে লুকিয়ে রেখেছিল?”

নীলাঞ্জনা এবার বৃদ্ধের দিকে তাকাল।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন—

—আমি।

নন্দিতা পিছিয়ে গেল।

—আপনি?

—আমি তোদের দুজনকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু একসময় বুঝেছিলাম, একজনকে আড়াল না করলে অন্যজনকে বাঁচানো যাবে না। তাই তোকে মায়ের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আর নীলাঞ্জনাকে এই বাড়িতে রেখেছিলাম।

—কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন, আমার বোনকে অন্য পরিবারে দেওয়া হয়েছিল!

—আমি মিথ্যে বলেছিলাম। কারণ আমি জানতাম, যে মানুষটা তোদের খুঁজছে, সে যদি নীলাঞ্জনাকে পায়, তাহলে তোকে খুঁজে বের করতেও তার দেরি হবে না।

নন্দিতা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আপনি আমাদের জীবন নিয়ে খেলেছেন!”

বৃদ্ধ মাথা নিচু করলেন।

—হ্যাঁ। আর সেই অপরাধের শাস্তি আমি পঁচিশ বছর ধরে ভোগ করছি।

ঠিক তখনই বাড়ির ওপরতলা থেকে একটা ভারী শব্দ এল।

ধপ!

তারপর পায়ের শব্দ।

ধীরে ধীরে কেউ সিঁড়ি দিয়ে নামছে।

অনন্যা অস্ত্র বের করলেন।

—কে ওখানে?

কোনও উত্তর এল না।

পায়ের শব্দ থেমে গেল দরজার ঠিক বাইরে।

তারপর শোনা গেল একজন পুরুষের গলা—

“নন্দু, তুই কি ঠাকুরদাকে পেয়ে গেছিস?”

নন্দিতা জমে গেল।

এই কণ্ঠস্বর সেই মানুষটার।

যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

যে নিজেকে তার বাবা বলে পরিচয় দিয়েছিল।

দরজার ওপাশ থেকে লোকটি বলল, “দরজা খোল। আমি তোকে সব সত্যি বলে দেব।”

অনন্যা বন্দুক তাক করে দরজার সামনে দাঁড়ালেন।

—আপনি কে? নিজের পরিচয় দিন!

ওপাশে লোকটি হাসল।

—আমার পরিচয় তো আপনারা অনেকবার বদলে দিয়েছেন, ইন্সপেক্টর। কখনও ঋত্বিক, কখনও শশাঙ্কশেখর, কখনও অমিয় সেনের রোগী। আজ আমি শুধু একটা নাম নিয়ে এসেছি।

—কী নাম?

লোকটি বলল—

“আমি সেই মানুষ, যাকে নন্দিতা পঁচিশ বছর আগে নিজের হাতে খুন করেছিল।”

নন্দিতা চিৎকার করে উঠল।

—আমি কাউকে খুন করিনি!

দরজার ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“তুই তখন তিন বছরের শিশু ছিলি। তোর হাত থেকে বন্দুকটা কে কেড়ে নিয়েছিল, সেটা তুই ভুলে গেছিস। কিন্তু আমি ভুলিনি।”

বৃদ্ধ শশাঙ্কশেখর হঠাৎ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন।

—না! ওকে ঢুকতে দিও না!

অনন্যা চিৎকার করে বললেন, “সবাই পিছিয়ে যান!”

কিন্তু তার আগেই দরজার তালা নিজে থেকেই খুলে গেল।

দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে নন্দিতা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

লোকটির মুখ তার বাবার মতো।

কিন্তু এবার তার চোখে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। মুখে বয়সের ছাপ। চুলে পাক ধরেছে। কপালের পাশে পুরোনো ক্ষতের দাগ।

সে নন্দিতার দিকে তাকিয়ে বলল—

—আমি ঋত্বিক। তোর বাবা।

নন্দিতার চোখে জল এসে গেল।

—আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?

ঋত্বিক উত্তর দেওয়ার আগে বৃদ্ধ শশাঙ্কশেখরের দিকে তাকালেন।

—বাবা, আপনি এখনও বেঁচে আছেন?

বৃদ্ধ কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “ঋত্বিক…”

ঋত্বিক ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

—আপনি আমাকে মৃত ঘোষণা করেছিলেন। আমার নামে শ্রাদ্ধ করেছিলেন। আমার মেয়েকে আমার কাছ থেকে দূরে রেখেছিলেন। কেন?

বৃদ্ধের চোখে জল।

—আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।

ঋত্বিক হেসে উঠলেন।

—আমাকে বাঁচাতে? নাকি নিজের অপরাধ ঢাকতে?

তিনি পকেট থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করলেন। ছবিতে তরুণ শশাঙ্কশেখর, মাধবী, ছোট্ট ঋত্বিক এবং আরও একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

সেই মানুষটির মুখ ঋত্বিকের মতোই।

কিন্তু ছবির নিচে লেখা—

“ঋত্বিক ও প্রতিরূপ— ১৭ অক্টোবর, ২০০১।”

নন্দিতা ছবিটা দেখে বলল, “প্রতিরূপ মানে কী?”

ঋত্বিক তার দিকে তাকালেন।

—যে মানুষটা আমার মুখ নিয়ে এই বাড়িতে ফিরে আসত, সে কোনও ভূত নয়, নন্দু। সে একজন মানুষ। তাকে ছোটবেলায় আমার মতো করে তৈরি করা হয়েছিল। তার মুখ, তার কণ্ঠস্বর, এমনকি তার স্মৃতির একটা অংশও আমার মতো করে গড়ে তোলা হয়েছিল।

অনন্যা বললেন, “এটা কীভাবে সম্ভব?”

ঋত্বিক উত্তর দিলেন, “ডক্টর অমিয় সেন মানুষের স্মৃতি ও আচরণ নিয়ে বেআইনি পরীক্ষা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষের পরিচয় অন্য মানুষের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব। আমাকে নিয়ে তাঁর পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। কিন্তু একসময় আমি পালিয়ে যাই। আর আমার জায়গায় রেখে যাই সেই মানুষটিকে, যাকে তিনি আমার প্রতিরূপ হিসেবে তৈরি করেছিলেন।”

নন্দিতা কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে বারান্দায় যে মানুষটাকে দেখেছিলাম, সে কে?”

ঋত্বিকের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

—সে আমার প্রতিরূপ।

—আর সে বলেছে, আমি তাকে খুন করেছিলাম!

ঋত্বিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কারণ তুই তাকে সত্যিই গুলি করেছিলি।”

নন্দিতা যেন মাটিতে বসে পড়ল।

—কিন্তু আমার বয়স তখন মাত্র তিন!

—তুই তাকে গুলি করিসনি নিজের ইচ্ছায়। তোর হাতে বন্দুকটা তুলে দেওয়া হয়েছিল। আর তোর সামনে এমন একটা দৃশ্য তৈরি করা হয়েছিল, যাতে তুই বিশ্বাস করিস, তুই নিজের বাবাকে মেরে ফেলেছিস।

নন্দিতা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “কেন?”

ঋত্বিক তার কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসলেন।

—কারণ তোর স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য তাদের একটা কারণ দরকার ছিল। তুই যদি নিজের বাবাকে খুন করার স্মৃতি নিয়ে বড় হতি, তাহলে একদিন সত্যি খুঁজতে গিয়ে সবকিছু প্রকাশ করে দিতি।

নন্দিতা মাথা নাড়ল।

—আমি আর কিছু শুনতে চাই না।

ঋত্বিক তার হাত ধরলেন।

—শুনতেই হবে, নন্দু। কারণ তোর বোনের জীবনের ওপর এখন বিপদ নেমে এসেছে।

সবাই নীলাঞ্জনার দিকে তাকাল।

নীলাঞ্জনা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ ফ্যাকাশে।

ঋত্বিক বললেন, “যে প্রতিরূপ এতদিন এই বাড়িতে আসত, সে নীলাঞ্জনাকে খুঁজছিল। কারণ সে জানে, নীলাঞ্জনার কাছে সেই আসল নথি আছে, যা প্রমাণ করবে ডক্টর অমিয় সেন এখনও বেঁচে আছেন।”

অনন্যা চমকে উঠলেন।

—কিন্তু অমিয় সেন তো পনেরো বছর আগে মারা গেছেন!

ঋত্বিক মাথা নাড়লেন।

—যে দেহটাকে অমিয় সেন বলে শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটা তাঁর দেহ ছিল না।

নন্দিতা এবার আর সহ্য করতে পারল না।

—তাহলে আসল অমিয় সেন কোথায়?

ঋত্বিক উত্তর দিলেন না।

তার বদলে তিনি নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বললেন—

—নীলু, তুই কি সেই নথিটা এখনও নিজের কাছে রেখেছিস?

নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ।

—কোথায়?

নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে নিজের জামার ভেতর থেকে একটা ছোট্ট চাবি বের করল।

—বাড়ির ছাদের ঘরে।

ঋত্বিক চোখ বন্ধ করলেন।

—তাহলে আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে সাইরেনের শব্দ ভেসে এল। অনন্যার সহকর্মীরা এসে পৌঁছেছেন। তিনি দ্রুত ফোনে নির্দেশ দিতে লাগলেন।

কিন্তু নন্দিতা লক্ষ করল, ঋত্বিক বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন।

রাত ১২টা ০৩ মিনিট।

—বাবা, কী হয়েছে?

ঋত্বিক উত্তর দিলেন না।

তিনি ধীরে ধীরে নন্দিতার দিকে তাকালেন।

—নন্দু, একটা কথা মনে রাখিস। আজ রাত শেষ হওয়ার আগে তোর সামনে দুটো মৃত্যু ঘটবে। একটা সত্যিকারের, আরেকটা মিথ্যে।

—মানে?

ঋত্বিক তার হাত শক্ত করে ধরলেন।

—তুই যাকে বাঁচাতে যাবি, সে হয়তো বেঁচে থাকার যোগ্য নয়। আর যাকে অপরাধী ভাববি, সে হয়তো তোকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন দিয়েছে।

নন্দিতা কিছু বুঝতে পারল না।

ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে নীলাঞ্জনার চিৎকার শোনা গেল।

—দিদি! তাড়াতাড়ি এসো!

সবাই ছুটে সিঁড়ির দিকে গেল।

ছাদের ঘরের দরজা খোলা। ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাগজপত্র। জানালার পর্দা বাতাসে উড়ছে।

আর মেঝেতে পড়ে আছে একটি দেহ।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

শরীরের ওপর সাদা চাদর।

নীলাঞ্জনা কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি যখন এসেছি, তখনই এভাবে পড়ে ছিল।”

অনন্যা সাবধানে চাদরটা সরালেন।

নন্দিতা চিৎকার করে উঠল।

মেঝেতে পড়ে থাকা মানুষটি অবিকল ঋত্বিকের মতো দেখতে।

কিন্তু তার বুকের ওপর রক্ত দিয়ে লেখা—

“একজন বাবা বেঁচে আছে। অন্যজনকে মেয়েই মেরেছে।”

নন্দিতা পিছিয়ে গেল।

তারপর তার চোখ পড়ল দেহটার হাতে।

আঙুলে একটা আংটি।

আংটিটা সে চিনতে পারে।

ছোটবেলায় ছবিতে বাবার হাতে এই আংটিই দেখেছিল।

কিন্তু আসল ঋত্বিকের হাতেও তো একই আংটি ছিল!

তাহলে মেঝেতে পড়ে থাকা মানুষটা কে?

আর একটু আগেই যে মানুষটি নিজেকে তার বাবা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন, তিনি কোথায় গেলেন?

নন্দিতা ঘুরে তাকাল।

ঋত্বিক নেই।

অনন্যা নেই।

শুধু নীলাঞ্জনা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা রক্তমাখা কাগজ।

নন্দিতা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “ওরা কোথায়?”

নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

তার চোখে জল নেই। মুখে কোনও আতঙ্ক নেই।

শুধু একটা অদ্ভুত হাসি।

—দিদি, তুই এখনও বুঝতে পারছিস না?

—কী?

নীলাঞ্জনা কাগজটা নন্দিতার হাতে দিল।

সেখানে লেখা—

“নন্দিতা রায়, তোমার বাবা কখনও নিখোঁজ হননি। তিনি এই বাড়িতে আছেন। কিন্তু তুমি যাকে এতক্ষণ বাবা বলে চিনেছ, সে আসলে তোমার যমজ বোনের বাবা।”

নন্দিতা হতভম্ব হয়ে গেল।

—আমার যমজ বোনের বাবা?

নীলাঞ্জনা এবার খুব নিচু গলায় বলল—

“কারণ আমি তোর বোন নই, নন্দু।”

নন্দিতার বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল।

নীলাঞ্জনা তার সামনে এসে দাঁড়াল।

“আমি তোর মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। কিন্তু তুই আমার যমজ বোন নস। তোর আসল যমজ বোনকে জন্মের পরই মেরে ফেলা হয়েছিল।”

নন্দিতা পিছিয়ে গেল।

—তাহলে আমি কে?

নীলাঞ্জনা তার মুখের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল—

“তুই সেই মেয়ে, যাকে পঁচিশ বছর আগে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। আর আজ রাতেই তোর দ্বিতীয় মৃত্যু হবে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে নন্দিতা নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।

কেউ যেন তার গলায় কথা বলছে—

“নীলু, দরজাটা খোল। আমি ফিরে এসেছি।”

কিন্তু নন্দিতা তো কিছু বলেনি।

তাহলে তার কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে কে কথা বলছে?

আর অন্ধকারের ওপাশ থেকে যে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে, সে কি সত্যিই তার মৃত যমজ বোন?

নাকি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটি আবার ফিরে এসেছে?

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *