শুক্রবার রাত এগারোটা চল্লিশ।
আকাশে চাঁদ নেই। মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে সরু রাস্তাটা ক্রমশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। রাস্তার দুপাশে ধানখেত, মাঝেমধ্যে পরিত্যক্ত বাড়ি আর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা পুরোনো গাছ। অরিত্রর গাড়ির হেডলাইট ছাড়া চারপাশে আলোর কোনও চিহ্ন নেই।
সামনের সিটে বসে অরিত্র বারবার ঘড়ি দেখছিল।
তার পাশে ঋতম। বন্ধুর মুখেও আজ আর কোনও কৌতুক নেই। অরিত্রর কাছ থেকে সমস্ত ঘটনা শোনার পর সে নিজের মতো করে কিছু খোঁজখবর করেছে। কিন্তু যত তথ্য জোগাড় করেছে, রহস্য ততই গভীর হয়েছে।
ঋতম বলল, “আর পাঁচ মিনিট। তারপর আমরা নীলকুঠিতে পৌঁছে যাব।”
অরিত্র উত্তর দিল না।
তার পকেটে মায়ের ডায়েরি থেকে ছেঁড়া একটি পাতা, নীল খাম, যমজ ভাইয়ের ছবি এবং পুরোনো ক্যাসেট। যাওয়ার আগে সে বাবাকে অনেকবার ফোন করেছিল। ফোন বন্ধ। থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করার কথাও ভেবেছিল, কিন্তু বাবার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে নীলকুঠির সম্পর্ক আছে কি না, তা না জেনে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
ঋতম অবশ্য তাকে বারবার সতর্ক করেছে।
“একটা কথা মনে রাখিস, অরিত্র। যে লোক তোকে এই বাড়িতে ডাকছে, সে তোর বন্ধু নাও হতে পারে। আমরা কোনও কিছু না বুঝে আলাদা হয়ে যাব না।”
অরিত্র বলেছিল, “আমি শুধু আমার মাকে আর ভাইকে খুঁজতে চাই।”
ঋতম গম্ভীরভাবে উত্তর দিয়েছিল, “আর আমি চাই, তুই জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরিস।”
গাড়ি একটা ভাঙা সেতুর কাছে এসে থামল। তার পরের রাস্তা এতটাই সরু যে গাড়ি নিয়ে এগোনো সম্ভব নয়।
দুজন নেমে পড়ল।
দূরে অন্ধকারের মধ্যে নীলকুঠির ভাঙা চূড়া দেখা যাচ্ছে। গাছের ডালপালা বাড়িটার বেশির ভাগ অংশ ঢেকে রেখেছে। একসময় যে বাড়ি বিশাল জমিদারির গৌরব ছিল, এখন তার দেওয়ালে শ্যাওলা, ছাদে বুনো ঘাস, আর জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে অন্ধকার।
গেটের কাছে পৌঁছে অরিত্র থমকে দাঁড়াল।
লোহার গেটের ওপর সাদা রঙে লেখা—
‘মধুমিতা শিশু নিবাস।’
নীচে আরও ছোট অক্ষরে—
‘প্রতিষ্ঠিত ১৯৮৭।’
ঋতম মোবাইলের আলো ফেলে লেখাটা দেখল।
“তোর মা কি এই অনাথ আশ্রমে কাজ করতেন?”
“আমি জানি না।”
“তাহলে তোর মায়ের নাম এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কেন?”
অরিত্র কোনও উত্তর দিল না। গেটের পাশে একটা ছোট ঘণ্টা ঝুলছিল। সে একবার টানল।
ভেতর থেকে কোনও সাড়া এল না।
দ্বিতীয়বার টানতেই বাড়ির ভেতরে কোথাও একটা দরজা খোলার শব্দ হলো।
তারপর ধীরে ধীরে গেটটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ঋতম ফিসফিস করে বলল, “হাওয়ায় খুলে গেল নাকি?”
অরিত্র গেটের কবজার দিকে তাকাল। জং ধরা লোহার গেটটা এত ভারী যে সামান্য হাওয়ায় খোলার কথা নয়।
ভেতরে ঢুকে তারা একটা পাথরের পথ ধরে এগোতে লাগল। বাড়ির সামনে পৌঁছতেই অরিত্র দেখল, প্রধান দরজার পাশে একটা কেরোসিনের লণ্ঠন জ্বলছে।
দরজায় ঝুলছে একটি নীল খাম।
তার ওপর লেখা—
‘অরিত্রর জন্য।’
অরিত্র খামটা খুলল। ভেতরে একটি ছোট চাবি এবং কাগজের টুকরো।
‘দোতলার সতেরো নম্বর ঘর। সেখানে যা আছে, তা তোমার জন্মের আগের সত্যি।’
ঋতম কাগজটা পড়ে বলল, “আমরা একসঙ্গে যাব। তুই আগে, আমি পেছনে।”
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একটা পুরোনো গন্ধ নাকে এল। ধুলো, স্যাঁতসেঁতে কাঠ আর বহুদিন বন্ধ থাকা ঘরের গন্ধ। দেওয়ালে সারি সারি ছবি। ছোট ছোট শিশুদের ছবি। প্রত্যেকের ছবির নিচে একটি করে নাম ও তারিখ লেখা।
অরিত্র ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা ছবির সামনে এসে থেমে গেল।
ছবিতে সাত বছরের একটি ছেলে। পরনে সাদা জামা, কালো হাফপ্যান্ট। চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে পরিচিত।
ছবির নিচে লেখা—
‘অরুণ মজুমদার। জন্ম: ১৪ নভেম্বর ১৯৯২।’
অরিত্রর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
তার যমজ ভাইয়ের ছবি এই বাড়ির দেওয়ালে কেন?
ছবির পাশে আরেকটি ছবি। সেখানে এক মহিলার কোলে দুটি শিশু। মহিলার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তাঁর গলার রুপোর লকেটটা অরিত্র চিনতে পারল।
সেটা তার মায়ের লকেট।
ছবির নিচে লেখা—
‘মধুমিতা মজুমদার। পরিচর্যাকারী।’
ঋতম বলল, “তোর মা এখানে কাজ করতেন। কিন্তু তোর পরিবার তো কখনও বলেনি।”
অরিত্র ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে শুধু বলা হয়েছিল, মা বাড়িতে থাকতেন। বিয়ের পর কোথাও চাকরি করেননি।”
“তাহলে কেউ একজন তোকে ইচ্ছা করে অনেক কিছু জানতে দেয়নি।”
ঠিক সেই সময় দোতলার ওপর থেকে একটা শিশুর হাসির শব্দ ভেসে এল।
দুজনেই মাথা তুলে তাকাল।
হাসিটা আবার শোনা গেল।
তারপর একটা কণ্ঠ বলল, “দাদা, এত দেরি করলে কেন?”
অরিত্রর সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
ঋতম তার হাত চেপে ধরল।
“শুনেছিস?”
অরিত্র মাথা নাড়ল।
দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তাদের মনে হচ্ছিল, বাড়িটা যেন প্রতিটি পদক্ষেপ গুনছে। সতেরো নম্বর ঘরের দরজাটা করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে।
দরজায় তালা ঝুলছে।
অরিত্র নীল খামের ভেতর পাওয়া চাবিটা বের করল। চাবি ঢুকিয়ে ঘোরাতেই তালাটা খুলে গেল।
দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে তারা দেখল, ঘরের মাঝখানে একটা কাঠের টেবিল। তার ওপর পুরোনো টেপ রেকর্ডার, একটা ফাইল, কয়েকটি চিঠি এবং একটি ছোট আয়না।
দেওয়ালে কালো রঙে লেখা—
‘একটি শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকটি শিশুর পরিচয় মুছে দেওয়া হয়েছিল।’
ঋতম ফাইলটা খুলল। ভেতরে হাসপাতালের কাগজপত্র, শিশুদের নামের তালিকা এবং কয়েকটি হাতে লেখা রিপোর্ট।
একটি রিপোর্টের তারিখ ১৪ নভেম্বর ১৯৯২।
অরিত্র দ্রুত পড়তে লাগল।
সেখানে লেখা ছিল, একই রাতে দুইটি শিশুর জন্ম হয়েছিল। দুই শিশুর মা মধুমিতা মজুমদার। কিন্তু হাসপাতালের রেজিস্টারে একটি শিশুর নামের পাশে লাল কালিতে লেখা—
‘স্থানান্তরিত।’
অন্য শিশুর নামের পাশে—
‘অভিভাবকের কাছে হস্তান্তরিত।’
কোন শিশুকে কোথায় পাঠানো হয়েছিল, তার উল্লেখ নেই।
ঋতম বলল, “এখানে হাসপাতালের সিল আছে। কিন্তু নথির শেষ পাতাটা ছেঁড়া।”
অরিত্র ফাইলের ভেতর থেকে একটি চিঠি বের করল।
চিঠিটা লেখা দেবব্রত মজুমদারের নামে।
‘আপনি যে শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন, তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করবেন না। বিনিময়ে অন্য শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। আপনি যদি চুক্তি ভঙ্গ করেন, তবে দুজনের জীবনই বিপন্ন হবে।’
চিঠির শেষে কোনও স্বাক্ষর নেই।
শুধু একটি প্রতীক—একটি নীল বৃত্তের মধ্যে কালো ত্রিভুজ।
ঋতম প্রতীকটা দেখে চমকে উঠল।
“এই চিহ্নটা আমি আগে দেখেছি।”
“কোথায়?”
“পুরোনো সংবাদপত্রের একটা ছবিতে। প্রায় তিরিশ বছর আগে একটা শিশু পাচার চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছিল। কয়েকজন হাসপাতালকর্মী আর আশ্রমের কর্মচারীর নাম উঠে এসেছিল। কিন্তু তদন্ত হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।”
অরিত্রর গলা শুকিয়ে এল।
“তাহলে কি আমার ভাইকে পাচার করা হয়েছিল?”
“এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে নথিগুলো স্বাভাবিক নয়।”
হঠাৎ টেপ রেকর্ডারটা নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।
খসখসে শব্দের পর একটা পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।
“যদি এই রেকর্ডিং কেউ শুনে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে আমি আর নিরাপদে নেই।”
অরিত্র কণ্ঠটা চিনতে পারল।
তার বাবা।
রেকর্ডিংয়ে দেবব্রত বলছেন, “আমার নাম দেবব্রত মজুমদার। ১৯৯২ সালের ১৪ নভেম্বর আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী মধুমিতা যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম এক সন্তানকে নিয়ে। অন্য সন্তানকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেটা আমি জানতাম না—অন্তত প্রথমে জানতাম না।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর আবার কণ্ঠ ভেসে এল।
“যে মানুষটি আমাকে বলেছিল অন্য শিশুটি মারা গেছে, সে মিথ্যে বলেছিল। আমি অনেক বছর পর জানতে পারি, শিশুটি বেঁচে আছে। তাকে এই আশ্রমে রাখা হয়েছিল। মধুমিতা তাকে খুঁজে পেয়েছিল। তারপর থেকেই সবকিছু বদলে যায়।”
অরিত্রর চোখে জল চলে এল।
রেকর্ডিংয়ে বাবা বলছেন, “আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল, সত্যি প্রকাশ করলে অরিত্রকে হারাব। আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী আমাকে ক্ষমা করেনি। ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর সে নীলকুঠিতে ফিরে আসে। তারপর…”
হঠাৎ রেকর্ডিং থেমে গেল।
ঋতম টেপ রেকর্ডারটা পরীক্ষা করল।
“ক্যাসেটের ফিতা জ্যাম হয়ে গেছে।”
অরিত্র বলল, “বাকিটা শুনতেই হবে।”
সে ক্যাসেটটা বের করে যত্ন করে রাখল। ঠিক তখনই ঘরের পেছনের দেওয়ালে একটা শব্দ হলো।
টক।
তারপর আবার—
টক। টক।
দুজনেই ঘুরে তাকাল।
দেওয়ালের এক পাশে একটা পুরোনো কাঠের আলমারি। আলমারির দরজা সামান্য ফাঁক হয়ে রয়েছে। ভেতর থেকে যেন কেউ আঙুল দিয়ে কাঠে টোকা মারছে।
ঋতম ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
“ভেতরে কেউ আছ?”
কোনও উত্তর নেই।
সে আলমারির দরজা খুলতেই ভেতর থেকে একটা পুরোনো পুতুল মেঝেতে পড়ে গেল। পুতুলটার চোখে কালো বোতাম, গায়ে নীল জামা।
পুতুলটার সঙ্গে বাঁধা একটি কাগজ।
অরিত্র কাগজটা খুলল।
‘দাদা, তুমি যদি সত্যিই আমাকে খুঁজতে আসো, তাহলে মনে রেখো—আমি তোমার শত্রু নই। কিন্তু তুমি যাকে বাবা বলে জানো, সে আমার জীবন কেড়ে নিয়েছিল।’
নীচে লেখা—
‘অরুণ।’
রাত বারোটা পেরিয়ে গিয়েছিল।
অরিত্র আর ঋতম ঘরের প্রতিটি কাগজ পরীক্ষা করছিল। এমন সময় করিডরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
এবার শব্দটা স্পষ্ট।
কেউ একজন ধীরে ধীরে সতেরো নম্বর ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে।
ঋতম দরজার পাশে দাঁড়াল। অরিত্র টেবিলের ওপর রাখা লণ্ঠনটা তুলে নিল।
পায়ের শব্দ দরজার সামনে এসে থেমে গেল।
তারপর বাইরে থেকে একটা পুরুষকণ্ঠ বলল, “অরিত্র।”
কণ্ঠটা তার বাবার।
অরিত্র দরজার দিকে ছুটে গেল।
“বাবা!”
দরজা খুলতেই সে দেখল, দেবব্রত মজুমদার দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর জামাকাপড় ভেজা, কপালে কাটা দাগ, চোখের নিচে কালচে ছাপ।
অরিত্র বাবাকে জড়িয়ে ধরতে গেল। কিন্তু দেবব্রত হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।
“আমাকে ছুঁস না।”
“কী হয়েছে তোমার? কোথায় ছিলে?”
দেবব্রত ঘরের ভেতরে ঢুকে টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলোর দিকে তাকালেন। তাঁর মুখের ভাব দেখে মনে হলো, তিনি সবকিছু আগেই জানতেন।
ঋতম বলল, “আপনি জানতেন এই বাড়িতে কী আছে?”
দেবব্রত তার দিকে তাকালেন।
“তুমি কে?”
“আমি অরিত্রর বন্ধু।”
“তোমার এখানে আসা উচিত হয়নি।”
অরিত্র বাবার হাত ধরে বলল, “আমার যমজ ভাই কোথায়?”
দেবব্রত চোখ বন্ধ করলেন।
“আমি জানি না।”
“মিথ্যে বলছ! তোমার রেকর্ডিং শুনেছি। তুমি জানো অরুণ বেঁচে আছে।”
“আমি জানতাম সে বেঁচে আছে। কিন্তু কোথায় আছে, জানতাম না।”
“তাহলে এত বছর আমাদের কাছ থেকে সব লুকিয়েছ কেন?”
দেবব্রত চুপ করে রইলেন।
অরিত্র এবার চিৎকার করে বলল, “মা কোথায়?”
প্রশ্নটা শুনে দেবব্রত যেন হঠাৎ ভেঙে পড়লেন। তিনি চেয়ারে বসে মুখে হাত দিলেন।
“তোর মা আমাকে কখনও ক্ষমা করেনি। আমি তাকে বাঁচাতে পারতাম। কিন্তু পারিনি।”
“কী হয়েছিল সেদিন?”
দেবব্রত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর মধুমিতা এখানে এসেছিল অরুণকে নিয়ে যেতে। সে জানতে পেরেছিল, অরুণকে অন্য নামে বড় করা হচ্ছে। তার কাছে প্রমাণ ছিল। কিন্তু আশ্রমের যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারা তাকে আটকে দেয়। আমি খবর পেয়ে এখানে এসেছিলাম। তোর মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।”
“তারপর?”
“আমরা ঝগড়া করেছিলাম। সে বলেছিল, আমি যদি সত্যি প্রকাশ না করি, তাহলে সে নিজেই সব জানাবে। আমি তাকে থামাতে পারিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ির পেছনের দিক থেকে চিৎকার শুনতে পাই। দৌড়ে গিয়ে দেখি, মধুমিতা নেই।”
“তুমি পুলিশকে বলেছিলে, মা নদীতে পড়ে মারা গেছেন।”
দেবব্রত মাথা নিচু করলেন।
“আমাকে তাই বলতে বলা হয়েছিল।”
“কারা বলেছিল?”
দেবব্রত মুখ খুললেন, কিন্তু শব্দ বেরোল না।
ঠিক তখনই ঘরের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারে কেউ একজন হাসল।
একটি যুবক কণ্ঠ।
“বাবা, এত বছর পরেও তুমি সত্যিটা বলতে পারলে না?”
দরজার কাছে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে ছিল।
ঋতম মোবাইলের আলো জ্বালল।
আলোর বৃত্তে দেখা গেল একজন যুবক। কালো জামা, ভেজা চুল, ডান গালে লম্বা কাটা দাগ।
অরিত্র ছবির যুবকটিকে চিনতে পারল।
অরুণ।
তার যমজ ভাই।
অরিত্র এক পা এগিয়ে গেল।
“তুমি অরুণ?”
যুবকটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তুমি আমাকে খুঁজতে এসেছ, নাকি নিজের পরিচয় বাঁচাতে?”
অরিত্রর গলা কেঁপে উঠল।
“আমি শুধু সত্যিটা জানতে চাই।”
অরুণ হেসে উঠল। সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না, ছিল বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ।
“সত্যি? সত্যিটা খুব সহজ, দাদা। আমাদের জন্মের রাতে একজন শিশুকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্যজনকে এমন জায়গায় পাঠানো হয়েছিল, যেখানে তার নাম, পরিচয়, সবকিছু বদলে দেওয়া হয়। আর সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আমাদের বাবা।”
দেবব্রত উঠে দাঁড়ালেন।
“অরুণ, আমি যা করেছি, ভয়ে করেছি।”
“ভয়? তুমি আমাকে একবারও খুঁজতে আসোনি। মা যখন আমাকে খুঁজে পেয়েছিল, তখনও তুমি তাকে সাহায্য করোনি।”
অরুণের চোখ লাল হয়ে উঠেছিল।
অরিত্র বলল, “কিন্তু মা কোথায়? তুমি জানো?”
অরুণ তার দিকে তাকাল।
“মা বেঁচে আছে।”
অরিত্রর বুকের ভেতর যেন আলো জ্বলে উঠল।
“কোথায়?”
অরুণ উত্তর দেওয়ার আগে পকেট থেকে একটা ছোট চাবি বের করল। চাবিটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, “এই বাড়ির নীচে একটা ঘর আছে। সেই ঘরে মায়ের শেষ চিঠি রাখা। চিঠিতে সব লেখা আছে।”
ঋতম বলল, “তাহলে আমাদের সেখানে নিয়ে চলো।”
অরুণ মাথা নাড়ল।
“আমি কাউকে কোথাও নিয়ে যাব না। তোমরা নিজেরাই খুঁজে নাও।”
অরিত্র চাবিটা হাতে নিল।
“তুমি আমার সঙ্গে যাবে না?”
অরুণ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল, “আমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে ছোটবেলা থেকেই মিথ্যে দিয়ে বড় করা হয়েছে। অন্যজনকে বড় করা হয়েছে ঘৃণা দিয়ে। তুমি জানো না, তোমার জন্য কতজনের জীবন নষ্ট হয়েছে।”
“আমি তো কিছুই জানতাম না!”
“সেটাই তোমার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল।”
অরুণ ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
অরিত্র তার পেছনে ছুটল।
“দাঁড়াও! অন্তত একবার আমার সঙ্গে কথা বলো!”
অরুণ থামল না।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে অন্ধকার করিডরে মিলিয়ে গেল।
অরিত্র দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি, বারান্দা, উঠোন—কোথাও কেউ নেই।
গেটের কাছে পৌঁছে সে দেখল, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু ভেজা মাটিতে কোনও পায়ের ছাপ নেই।
যেন অরুণ কখনও এই বাড়িতে আসেইনি।
দেবব্রত তখনও সতেরো নম্বর ঘরে বসে ছিলেন।
অরিত্র ফিরে এসে বাবার সামনে দাঁড়াল।
“নীচের ঘরটা কোথায়?”
দেবব্রত ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।
“ওই ঘর খুলিস না।”
“কেন?”
“কারণ তোর মা সেখানে নেই।”
“তুমি কীভাবে জানো?”
দেবব্রত উত্তর দিলেন না।
অরিত্র চাবিটা শক্ত করে ধরে বলল, “আমি আর মিথ্যে শুনব না।”
সে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল। প্রধান দরজার পাশের দেওয়ালে হাত বোলাতে বোলাতে একটা সরু কাঠের দরজা খুঁজে পেল। দরজাটা বাইরে থেকে দেওয়ালের রঙে ঢেকে রাখা হয়েছিল। তালার গায়ে মরচে পড়ে আছে।
অরিত্র চাবিটা ঢোকাল।
তালা খুলে গেল।
দরজার ওপারে সরু সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। অরিত্র মোবাইলের আলো জ্বেলে নামতে লাগল। পেছনে ঋতমও এল।
সিঁড়ির শেষে একটা ছোট ঘর।
ঘরের মাঝখানে কাঠের টেবিল। তার ওপর একটি টেপ রেকর্ডার, কয়েকটি ফাইল এবং একটি লাল কাপড়ে মোড়া বাক্স।
দেওয়ালে টাঙানো ছিল মধুমিতার একটি ছবি।
ছবির নিচে লেখা—
‘আমি হারিয়ে যাইনি। আমাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
অরিত্র ছবির সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর বাক্সটা খুলল।
ভেতরে একটি চিঠি।
মায়ের হাতের লেখা।
‘অরিত্র ও অরুণ,
যদি তোমরা দুজন এই চিঠি একসঙ্গে পড়তে পারো, তবে বুঝব আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ইচ্ছেটা পূরণ হয়েছে। তোমাদের আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল এমন একটি অপরাধ ঢাকতে, যার সঙ্গে তোমাদের কোনও সম্পর্ক ছিল না।
তোমাদের জন্মের রাতে আমি শুধু দুই সন্তানের মা হইনি। আমি এমন একটি সত্যের সাক্ষী হয়েছিলাম, যা প্রকাশ পেলে কয়েকজন ক্ষমতাবান মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যেত।
আমি জানতাম, তোমাদের একজনকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তাই আমি প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছিলাম।
কিন্তু যে মানুষটিকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম, সে-ই আমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।
তোমাদের বাবা আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল কি না, তা নিয়ে আমার আর কোনও প্রশ্ন নেই। কারণ সে সত্যের পাশে দাঁড়ায়নি।
তবে মনে রেখো, তোমাদের জন্মের রহস্য শুধু তোমাদের পরিচয়ের রহস্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি শিশুর জীবন।
সেই শিশুটি এখনও জানে না, তার প্রকৃত বাবা-মা কারা।’
চিঠির শেষ অংশটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
অরিত্র আর ঋতম একে অপরের দিকে তাকাল।
ঋতম বলল, “আরও একটি শিশু?”
অরিত্র চিঠিটা আলোয় তুলে ধরল। ছেঁড়া অংশের নিচে খুব হালকা কালির দাগ দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ ওপরের লেখা মুছে ফেলেছে। সে আঙুল দিয়ে কাগজটা স্পর্শ করল।
হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা টেপ রেকর্ডার চালু হয়ে গেল।
এবার মায়ের কণ্ঠ।
“অরিত্র, যদি তুই এই রেকর্ডিং শুনিস, তাহলে বুঝবি আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারছি না। তোর ভাইকে খুঁজে পেলে তাকে বলিস, আমি তাকে কোনও দিন ছেড়ে যাইনি। আর দেবব্রতকে বলিস, সে যেন নিজের অপরাধের শাস্তি মেনে নেয়।”
একটু বিরতি।
তারপর মায়ের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।
“কিন্তু সবথেকে ভয়ংকর সত্যিটা এখনও বলা হয়নি। যে মানুষটি তোদের দুজনকে আলাদা করেছিল, সে তোদের পরিবারেরই একজন।”
রেকর্ডিং থেমে গেল।
ঘরের ভেতরে নেমে এল গভীর নীরবতা।
অরিত্র ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।
সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন দেবব্রত।
তাঁর হাতে একটি রিভলভার।
অরিত্রর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
দেবব্রত কাঁপা গলায় বললেন, “চিঠিটা আমাকে দে।”
“কেন?”
“কারণ ওটা তোর মায়ের লেখা শেষ চিঠি নয়।”
“তাহলে শেষ চিঠিটা কোথায়?”
দেবব্রত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—
“যে মানুষটাকে তুই এতক্ষণ ধরে খুঁজছিস, সে শুধু তোর ভাই নয়।”
অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।
দেবব্রতর চোখে জল এসে গেছে।
“সে-ই তোদের মাকে শেষবার দেখেছিল। আর সে-ই জানে, তোর জন্মের রাতে তৃতীয় শিশুটিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”
“তৃতীয় শিশু?”
দেবব্রত মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ, অরিত্র। তোদের জন্মের রাতে হাসপাতালে দুটো নয়, তিনটি শিশু ছিল।”
ঠিক তখনই ঘরের পেছনের দেওয়ালে একটা ভারী শব্দ হলো।
দেওয়ালের একটা অংশ ধীরে ধীরে সরে গেল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল—
“দেবব্রত, আর মিথ্যে বলো না।”
অরিত্রর হাত থেকে চিঠিটা পড়ে গেল।
কণ্ঠটা তার পরিচিত।
সেই কণ্ঠ সে ফোনে শুনেছিল।
সেই কণ্ঠ তার শৈশবের ঘুমপাড়ানি গানের মধ্যে ছিল।
তার মা।
অন্ধকারের মধ্যে একটি ছায়ামূর্তি এগিয়ে এল।
আর সেই ছায়ার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন—যার মুখ অরিত্রর মতো, অরুণের মতো, অথচ দুজনের কারও মতো নয়।
মহিলা ধীরে ধীরে বললেন—
“তোমাদের দুজনের জন্যই এত বছর অপেক্ষা করেছি। কিন্তু তোমরা এখনও জানো না, তোমাদের মধ্যে কে আসল অরিত্র।”
চলবে…