“তোমাদের মধ্যে কে আসল অরিত্র?”
মায়ের মুখ থেকে কথাটা শোনার পর ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।
অরিত্র স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার মুখে বয়সের ছাপ পড়েছে, চুলে পাক ধরেছে, চোখের কোলে গভীর ক্লান্তি। তবু সেই চোখ দুটো চিনতে ভুল হলো না। ছোটবেলায় যে চোখের দিকে তাকিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ত, সেই চোখই আজ তার সামনে।
“মা!”
অরিত্র ছুটে গেল। কিন্তু মধুমিতা হাত তুলে তাকে থামালেন।
“একটু দাঁড়া।”
“কেন? এত বছর পর তোমাকে পেলাম। তুমি বেঁচে আছ, অথচ আমাদের কাছে ফিরে আসোনি কেন?”
মধুমিতার চোখ ভিজে উঠল।
“আমি ফিরতে চেয়েছিলাম, অরিত্র। অনেকবার চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমাদের কাছে ফিরলে তোমাদের দুজনেরই জীবন বিপন্ন হতো।”
অরিত্রর গলায় কান্না জমে উঠল।
“তুমি কি জানো, আমি কত বছর তোমাকে মৃত ভেবে কাটিয়েছি?”
মধুমিতা চোখ নামিয়ে নিলেন।
“জানি। প্রতিটি বছর, প্রতিটি দিন আমি সেই অপরাধের বোঝা নিয়ে বেঁচেছি।”
“কিন্তু তুমি আমাকে ফোন করেছিলে। বলেছিলে, নীলকুঠিতে না আসতে। তাহলে এখন সামনে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
“কারণ এবার আর পালানোর সময় নেই।”
অরিত্র মায়ের পাশে দাঁড়ানো যুবকটির দিকে তাকাল। তার মুখে অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি। যেন সে একই সঙ্গে অরিত্রর পরিচিত এবং সম্পূর্ণ অপরিচিত।
যুবকটি বলল, “মা, আর দেরি কোরো না। সব সত্যি আজই বলতে হবে।”
দেবব্রত তখনও সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে ধরা রিভলভার কাঁপছে।
ঋতম সতর্ক গলায় বলল, “বন্দুকটা নামিয়ে রাখুন। এখানে কেউ আপনাকে আক্রমণ করতে আসেনি।”
দেবব্রত যেন কথাটা শুনতেই পেলেন না। তাঁর চোখ আটকে আছে মধুমিতার দিকে।
“তুমি বেঁচে আছ?”
মধুমিতা ঠান্ডা গলায় বললেন, “এই প্রশ্নটা তুমি আমাকে করছ, দেবব্রত? সতেরো বছর ধরে আমি কোথায় ছিলাম, সেটা জানার চেষ্টা একবারও করোনি। আজ আমাকে দেখে অবাক হচ্ছ?”
“আমি ভেবেছিলাম, তুমি…”
“মরে গেছি?”
দেবব্রত মাথা নিচু করলেন।
“তুমি নিজেই তো সবাইকে বিশ্বাস করিয়েছিলে যে আমি নদীতে পড়ে মারা গেছি। পুলিশকে মিথ্যে বলেছিলে। আমার ছেলেকে মিথ্যে বলেছিলে। নিজের বিবেককেও মিথ্যে বুঝিয়েছিলে। এখন আর কী বলার আছে?”
দেবব্রতর হাত থেকে রিভলভারটা মেঝেতে পড়ে গেল।
অরিত্র মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে একটা কথার উত্তর দাও। আমি কে?”
মধুমিতা তার দিকে তাকালেন।
“তুই আমার ছেলে।”
“সেটা তো জানি। কিন্তু আমি কি অরিত্র? নাকি অরুণ?”
প্রশ্নটা শুনে মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন। যেন এই প্রশ্নের জন্যই তিনি সতেরো বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
“তুই অরিত্র। কিন্তু তোর নামের সঙ্গে এমন একটা মিথ্যে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যার সত্যিটা জানতে পারলে তোর নিজের জীবনকেই নতুন করে চিনতে হবে।”
“কী মিথ্যে?”
মধুমিতা উত্তর দেওয়ার আগেই যুবকটি এগিয়ে এল।
“আমি বলছি।”
সে টেবিলের ওপর রাখা লণ্ঠনটা তুলে নিজের মুখের কাছে ধরল। আলোয় তার ডান গালের কাটা দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“আমার নাম অরুণ। জন্মের সময় আমার নামও অন্য কিছু ছিল। আমাদের দুজনের জন্মের রাতে হাসপাতালের নথিতে তিনটি শিশুর নাম ওঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই তিনটি শিশুর মধ্যে একজনের কোনও পরিচয় ছিল না।”
অরিত্র অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
“তিনটি শিশু কেন? মা তো যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিল!”
অরুণ বলল, “সেটাই আমাদের শেখানো গল্প। কিন্তু জন্মের রাতের হাসপাতালের আসল নথি অন্য কথা বলে।”
সে নিজের পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করল।
“এটা হাসপাতালের মূল রেজিস্টারের অনুলিপি। অনেক কষ্টে সংগ্রহ করেছি। এখানে দেখ—তিনটি এন্ট্রি।”
অরিত্র কাগজটা হাতে নিল। কাগজ পুরোনো, প্রান্ত ছেঁড়া, কিন্তু লেখাগুলো স্পষ্ট।
প্রথম এন্ট্রি—অরিত্র মজুমদার।
দ্বিতীয় এন্ট্রি—অরুণ মজুমদার।
তৃতীয় এন্ট্রি—পরিচয় অজ্ঞাত, পুরুষ শিশু।
তৃতীয় নামের পাশে লাল কালিতে লেখা—
‘বিশেষ নির্দেশে স্থানান্তর।’
অরিত্রর মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল।
“এটা কীভাবে সম্ভব? মা কি তিনটি সন্তানের জন্ম দিয়েছিল?”
মধুমিতা ধীরে ধীরে বললেন, “আমি যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলাম। তৃতীয় শিশুটি জন্মেছিল একই হাসপাতালে, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে। তার মাকে তখন মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। শিশুটিকে অনাথ বলে নথিভুক্ত করা হয়।”
ঋতম প্রশ্ন করল, “তাহলে তিনটি শিশুর নথি একই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হলো কীভাবে?”
মধুমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“কারণ তৃতীয় শিশুটির জন্মের সঙ্গে এমন একটি অপরাধ জড়িয়ে ছিল, যা আড়াল করতে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী নথি বদলে দিয়েছিল। আর সেই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল এমন একজন, যাকে আমি নিজের ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করতাম।”
“কে সে?” অরিত্র জিজ্ঞেস করল।
মধুমিতা উত্তর দিলেন না। বরং পাশে দাঁড়ানো যুবকটির দিকে তাকালেন।
যুবকটি বলল, “আমার মুখের দিকে ভালো করে তাকাও।”
অরিত্র তাকাল।
“তুমি দেখতে আমার মতো। কিন্তু আমার থেকে আলাদা। তোমার চোখের ওপরের বাঁ দিকের ভ্রুতে ছোট একটা দাগ আছে। আমার নেই। তোমার ডান হাতের কবজিতে জন্মদাগ আছে। আমারও নেই।”
অরিত্র নিজের কবজির দিকে তাকাল। জন্মদাগটা সে ছোটবেলা থেকেই দেখেছে।
অরুণ বলল, “আমাদের মধ্যে একজনের পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুধু আমাদের দুজনের নয়, তৃতীয় শিশুটির পরিচয়ও বদলানো হয়েছিল। আর সেই শিশুটি আজও বেঁচে আছে।”
“তুমি জানো সে কে?”
“জানি না। তবে জানি, সে আমাদের খুব কাছেই আছে।”
ঘরের নীরবতা ভাঙল ঋতম।
“একটা কথা বুঝতে পারছি না। যদি তৃতীয় শিশুটির পরিচয় বদলে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার সঙ্গে অরিত্র আর অরুণের সম্পর্ক কী?”
মধুমিতা বললেন, “সম্পর্কটা রক্তের নয়, অপরাধের। ওই শিশুটির মা মারা যাওয়ার আগে একটা গুরুত্বপূর্ণ নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই নথি প্রমাণ করত, হাসপাতালের কিছু মানুষ নবজাতক শিশুদের পরিচয় বদলে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দিচ্ছে। তার বিনিময়ে টাকা নেওয়া হতো।”
ঋতম চমকে উঠল।
“শিশু পাচার?”
“হ্যাঁ। কিন্তু শুধু টাকা নয়। কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের পরিচয় বদলানো হতো সম্পত্তি দখল করার জন্য। কোনও পরিবারে উত্তরাধিকারী না থাকলে, সেই পরিবারের মৃত শিশুর জায়গায় অন্য শিশুকে বসিয়ে দেওয়া হতো। পরে সমস্ত নথি পাল্টে সেই শিশুকেই বৈধ উত্তরাধিকারী দেখানো হতো।”
অরিত্রর চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।
“তাহলে কি আমার পরিচয়ও বদলানো হয়েছিল?”
মধুমিতা তার হাত ধরলেন।
“তোর জন্মের পরিচয় বদলানো হয়নি। কিন্তু তোর ভাইকে তোর কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আর তৃতীয় শিশুটিকে এমন একটি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যারা নিজেদের মৃত সন্তানকে ফিরিয়ে পেতে চেয়েছিল।”
অরিত্র ধীরে ধীরে সবকিছু বোঝার চেষ্টা করল।
“তাহলে আমার বাবা এই ঘটনার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত?”
দেবব্রত এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার তিনি মাথা তুললেন।
“আমি প্রথমে কিছুই জানতাম না। মধুমিতার প্রসবের পর হাসপাতালের এক কর্মচারী আমাকে বলেছিল, একটি শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক। পরে জানানো হয়, সে মারা গেছে। আমি অন্য শিশুটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরি। কয়েক মাস পর জানতে পারি, অরুণ বেঁচে আছে।”
“তখন তাকে ফিরিয়ে আনোনি কেন?”
দেবব্রত চোখ মুছলেন।
“কারণ ততদিনে আমি এমন একটি কাগজে স্বাক্ষর করে ফেলেছিলাম, যার মাধ্যমে আমি নিজের ছেলের পরিচয় সম্পর্কে মিথ্যে স্বীকার করেছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল, সব চুপচাপ মেনে নিলে অরিত্র নিরাপদ থাকবে। কিন্তু আমি বুঝিনি, আমার নীরবতা আরও বড় বিপদ ডেকে আনবে।”
অরুণ তীব্র গলায় বলল, “তুমি নিজের নিরাপত্তার জন্য আমাকে অনাথ আশ্রমে ফেলে রেখেছিলে!”
“আমি জানতাম না তোকে কোথায় রাখা হয়েছে!”
“কিন্তু মা জানত। মা আমাকে খুঁজে পেয়েছিল। আর তারপর কী হয়েছিল, সেটা তুমি জানো।”
দেবব্রত মুখ ঢেকে ফেললেন।
অরিত্র বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর কী হয়েছিল?”
দেবব্রত কাঁপা গলায় বললেন, “সেদিন মধুমিতা প্রমাণ নিয়ে নীলকুঠিতে এসেছিল। সে চেয়েছিল, সব নথি পুলিশের হাতে তুলে দেবে। কিন্তু এখানে আসার আগেই কেউ তার ওপর হামলা করে। আমি যখন পৌঁছই, তখন সে আহত অবস্থায় পড়েছিল। আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।”
মধুমিতা বললেন, “কিন্তু তুমি আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওনি।”
দেবব্রত মাথা নিচু করলেন।
“আমি ভয় পেয়েছিলাম। যারা এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারা আমাকে হুমকি দিয়েছিল। তারা বলেছিল, আমি যদি মুখ খুলি, তাহলে অরিত্রকে মেরে ফেলবে।”
“তাই তুমি আমাকে মৃত বলে ঘোষণা করলে?” মধুমিতা জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম।”
“কীভাবে?”
দেবব্রত কোনও উত্তর দিলেন না।
মধুমিতা এবার অরিত্রর দিকে তাকালেন।
“আমি সেদিন মারা যাইনি। আমাকে এই বাড়ির পেছনের একটি গোপন ঘরে রাখা হয়েছিল। কয়েক সপ্তাহ পর এক বৃদ্ধা পরিচারিকা আমাকে উদ্ধার করেন। তিনি আমাকে অন্য একটি গ্রামে নিয়ে যান। আমি পুলিশের কাছে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার কাছে থাকা মূল নথিগুলো তখন আর আমার কাছে ছিল না। আর যারা অপরাধ করেছিল, তারা আগেই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে প্রমাণ তৈরি করে রেখেছিল।”
“তাহলে তুমি এত বছর পরে ফিরে এলে কেন?”
“কারণ কয়েক মাস আগে আমি জানতে পারি, অরুণকে খুঁজে পাওয়া গেছে। সে নীলকুঠিতে ফিরে এসেছে। আমি বুঝেছিলাম, এবার হয়তো সত্যিটা প্রকাশ করা সম্ভব হবে।”
অরিত্র মায়ের হাত শক্ত করে ধরল।
“তুমি আমাকে একবারও খুঁজতে পারতে।”
মধুমিতা কেঁদে ফেললেন।
“খুঁজেছি, অরিত্র। তোর স্কুলের সামনে গিয়েছি। তোর কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছি। দূর থেকে তোকে দেখেছি। কিন্তু তোর কাছে যেতে পারিনি। যারা তোকে নজরে রাখত, তারা আমার প্রতিটি পদক্ষেপ জানত।”
অরিত্রর চোখে জল এসে গেল।
“আমি তোমাকে ঘৃণা করতাম না, মা। আমি শুধু ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছ।”
মধুমিতা তাকে বুকে টেনে নিলেন।
দীর্ঘ সতেরো বছর পর মা ও ছেলের আলিঙ্গনে জমে থাকা অভিমান কিছুটা গলে গেল। কিন্তু সত্যের শেষ দরজা তখনও বন্ধ।
ঋতম হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা নথিগুলোর মধ্যে একটা কাগজ দেখতে পেল।
কাগজে একটি বাড়ির ঠিকানা লেখা।
ঠিকানাটা কলকাতার এক অভিজাত আবাসনের।
তার নিচে নাম—
‘ডা. অনির্বাণ সেনগুপ্ত।’
ঋতম নামটা পড়েই চমকে উঠল।
“এই মানুষটাকে আমি চিনি।”
অরিত্র তাকাল।
“কে?”
“ডা. অনির্বাণ সেনগুপ্ত। শহরের নামী শিশু বিশেষজ্ঞ। একাধিক হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বাবা ছিলেন সেই সময়ের একজন চিকিৎসক, যাঁর বিরুদ্ধে শিশুদের পরিচয় বদলের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু কখনও প্রমাণ হয়নি।”
মধুমিতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
“অনির্বাণ সেই তৃতীয় শিশুটি।”
ঘরে নেমে এল নীরবতা।
অরিত্র বলল, “তুমি নিশ্চিত?”
“আমি নিজে তাকে ছোটবেলায় দেখেছি। তার আসল মা মারা যাওয়ার পর তাকে অন্য একটি পরিবারে তুলে দেওয়া হয়। সেই পরিবারের কাছে সে নিজের সন্তান হিসেবেই বড় হয়েছে। তার বর্তমান পরিচয় তৈরি হয়েছিল সেই রাতের ঘটনার পর।”
ঋতম বলল, “কিন্তু যদি সে জানেই না যে তার পরিচয় বদলানো হয়েছিল, তাহলে তাকে অপরাধী বলা যায় না।”
“আমি তাকে অপরাধী বলছি না,” মধুমিতা উত্তর দিলেন। “আমি বলছি, সে সত্যিটা জানার অধিকার রাখে।”
অরিত্র কাগজটা হাতে নিল।
“তাহলে আমাদের তার সঙ্গে দেখা করতে হবে।”
অরুণ এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে বলল, “সেটা এত সহজ হবে না।”
“কেন?”
“কারণ অনির্বাণ শুধু একজন চিকিৎসক নয়। সে জানে, তার জন্মের নথিতে কী বদল করা হয়েছিল। সে অনেক বছর ধরে এই ঘটনার সূত্র খুঁজেছে। কিন্তু সে কখনও চায়নি সত্যিটা প্রকাশ পাক।”
ঋতম বলল, “তুমি তার সঙ্গে দেখা করেছ?”
অরুণ উত্তর দিল না।
অরিত্র তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এত কিছু জানো, অথচ আমাদের কিছু বলোনি কেন?”
অরুণের চোখে ক্ষোভ ফুটে উঠল।
“কারণ তোমরা কেউই আমার জায়গায় দাঁড়াওনি। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন প্রতিদিন অন্য শিশুদের সঙ্গে আশ্রমে ঘুমাতাম। আমার জন্মদিনে কেউ আসত না। স্কুলে কেউ আমাকে নিতে আসত না। অসুস্থ হলে মাথায় হাত রাখার মতো কেউ ছিল না। আর তুমি নিজের বাড়িতে বড় হয়েছ, নিজের নামে স্কুলে পড়েছ, নিজের মায়ের সঙ্গে থেকেছ।”
“আমি তো জানতামই না তোমার কথা!”
“আমি জানি। কিন্তু অজানা থাকার সুবিধেটাও তোমার ছিল।”
অরিত্র চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর অরুণের গলা নরম হলো।
“আমি তোমাকে দোষ দিতে চাই না। কিন্তু এত বছর ধরে আমি একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি—আমাকে কেন ফেলে রাখা হয়েছিল? মা কি আমাকে চাইতেন না? বাবা কি আমাকে অস্বীকার করেছিলেন? নাকি আমি এমন কোনও অপরাধের সাক্ষী ছিলাম, যার জন্য আমাকে আড়াল করা দরকার ছিল?”
মধুমিতা এগিয়ে এসে অরুণের মুখে হাত রাখলেন।
“তুই কোনও অপরাধ করিসনি। তোকে আমি কোনও দিন ছেড়ে যাইনি।”
অরুণ মায়ের হাত সরিয়ে দিল না। কিন্তু তার চোখের জলও মুছল না।
“তাহলে প্রমাণ দাও, মা। আমাদের জন্মের রাতের আসল নথি কোথায়?”
মধুমিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “মূল নথি আমার কাছে নেই। কিন্তু তার একটি অংশ আছে। সেটি এমন একজনের কাছে রাখা, যে এই বাড়ির অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।”
“কে সে?”
“তোমাদের ছোটবেলার স্কুলের প্রধান শিক্ষক—সুধাংশু রায়।”
অরিত্র অবাক হয়ে গেল।
“আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক?”
“হ্যাঁ। তিনি তখন হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে সব ছেড়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনিই আমাকে নথির একটি অনুলিপি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, নথিটা এমন জায়গায় রেখেছেন, যেখানে অপরাধীরা কোনও দিন খুঁজে পাবে না।”
ঋতম বলল, “সেই জায়গাটা কী?”
মধুমিতা উত্তর দিলেন, “আমি জানি না। শুধু জানি, তিনি একটি কবিতার মধ্যে তার সংকেত রেখে গিয়েছিলেন।”
“কী কবিতা?”
মধুমিতা স্মৃতি থেকে বলতে লাগলেন—
“যেখানে শিশুরা প্রথম অক্ষর শেখে, যেখানে ঘণ্টা বাজে দিনের শেষে, যেখানে নাম মুছে যায় কালো বোর্ডে, সত্যি ঘুমিয়ে আছে তারই দেশে।”
অরিত্রর মনে পড়ল, তাদের পুরোনো স্কুলের একটি ঘর ছিল যেখানে বহু পুরোনো বই রাখা থাকত। প্রধান শিক্ষক বলতেন, ওই ঘরে স্কুলের ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে।
“স্কুলের পুরোনো গ্রন্থাগার,” অরিত্র বলল।
ঋতম মাথা নাড়ল।
“হতে পারে। কিন্তু আমাদের আগে জানতে হবে, ওই নথি এখনও সেখানে আছে কি না।”
ঠিক তখনই দেবব্রত ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
“তোমরা সেখানে যেতে পারবে না।”
অরিত্র বাবার দিকে ঘুরে তাকাল।
“কেন?”
“কারণ সুধাংশু রায়ের মৃত্যুর পর ওই ঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তার কয়েক মাস পর স্কুলের এক কর্মচারী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়।”
ঋতম বলল, “আপনি এত কিছু জানেন, অথচ এতদিন চুপ ছিলেন কেন?”
দেবব্রতর চোখে অসহায়তা।
“কারণ আমি জানতাম, অপরাধের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলো এখনও ক্ষমতাশালী। আমি ভেবেছিলাম, সময়ের সঙ্গে সব চাপা পড়ে যাবে।”
অরুণ তিক্ত হেসে বলল, “অপরাধ কখনও চাপা পড়ে না, বাবা। শুধু তার শিকাররা চুপ করে থাকে।”
রাত তখন প্রায় তিনটে।
নীলকুঠির বাইরে বৃষ্টি থেমেছে। অরিত্র, অরুণ, মধুমিতা এবং ঋতম বাড়ি থেকে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দেবব্রতকে সঙ্গে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে মতভেদ দেখা দিল।
অরিত্র বলল, “বাবা আমাদের সঙ্গে যাবেন।”
অরুণ আপত্তি করল।
“যে মানুষ এত বছর সত্যি লুকিয়েছে, তাকে বিশ্বাস করা যায় না।”
অরিত্র শান্ত গলায় বলল, “বিশ্বাস আর বিচার এক জিনিস নয়। ওঁর অপরাধের বিচার হবে। কিন্তু সত্যিটা জানতে হলে ওঁকেও আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে।”
মধুমিতা বললেন, “অরিত্র ঠিক বলেছে। এবার কেউ পালাবে না।”
দেবব্রত কোনও প্রতিবাদ করলেন না।
বাড়ির প্রধান দরজা পেরিয়ে তারা উঠোনে এসে দাঁড়াতেই অরিত্রর ফোন বেজে উঠল।
অজানা নম্বর।
সে কল ধরল।
ওপাশ থেকে একজন পুরুষকণ্ঠ বলল, “তুমি নীলকুঠিতে গিয়েছিলে?”
অরিত্র সতর্ক হয়ে উত্তর দিল, “কে বলছেন?”
“যে সত্যিটা তোমার জানার কথা ছিল না।”
“আপনি কে?”
“আমার নাম অনির্বাণ সেনগুপ্ত।”
অরিত্র চমকে উঠল।
“আপনি কীভাবে আমার নম্বর পেলেন?”
“ওসব গুরুত্বপূর্ণ নয়। তুমি যে নথি খুঁজছ, সেটা পাবে না।”
“কেন?”
“কারণ সেই নথিতে শুধু আমার জন্মের সত্যি নেই। তোমার মায়ের মৃত্যুর সত্যিও আছে।”
অরিত্রর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“আমার মা বেঁচে আছেন।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর অনির্বাণ বলল, “তাহলে তিনি তোমাকে সব বলেননি।”
অরিত্র মায়ের দিকে তাকাল।
মধুমিতা ফোনের ওপাশের কথা শুনতে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু অরিত্রর মুখ দেখে তাঁর চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
অরিত্র বলল, “আপনি কী বলতে চাইছেন?”
অনির্বাণের গলা এবার আরও নিচু।
“২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর নীলকুঠিতে একজন মহিলা নিখোঁজ হননি। তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। আর সেই ঘটনার পর যাকে জীবিত অবস্থায় অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে তোমার মা নয়।”
অরিত্রর হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“আপনি মিথ্যে বলছেন!”
“আমি মিথ্যে বলছি কি না, সেটা জানতে চাইলে আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় আমার হাসপাতালে এসো। একা আসবে। সঙ্গে তোমার মায়ের ডায়েরিটা আনবে।”
“আপনি জানেন ডায়েরি আমার কাছে আছে কীভাবে?”
“কারণ ডায়েরিটা আমিই তোমার বাড়িতে পাঠিয়েছিলাম।”
অরিত্রর চোখ বড় হয়ে গেল।
“নীল খামগুলোও আপনি পাঠিয়েছেন?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
অনির্বাণের উত্তর এল ধীরে ধীরে।
“কারণ তোমাদের পরিবারে যে মানুষটাকে সবাই মৃত ভেবেছে, সে ফিরে এসেছে ঠিকই। কিন্তু সে তোমাদের মা কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও বাকি।”
কল কেটে গেল।
অরিত্র ফোনটা নামিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
মধুমিতার মুখে কোনও রং নেই।
অরিত্র ধীরে ধীরে বলল, “মা, অনির্বাণ বলছে, তুমি আমার মা নও।”
মধুমিতা যেন কথাটা শুনেও শুনলেন না। তিনি কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন। তাঁর চোখে এমন ভয়, যা অরিত্র আগে কখনও দেখেনি।
অরুণ এগিয়ে এসে বলল, “মা?”
মধুমিতা কাঁপা গলায় বললেন, “না… না, এটা হতে পারে না।”
অরিত্র তাঁর হাত ধরল।
“আমাকে সত্যিটা বলো।”
মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন। তারপর খুব ধীরে বললেন—
“অরিত্র, আমি তোকে জন্ম দিয়েছি। কিন্তু তোকে যে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম, সে শিশুটি…”
তিনি বাকিটা বলতে পারলেন না।
দূরে নীলকুঠির ভেতরে হঠাৎ একটা বিস্ফোরণের মতো শব্দ হলো।
সবাই ঘুরে তাকাল।
দোতলার একটি জানলা দিয়ে আগুনের আলো বেরিয়ে আসছে।
ঋতম চিৎকার করে বলল, “আগুন!”
অরুণ ছুটে বাড়ির দিকে গেল। অরিত্র মাকে ধরে বাইরে টেনে আনল। দেবব্রতও তাদের পেছনে এলেন।
কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল কাঠের ছাদে। ধোঁয়ায় ঢেকে গেল জানলা, করিডর, সিঁড়ি।
ঋতম পুলিশ ও দমকলে ফোন করতে লাগল।
অরিত্রর চোখ তখনও দোতলার জানলায় আটকে। আগুনের ভেতরে সে যেন কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।
একজন মহিলা।
তার হাতে একটি নীল খাম।
মহিলাটি জানলার কাছে এসে অরিত্রর দিকে তাকালেন। তারপর ঠোঁট নাড়লেন।
দূরত্বের কারণে শব্দ শোনা গেল না। কিন্তু অরিত্র স্পষ্ট বুঝতে পারল, তিনি একটি কথাই বলছেন—
‘বিশ্বাস করিস না।’
পরক্ষণেই ছাদের একটা অংশ ভেঙে পড়ল। আগুনের শিখা জানলা ঢেকে দিল।
অরিত্র চিৎকার করে উঠল, “ভেতরে কেউ আছে!”
অরুণ তাকে ধরে পিছিয়ে আনল।
“ওখানে গেলে তুইও মরবি!”
অরিত্র ছটফট করতে লাগল।
“ওই মহিলা কে? মা কি ভেতরে রয়ে গেছে?”
মধুমিতা তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। কিন্তু তাঁর চোখে আতঙ্কের পাশাপাশি এমন এক অপরাধবোধ ছিল, যা অরিত্রর সমস্ত প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলল।
সেই রাতেই নীলকুঠির আগুনে পুড়ে গেল বহু পুরোনো নথি, ছবি, চিঠি আর স্মৃতির শেষ আশ্রয়।
কিন্তু অরিত্রর পকেটে তখনও ছিল একটি জিনিস।
মায়ের ডায়েরির ছেঁড়া পাতা।
আগুন লাগার আগে সে সেখানে একটি লাইন পড়েছিল, যা এতক্ষণ তার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।
‘যদি কোনও দিন আমার পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হয়, তবে মনে রেখো—যে তোমাকে জন্ম দেয়, সে-ই সব সময় তোমার মা হয় না; আর যে তোমাকে বড় করে, সে-ও সব সময় তোমার বাবা হয় না।’
অরিত্র আকাশের দিকে তাকাল।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের উত্তর পাওয়ার বদলে সে আরও গভীর অন্ধকারে প্রবেশ করেছে।
তার মা বেঁচে আছেন—কিন্তু তিনি কি সত্যিই তার মা?
তার যমজ ভাই অরুণ—কিন্তু তাদের মধ্যে কার পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল?
আর ডা. অনির্বাণ সেনগুপ্ত—তৃতীয় শিশুটি—কেন তাদের পরিবারের অতীত নিয়ে এত কিছু জানেন?
সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অরিত্রকে এবার যেতে হবে সেই হাসপাতালে, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল।
কিন্তু সে জানত না, পরদিন বিকেল পাঁচটায় হাসপাতালের দরজা পেরিয়ে ঢোকার পর তার জন্য অপেক্ষা করছে আরও ভয়ংকর এক সত্য।
কারণ হাসপাতালের পুরোনো রেজিস্টারে শুধু তিনটি শিশুর নাম ছিল না।
ছিল চতুর্থ একটি নামও।
আর সেই নামের পাশে লেখা ছিল—
‘মৃত্যুর কারণ: নথিভুক্ত নয়।’
— সমাপ্ত —